দেখতে দেখতে কাটলো আরো ৬ দিন।এর মধ্যে সোহা আর রাফিনের বিয়ের ডেইটও ফিক্স করে ফেলেছে রেগান সিং,,,সামনের মাসের ১৩ তারিখ,,,,আর মাত্র কিছু দিন হাতে,,,,সোহা মনে মনে এবার ভেবেই নিলো তার প্রিন্স আর তাকে নিতে আসবে না,,,তাতে কি?সোহা কি অন্য কাউকে বিয়ে করবে নাকি,,কক্ষনো নাহ,,,বিয়ের দিনই নিজেকে শেষ করবে সোহা,,,প্রতিজ্ঞা করেছে সে নিজের কাছে,,,আদ্রের প্রতি তার ভালোবাসার কাছে।,,,,,,,,রাফিন এসে একটু আগেই বলে গেলো,,,,কাল দুপুরেই রওয়ানা হবে তারা,,,,ঋষিকেশ থেকে বাসে সোজা মুম্বাই,,,সেখানে স্টেশন থেকে ট্যাক্সি নিয়ে কনসার্ট হল।,,,,
ঐদিকে আদ্রের বাড়িতেও গোছগাছ শেষ।এক্ষুনি রওয়ানা দিবে সবাই।সবাই বলতে আদ্র,বিহান,রুসা,রিসব,সায়মান, শারমায়া,ইমুও আছে,,,আর যাচ্ছে জিমান, সিমান সহ আদ্রের ব্যান্ডের বাকি সদস্যরা। একই ফ্লাইটে যাচ্ছে সবাই।মুম্বাই এয়ারপোর্ট থেকে একটা আলিসান হোটেলে রেস্ট নিবে সবাই,,,এর মধ্যে আদ্রের ব্যান্ডও লাস্ট রিহার্সাল করে নিবে। তারপর সন্ধ্যায় কনসার্ট হল।,,,,,,,
()()()()()()()
এন্ট্রিগেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই থ হয়ে গেলো সোহা,এত বড় অডিটোরিয়াম,,,, যার সম্পুর্ণই ডেকোরেট করা,,,অবাক হয়ে সোহা বলেই উঠলো...
"জানেন,,,আমাদের দেশের ক্রিকেট প্লে গ্রাউন্ডটাও এতো বড় নাহ,,".
রাফিন হেসে দিলো,,, তবে রেগান সিং তেজি কন্ঠে বললো...
" ইহা এতনি জোর সে বাত মাত কার লারকি,,,(এখানে এতো জোরে কথা বলবি না মেয়ে)"
শেষ,,,, অবাকতা শেষ হয়ে গেলো সোহার।আসতিয়া কিছু একটা ইশারা করতেই সোহা বেগুনি রঙের ওরনাটা আরেকটু মাথায় টেনে নিলো।
রাফিন বললো...
"ভাইয়া,,,দো সীট আগমে হেয়৷ ওর দে পিছে হেয়।"
রেগান বললো...
"একসাথ মিলা নেহি?"
রাফিন মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো..
"ওহ,,ভাইয়া,,,মেয় ওর সোহা... "
রেগান বুঝলো ব্যাপারটা,,,আসতিয়াকে নিয়ে সামনে থেকে চার নম্বর সারির দুটো সীটে বসলো।,,,,রাফিন সোহার হাত ধরে একেবারে প্রায় শেষের দিকে নিয়ে গেলো,,,, তারা সীট পায়নি,,,মিথ্যা বলেছিলো,,,,সে সোহাকে বললো..
"আসালমে সোহা,,,, মেয় কোয়ি সীট নেহি লিয়া,,,,গানা হে তো,,,,বেঠি বেঠি দেখনেমে মাজা নেহি আতি,,,,তুজে প্রবলেম হোগি কেয়া?"
সোহা মাথা নাড়ালো।যার মানে তার কোনো সমস্যা নেই।,,,,,
লাখ লাখ মানুষের ভীরে রেগান আর রাফিনদের দুরত্ব অনেকটাই বাড়িয়ে দিলো।,,,একটু পরেই স্পিকারে এংকার বলতে লাগলো...
"লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যানস,,,, আপলোগ আজ ইতনা দুর দুর সে আয়া হে,,,উসকে লিয়ে,,, যো হামারি নেহি,,বাংলাদেশ কি গৌরাব হেয়য়,,বাট, নাও ওহ ইস দুনিয়াকি গৌরাব হেয়,৷ সোওওও,,,ওয়ালকাম ব্যাক দা গ্রেট আদ্রিয়ান জুনায়েদ।"
মুহুর্তেই আরো জোরে হৈ-হুল্লোড় পড়ে গেলো সারা অডিটোরিয়াম জুড়ে। চারদিকে শোরগোল,,, কিন্তু এই লাখ লাখ মানুষের ভীরে থমকালো একজন।,,,ঐ সাধারণ এংকারের কথা গুলি তার কাছে কম্পমান অগ্নি শিখার আলোকছটার থেকেও বেশি কিছু মনে হলো,,,মনে হলো সে অবান্চিত করে ছু সুনলো মাত্রই।পাশে উল্লাসে মেতে থাকা রাফিনের হাতটা হালকা চেপে ধরলো। ভাঙা কন্ঠে বললো...
"ক্ কি নাম বললো?"
সে খুশি মনেই বললো...
"আদ্রিয়ান জুনায়েদ,,,, হেয় সোহা,,,,তেরি কান্ট্রিসে হেয় ইয়ে।,,,তু জানতি হেয় ইসকো?"
আদ্রিয়ান জুনায়েদ ছাড়া বাকি কথা যেন কানেই গেলো না সোহার।,,,রাফিনও আর ঘাটলো না,,,,হাততালি দিয়ে খুশিতে স্বাগতম জানাতে লাগলো সেই অপ্রত্যাশিত ব্যাক্তিটিকে,,,অথচ সে জানেই না৷ এই ব্যাক্তির জন্য সে তার জিবনের প্রথম প্রেম হারাতে পারে,,,সে জানেই না যে,,এই ব্যক্তির জন্যই সোহা তার প্রনয় ডাকে সারা দেয় না,,বারবার প্রত্যাখান করে।,,,,
সোহা বাক শূন্য। কি করবে এখন সে?,,,তার প্রিন্স এসেছে,,,,,তার প্রিন্স,,,,এবার? এবার কি করা উচিৎ তার??,,ছলছল দৃষ্টিতে তাকালো স্টেজের দিকে,,,,, অনেক দুরে,,,,বোঝা যাচ্ছে কয়েকজন উঠে আসছে স্টেজে,,,তবে এটা বোঝা যাচ্ছে না কারা এরা,,,,,,,চোখ গেলো উপরে থাকা বিশাল পর্দায়,,,যেখানে স্পষ্ট ভাসছে তার আদ্র স্যারের অবয়ব।হাতে গিটার,,,সেই পুরোনো গিটারটা,,,,হ্যা,,,সোহা এটা চিনে,,,অনেকবার বাজিয়েছে,,,চিনবে না কেন,,,আদ্র,,,তার প্রিন্স,,,কতদিন পর?,,কতদিন পর দেখছে এই মুখটা?জানে না,,,কিচ্ছু জানেনা সোহা,,,তবে সে জানে এই লোকটা তার,,,হ্যা,,,এই লোকটাই তার প্রিন্স।ঐ তো মাইক্রোফোন হাতে তুললো সে।,,,,সোহা একবার অডিটোরিয়ামে চোখ বুলালো,,,,লক্ষ লক্ষ হাত উপরে দুলছে,৷ সাথল সাথে কানে ভাসছে, সবার একতালে বলে উঠা দু তিনটা শব্দ,,, "ওয়েলকাম ব্যাক আদ্রিয়ান,,৷ "
হৃদয় থেমে যাচ্ছে সোহার,,,,আঙুল উঠিয়ে বড় পর্দাটার দিকে তাক করলো সোহা....
"এ্ এটা কি সত্যিই?"
রাফিন শুনলো,,,হেসে হেসেই বললো...
"হা সোহা রানি,,,,স্টেজ কো হি দেখাতা হে ইয়ে।,,,"
দুনিয়া ঘুরছে সোহার,,৷ হ্যা,,,সত্যিই ঘুরছে,,,নাহ,,,সে ঘুরছে,,,না না,,,বাকি সব ঘুরছে,,,,আওলাচ্ছে সোহা৷, এমন সময় কানে ভেসে এলো সেই পুরোনো গলা,,,সেই একই সুরে গাওয়া গান৷,,,,তার আদ্র স্যারের কন্ঠে গাওয়া গান......
Yea dil tanha kiu rehe...
kiu hum tukroo mein jiye.
সোহার হৃদয়ে উথাল পাথাল অবস্থা। আদ্রের ভারি কন্ঠ যেন তাকে আদ্রের সীমা জানান দিচ্ছে।,,,,,
আদ্র একটু থামলো,, সব নিস্তব্ধ,,, একটু পর সেই নিস্তব্ধতাকে ছারিয়ে আদ্র আবার গেয়ে উঠলো...
,,,Main adhuraaa ji raha hu,
khud par eye ak saja hu.
Mujhe teri jarurat hain,,
Mujhe teri jarurat hain,,
Mujhe teri jarurat hain....
আর সইতে পারলো না সোহা,,,চোখ বন্ধ করে লুটিয়ে পড়লো,,, রাফিনের খেয়াল হতেই ধরলো তাকে।উৎকন্ঠা সে...
"সোহা,,,সোহা?,কেয়া হোগেয়া তেরে কো?,,আখে খোল সোহা?"
জ্ঞান নেই সোহার।তাদের সামনে থাকা ব্যক্তিটি উঠে সোহাকে বসালো একটা চেয়ারে,,,রাফিন তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে,,,,,
লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের ভীরে আশেপাশের ৮-৯ জন ছাড়া আর কারোরই তেমন চোখে পড়লো না সোহাকে,,,সবাই ব্যস্ত মঞ্চে থাকা আদ্রের গানের তালে নিজেদের বিভোর করতে।,,,,,
প্রায় ১০-১২ মিনিট পর রাফিন সক্ষম হলো সোহার জ্ঞান ফেরাতে। এর মধ্যে আদ্র, বিহান, তাদের ব্যান্ড সহ একটা বাংলা গানও গাইলো,,,,,দর্শকরা লক্ষ্য করলো আগের মতো আদ্রের চোখে মুখে আর উচ্ছ্বাস নেই,,,গানগুলোও কেমন বিরহের জানান দিচ্ছে।,,, সোহা তাকালো আদ্রের দিকে,,,গান প্রায়ই শেষ পর্যায়ে। পাশ থেকে রাফিন বললো...
"সোহা?তু ঠিক হেয় না?,,বোল?"
কথাটার উত্তর পেলো না রাফিন,,,সোহা ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে,,৷ কাপা কাপা আঙুলটা তাক করলো পর্দায় থাকা আদ্রের দিকে।ক্লান্ত কাপা কন্ঠে বললো...
"আ্ আমার প্ প্রিন্স"
থমকালো রাফিন,,,কি বললো সোহা,,,তার প্রিন্স?সেই প্রিন্স?যার জন্য সোহা রাফিনের কাছে ধরা দিতে চায় না?,,,,
সোহার দিকে তাকালো রাফিন৷ আবার আদ্রের দিকে।,,, এটা হতে পারে নাহ,, তার সোহা তাকে ছাড়তে পারে নাহ,,,,তাড়া দিয়ে সোহাকে বললো...
"আদ্রিয়ান জুনায়েদ?সোহা?ওহ তেরি প্রিন্স?"
সোহাও উৎফুল্ল হয়ে বললো...
"হ্যা,,,,আমার প্রিন্স,৷ আদ্রিয়ান জুনায়েদ,,আমার আদ্র স্যার,,,উনিই আমার প্রিন্স,৷ "
রাফিন কিছু বুঝতে পারছে না,,,এতো বড় মাপের সিঙ্গার কিনা সোহার প্রিন্স?এটা কি করে সম্ভব?এতো দিন সোহা এই প্রিন্সের কথা বলতো?,,,আচ্ছা?উনার সোহাকে মনে আছে?না না না,,,এতোগুলো দিনে নিশ্চয়ই ভুলে গেছে উনি সোহাকে।হ্যা,,,ভুলেই গেছে..
এসব ভেবেই রাফিন সোহার হাত ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললো...
"ওহ তুজে ভুল গেয়া সোহা,,,,ইয়াদ নেহি হেয় উসকা তুজে,,,ওহ ইতনি ছোটি বাত ইয়াদ মে নেহি রাখেগি সোহা.."
সোহা অনবরত মাথা ডানে বামে নাড়ছে।কিছু বলতে পারছে না৷ তার আদ্র স্যার তাকে ভুলে নি,,,,কান্নার কারনে কথাটা মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না তার।
''''''''
গান শেষ করে আদ্র হাতের গিটারটা নিচে স্ট্যান্ডে রাখলো,,,মাইক্রোফোনটা হাতে তুলে নিলো,,,, দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে আদ্রের কথা শোনার জন্য। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আদ্র হাত উচু করে সবার মনোবল আকর্ষণ করলো।এরপর হাত নামালো,,, বলে উঠলো...
"It’s Adriyan Junayed,,,,,Can I sey something in my won language? " (আমি কি আমার নিজের ভাষায় কিছু বলতে পারি?)"
সকল দর্শক চেচিয়ে সায় জানালো।,,,,কেউ কেউ বাংলা বোঝে,,,আবার কেউকেউ না বুঝলেও শুনবে,,একটু হলেও বুঝবে তো...
আদ্র একটু থেমে বলা শুরু করলো...
"এটা আমার কাম ব্যাক শো।,,,হারিয়ে গিয়েছিলাম আমি গত সাত মাস আগে।কেন জানেন??,,,"
সবার মধ্যে উত্তেজনা,,, আদ্রের হারিয়ে যাওয়ার গল্প শোনার জন্য, , আদ্র একটু থেমে কাতর কন্ঠে বলে উঠলো...
"কারন,,,আমার সর্বাঙ্গ জুড়ে যে একটা মানুষের বসবাস ছিলো?,,সে হারিয়ে গিয়েছে।,,,,"
আদ্র চোখ বন্ধ করলো,,,কার্নিস বেয়ে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা জল।বড় পর্দায় প্রায় সকলেই লক্ষ্য করলো তা।,,,কাতর কন্ঠে আদ্র বলে উঠলো...
"আ্ আমার ডল৷,,,, আমার পুতুলটা হারিয়ে গেছে আমার থেকে।"
এতক্ষণ সোহাকে বোঝাতে ব্যাস্ত ছিলো রাফিন,যে আদ্র তাকে ভুলে গেছে।আদ্রের কথায় তেমন মন ছিলো নাহ।কিন্তু হঠাৎ ডল,,,পুতুল,,,শব্দ গুলো শুনেই থেমে গেলো রাফিন।,,,ফিরে তাকালো স্টেজের দিকে,,,,শুনতে লাগলো আদ্রের কথা।সোহাও ছলছল চোখে তাকালো তার প্রিন্সের দিকে।..
"আগেও বলেছিলাম আমি,,,আমার একটা ছোট্ট পুতুল ছিলো।,,খুব যতনের সে।যবে থেকে দেখা হয়েছিলো,,,তবে থেকেই আমার হৃদয়ের সবটা দখল করে নিলো সে।সম্মোহন করে রেখেছে একদম,,,ওয়ান কাইন্স অফ হেলুসিনেশন।,,সম্মোহীনি,,তার নাম সম্মোহীনি,,,নিজের নামটাকেই বেছে নিলো আমায় ভালোবাসায় জড়ানোর জন্য।,,, এমন ছিলো সে,নিজের অজান্তেই আমাকে মোহিত করতো,,দিন দিন আমি তার মায়ায় এতোটাই ডুবে গেলাম যে মনে হতো,,,ডুবে ডুবেই শান্ত আমি,,,,ইয়াহ গায়েজ,,,তখন এই আদ্র রিয়েলাইজ করেছিলো যে সে প্রেমে পরেছে।একটা ছোট্ট,, পিচ্চি পুতুলের প্রেমে পড়েছে।,,, তবে আমার ধারনা ভুল ছিলো...."
সোহা থমকালো।কি বলছে আদ্র?ভুল ছিলো মানে?সে কি আর সোহাকে চায় না?চায়না তার পুতুলকে?,,,,
রাফিনও যেন একটু আশার আলো দেখলো,, এই বুঝি আদ্র বলবে যে সোহা শুধু তার মোহ ছিলো,,,প্রেম নাহ,,
সোহার হাতে থাকা নিজের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো রাফিন।,,,,থেমে আদ্র বললো...
"আমি আমার পুতুলের প্রেমে পরিনি,,, একদম প্রেমে পরিনি,,,প্রেমে পড়লে আমি আমার পুতুলকে এতো দিনে ঠিকই ভুলে যেতাম,৷ আমি যে ভালোবেসেছি পুতুলটাকে।,,ভীষন ভালোবেসে ফেলেছি।,,,ভালোবেসেছি বলেই আজও পুতুলটার শূন্যতা আমায় কুড়ে কুড়ে খায়,,,,,,তাকে আজও আমি চাই,,,,ভীষন ভাবে তাকে চাই।, নিজের করে চাই।"