রুমু চা নিয়ে ঝুমুর ঘরে গিয়ে দেখল মেয়েটা মোবাইলে কথা বলছে, অবয়ব খুশিতে ঝলমল করছে দেখে বুঝতে পারল ওপ্রান্তে নিশ্চয়ই মৃদুল। দেখে ভালো লাগল খুব। এবার সব ভালোই হোক তবে! তবুও বুকের কোথাও যেন একটা টনটনে ব্যথা হলো। এমন সুন্দর ভালোবাসায় মোড়া সময় ওর জীবনেও তো এসেছিল। কতই না স্বপ্নের বুনন এঁকেছিল শাফায়াতের সাথে! স্বপ্ন যত সুন্দর হয় বাস্তবতা ঠিক ততটাই রূঢ় হয়।
মানুষকে একবার দেখার সময়ই মুখোশের পেছনের চেহারা দেখা যায় না কেন? রুমুর মনে হলো কোনো মানুষ ভালো না মন্দ এটা যদি পরিমাপ করা যেত খুব ভালো হতো। এমন একটা ডিটেক্টর থাকলে তাতে কিছু প্যারামিটার সেট করা গেলে প্রতারিত হবার সংখ্যা একেবারে কমে যেত। নিজের এমন অমূলক ভাবনায় হেসে ফেলল রুমু।
শাফায়াতের সত্যিকারের শয়তানি চেহারার উপর আঁটা সুন্দর মুখোশটাকেই পুরো মানুষটা ভেবে যে ভুলটা করেছিল তার মাশুল তো হাড়েমজ্জায় দিচ্ছে এখন। সন্তানদের জীবনটা কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেবে না। এমন নোংরা লোকের সংস্পর্শে ওদের থাকতে দেবে না ও। নিজের ভেতরে যেটুকু শিক্ষা, মনুষ্যত্ব, যেটুকু সভ্যতা ভব্যতা এখনো খানিকটা অবশিষ্ট আছে সবটা ছেলেদের মধ্যে ঢেলে দিয়ে হলেও ওদের সুশিক্ষিত করবে।
সুশিক্ষা মানেই তো গাদাগাদা বই মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দেয়া নয়, মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করতে পারাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। প্রাতিষ্ঠানিক এবং মানবিক দুটো শিক্ষাতেই ওদের বড় করবে ও। এ ব্যাপারে পুরোপুরি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রুমু।
তবে ও জানে শাফায়ত ওর কাছে হারতে চাইবে না বলেই ছেলেদের নিজের কাছে রাখতে চাইছে কেবল। এছাড়া আর কোনো কারণ নেই বাচ্চাদের নিজের কাছে রাখতে চাওয়ার। শাফায়াতের সাথে টক্কর দিয়ে কতটা টিকে থাকতে পারে এটাই দেখতে চায় রুমু। এরজন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে বেশ জোরেসোরে।
***
সেদিন রায়ানকে জরুরী ভিত্তিতে ঢাকায় শিফট করা হয়েছিল। আজ তিনদিন পার হলো, অনেকগুলো সেলাই লেগেছে। এখনো পুরোপুরি শুকায়নি ক্ষত, আরও দু-একদিন লাগবে হয়তো। সেদিন একে তো রক্তক্ষরণ বেশিই হয়েছিল, আরেকদিকে এনাস্থেশিয়ার প্রভাব মিলিয়ে ভীষণ দূর্বল হয়ে পড়েছিল রায়ান। কখনো জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিল তো কখনো গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছিল। তবে খুব বেশি চিন্তার কিছু ছিল না।
নবনীর এই ক'দিন রায়ানের কেবিনে একেবারে দমবন্ধ করে কেটেছে। মাঝে কেবল কিছুক্ষণের জন্য বাসায় গেছে। আফজাল সাহেবও খুব উৎকন্ঠিত ছিলেন। আশরাফ সাহেব ছেলের খবর শুনেই জরুরী ভিত্তিতে আসার বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন। আগামীকাল রাতে এসে পৌঁছাবেন তিনি। ভয়ংকর খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারত ভেবেই শিউরে উঠল ভেতরটা। মনে মনে অসংখ্যবার আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করেছেন বাবা আর মেয়ে।
তবে যাকে নিয়ে এই উদ্বেগ সে যেন বড্ড নির্বিকার।
"আপনারা এত চিন্তিত হবেন না তো আঙ্কেল! খুব বেশি কিছু হয়নি। আমি ভীষণ বিব্রতবোধ করছি যে আপনাদের এমন একটা সিচুয়েশনে ফেলে দিয়েছি।"
কথা বলতে এখনো কিছুটা কষ্ট হয় ওর। তবুও ওদের আশ্বস্ত করতে চাইল। ঋণ বেড়ে বেড়ে পাহাড় প্রমাণ! তবে এই ঋণে ডুবে থাকতেও যেন ভালো লাগে, আকুণ্ঠ ডুবে যেতেও ভালো লাগে!
রায়ান সবচেয়ে বেশী বিস্মিত হয়েছে নবনীর আচরণে! মেয়েটা ওকে একেবারেই সহ্য করতে পারত না, সুযোগ পেলেই কথার অগ্নিবাণে বিদ্ধ করতে যেন এক পায়ে খাড়া সবসময়। এমনকি এই ঘটনা জানানোর জন্য ফোন করেছিল সে সময়ও ওকে প্রায় ধমকেছিল এই ইস্পাত হৃদয় মেয়েটা। তবে এবারে তিক্ততা ছিল না, বরং কোথাও একটা আশ্চর্য অধিকারবোধ ছিল। এই মেয়েটাই ওর হাল ভাঙা জীবনের সঠিক রাস্তা বাতলে দিয়েছে, জীবন বদলে দিয়েছে। নবনীর মন রায়ানের জন্য একটা মূর্তিমান গোলকধাঁধা। এর অলিগলি আঁতিপাঁতি হাতড়ে মরলেও মনে হয় না কখনো পড়তে পারবে!
নবনীর এই আচরণে সবচেয়ে বেশী বিস্মিত হয়েছেন আফজাল সাহেব। নিজের মেয়েকে তিনি খুব ভালো জানেন। সবসময় নিজের চারপাশ কাঠিন্যের খোলসে আবৃত রাখলেও ভেতরটা ভীষণ নরম একতাল কাদামাটি। ওই খোলস ভেদ করে একবার যারা ওর মনের কাদা মাটিতে ঢুকে পড়ে তাদের জন্য নিজের সবটা বিলিয়ে দিতে পারে মেয়েটা। মেয়ের মনে রায়ান যে ভালোমতোই প্রবেশ করেছে, এটা বেশ ভালোই বুঝতে পারল উনার বিচক্ষণ চোখ। মনে মনে দোয়া করলেন, মেয়ের মনে রায়ান যেন একটা পাকাপোক্ত আসন পায়। মেয়েটা একটু মন থেকে হাসুক, প্রাণ খুলে হাসুক।
"বাবা, তুমি এখন বাসায় যাও তো। তোমার শরীর খারাপ করবে। এমনিতেই অনেক ধকল গেছে।"
"তুই আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করিস কেন বল তো? আমি কি বেশিই বুড়িয়ে গেছি?"
"কী যে বলো না বাবা? তুমি একটুও বুড়িয়ে যাওনি। তুমি তো পারফেক্ট এভারগ্রীন। আরও বহুকাল যেন এমনই এভারগ্রীন থাকতে পার তাই একটু আধটু নিয়মকানুন তো মানতেই হবে তাই না?"
"ষাটের কোটা পেরিয়েও যখন বুড়ো হইনি, মনে হয় না এই জীবনে আর বার্ধক্য আসবে। একেবারে তারুণ্য নিয়েই ওপারে যেতে চাই।"
এতক্ষণ দুজনেই হেসে হেসে কথা বলছিল গুমোট পরিবেশটা হালকা করার জন্য। কিন্তু শেষের কথায় রুমের বাতাসে বিষাদ জমা হলো।
"বাবা, তুমি যদি আর কক্ষণো এধরণের কথা বলো তবে আমি যেদিকে দু-চোখ যায় সেদিকে চলে যাব।"
আর্দ্র চোখেও দৃঢ় গলা নবনীর। বাবা নবনীর হাতে হাত রাখলেন,
"আরে আমি তো কথার কথা বলেছি। তুই সবসময় সিরিয়াস হয়ে যাস কেন?"
নবনী কঠিন চোখে তাকাল বাবার দিকে, আর বাবা স্বভাব সুলভ হেসে বললেন,
"মা রে, আর কতবার বলব তোকে যে এভাবে তাকাবি না। আমি ভয় পাই খুব!"
আবারও স্বাভাবিকতা ফিরে এলো কিছুটা। বাবা যাবার আগে নবনী হাসপাতালের লবি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলো।
"একটা কথা বলি তোকে মা? রেগে যাস না যেন আবার।"
রওনা দেবার আগে নবনীর হাত ধরে বললেন বাবা, মাথা নেড়ে সম্মতি দিল ও।
"মনের দরজা গলে যদি কেউ টুপ করে মনে ঢুকে যায়, তাকে মন বাড়িয়ে সেখানে জায়গা করে দে। মনের ডাক শুনতে হয় মা। ইচ্ছেকে উপড়ে ফেলিস না, আমার তবে খুব কষ্ট হবে। আমাকে অপরাধী করে দিস না মা!"
নবনী ওখানেই স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে রইল, মুখে কথা যোগাল না। চমকে উঠল, থমকে গেল একেবারে। সবশেষে একটা তীব্র গ্লানিবোধ ওকে গ্রাস করল। ওর আরও সতর্ক হবার দরকার ছিল। মনকে ধরে শেকলে বেঁধে বাক্সবন্দী করার প্রয়োজন ছিল। তবে অবাধ্য, বেহায়া মন রায়ানের পানে ছুটতে পারত না।
বাবা কীভাবে যেন ওর সবকিছু বুঝে ফেলেন! নিজের ভেতরে চেপে রাখা অনুভূতিও কোন মন্ত্র বলেই না জেনে গেলেন! আর নবনীকে ডুবিয়ে গেলেন দ্বিধার সমুদ্রে!
***
মৃদুলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে ঝুমুর। দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি, সেটা ঝুমু গো ধরেছে বলেই। দুই বোন মিলে ঠিক করেছে একটা বুটিক হাউজ দেবে। অল্প পুঁজি নিয়ে আর কোনো জিনিস মাথায় এলো না। আশেপাশে এত এত বুটিক হাউজ তাই দ্বিধায় ছিল যে ওদের টা কতটা চলবে! কিন্তু আল্লাহ ভরসা বলে শুরু করাই শ্রেয় মনে করল। আদৌ চলবে কিনা তাও জানে না, তবুও চেষ্টা করতে চায়। এটা কিছুটা দাঁড় করিয়ে তবেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চায় ঝুমু।
মৃদুলও মেনে নিয়েছে, এতদিন অপেক্ষা করতে পেরেছে যখন আর কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখাই যাক না হয়! নিজের অর্ধাংশের এইটুকু সিদ্ধান্তকে যদি সম্মান করতে না পারে তবে নিজেকেও যে সম্মান করা হয় না। অর্ধেক বাদ দিয়ে সে তো পরিপূর্ণ হতে পারবে না। নিজের পূর্ণতার জন্য হলেও বাকী জীবন পথের সঙ্গীকে সম্মান করা উচিত।
মৃদুল ওদের ব্যবসায় কিছু সাহায্যও করতে চেয়েছিল, কিন্তু ওরা নেয়নি। ঝুমু তো প্রায় তেড়েফুঁড়ে এসেছিল। ওদের এক কথা, এটা ওদের নিজেদের লড়াই, নিজেরাই দাঁড় করাতে চায়। তবে মৃদুল শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকে যদি কোনো সাহায্য করতে চায় করতে পারে। মৃদুল তাতেই রাজি। ব্যাংক থেকে লোন নেবার পরামর্শ দিয়েছিল, কিন্তু ওরা আপাতত লোন নিতে ইচ্ছুক না। যদি বড় করার দরকার হয় তখন নেয়া যাবে।
কখনো ঝুমুকে আরেকবার চোখের দেখা দেখতে পারবে কিনা তাই জানত না মৃদুল! নিয়তি হয়তো অন্যকিছু ভেবেছিল, ওদের মেলাতেই চাইছিল হয়তো! তাই এতদিন পর আবার দেখা তো হলোই, নিজের জীবনেও পেতে যাচ্ছে।
ঝুমুকে পাবার সম্ভাবনা যখন তৈরী হলো একদিকে যেমন অদ্ভুত একটা ভালোলাগায় ছেয়ে গিয়েছিল, তেমনি ঝুমুর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য পুড়ে গিয়েছিল ভেতরে ভেতরে। যে হাসিতে তাকিয়ে সহস্র মুহূর্ত কাটানোর প্রতিজ্ঞা করেছিল, সেই হাসিটাই বিলীন হয়ে গিয়েছিল। ওর নিজের জ্বালানির জন্য হলেও ওই হাসিটা ওর প্রয়োজন, ভীষণ ভীষণ প্রয়োজন। তাই তো এমন মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যেদিন ঝুমু ওকে হ্যাঁ বলেছে সেদিন মন প্রশান্তিতে ভরে উঠেছিল। বহুকাল বাদে মনটা স্থিরতা পেয়েছিল। আর এখন বিয়ের জন্য অধীর আগ্রহে ক্ষণ গণনা করছে, অপেক্ষা করছে মাহেন্দ্রক্ষণের।
***
রায়ানকে খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দিল নবনী।
"এখন কেমন লাগছে আপনার?"
"খুব একটা খারাপ না। আপনারা অনেক কষ্ট করলেন। স্যরি, আপনাদের বিপদে ফেলে..."
"এখন ঘুমিয়ে যান তো, ঘুমান। সারাদিন স্যরির ফ্যাচফ্যাচ শুনতে ভালো লাগে না। আপনার সব স্যরি যদি কোন বাক্সে জমিয়ে রাখা যেত, তবে ওগুলো বিক্রি করে কোটিপতি হয়ে যেতে পারতাম। অন্যকিছু বলার হলে বলুন নয়তো চুপচাপ ঘুমান।"
ঝাঁঝিয়ে উঠল নবনী। কীসের এক গান সারাদিন কানের কাছে শোনাতে থাকে। মনে মনে কিছু শক্ত গালি দিল রায়ানকে।
নবনীর ইচ্ছে করছিল এই স্যরিগুলো বোতল বন্দী করে পানি দিয়ে গুলিয়ে সামনের মাথামোটা ছেলেটাকে গিলিয়ে দিতে। কিংবা ভ্যাক্সিনের মতো করে প্রয়োগ করতে। 'বিষে বিষক্ষয়' এর মতো 'স্যরিতে স্যরি ক্ষয়' করা যেত তবে।
.............