আজকের রাতটার জন্য গত কয়েকমাস কী প্রতীক্ষায়ই না থেকেছে নবনী! এই তো রায়ান বসে আছে ওর সামনে। শেরওয়ানিতে ওকে দেখতে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে। এই ছেলেটা এত সুন্দর কেন? ওর চোখ বারবার রায়ানের দিকে চলে যাচ্ছে। আর যতবার এমন হচ্ছে ততবার চোখ নামিয়ে নিতে হয়েছে৷ কারণ ছেলেটা ওর দিকেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। ওর মধ্যে সত্যিই কি মুগ্ধ হবার মতো কিছু আছে?
"এই যে মেয়ে, সবসময় আমাকে পরাস্ত করার জন্য তোমার ঠোঁটের ডগায় কথা রেডি থাকে। আজ চুপ করে আছ কেন?"
"অনেক কথা একসাথে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। কোত্থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না! তুমিও বা চুপ করে আছ কেন?"
বলেই আবার চুপসে গেল৷ কেবল সোজা তাকিয়ে রইল রায়ানের চোখে।
আজ এত লজ্জা আসছে কোত্থেকে? রায়ানের সাথে কথাবার্তা তো ওর নতুন নয়। তবে আজ কেন সহজ হতে পারছে না। তখনও তো ও রায়ানকে ভালাবাসত, অতি গোপনে। আজ সেটা প্রকাশিত বলে, সম্পর্ক বদলে গেছে বলেই কি এত লাজ অবয়বে ভিড়েছ?
"ভালো তো আমিই আগে বেসেছি, এখন কথাও আমি প্রথমে শুরু করব?"
ঠাট্টাচ্ছলে বলল রায়ান।
"কে বলেছে তুমি আগে থেকে ভালোবাস? তোমার অনেক আগে থেকে আমি তোমাকে ভালোবাসি।"
"ধূর, একদম নয়। তুমি মিথ্যে বলছ!"
নবনী মৃদু হেসে বলল,
"যখন থেকে জেনেছি তোমার বাইরের থেকে ভেতরটা কয়েকগুণ সুন্দর, সেদিনই তোমাতে ডুবেছি। পুরোপুরি ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতেই না নিজেকে আরও শক্ত করেছি। নিজেকে ধমকেছি, তোমাকে কথা শুনিয়েছি। কিন্তু এতে কিছুই হয়নি জানো। আরও বেশী করে ডুবে গেলাম। কখন যে ডুবে মরেছি বুঝতেই পারিনি।"
রায়ান বিস্মিত চোখে নবনীকে দেখছে, এই আবেগপ্রবণ নবনীকে চেনে না ও।
"তবে ফিরিয়ে দিয়েছিলে কেন?"
"ভয়ে।"
"কীসের ভয়?"
"ভালোবাসা পেয়ে হারানোর ভয়। না পেলে যতটা কষ্ট হয়, পেয়ে হারিয়ে ফেললে ভেতরটা গুড়িয়ে যায়। আরেকবার ভেঙে যাবার শক্তি আমার ছিল না, রায়ান। এখনো নেই।"
"আমরা দুজনেই যদি দু'জনকে ভালোবাসি তবে হারানোর ভয় অমূলক নয়?"
দু'দিকে মাথা নাড়ায় নবনী,
"আমি ছাড়া বাবার পুরো পৃথিবী একেবারে শূন্য। এক অসীম একাকীত্বের বোঝা বাবাকে কী করে চাপিয়ে দিতাম বলো তো?"
"আমি তোমাকে কোনোদিনও প্রেসার দেব না নবনী।"
"তুমি এত ভালো কেন রায়ান?"
"এটা কি আমাকে অপ্রস্তুত করার জন্য বললে?"
"না, মন থেকে বলেছি। বাবার পরে আমার দেখা শুদ্ধতম মানুষ তুমি।"
"আমি আঙ্কেল আর তোমার পৃথিবীর ছোট্ট একটা অংশ হতে চাই নবনী?"
"তুমি আসলেই পাগল। তুমি তো আমার পৃথিবীর বাসিন্দা সেই কবেই হয়ে গেছ। নয়তো আজকের রাতটাই আসত না জীবনে।"
রায়ানের নাক টিপে কথাটা বলল নবনী।
রায়ান হেসে ফেলল, "আমি মনে হয় সত্যিই পাগল। তোমার সাথে কথা বলতে গেলেই এমন বুদ্ধুর মতো কথা বলে ফেলি।"
এই কথায় নবনীও হেসে ফেলল।
"নবনী, তুমি আমার জীবনের 'লেডি উইথ দ্যা ল্যাম্প'। আমার ঘুটঘুটে হৃদয়কে আলোকিত করেছ তুমি। নয়তো সেই আঁধারেই নিজের সমাধি হয়ে যেত!"
নবনী ওর হাতটা বাড়িয়ে দিল রায়ানের দিকে, হাতটা ধরে রায়ান মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি পেল। এটা তো শুধু হাত নয়, এটা একটা আহবান। পুরো মানুষটাকে নিজের জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার আহবান! ভালোবাসার কাঙালপনা এবার তবে সত্যিই ঘুচল ওর।
"এই হাত কখনো ছাড়বে না তো রায়ান?"
"নিঃশ্বাস থাকতে তো নয়। এতটা দুঃসাহস আমার নেই নবনী।"
রায়ানের গলায় দৃঢ় প্রত্যয়।
"ছাড়লে কিন্তু আমি সত্যিই মরে যাব রায়ান।"
নবনীর হাতটা আরও কাছে টেনে নিজের হৃদপিণ্ডের উপরে রাখল রায়ান,
"এই হাতটা ছাড়ার আগে যেন আমার এই হৃদ যন্ত্র বিকল হয়ে যায়।"
নবনী ওর অন্য হাতটা দিয়ে রায়ানের মুখ চেপে ধরল,
"আজকের রাতটা অনেক কাঙ্ক্ষিত রাত, ভালোবাসার রাত। আজকের রাতে এসব অলক্ষুণে কথা বলতে নেই।" গভীর আবেগে কথাটা বলল নবনী।
দুই জোড়া সজল চোখে অশ্রুর ভীড়, আনন্দাশ্রু! চোখে থাকল সারাজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি। বলা না বলা কথারা যেন ভাষা খুঁজে ফিরছিল।
জানালার পর্দা সরিয়ে দিল নবনী, জানালা গলে আধখানা চাঁদ পুরোটাই যেন ঢুকে পড়ছে এই ঘরে, কী অদ্ভুত সুন্দর ভালোবাসার ঘর।
***
রুমুর সময়টা বেশ কাটছে, ভীষণ ব্যস্ততায়। সারাদিন ব্যবসার সাথে ছেলেদের সামলাতে এখন হিমসিম খেতে হয়। ঝুমু চলে গিয়েছিল মৃদুলের সাথে ওর কর্মস্থলে। কিন্তু অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় রুমু ওকে নিয়ে এসেছে। মা নেই তাতে মায়ের দায়িত্বে হেলাফেলা করতে চায় না ও। মৃদুল আপাতত ছুটি পায়নি বলে ঝুমুকে রেখে আবার চলে গেছে।
কিন্তু বেচারা সারাদিনে একটু ফাঁক পেলেই ফোন করছে। ঝুমু ঘুমিয়ে থাকলে রুমু ফোন ধরে ওকে আপডেট জানাচ্ছে। বোনের জন্য ছেলেটার উদ্বেগ দেখতে ওর বড় ভালো লাগে।
প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে মৃদুল আসে, শনিবার রাতে আবার বেরিয়ে যায়। যতক্ষণ থাকে সারাক্ষণ মেয়েটার খেয়াল রাখে। অনেকটা মুটিয়ে গেছে, কিন্তু তবুও মৃদুলের চোখে যেন এভাবেও সুন্দর লাগছে ওকে। ভালোবাসার চোখে দেখলে সবই সুন্দর দেখায়।
নতুন প্রাণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে ওরা। ঝুমুর উপলব্ধি, খারাপ সময় জীবনে আসে বলেই সুখগুলো এত সুন্দর হয়ে ধরা দেয়।
নাঈম যখন পেটে ছিল শাফায়াত তখন কেমন দূরে দূরে থাকত। উল্টো কতরকম অভিযোগ ছিল ওর। সেখানে কোন আশায় আরও সময় কাটিয়েছিল ও। এখন আর আক্ষেপ হয় না ওর। আল্লাহ সবাইকে তার কাজের উত্তম প্রতিদান দেন। শাফায়াতকেও হয়তো দিয়েছেন।
এই তো সেদিন ওর শাশুড়ির সাথে দেখা হয়েছিল, তিনি বললেন শাফায়াতের নাকি চাকরি চলে গেছে। হন্যে হয়ে নতুন চাকরি খুঁজছে। হয়তো পেয়েও যাবে। কিন্তু রিতার বিয়ে হয়ে গেছে অন্য একজনের সাথে। তবে রুমু মন থেকে শাফায়াতের খারাপ চায় না, এসবও স্পর্শ করেনি ওকে। শুধু শুনে গেল কেবল। তিনি আজ আরেকবার রুমুকে আশীর্বাদ করে বিদায় নিলেন, নাতিদের বুকে চেপে আদর করলেন, এরপর কেঁদে বিদায় নিলেন। উনার জন্যই কেবল মন কেমন করে ওর। এছাড়া আর কোনো পিছুটান নেই।
এখন সবাইকে নিয়েই রুমু সুখী, ভীষণ সুখী!
***
সবসময় মানুষ যেভাবে জীবনকে সাজাতে চায় সেভাবে হয় না। ছক কেটে হিসেব কষে জীবন চলে না, চলে নিজের নিয়মে, নিজের বানানো ছকে। রায়ান চেয়েছিল দেশেই শিফট করবে। কিন্তু প্রায় মাসখানেক সব পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারল ফটোগ্রাফিতে বাংলাদেশে কিছু করার খুব একটা সুযোগ নেই। প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের অবস্থা খুব নাজুক। এখানে কোনো একটা প্রফেশনের পাশাপাশি লোকে এটা করে। খুব অল্প কয়েকজন আছে যারা সত্যিকার অর্থে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা হাতে গোণা।
রায়ান মনে মনে দমে গেল, নবনীকে এখানে রেখেই ফিরতে হবে ওকে। নবনীর কষ্ট হলেও মেনে নিল এটা। রায়ান ওর সমস্যা মেনে নিয়েছে, ও কেন পারবে না!
আফজাল সাহেবকে নবনী বলল ও আরও কিছুদিন দেশে থাকতে চায়। মাস দুয়েক পরে যাবে। তিনি এটাতে খুব একটা আপত্তি করলেন না।
কিছুটা ভগ্নমনোরথে রায়ান ফিরে গেল ওর কর্মস্থলে। আর শুরু হলো অপেক্ষার প্রহর, আবার কবে মিলবে তার জন্য! কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে কোথাও মান অভিমানের পালাও জমে।
***
সময়ের চাকা ঘুরে, সাথে দূরত্ব বাড়ে। লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ মেইনটেইন করা আসলেই কঠিন। যতটা সহজে বলেছিল ওরা, দেখা গেল এটা ততটা সহজ নয়।
দুজনেই কর্মব্যস্ত মানুষ, সাথে সময়ের পার্থক্য মিলিয়ে পর্যাপ্ত কথা হতো না। রায়ানের কাজের তো টাইম লিমিটও নেই সেভাবে। প্রায় মাস ছয়েক কাটার পরেই হাঁপিয়ে গেল রায়ান। ওর মনে হতে থাকে পেয়েও বুঝি পাওয়া হয়নি। নবনীকে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও খুব করে কাছ থেকে দেখতে ইচ্ছে হয় ওর। এটা কি অন্যায় চাওয়া? কিন্তু ও কষ্ট পাবে বলে কখনো বলা হয় না। কাছে পেয়েও কয়েক সিন্ধু দূরত্ব ওদের মধ্যে। দুজনেই দুজনের কাছে সিন্ধুপারের মানুষ, কয়েক সিন্ধু।
ওদিকে ও মুখ ফুটে না বললেও নবনী এটা বেশ ভালোই বুঝতে পারে। মাঝে মাঝে মনে হয় আগেই তো ভালো ছিল, এ কোন দোটানায় পড়ল!
আফজাল সাহেব ভালোই বুঝতে পারেন তারজন্যই নবনীর এই অসংলগ্ন আচরণ। তিনি একদিন মেয়েকে নিজের কাছে ডাকলেন,
"মা, সময় মানুষের চাওয়া পাওয়া বদলে দেয়। তোকে তো আমি বলেছিলাম, আমার এখন একমাত্র চাওয়া তোর ভালো থাকা। ছেলেটাকে কেন শুধু শুধু কষ্ট দিচ্ছিস?"
নবনী জানে এখানে থাকলে বাবার অপরাধ বোধের বোঝা বেড়ে যাবে ক্রমশ। তাই মনে মনে যাওয়াই ঠিক করল।
অনেক ভেবে রায়ানকে ফোন করে নিজের সিদ্ধান্ত জানালো ও।
"নবনী, আমি চাই না তুমি নিজের মনের বিরুদ্ধে কিছু কর। তুমি চাইলে বাবার সাথে আমি কথা বলি?"
"না, আমি জানি তুমিও কষ্ট পাচ্ছ, ওদিকে বাবাও কষ্ট পাচ্ছে। আর আমি মাঝে পিষ্ট হচ্ছি। আমি তো দুজনকেই ভালোবাসি। সবকিছু একসাথে কেন পাওয়া যায় না রায়ান?"
বহুদিন পরে মেয়েটা আবার ভেঙে পড়ল, কিন্তু রায়ানের এখানে কীইবা করার আছে! নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছে ওর।
সিদ্ধান্ত নেবার কিছুদিনের মধ্যেই জানতে পারল নবনীর পি.এইচ.ডি এর জন্য যে অ্যাপ্লাই করা ছিল সেটা গ্র্যান্টেড হয়েছে। মেয়ের জন্য ভীষণ গর্বিত হলেন তিনি। এবার তো ওর দোটানার সুযোগটাও থাকল না। ডক্টরেট ডিগ্রি নেবার এত ভালো সুযোগটাও ওকে কেন যেন খুশি করতে পারল না।
কিছুদিনের মধ্যে রায়ান চলে এল ওকে নিতে। রায়ানকে নিজের বাসা ছাড়তে হবে। কারণ নবনীর ইউনিভার্সিটি অন্য স্টেটে।
"বাবা, আপনি চলুন না আমাদের সাথে। আমরা সবাই মিলে ভীষণ ভালো থাকব।"
রায়ান প্রস্তাব দিয়ে বসল আফজাল সাহেবকে।
"না বাবা৷ তোমরা ভালো থাক। এই বাসাটা আমার কতটা কাছের এটা আমি জানি। আমার জন্ম শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য সব এখানেই কেটেছে। বাবা মায়ের স্মৃতি, অবনীর স্মৃতি, নবনীর ছেলেবেলা এসব ফেলে আমি কী করে যাই? তোমরা সুখী হও বাবা। আমার পাগলাটে রাগী মেয়েটাকে সুখী কর, তোমরা সুখে থাক, আমার সমস্ত দোয়া তোমাদের জন্য থাকল।"
রায়ান আর কথা বাড়ায়নি। কেবল মনে মনে বলেছে,
"আপনার পাগলাটে মেয়ের সুখের সাথে তো আমার সুখটাও জড়িয়ে আছে৷ একই সুতোয় বাঁধা। ও না হাসলে আমিও তো হাসতে পারব না।"
***
চলে যাবার দিন বাবা মেয়ে আকুল হয়ে কাঁদল। আফজাল সাহেব নিজের ভেঙে পড়া চেহারাটা মেয়েকে দেখাতে চাননি, কিন্তু কী যে হয়ে গেল হঠাৎ, নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারলেন না। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে ফেললেন।
চামেলিকে হাজারটা জিনিস বুঝিয়ে দিল নবনী। যবে থেকে ঠিক হয়েছে ওর চলে যাবার কথা তারপর থেকে চামেলিকে হাতে ধরে রান্না শিখিয়ে এসেছে। হাজারবার করে বাবার কোনটা লাগবে, কী খাবেন সব শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছে।
বাবাকে দিয়েছে হাজারটা উপদেশ,
"বাবা, শোনো, ওষুধের কথা কিন্তু তুমি সবসময় ভুলে যাও। মাঝেমাঝে জর্দা দিয়ে পান খেয়ে ফেল। এসব কিন্তু একদম করবে না। রাত তো জাগবেই না বলে দিলাম। সকালে উঠে নিয়ম করে হাটতে ভুলবে না।"
একসাথে এতকিছু বলে থামল ও, কিছুটা থেমে বলল,
"আমি না ডাকলে তো তোমার ঘুম ভাঙে না, ঘুম ভেঙে আমার মুখ না দেখলে থাকতে পারবে তো বাবা?"
এবার বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ল নবনী, আফজাল সাহেবও। বাবার বুকের কাছে শার্টের অংশ নোনা জলে ভিজে গেল।
"যাবার আগে আমাকে কিছু বলবে না বাবা?"
"পৃথিবীর সব সুখ দিয়ে তোর ঘর ভরে যাক।"
আরও অনেক কিছুই বলতে চাইছিলেন তিনি, কিন্তু মুখে আর কোনো কথা যোগাল না। এরচাইতে বেশী ভেঙে গেলে মেয়ের বিদায় কী করে দেখবেন? তাই আর কিছু বললেন না, কেবল মাথায় হাত বুলালেন।
স্নেহের, ভালোবাসার।
***
ক্লাস, রিসার্চ ওয়ার্ক মিলিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল নবনী। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাবার সাথে ভিডিও চ্যাটিং চলে সবসময়। রায়ানও সারাদিন নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। রাতটুকু যেন ওদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে আসে। সব অপূর্ণতা পেছনে ফেলে মিষ্টি একটা প্রশান্তির বাতাস বইয়ে দেয় ওদের জীবনে। প্রতি উইকেন্ডে আশরাফ সাহেব আসেন পুরো পরিবার নিয়ে, কোনোবার ওরাও যায়। এই নিয়েই সময় যাচ্ছে।
নবনী এখন ওর স্বপ্নের ব্যাখ্যা খুঁজে পায়। রায়ানের হাত ধরে বাবার সঙ্গ ছাড়বে বলেই হয়তো ওমন স্বপ্ন দেখত। মানুষকে বোধহয় অর্ধেক পৃথিবী নিয়েই বাঁচতে হয়। ওর পৃথিবীটা দুই টুকরো হয়ে সিন্ধুর এপার ওপার ছড়িয়ে আছে। চাইলেও সেটাকে একসাথে জুড়ে দেওয়া সম্ভব নয় ওর পক্ষে। সাথে বাবার গর্বের ডিগ্রিটা।
***
দেখতে দেখতে তিনবছর কেটে গেছে। নবনী যাবার পর থেকেই আফজাল সাহেব যেন একটা কাঠের পুতুল। চারপাশে অথৈ শূন্যতা। শূন্যতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাচ্ছেন তিনি। মনে হয় চারপাশে কেউ নেই, কিছু নেই, কেবল সিন্ধুসম শূন্যতা!
দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান নবনীর লাইব্রেরি ঘরে। নবনীর ছুঁয়ে দেয়া বইগুলোতে নিজের হাত বুলান। একটা পুরনো ড্রয়ার খুলে নবনীর ছেলেবেলাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। কী ছোট্ট জামা, জুতো। মেয়েটা কত্ত বড় হয়ে গেল।
চামেলি ভীষণ কষ্ট পায়, এমন হাসিখুশি মানুষটা কেমন বিষাদে ডুবে যান তাই ভেবে। ওর চোখ ফেঁটে জল নামে।
চন্দ্র বাড়িটা মাতিয়ে রাখে। নবনী ছেলেবেলায় যেমন দুষ্টুমি করত কিছুটা তেমনই মনে হয়। আফজাল সাহেবের মনে হয় বুঝি ছোট্ট নবনী সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
নিজের কষ্টকে কষ্ট মনে হয় না, যখন মেয়ের সুখে ঝলমলে মুখটা দেখেন, সাথে রায়ানের মুখটা। তার রাজকন্যাকে একটা যোগ্য রাজপুত্র দিতে পেরেছেন এটাতেই তার সুখ।
মাঝে চারবার এসেছিল মেয়েটা। বারবার বলেছে,
"আমার ডিগ্রিটা হয়ে যাক, এরপর কিন্তু আমি পাক্কা চলে আসব।"
উনার মুখ তখন ছেলেমানুষী হাসিতে উদ্ভাসিত হয়।
নিজের চোখটা মুছে নিলেন, মেয়ের কল দেবার সময় হয়ে গেছে। চোখে একফোঁটা পানি দেখলে মেয়েটা সব ছেড়ে ছুটে আসবে।
"বাবা, তুমি আজকে হাঁটতে যাওনি? তোমার শরীর ঠিক আছে তো?"
"আরে আমি একেবারে ঠিক আছি। তুই কেমন আছিস?"
"আমি খুব ভালো আছি বাবা। তুমি সত্যি করে বলো না?"
"আরে পাগল মেয়ে, আমি সত্যিই ভালো আছি।"
রায়ান পাশ থেকে বলল,
"বাবা কিছুদিনের জন্য তো এসে ঘুরে যেতে পারেন। আপনারও ভালো লাগবে, আমাদেরও ভালো লাগবে।"
"যাব বাবা। একসময় ঠিক যাব।"
"তুমি কিন্তু শরীরের উপরে অনিয়ম করছ।"
"তুই চিন্তা করিস না মা। চামেলি, চন্দ্র ওরা কোনো অনিয়ম হতে দেয় না। চন্দ্রটা বড় হচ্ছে তো। তোর মতো চোখ রাঙানো শিখে নিয়েছে।"
নবনী আবার কেঁদে ফেলল। রায়ান পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ফোন রেখে রায়ানের বুক ভিজিয়ে দিল মেয়েটা। রায়ানের এমন এক পৃথিবী ভালোবাসা না পেলে ও বুঝি দম বন্ধ হয়েই মরে যেত। এই অদ্ভুত সুন্দর ভালো মানুষ ছেলেটা ওকে পরিপূর্ণ করেছে!
সেদিন রায়ানকে করা প্রশ্নটা আবার করে বসে নবনী,
"আমার পৃথিবীটা অর্ধেক কেন রায়ান? বাবার কাছে গেলেও অর্ধেক, এখানেও অর্ধেক। আমার পুরো পৃথিবী কি একসাথে জুড়বে না কোনোদিন?"
রায়ান মনে মনে ঠিক করে রেখেছে নবনীর পি.এইচ.ডি শেষ হলেই দেশে ফিরবে। এখানকার আদলে একটা বড়সড় স্টুডিও নিজেই খোলার সামর্থ্য থাকবে ততদিনে। হয়তো কোনো আন্তর্জাতিক মানের ফটোগ্রাফিক ম্যাগাজিনও করে ফেলার চেষ্টা করবে!
কষ্ট হলেও নবনীর টুকরো পৃথিবী আবার একসাথে জুড়বে ও। এটাই মনে মনে চাইল আল্লাহর কাছে।
এই মেয়েটা ওর হৃদয় ভরিয়ে দিয়েছে ভালোবাসার প্রগাঢ়তায়। ওর সুখটাও তো দেখতে হবে ওকে।
তবে এখনো নবনী ওকে কথা দিয়ে অপ্রতিভ করে দেয়, চোখ রাঙিয়ে যখন তাকায় অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়। আরও ভালোবাসা বেড়ে যায়, এই মেয়ের মনের অলিগলি এখনো পুরো চিনে উঠতে পারেনি, তবে এটাতে ওর আক্ষেপ নেই। কিছু কিছু হারেও প্রগাঢ় শান্তি মিশে থাকে!