নিস্তব্ধ এই রাতে অন্য ভুবনের একেবারে ভিন্ন দুটো প্রাণ যেন নিজেদের হৃদয় দিয়ে হৃদয়কে ছুঁয়ে দিচ্ছে, নিজেদের অগোচরেই! এই রাত, এই চাঁদ, ও-ই তারারা, হিমশীতল বাতাস, ফুলের মাতাল করা সৌরভ আর কিছু ঝিঁঝিঁ পোকা যেন স্বাক্ষী হিসেবে আছে কয়েক সিন্ধু দূরত্ব পেরিয়ে দুটো হৃদয়ের কাছাকাছি আসার মাহেন্দ্রক্ষণের। কিছু অনুভূতির বিনিময় হচ্ছে চুপিসারেই। কিন্তু সেটাকে কেউই প্রশ্রয় দিল না, রায়ান প্রসঙ্গে ফিরল সহসাই,
"তুমি পরে ওই ফ্রডটার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নাওনি?"
"নাহ্! এরপর কখনো ওকে দেখিইনি, তাছাড়া আমি সব ভুলে যেতে চেয়েছিলাম। কাউকে বলিইনি কিছু।"
"আরও কতগুলো মেয়ে না জানি ওর ট্র্যাপে পা দিয়েছে! তুমি ফিরে আসতে পেরেছ, সবার ভাগ্য তো এত ভালো হয় না, তাই না?" ক্রুদ্ধ স্বরে বলল রায়ান।
"এটা ও পারেনি, ওই পশুটা ওর প্রাপ্য শাস্তি পেয়েছে।"
"কীভাবে? তুমি তো বললে তুমি..."
রায়ানকে শেষ করতে না দিয়েই উত্তর দিল নবনী,
"আমি কিছু করিনি বলে তো অন্যরা চুপ থাকবে না। আমার সাথে ওই ঘটনার প্রায় বছর দুয়েক পরে পত্রিকায় একটা খবরে চোখ আটকে যায়। অল্পবয়সী মেয়েদের সাথে সম্পর্ক তৈরী করে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটা চক্র ধরা পড়েছিল। সেখানে ওরও ছবি ছিল। এমনকি রেপ আর মার্ডারের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছিল। কোর্ট ওর প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করেছে। এই খবরটা যেদিন আমি শুনেছিলাম সেদিন আমার পৈশাচিক এক আনন্দ হয়েছিল। এমন ঘৃণ্য একটা পশুকে কী করে ভালোবেসেছিলাম ভাবলেই গা গুলিয়ে আসে।"
নবনীর অবয়বে কিছুটা হিংস্রতার ছাপ পড়ল বলে মনে হলো রায়ানের।
"আমার কেবল আক্ষেপ কী জানো রায়ান?"
দু'দিকে মাথা নেড়ে উত্তর দিতেই নবনী বলল,
"বাবাকে কী করে তখন ভুলে গেলাম সেটাই! আমি তো জানতাম আমি ছাড়া বাবার কেউ নেই। তবুও..."
এবার যেন কিছুটা ভেঙে পড়ল নবনীর গলা, তবে সামলে নিল আশ্চর্য দৃঢ়তায়!
"ভুল তো মানুষেরই হয়, তাই না। প্রতিটা ভুলই আমাদের জন্য বিশাল একটা শিক্ষা। সব মানুষ আগে থেকে ভেবে ভেবে সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ভুল করেও অনেকে শেখে। তুমি তখন আর কতটাই বা বুঝতে? ছুঁড়ে ফেলে দাও না ভুলগুলো, দেখবে জীবনের সব খুশি ধরা দেবে!"
"তোমাকে কে বলল আমি ভুল আঁকড়ে বসে আছি? সেসব কবেই ধুয়েমুছে নিজেকে সূচী করেছি। ওসব ময়লা আবর্জনা ঝেড়ে ফেলেছি বহু আগে। বাবা পাশে ছিল বলেই না সবটা পেরেছি।"
"কেউ যদি আবার কখনো তোমার মনের বন্ধ দরজায় জোরেশোরে কড়া নাড়ে, সেই বেচারা কি সাড়া পাবে নাকি সেই দরজাতেই মাথা ঠুকে মরতে হবে বেচারাকে?"
আনমনেই কথাটা বলে ফেলল রায়ান, আর বলার পরে নিজের মাথাটা ঠুকতে ইচ্ছে হলো। এমন বেফাঁস কথা কেন যে মুখে এলো, এই মেয়ে নিশ্চয়ই এবার বড়সড় একটা লেকচার দিয়ে দেবে! ভাবার সাথে সাথে কথাটা কিছুটা সত্যি হয়ে গেল, কোনো লেকচার না দিলেও লজ্জায় ফেলল ঠিকই,
"কেন? তুমি কড়া নাড়াতে চাও বুঝি?"
সরাসরি রায়ানের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল মেয়েটা। রায়ানও কেমন ঘোরগ্রস্ত হয়ে বলে বসল,
"যদি কড়া নাড়াতে চাই?"
নবনী সশব্দে হেসে উঠল, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে। হাসতে হাসতেই বলল,
"বাহ্! তোমার বেশ উন্নতি হয়েছে তো! তবুও বলতেই হবে দ্যাট ওয়াজ এ্য ভেরি ব্যাড জোক!"
হাসতেই থাকল নবনী, রায়ান নিজের মনের কথাটা প্রায় বলে ফেলেছিল আনমনেই। নবনী নিজেই যেন ওকে সামলে নেবার পথ বাতলে দিল! নিজে লজ্জায় পড়ার হাত থেকে বাঁচতেই কিনা জানে না, এই অযুহাতটাকেই সত্য প্রমাণ করার জন্য মুখ ভোতা করে বলল,
"কী আর করা বল তো, আমি রসকষহীন কাঠখোট্টা একজন। এরপর থেকে নিজের এই স্কিলটা অবশ্যই ডেভেলপ করার চেষ্টা করব।"
"চল নিচে যাই। আমার ঘুম পেয়েছে খুব।"
মুখে এটা বললেও নবনী মনে মনে ঠিক আওড়াল,
"যদি সারারাত এভাবেই কেটে যেত, খুব বেশি ক্ষতি হতো কি?"
***
মাঝে প্রায় মাস দুয়েক চলে গেছে, রুমু কিছুদিনে আরও নিবিড়ভাবে দেখল শাফায়াত কতটা তলানিতে নিজেকে নামাতে পারে। ওদের কেইস চলছে কোর্টে, বাচ্চার অভিভাবকত্ব নিয়ে। কোথাকার কোন দিন শাফায়াত ওর বন্ধুদের মাঝেমধ্যে বাসায় নিয়ে আসত, শুধু সামাজিকতা রক্ষায় যেটুকু হেসে হেসে কথা বলত রুমু। এসবকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কী বিশ্রীভাবেই না কদর্য রূপ দিয়ে উপস্থাপন করেছে।
যদিও শাফায়াতের এসব জঘন্য মিথ্যাও ওকে জেতাতে পারল না। কীভাবে কীভাবে যেন রুমুই অভিভাবকত্ব পেল, নিজের এই সৌভাগ্যের জন্য কতবার যে শুকরিয়া করল আল্লাহর কাছে! এক্ষেত্রে ওর শাশুড়ির জবানবন্দি বোধহয় কাজে এসেছে সবচেয়ে বেশি। নিজের ছেলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রুমুর পাশে থাকবেন এই আশা রুমু স্বপ্নেও করেনি। ছেলে অন্তঃপ্রাণ মা কতটা বীতশ্রদ্ধ হলে নিজের ছেলের উল্টো স্রোতে হাঁটেন সেটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। এই প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলার প্রতি যত জমাট কষ্ট, অভিমান আর অভিযোগ ছিল সবটা মন থেকে বের করে দিল। জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেও প্রাক্তন বউ- শাশুড়ি! সম্পর্কের সুতোটা পুরোপুরি কেটে যাবার পর যেন দুজন নতুন সম্পর্কে বাঁধা পড়েছে, আত্মার সম্পর্ক!
তবে ওদের বুটিক হাউজ এখনো দাঁড় করাতে পারেনি, এত তাড়াতাড়ি অবশ্য পারার কথাও নয়। ওরা খুব জোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিছু লিফলেট বিলি করেছে, ফেসবুকে পেইজ খুলে সেটার বুস্ট করেছে। এর বেশি কিছু করার সামর্থ্য আপাতত ওদের নেই। তবে ওরা চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রচলিত ডিজাইনের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু যুক্ত করার। এটাতেই তো ওরা ওদের স্বপ্ন ঢেলে দিয়েছে। মৃদুলের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য না নিলেও সর্বোচ্চ পাশে থেকে যেটুকু সাপোর্ট দেয়ার, দিয়ে যাচ্ছে।
ঝুমুর চোখেমুখে এখন সবসময় একটা সুখী মানুষের ছাপ দেখা যায়। এটাই তো হারিয়ে ফেলেছিল মেয়েটা। ঝুমু যখন ঝলমলিয়ে হেসে উঠে মৃদুল তখন একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়। এই হাসিতেই তো ওর সব সুখ মিশে আছে!
সাফিয়া বেগমও বেশ খুশি, কেবল রুমুই একটু মন মরা থাকে মাঝে মাঝে। সেটা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছে দ্রুতই, অনেকটা পেরেছেও। নাঈম আর তামিমের মতো দুটো ফুটফুটে ছেলে, সাফিয়া বেগমের মতো সব আগলে রাখা মা আর ঝুমুর মতো এতো সাপোর্টিভ একটা বোন থাকলে চাইলেও দূর্বল হওয়া সম্ভব নয়। এখন শুধু পায়ের তলায় শক্ত মাটি পাবার অপেক্ষা।
***
এই দুই মাসে রায়ান আর নবনীর বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছে, তবে নবনী খুঁচিয়েই যায় রায়ানকে। কেন যেন ভালো লাগে, ইদানিং রায়ানও ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে কথা ফিরিয়ে দেয়, আগের মতো অপ্রতিভ হয়ে যায় না।
তবে এরমধ্যে চন্দ্রর মায়ের অবস্থা একেবারে খারাপ হয়ে গেল। রায়ানের সাথে সাথে আফজাল সাহেব আর নবনীও ছুটোছুটি করল কয়েকদিন। কিন্তু ওদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে পারি জামাল চন্দ্রের মা, বড্ড অকালেই। মরন ব্যাধি কাটিয়ে জীবনে ফেরা হলো না।
ছোট্ট চন্দ্রকে নিয়ে কত স্বপ্নের জাল বুনেছিল, অথচ অপূর্ণ স্বপ্ন বুকে নিয়ে বিদায় নিল, মা তো চলে গেল মায়া কাটিয়ে, এই বাচ্চা মেয়েটাকে কী করে সামলাবে ওরা ভেবে পায় না! ছোট্ট চন্দ্রের মর্মস্পর্শী কান্নায় এক হৃদয় বিদারক পরিবেশ তৈরী হয়। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে, চিরনিদ্রায় শায়িত করে চন্দ্রকে নিয়ে বাসায় ফেরে ওরা।
আফজাল সাহেব আর নবনী চন্দ্রকে নিজেদের সাথেই রাখবেন। তবে চামেলি চন্দ্রের কান্নায় নিজেও হাউমাউ করে কেঁদে উঠে, জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে,
"ও খালু গো, আমি তো আর কোনোদিন সংসার বান্ধুম না, এই মাইয়া আইজ তনে আমার মাইয়া, কন না খালু? আমারও তো মা ডাক শুনবার ইচ্ছা করে, দম আটকায়া আসে। ওরে কন না আমি ওর মা। বুকটা খাঁ খাঁ করে খালি। কেউ যদি আমারে মা কইয়া ডাহে বুকের জ্বালাডা ইটটু হইলেও জুড়াইত। ও নবনী আফা, ভাইজান ওরে কন না?"
এই হাসিখুশি অল্প বুদ্ধির মেয়েটার মধ্যে এতটা হাহাকার জমে ছিল আর ওরা এতটা কাছে থেকেও এটা বুঝতে পারেনি!
সব মানুষ একটা করে হাহাকারের প্রকোষ্ঠ বুকে ধারণ করে, ভার বয়ে বেড়ায়! সময় মতো সেই হাহাকার বেরিয়ে আসে, আবার নতুন করে তাতে হাহাকার জমা হয়!
চামেলিকে আশ্বাস দেওয়া হলো যে চন্দ্র ওরই মেয়ে হিসেবে থাকবে। চামেলি তবুও চন্দ্রকে ছাড়ল না, ওর হাহাকার ভরা বুকে আঁকড়ে ধরে বসেই রইল!
***
আরও প্রায় মাসখানেক কেটে গেল, রায়ানের কাজ শেষ প্রায়। ছয়মাসের জন্য এসেছিল কিন্তু প্রায় আটমাস হতে চলল। নানান ঝামেলায় কাজ পিছিয়েছে, ওদিকে এক্সিবিশনের সময়ও হয়ে আসছে। এবার তো ওকে ফিরতেই হবে।
চন্দ্র কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে এখন। চামেলি যেন নিজের মেয়েকে পেয়ে গেছে। সবথেকে আশ্চর্য বিষয় হলো, যে সিরিয়াল দেখার সময়টায় ওকে ক্রেন দিয়ে টেনেও তোলা যেত না, এখন সেই সিরিয়াল দেখা বাদ দিয়ে ওই সময়টায় চন্দ্রকে পড়তে বসায়! ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিল চামেলি, সেটাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছে এবার। অল্প সময়েই এই পাগলাটে মেয়েটা কত ভালো মা হয়ে উঠেছে!
রায়ান ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেছে, আর সপ্তাহখানেক আছে ও। এবার তো ফিরতেই হবে, এসেছিল শূন্য হৃদয়ে, ফিরে যাচ্ছে প্রাপ্তির ঝুলি কানায় কানায় পূর্ণ করে। যেটুকু অপূর্ণতা তা কেবল অপ্রকাশিত অনুভূতির জন্যই। মেয়েটা বুঝবে তো ওকে? নাকি...
...........