সময় তার নিয়মেই চলে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষও এগিয়ে যায়। পেছনে পরে থাকে কিছু তিক্ততা, কিছু না পাওয়ার আক্ষেপ, আবার এমন কিছু প্রাপ্তি যা অদ্ভুত একটা তৃপ্তির পরশ ছুঁইয়ে দেয় সমস্ত হৃদয়ে। রুমুর জীবনের সমস্ত অপ্রাপ্তি আর ব্যথা ওর ছেলে দুটোর দিকে তাকাতেই কেমন পূর্ণতা হয়ে ধরা দেয়। প্রশান্তিতে ভরে যায় সমস্ত হৃদয়। বুটিক হাউজ দাঁড়িয়ে গেছে বলা যায়। আহামরি কিছু না হলেও নিজের পায়ের নিচে এখন এখন শক্ত একটা ভিত আছে, ঝড়ে পিছলে পড়ার সম্ভাবনা খুব কম। তবে ইদানিং ওর চিন্তা হয় খুব মায়ের জন্য।
বেশ কিছুদিন হয় সাফিয়া বেগমের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। আজ নিজের সব ছেলেমেয়েদের ডেকেছেন, সবাই মায়ের বিছানার চারপাশে বসে আছে।
"আমার এখন যাবার সময় চলে এসেছে। দুনিয়ায় তো কতদিন থাকলাম, মানুষটা বহুদিন একলা আছে। যেকোনো সময় আল্লাহর কাছ থেকে ডাক আসবে, তাই কিছু কথা তোদের বলে যেতে চাই।"
এটুকু বলেই হাঁপিয়ে গেছেন, শ্বাস নিচ্ছেন টেনে টেনে।
"মা, এসব কী বলো! তোমার আরও অনেকদিন বাঁচতে হবে। সারাজীবন তো কত কষ্ট করলা, এখন এই সুখের মুখটা দেখতে হবে তো!"
আকুল হয়ে বলল রুমু।
"তোদেরকে জীবনে উঠে দাঁড়াতে দেখে যাচ্ছি, এরচাইতে বড় শান্তির আর কী আছে বল।"
রুমের সবাই অত্যন্ত ভারাক্রান্ত, কারও মুখে কথা নেই।
"তোদের মনে আছে, সেই অভাবের মধ্যেও আমরা সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতাম? তোরা একটা ছোট্ট জিনিসও ভাগ করে খেতি, একজনের কষ্টে আরেকজন এগিয়ে যেতি? আমার তখন গর্বে বুক ভরে যেত। মনে হতো, কে বলেছে টাকার মধ্যেই সুখ থাকে। আমার তো টাকা নাই তবুও আমার এই ভাঙা ঘরে এমন স্বর্গ কী করে ধরা দিল? আসলে মনে সন্তুষ্টি থাকলে অল্পতেই সুখী হওয়া যায়। নিজেকে যে কী সুখী মনে হতো!"
আবারও ক্ষণেক থামলেন, কথা কিছুটা জড়িয়ে জড়িয়ে আসছে।
"মা, তোমার কষ্ট হচ্ছে তো।" রুমু মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল।
"বলতে দে তো। আর যদি বলতে না পারি!"
"যা বলছিলাম, সেই ঘরে হঠাৎ করেই কীসের যেন নজর পড়ল, সুখের ঘর ভেঙে খানখান হয়ে গেল। আমিও একা হয়ে গেলাম। যেই মানুষটা সারাজীবন পাশে ছিল সেই চলে গেল। ছেলেরা বিয়ে করল আলাদা সংসার হলো। আমার দোয়া সবসময় তাদের সাথে থাকল, দূরে থাকলেও যেন সুখে থাকে ওরা। মেয়েরা ভুল করে ভুলের মাশুল দিয়ে জীবনে থেমে আছে। কী দুঃসহ কঠিন সময়! অথচ মানুষটা আমার পাশে নাই। আমি আল্লাহর কাছে খালি দোয়া করতাম, 'আল্লাহ ওদের পথ দেখাও, ওরা পথ খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমাকে তুমি নিও না।" আল্লাহ আমার ডাক শুনলেন। এখন আমি খুশি খুশি যেতে পারব। জীবনের কাছে আমার আর কোনো আক্ষেপ নাই। তোরা শান্তিতে থাক এই দোয়া থাকল।"
ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"বাবারা, তোদের দুইটা বোনকে তোরা দেখে রাখিস। জানি ওরা নিজেরাই পারবে, তবুও রক্তের টান তোরা ভুলিস না।"
এই ছিল তাঁর শেষ আর্তি।
তার ঠিক দু'দিন পরের এক ভোরে দৃঢ়চেতা এই মা বিদায় নিলেন। একজীবনের আধেক গেছে স্বামীর পাশে থেকে সাহস দিয়ে, আর অর্ধেক মেয়েদের কষ্ট দেখে দেখে তার উপশমের চেষ্টায়। শেষ মুহূর্তে বিজয়টা দেখে এক চিলতে তৃপ্তি বুকে চেপে তিনি পাড়ি জমালেন ওই পারে।
একটা জিনিস অবশ্য তিনি পারেননি, রুমুকে আরেকবার বিয়ে করতে বলেছিলেন, কিন্তু মেয়ে আর সেই পথে যেতে চায়নি। জানে সবাই শাফায়াত হয় না, তবুও এখন ওর ধ্যানজ্ঞান কেবল নাঈম আর তামিম।
মৃদুল আর ঝুমুর জীবনটা চলছিল দারুণ, কিন্তু মায়ের প্রস্থানে ভীষণ ভেঙে পড়েছে। এবারও মৃদুলের হাতটা পাশে পেল। বারবার ঝুমুর মনে হলো,
"মানুষটা এত ভালো কেন?"
***
রায়ান দুই মাসে হাতের সব কাজ গুছিয়ে দেশের ফ্লাইটে চাপল। ওর পুরো পরিবার আগেই বাংলাদেশে পাড়ি দিয়েছে। নবনীর সাথে বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে, আফজাল সাহেব একমাত্র মেয়ের বিয়েতে কোনো কমতি রাখতে চান না। আশরাফ সাহেবও চান জাঁকিয়ে আয়োজন করতে। তাই আগেই চলে এসেছেন পুরো পরিবার নিয়ে।
রায়ানের সময়টা যেন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে যাচ্ছে, নবনী ওকে বলেছে ও বিয়েতে রাজি, তবে এখনই বাবাকে ছেড়ে যেতে চায় না। ও এতেই রাজি হয়ে গেছে। জানে নবনীর কাছে বাবা কী! তাছাড়া স্নেহপরায়ণ এই লোকটাকে একা করে দিতে ওরই কি ভালো লাগবে?
কে বলেছে স্বপ্ন সত্যি হয় না? এই তো ওর স্বপ্ন সত্যি হলো, আরাধ্য প্রাপ্তি কেমন ধরা দিল হাতের মুঠোয়! এক চিলতে হাসি লেগে থাকল রায়ানের ঠোঁটের কোণায়।
***
আফজাল সাহেবের খুশিতে চোখ ভিজে গেল, মেয়ের মাথায় হাত রেখে পৃথিবীর যত শুভকামনা আছে সবটা দোয়ায় চাইলেন মেয়ের জন্য। খুশি হবেনই না কেন? মেয়ে যে বৈরাগ্য ভুলে সুখ ধরতে রাজি। মেয়ের সুখেই তো তাঁর সব সুখ। এই মেয়েটা ছাড়া আর কে আছে?
চামেলি যখন নবনীর বিয়েতে রাজি হবার কথাটা জানল খুশিতে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে উঠেছিল। দুজন প্রিয় মানুষের ব্যথাটা ওর চোখ এড়ায়নি, তাই সবসময় ওর চাওয়া ছিল ওরা দুটোতে এক হোক। কী যে সুন্দর মানাবে দুজনকে!
এই বাসায় আসার পর প্রায় অনেকদিন হয়ে গেছে চন্দ্রর। মাকে মনে পড়লে মন কেমন করে উঠে। এছাড়া বাকি সময়টা এত সুন্দর কাটে যা ও ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না! এখন তো বিয়ের আয়োজন চলছে, একেবারে মহা ধুমধামে। এমন বিয়েতে এর আগে ও কখনো সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারেনি। তাই খুশিটা আরও বেশি। নবনী খালামনির বিয়ে বলে কথা, তাও আবার রায়ান মামার সাথে। ভালো মানুষের সাথে ভালো মানুষের জোড়, কী দারুণ ব্যাপার!
***
নবনীর সময়টা কীভাবে কাটছে বোধকরি ও নিজেই জানে না! একদিকে বাবার কাছেও থাকতে পারছে, আবার রায়ানকেও পাচ্ছে। এমন সোনায় সোহাগা আর কী হতে পারে!
ও সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে বাবার চোখে ফুটে উঠা প্রগাঢ় আনন্দ দেখে। ওই মুখের হাসি দেখতে ও তো নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে পারে।
সহসাই রায়ানকে ভীষণ পাগল মনে হলো, ছেলেটা একটুখানি ভালোবাসার জন্য পাগল, ভালোবাসা কাতুরে বলাই যায়। দেখে বোঝা যায় না এই ছেলে যে কী ভীষণ রোমান্টিক!
প্রথম দেখা হবার পরের সেই ইচ্ছা শত্রুতা, তারপর কখন যে সেটা ভুলে ওর পাথর মনে ছেলেটা ঢুকে বসে পড়েছিল ও বুঝতেই পারেনি! এরপর কিছু দোলাচল, আর তারপর কেবল ভালোবাসা আর ভালোবাসা!
কখনো ওর জীবনে এমন কেউ আসবে যে নিজের পুরোটা দিয়ে ওকে ভালোবাসবে এমনটা ও কখনো ভাবেনি। সজলের মতো কিছু কীট যেমন পৃথিবীতে আছে, তেমনি রায়ানের মতো সত্যিকারের মানুষও আছে। তাইতো পৃথিবীটা এখনো এত সুন্দর! নয়তো কবেই পঁচে গলে নষ্ট হয়ে যেত!
এখন ওর সময় কাটছে রায়ানকে কখন সামনে থেকে দেখবে সেই প্রতীক্ষায়। ওই পাগল ছেলেটার ভালোবাসা ও দেখেছে, কিন্তু ওর নিজের হৃদয়টা খুলে দেখানো বাকি রয়ে গেছে। রায়ানের জন্য যতটা আকুলতা নিয়ে অপেক্ষা করছে, এমন তীব্র তৃষ্ণার্ত অপেক্ষা আগে কখনো করেনি ও। এক শুদ্ধতম রাজপুত্র যেন রায়ান, যার হৃদয়ে এতটুকু ক্লেদ নেই।
***
রায়ান এসে নবনীকে সেভাবে দেখতে পেল না, শুকনো কিছু কুশল বিনিময়ের পরেই লাপাত্তা হয়ে গেছে মেয়েটা। ফোনও ধরছে না, শুধু মেসেঞ্জারে একটা কথা লিখেছে,
"আরও একটু অপেক্ষা করো ডিয়ার ক্যাবলাকান্ত, সব কথা একেবারে বিশেষভাবেই বলব। তাই জীবনের অত্যন্ত সুন্দর একটা দিনের জন্যই সবটা তোলা থাক।"
এই মেয়েটা এমন কেন, প্রায় বছরখানেক পরে দেখা হলো, তবুও এত দূরত্ব রাখল। কী হতো সামনাসামনি বসে কিছুটা সময় জোছনা বিলাস করলে? কিছুটা যেন অভিমান হলো ওর।
***
দেখতে দেখতে বিয়ের দিনটা চলে এলো, যেই দিনটার জন্য এত তৃষিত হয়ে অপেক্ষা চলেছে দুজনের।
আফজাল সাহেবের নিজের আত্মীয়স্বজন খুব একটা নেই, তবে কিছুটা দুঃসম্পর্কের হলেও সবাইলে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। আশরাফ সাহেবের গ্রামের বাড়ির সবাই এসেছে।
নবনী বিয়ের সাজে বসে আছে, আফজাল সাহেব মুগ্ধ চোখে মেয়েকে দেখছেন। এইতো সেদিন তাঁর আর অবনীর ঘর আলো করে এলো ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েটা। কী ছোট ছোট হাত-পা! জীবন্ত একটা পুতুল যেন! সেই নবনী দেখতে দেখতে আজ বিয়ের কণে। ক'দিন পরে নিজেরই কোল আলো করে আসবে ওর সন্তান। সেই ছোট্ট নবনী নিজেই কিনা মা হবে! সময় কী অদ্ভুত!
আনন্দে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন, কেঁদে ফেলল নবনীও। কাজল লেপ্টে সাজগোজ সব গুলিয়ে গেল, সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অশ্রু আজ একটুও বাঁধা মানছে না, এটা তো শুধুই নোনা জল নয়, এতে মিশে আছে বাবা মেয়ের অপার ভালোবাসা!
আফজাল সাহেবের মনে হলো মেয়েরা কেন বড় হয়ে যায়, ক'দিন পরেই তো বাড়িটা শূন্য হয়ে যাবে। কী করে থাকবেন তিনি?
মেয়ে আর রায়ানের মাঝে হওয়া কথা তিনি জানেন না এখনো! নবনী জানে বাবা এটা মেনে নিতে চাইবেন না! তখন কী করবে নবনী? একটা ভালোবাসা ফেলে অন্য একটা ভালোবাসার হাত ধরে ওকে কী চলে যেতে হবে সেই অচেনা সুদূরে?
কেমন যেন টনটন করে উঠল বুকটা!
...........