তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ৩০

🟢

সোনারঙা বিকেলটা নিজেকে পুরো গোধূলি রঙে রাঙিয়ে নিয়েছে। দুপুরের প্রখর দোর্দন্ডপ্রতাপ সূর্যটা বিদায় বেলায় যেন ভীষণ মিষ্টি একটা আবেশ ছড়িয়ে দেয়, পৃথিবীতে একটা অদ্ভুত মায়ার পরশ বুলিয়ে দিয়ে মিলিয়ে যায়! এই মায়া মায়া কণে দেখা আলো নবনীর উপরেও যেন নিজের সবটুকু মায়া ঢেলে দিয়েছে!

রায়ান ছবি তুলছিল নিবিষ্ট মনে, সহসা নবনীর দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেল। ওর মনে হলো এমন পবিত্র সৌন্দর্য এর আগে কোনোদিন দেখেনি। কয়েক পা এগিয়ে গেল, ক্যামেরার ফোকাস নিজের অজ্ঞাতেই নবনীর দিকে ঘুরে গেল, মোহাবিষ্ট রায়ান শাটার নামাতে লাগল অনবরত।

আনমনা নবনী সচকিত হয়ে যতক্ষণে ঘুরে তাকালো ততক্ষণে অনেকবার ফ্রেমবন্দী হয়ে গেছে সে। নিজের জন্য রায়ানের চোখে মুগ্ধতা দেখতে পেল, কিন্তু এই মুগ্ধতার অন্যকোনো অর্থ দাঁড় করাবার চেষ্টা একেবারেই করল না, বলা ভালো সাহস হলো না।

নবনী তাকাতেই সম্বিতে ফিরল ঘোরগ্রস্ত রায়ান। ক্যামেরা নামিয়ে নিল চোখ থেকে। ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল, ভাবল এই বুঝি মেয়েটা রেগে যায়, বন্ধুত্ব চুকিয়ে বুকিয়ে দেয়াও খুব একটা অস্বাভাবিক মনে হলো না!

"আসলে, আমি ওই, মানে... তোমার পারমিশন নিতে গেলে এই সুন্দর কম্পোজিশন হারিয়ে ফেলতাম বলে বলা হয়নি। স্যরি।"

রায়ান নিজের মুগ্ধতা লুকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রাণপণে, এই দুস্প্রাপ্য, দুর্লভ বন্ধুত্ব ও কিছুতেই হারাতে চায় না। তাই কিছুটা ইতস্তত করে যে অযুহাত মাথায় এলো সেটাই হড়বড়িয়ে উগড়ে দিল।

"এত এক্সকিউজ দিও না তো। বন্ধুত্ব হয়ে গেছে আমাদের আর তুমি এখনো স্যরির ভূত মাথায় নিয়ে বসে আছ। আমি কিছু মনে করিনি। কিন্তু ফটোগ্রাফার সাহেব, শুধু প্রকৃতি আর অন্যের ছবিই তুলবেন?"

রায়ানের চোখে চোখ রেখে শেষের প্রশ্নটা একেবারে ঠাট্টাচ্ছলেই করল নবনী।

এরপর হাত বাড়িয়ে দিল,

"ক্যামেরাটা আমাকে দাও তো দেখি, তোমার কয়েকটা ছবি তুলে দেই। এই সুন্দর মুহূর্তটা চিরকালের জন্য ছবিতে বন্দী হয়ে থাক! সময় ফুরিয়ে যাক, সব হারিয়ে যাক, মুছে যাক, স্মৃতিটুকু কেবল বন্দী হয়ে থাক!"

রায়ান মুচকি হেসে ক্যামেরাটা নবনীকে দিল,

"বাহ্! তুমি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলো তো!"

নবনী কিছু বলল না, কেবল রায়ানের ছবি তুলল কয়েকটা।

নবনীর কাছে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য কখনো গুরুত্ব পায়নি, একবারই শুধু নিজের কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে ছিটকে পড়েছিল একেবারে খাদের কিনারায়। একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছিল বিশাল বড় অঘটন থেকে। এরপর আর কাউকে কোনো সুযোগ দেয়নি, সুযোগ তো বহুদূর নিজের ধারেকাছেও কাউকে আসতে দেয়নি।

তবে রায়ানের এই সৌন্দর্য ওকে ইদানিং খুব করে টানছে। কারণ রায়ানের বাইরের অবয়ব যেমন অসম্ভব সুন্দর তেমনি ভেতরটাও সরলতায় মুড়ানো। আর নবনী রায়ানের ভেতরটা পড়ে ফেলেছে বলেই ওকে কেমন টানছে কোনো এক অদৃশ্য সুতোর টানে! কী প্রগাঢ় সেই টান! মায়ার টান, ভালোবাসার টান! এই প্রগাঢ় টান এড়ানোর সাধ্য কি ওর হবে কখনো?

***

আফজাল সাহেব আর আশরাফ সাহেব যেন ফিরে গেছেন ফেলে আসা তারুণ্যে। ছেলেমানুষী খুঁনসুটিতে সারাক্ষণ মেতে থাকছেন। চামেলি হতভম্ব হয়ে দেখছে কেবল। আফজাল সাহেব ভীষণ প্রাণখোলা সদালাপী মানুষ, সারাক্ষণ হাসিখুশিতে ভরপুর থাকতে পছন্দ করেন এটা জানে চামেলি। কিন্তু এমন উদ্দাম ছেলেমানুষী ওকে অবাক করে খুব। আবার ভালোও লাগে ভীষণ। পাশে থাকা প্রত্যেকটা মানুষের হাসিমুখ কার না ভালো লাগে!

"হ্যাঁ রে আফজাল, ওরা দুটো তো মনে হয় কিছুটা এগিয়েছে! কী বলিস?"

"তা তো এগিয়েছেই। কিন্তু দুজনেই নিজেদের মধ্যে গো ধরে বসে আছে। এটাই কিছুটা চিন্তার। মেয়েটা আবার আমার কথা ভেবে পিছিয়ে পড়ে কিনা তাও দেখার বিষয়!"

"আমার ছেলেটাও সারাজীবন অনেক গুমরে মরেছে। সামনের দিনগুলো খুব সুন্দর হোক। তুই চিন্তা করিস না, ওরা নিজেদের আরেকটু বুঝতে পারলেই দুই বুড়ো মিলে ওদের চার হাত ঠিকই মিলিয়ে দেব।" কেমন একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

"তুই নিজেকে বুড়ো ভাবছিস তবে?"

"ধূর, কে বুড়ো? মনের বয়স সবে আটাশ।"

"আর আমার সাড়ে সাতাশ।"

দুজনেই হেসে উঠল প্রাণ খুলে। হাসতে হাসতেই কখন যে চোখটা ভিজে আসল কেউই বোধহয় বুঝতে পারল না, তবে এই অশ্রুতে কোনো বিষাদ নেই, আছে একরাশ স্বপ্নের বুনন!

রায়ান যখন নিজের বাংলাদেশে আসার ইচ্ছে পোষণ করে তখন আশরাফ সাহেব ফোন করেন বন্ধুকে। আফজাল সাহেব কিছুতেই রায়ানের হোটেলে থাকার ব্যাপারে সম্মতি দেন না। অগত্যা রায়ান রাজি হয় এখানে আসতে। আর তাতেই দুই বাবা যেন একটা পথের দিশা পান, দুই ট্র‍্যাক হারানো কঠিন হৃদয়কে কাছাকাছি আনতে চান। ভালোবাসা নাহয় না হোক হৃদয়ে হৃদয়ে ঠোকাঠুকি হলেও বরফ গলবে তো কিছুটা! আর বরফ গলে গেলে পানিটা যেমন একীভূত হয়, তেমনি দুই হৃদয়ও একীভূত হবে, এটাই বিশ্বাস করতে শুরু করেন তাঁরা।

কিন্তু এসব কথা রায়ান কিংবা নবনী কেউ জানে না, নবনী বোধহয় শুরুর দিকে কিছু আন্দাজ করতে পেরেছিল এমনটাই ভেবেছিলেন আফজাল সাহেব। ইচ্ছে যেন পূরণ হয় সেই দোয়া রাখলেন সন্তান স্নেহে চিন্তিত দুই বাবা। চামেলি সব শুনে খুশিতে একেবারে উচ্ছ্বসিত হয়ে গেল, কী সুখবর হতো যদি ওর প্রিয় 'নবনী আফা' আর 'রায়ান ভাইজান' এক হতো! সব ভালোই ভালোই হোক মন থেকে এই দোয়া চাইল চামেলি।

***

সূর্যটা টুপ করে ডুব দিল, সন্ধ্যা নামল পৃথিবীর বুকে।

"রায়ান চলো, এবার ফিরতে হবে নয়তো খুব বেশি দেরী হয়ে যাবে।"

"চলো।" বলে পা বাড়িয়েও আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে রায়ান বলে,

"নবনী, তুমি কি মন থেকে আমার সাথে বন্ধুত্বে সায় দিয়েছ, নাকি শুধু আমার কথা রাখতে?"

নবনীর সহসা ভীষণ রাগ হলো, এই ছেলের মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধির বালাই নেই একেবারে। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"তোমার কী মনে হয়?"

"জানি না বলেই তো জিজ্ঞেস করলাম! তুমি কিন্তু তোমার সম্পর্কে কিছুই জানাওনি আমাকে। তাই বললাম।"

"তুমি কি সত্যিই হাঁদারাম? তোমার মনে হয় এতদিনে জানার কথা আমার ইচ্ছে না হলে সেই কাজ আমি কখনো করি না? আর আমি তোমাকে কতটা বিশ্বাস করেছি এটা এখনো বোঝনি? বিশ্বাস না করলে এখানে, এত দূরে তোমাকে নিয়ে চলে আসতাম? চেহারার সাথে সাথে নিজের বুদ্ধিতেও যদি একটু শান দিতে তবে বুদ্ধি নামক বস্তুটা তোমার মাথা থেকে পালাত না!"

নবনীর কথায় রায়ান মুহূর্তেই বোকা বনে গেল, এই মেয়ের শত্রুতার সাথে সাথে বন্ধুত্বটাও ভয়ংকর, বেশিই ভয়ংকর!

"তুমি সবসময় এমন চাঁছাছোলা কথা কেন বলো? আমাকে ভড়কে দিতে? আর এর আগেও তুমি আমার চেহারা নিয়ে কথা বলেছ। এটাতে কী সমস্যা তোমার?"

কিছুটা আহত স্বরে বলল রায়ান।

"অনেক সমস্যা, সুন্দর চেহারার ছেলেরা মনের দিক থেকে ভীষণ কালো হয়।"

আনমনেই কথাটা বলে ফেলল নবনী, আর আফসোসে পুড়ল। কথা ফিরিয়ে নেবার কোনো সিস্টেম থাকলে কি খুব ক্ষতি হতো! রায়ানের ভেতরে আর বাইরে একইরকম এটা নবনী খুব ভালো করে জানে, তবে কেন মুখ ফসকে এমন একটা কথা বলে ফেলল?

রায়ান সহসা দমে গেল, ভীষণ অপমানিতবোধ করল। মুখে সেই অপমানের লালচে ছাপ পড়ল। তীব্র বেগে পা বাড়ালো গাড়ির দিকে। নবনীও পা চালাল দ্রুতলয়ে। রায়ান গাড়িতে বসার আগেই ফট করে ওর হাতটা ধরে ফেলল নবনী।

"রায়ান আমি আসলে এভাবে বলতে চাইনি। আর কথাটা তোমাকেও বলিনি। তুমি রেগে যেও না প্লিজ!"

ভীষণ কাতর শোনায় নবনীর গলা, রায়ান সবসময় ওর দৃঢ় গলা শুনেই অভ্যস্ত। তাই আজ এমন কাতরতা দেখে সহসা থমকে যায়। নবনী ওর হাতটা ছেড়ে দেয়,

"তুমি আমার সম্পর্কে জানতে চাও বললে না? বলব অবশ্যই। কিন্তু আজ এই দিনটা খুব সুন্দর একটা দিন ছিল আমার জন্য। আজকের দিনে কোনো আবর্জনা তুলে এনে নষ্ট করতে চাই না। আর এখন আমাদের যেতে হবে, নয়তো অনেক রাত হয়ে যাবে। চলো।" এই বলে গাড়িতে গিয়ে বসল নবনী।

নবনী না চাইলেও রায়ান জানে এই চমৎকার দিনের রেশ কিছুটা হলেও কেটে গেছে, তাল ছুটে গেছে কোথাও! এমন সোনারঙা দিন সহসা কেমন ধূসর হয়ে গেছে! কিছুক্ষণ স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে থেকে সঙ্গী হলো নবনীর। বাড়ির পথ ধরল দুই পাল ভাঙা নাবিক।

***

সেদিন কিংবা পরেরদিন কেউ কারও সাথে সেভাবে কথা বলল না। দুই বন্ধু নিজের সন্তানদের আচরণে কিছুটা ব্যথিত হলেন। কয়েকদিন থেকেই দুজনে ওদের পর্যবেক্ষণ করছেন আর সাথে চামেলি তো আছে। সে নাচতে নাচতে টিকটিকি হতে রাজি হয়েছে। চামেলির চোখ এখন বেশিরভাগ সময় রায়ান আর নবনীতেই নিবন্ধ থাকে।

আজ ঘুরে আসার একদিন পর নবনী রায়ানের দরজার কড়া নাড়ায়। রাত প্রায় দশটা তখন, মাত্র খাওয়া দাওয়া শেষ হয়েছে। রায়ান দরজা খুলে অবাক হয় ভীষণ। নবনীকে সে আশা করেনি এখন।

"কিছু বলবে?"

"না, গান শোনাব। চল ছাদে যাই।"

"হঠাৎ আমাকে গান শুনাতে ইচ্ছে হলো কেন জানতে পারি?"

"না পার না। যদি আস তবেই বলব। নয়তো বসে বসে ঘুমাও।"

রায়ানের অভিমান কৌতূহলের কাছে হেরে গেল, দরজা হালকা ভেজিয়ে নবনীর পিছু নিল।

ছাদে গিয়েই নবনী গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠল

'আমি তোমাকেই বলে দেব, কী যে একা দীর্ঘ রাত,

আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে।

আমি তোমাকেই বলে দেব সেই ভুলে ভরা গল্প

কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়,

ছুঁয়ে কান্নার রঙ, ছুঁয়ে জোছনার ছায়া...'

রায়ান চোখ বন্ধ করে গানটা অনুভব করছিল, গান থামতেই চোখ তুলে নবনীর দিকে তাকাল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে।

"আসলে আমি আমার ভুল দরজায় কড়া নাড়ার গল্পটা তোমাকে বলতে চাই। নিজের অল্পবয়সের কিছু আবেগী ভুলের গল্প। শুনবে তুমি?"

মেয়েটার গলায় কী যে এক অদ্ভুত ব্যথা ফুটে উঠল!

"তোমাকে নিয়ে কিছু কৌতূহল আছে ঠিকই, কিন্তু তোমার বলতে কষ্ট হবে এমন কিছু জানতে চাই না।"

"ওই অধ্যায় অনেক আগেই কেটেকুটে ফেলে দিয়েছি। আর কোনো কিছু নেই সেখানে। বরং কাউকে না বলা অধ্যায়ের কথা বলতে পারলে অল্প কিছু বাষ্পও যদি থেকে যায় তাও হয়তো মিলিয়ে যাবে! ভাবলাম, বলব যখন বন্ধুকেই বলি। "

একটা অদ্ভুত হাসি খেলে গেল নবনীর অবয়বে, আবছা চাঁদের আলোয় সেটা তাচ্ছিল্যের নাকি ব্যথা জয় করতে পারার বিজয়ের রায়ান ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।

"তাহলে বলো।"

"তখন স্কুলের শেষ বছর চলছিল। বয়স আর কতই বা। অন্য দশটা কিশোরী মেয়ের চাইতে কিছুটা মনে হয় বেশিই ইমোশনাল ছিলাম! একটা কোচিংয়ে পড়তে যেতাম তখন। একটা নতুন ভাইয়া এলো সেখানে ক্লাস নিতে। মাস্টার্স করার পাশাপাশি কোচিং-এ ক্লাস নিত আর কিছু টিউশন পড়াত সে। এখনকার সময় যেমন ক্রাশ বলে একটা শব্দ খুব প্রচলিত, তখন এটা সেভাবে প্রচলিত ছিল না। তবে বিষয়টা তেমনই। সে দেখতে এতই সুন্দর ছিল, কীভাবে যেন নিজের মধ্যে আবেগ এসে জমা হলো, আবেগের প্রবল স্রোতে ভাসতে ভাসতে প্রেমে পড়ে গেলাম। জীবনের প্রথম প্রেম যেন আমার সমস্ত কূল ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যেত লাগল! আমিও স্রোতে গা ভাসিয়ে দিলাম!"

.........

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ৩০