তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ৩১

🟢

"ওর নাম ছিল সজল। ওকে প্রথম দেখে আমার মনে হয়েছিল এই বুঝি আমার স্বপ্নে লালিত পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চাপা রাজপুত্রের দেখা পেয়ে গেলাম। কী যে ভুল ছিল ভাবনাটা! বাস্তবে তো সে ছিল কুটিল এক রাক্ষস পুত্র!"

ম্লান একটা ছাপ পড়ল নবনীর অবয়বে। রায়ান আগ্রহভরে তাকিয়ে রইল কেবল।

"ওর ঝকমকে সৌন্দর্যের কাছে শ্যামলা গড়নের নিজেকে দুয়োরাণী মনে হতো। ক্লাসে এত এত স্টুডেন্টের ভীড়ে ওর নজর আমার উপরে আলাদা করে পড়তই না। দুই একটা ফর্মাল কথাবার্তাতেই যেন আমি কোথাও ভেসে যেতাম। আমার এমন ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে থাকা দেখে ওর কিছুই বুঝতে বাকি থাকে না। একদিন নিজে থেকেই আমাকে ডাকে। আমার তখন কী যে বুক ধুকপুক! আমি ওর সামনে আসতেই ও বলে, 'আমার তোমাকে খুব ভালো লাগে নবনী।' এটুকু শুনে আমি হাওয়ায় ভাসতে লাগলাম। কিন্তু পরের কথা শুনে হতাশ হলাম খুব।"

রায়ান দেখল নবনী চোখ বন্ধ করে কথা বলছে, চাঁদের ঝাপসা আলোয় অবয়বে লুকিয়ে থাকা কষ্টেরা ধরা দিতে লাগল। কিন্তু এই কষ্টের ছিটেফোঁটাও গলায় নেই, অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে কথা বলছে নবনী।

"কী বলেছিল এরপরে?"

"ও বলেছিল, 'আমার মা নিজের ছেলের জন্য একটা সুন্দরী বউ চায়। তুমি নিঃসন্দেহে সুন্দরী কিন্তু গায়ের রঙ অনেক ময়লা। বাবা আর মায়ের ডিভোর্স হয়ে যাবার পর মা আমাকে অনেক কষ্টে মানুষ করেছে, তার ইচ্ছের মূল্য দেওয়া কি অন্যায় হবে আমার জন্য?' আমি ভেতরে ভেতরে ভেঙে গেলেও ওর মায়ের প্রতি ভালোবাসা দেখে গলে গেলাম। ভাবলাম আসলেই তো! আমি কেবল মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, 'তবে আমাকে এসব কেন বললেন? আমি তো আপনাকে নিজে থেকে কিছু বলিনি।' উত্তরে ও বলল, 'তুমি না বললেও তোমার চোখ আমাকে অনেককিছুই বলে দিয়েছে। তাই সব ক্লিয়ার কাট বলে দিলাম, আমি লুকোছাপা একেবারে পছন্দ করি না।' তখন কী আর জানতাম ওর পুরোটাই মিথ্যে!"

"তারপর কী হলো?" প্রশ্ন রায়ানের।

"বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আমি তখন কেন যেন একেবারেই কষ্ট পাইনি। মনে হয়েছিল ও ঠিকই বলেছে, আমার উচিত ওকে বিরক্ত না করা। যদিও তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনোরকম বিরক্ত করিনি। ভাবলাম সব ভুলে যাব। এসব ভেবে ঘুরে দাঁড়াতেই পিছুডাক শুনে থমকে গেলাম। 'তুমি চাইলে নিজেকে মায়ের পছন্দমতো সাজিয়ে নিতে পার কিন্তু। বাকিটা আমি সামলে নেব।' আমার মনে তখন যেন তুমুল শব্দে ড্রাম বাজছে, সুযোগ তবে আছে, এই ভেবেই আলোড়িত হলাম। আশান্বিত দৃষ্টি মেলে সজলের চোখের দিকে চাইলাম। ওর কথা মেনে নিয়ে নানারকম প্রসাধন মাখতে শুরু করলাম, নিজের চামড়া সাদা করার জন্য। এমনকি চালের গুঁড়া, ডালের গুঁড়া, দুধ, শসা, গাজর, আলু কিছুই বাদ দিলাম না। যা পেতাম তাই নিজের উপরে প্রয়োগ করতাম নিজের চামড়া সাদা বানানোর জন্য। প্রেমে এতটাই অন্ধ হয়ে গেলাম যে নিজেকে প্রতিনিয়ত কী ভীষণ অপমান করছি এই বোধটুকুই হারিয়ে ফেলেছিলাম!"

রায়ানের নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো, ক্ষুরধার বুদ্ধিমতী, তুখোড় ব্যক্তিত্বের এক তরুণীকেই দেখে এসেছে ও। সেই মানুষটা এমন বোকা বোকা কাজ করেছে ভাবতেই অদ্ভুত লাগছে ওর।

"তুমি ভাবতেও পারবে না রায়ান এরপর আমি কী ভয়ংকর কাজ করেছিলাম? কী ভীষণ অপমান করেছি নিজেকে, এর মাশুলও দিয়েছি অবশ্য। এভাবেই চলছিল সব। নিজের মনে তখন প্রেমের সমুদ্রের প্রবল স্রোতের সামনে অন্ধ আবেগ ছাড়া বাকিসব খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছিল। একদিন সজল আমাকে বলল, 'নবনী চল আমরা পালিয়ে বিয়ে করে ফেলি।' আমি প্রবল আপত্তি করলাম। আমি কেবলমাত্র ষোড়শী এক মেয়ে, বাবার কথাও তখন হুট করে মাথায় চলে এসেছিল। 'দেখো, মা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে, কিছুতেই মানবে না তোমাকে। তোমার বাবা এই বয়সে তোমাকে বিয়ে দেবে বলো?' এসব ভুজুংভাজুং যুক্তি দিয়ে আমাকে অনবরত বোঝাতে লাগল। আমার আপত্তি হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে আমি রাজি হয়ে গেলাম পালাতে। একদিন কোনো কিছু না ভেবে প্রবল অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে ঘর ছাড়লাম।"

এবার কথা না বলে থাকতে পারল না রায়ান,

"যে ছেলে সম্পর্কের শুরুতেই এমন আজেবাজে কথা বলতে পারে সে যে ফ্রড এটা তো স্পষ্টই বোঝা যায়। এমন একটা জঘন্য মেন্টালিটির ছেলের সাথে কীভাবে পালিয়ে গেলে তুমি?"

রায়ানের গলায় স্পষ্ট রাগের ছাপ। নবনীর মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠেছে।

"একটা কিশোরী মেয়ের আবেগের কাছে যুক্তি কতটা ধোপে টেকে বলো তো? অনেকেই ম্যাচিউরড হয় আগে আগে। আমি অনেককিছুই বুঝিনি। বাবা আমার একমাত্র কাছের বন্ধু, কিন্তু বাবার কাছে কি সবসময় সবকিছু বলা যায়? মা থাকলে হয়তো অনেককিছু বুঝতাম। বাবা বুঝেছিল পরে, মা থাকলে আমার আচরণের পরিবর্তন হয়তো আগেই বুঝতে পারত। কিন্তু এটা তো হয়নি।"

"এরপর কী হলো? পালিয়ে গিয়েছিলে বললে, তবে ফিরে আসলে কেন?"

"দুর্ভাগ্যে ভর করে পালিয়েছিলাম, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছি।"

"বুঝিনি।"

"ও আমাকে বুঝিয়েছিল, ওর যেহেতু সামান্য আয় আর পালিয়ে নতুন জায়গায় যাওয়া ভীষণ ঝক্কি, অনেক খরচের ব্যাপার স্যাপার আছে। কতশত হ্যাপা। সরাসরি না বললেও সূক্ষ্মভাবে আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল যেন খালি হাতে না বের হই। আমিও ভীষণ মাথামোটা ছিলাম, পালানোর আগে মায়ের গয়না যেগুলো আমার কাছে ছিল সেখান থেকে কিছু গয়না নিয়েছিলাম। বাবার ড্রয়ার থেকে কিছু টাকাও নিয়েছিলাম। বান্ধবীর জন্মদিনের কথা বলে সেই সকাল সাতটায় বেরিয়ে পরলাম। বাবাকে প্রথমবারের মতো মিথ্যে বলেছিলাম। সেদিন বাবার দিকে তাকিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল ভুল করছি, কিন্তু ওই যে অন্ধ আবেগ! সেটাকেই প্রশ্রয় দিয়ে সাঁতার না জেনেও ঝাপিয়ে পড়লাম মাঝ নদীতে।"

রায়ান এবারও মৌন শ্রোতা, আসলে কী বলবে তাই ভেবে পাচ্ছে না।

"কমলাপুর স্টেশনে ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম, ট্রেনের সময়ের কিছুক্ষণ আগে আগে সজল এলো। উঠে পড়লাম ট্রেনে। দুই স্টেশন পরের একটা স্টেশনে নেমে গেলাম। রিকশা নিয়ে, কখনো পায়ে হেঁটে আরও ভেতরে চলে গেলাম। একটা টিন শেডের বাড়িতে নিয়ে গেল, আমি কেবল পুতুলের মতো ওকে অনুসরণ করছি। আমাকে একটা ঘরে বসিয়ে আমার কাছ থেকে টাকা আর গয়নার ব্যাগটা চেয়ে নিয়ে বাইরে গেল ও। আমার ভেতরে কেমন একটা আশুভ সাড়া পাচ্ছিলাম। তবুও অবিশ্বাস করতে পারিনি তখনো। অপেক্ষা করতে করতে আমি ঘর থেকে বাইরে বেরোলাম, কী মনে করে হ্যান্ড ব্যাগটা হাতে নিয়েছিলাম। অপরিচিত জায়গা বলেই হয়তো! কিন্তু সেটাই কাজে দিল। কিছুদূর যাবার পর সজলকে দেখলাম ওর বয়সী একটা ছেলের সাথে কথা বলতে। কিছুটা এগিয়ে যেতেই ওদের কথার মধ্যে নিজের হৃদয় ভাঙার ডাক শুনেছিলাম। প্রতারিত হবার যে কী যন্ত্রণা, কী দহন এটা উপলব্ধি করেছিলাম হাড়েমজ্জায়!"

রাতের আকাশটা চাঁদের আলোয় ঝলসে যাচ্ছে যেন! জোছনা যেন বান ডেকেছে আজ! রায়ান এই আলোয় দগ্ধ হওয়া নবনীকে দেখছে কেবল। ও হলফ করে বলতে পারে নবনীর সজলের সাথে ওই সময়টার জন্য কেবল তীব্র অনুশোচনা আছে আর কোনো অনুভূতি নেই। ওর সহসা মনে হলো নবনীর যে আবেগ মরে গেছে, শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে সেই আবেগ কি আরেকবার জেগে উঠবে? ওর জন্য?

"ছেলেটা সজলকে বলছিল, 'আরে ব্যাটা, তুই এই পুচকে মাইয়্যারে বিয়া করবি?' আমি প্রশ্ন শুনেই কেন যেন কান খাড়া করে ফেলি। উত্তর শুনে মনে হচ্ছিল আমি বোধহয় স্বপ্ন দেখছি, ভয়াবহ কোনো দুঃস্বপ্ন! 'আরে ব্যাটা, ওই মাইয়্যারে আমি বিয়া করমু! পাগল নাকি! আরে বিয়ার কথা না বললে এইখানে আমার সাথে আসত নাকি। পটাইতে যে কত টোপ ফেলা লাগছে এইটা তো জানস না! আমার চেহারা দেইখ্যা পটছে ভালো কথা, কিন্তু নিজের মইধ্যে রাখছে। মা বাপের কিছু ইমোশনাল কাহিনী ঝাইড়া দিছি আর গইল্যা গেছে। গয়না আর টাকা মিলায়ে দুই লাখ টাকা তো হইবই। ছয়মাস গা ঢাকা দিয়ে অন্য জায়গায় টোপ ফালামু।' আমার মনে হচ্ছিল চারপাশে সব অন্ধকার হয়ে আসছে, কিছুই দেখছিলাম না। কিন্তু এরপর নিজেকে নিয়ে কোনো নোংরা কথা শুনতে চাইছিলাম না একদমই। এরপরে কী কথা হবে সেটা নিজেই বুঝতে পারলাম। অনেক ভুল তখনই হয়ে গেছে, নতুন করে এর পাল্লাটা বাড়াতে একেবারেই চাই না। সময় নষ্ট না করে সেখান থেকেই পা চালালাম, জানতাম কিছুক্ষণ পরেই আমার খোঁজ পড়ে যাবে, তাই যে পথে এসেছি, সেই পথে না গিয়ে অন্য পথ ধরলাম। পথঘাট কিছুই চিনি না। আল্লাহর নাম নিতে নিতে অচেনা রাস্তায় কোনোমতে পা চালিয়ে সামনে এগুতে থাকলাম। স্থানীয় দুজন লোকের দেখা পেলাম। আমি জানি না তারা কে? কিন্তু আমার জন্য সাক্ষাৎ ফেরেস্তা। তারা আমাকে ঢাকার বাসে তুলে দিয়েছিল। হ্যান্ডব্যাগে অল্প কিছু টাকা ছিল, তাই দিয়ে কোনোরকমে বাসায় পৌঁছলাম। এরপর শুধু মনে আছে ভীষণ জ্বরে পড়েছিলাম। আর তেমন কিছু মনে নেই। এরপর সব আবেগ সেঁচে ফেলে দিয়ে হৃদয়কে তপ্ত মরুভূমি বানিয়ে ফেললাম। বাবার কথাও তখন কী করে ভুলে বসেছিলাম এটাই সবচেয়ে বেশি করে পোড়ায় আমায়। এত ভুলও কেউ করে?"

রায়ানের ভারী কষ্ট হলো নবনীর জন্য, এমন মেয়েকেও বুঝি এভাবে পুড়ানো যায়! সজলের প্রতি তীব্র রাগে ফুঁসে উঠল ভেতরটা। আর একটা জিনিস উপলব্ধি করল, নবনীর দহনের যে উত্তাপ তাতে রায়ানও জ্বলছে! এটা কি তবে ভালোবাসাই? হ্যাঁ তাই তো! নবনীর জন্য ওর হৃদয়ে ভালোবাসার সমুদ্র জমেছে!

.......

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ৩১