আজ ঝুমুকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। কিন্তু ওর এসব একেবারেই ভালো লাগে না। প্রত্যেকবার সবটা জেনেই সবাই পিছিয়ে যায়। কিছু হবে না জেনেও শুধু শুধু সঙ সেজে একগাদা লোকের সামনে বসতে ওর নিজেকে কী যে ছোট মনে হয়, একেবারে তুচ্ছ মনে হয়! কিন্তু আপাতত ও নিরুপায়, নিজের পায়ে না দাঁড়াতে পারলে এই প্রহসন মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই।
ওর দুই ভাই ই পরিবার নিয়ে বাসায় এসেছে আজ। সকাল থেকেই তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে, ভাবীরা রান্নার কাজে লেগে গেছে। রুমু ঘরটা গুছিয়ে রাখছিল, ঝুমুর ঘরে এসে দেখল মেয়েটা এখনো তৈরী হয়নি মেয়েটা, চেহারার দ্বিধার ছাপ স্পষ্ট। পাত্রপক্ষ দুপুরে এখানে খাবে, আরেকটু পরেই চলে আসবে হয়তো!
"কী রে, এখনো এভাবে স্ট্যাচুর মতো বসে আছিস কেন? শাড়িটা পরে ফেল!"
"আপা, তুইও এসবে তাল দিস না তো। আমার এসব একটুও ভালো লাগছে না। শুধু শুধু কতগুলা টাকা নষ্ট! আমাদের জন্য এটা অপচয় ছাড়া আর কী?"
"এসব ভাবার সময় নেই এখন ঝুমু। যা তো, এখনই শাড়িটা পরে ফেল। তাড়াতাড়ি যা না!"
তাড়া লাগায় রুমু।
"আমি তো এমনিতেই সুন্দরী, আপা। আমার এই সৌন্দর্য তো কলঙ্কেই ঢাকা পড়ে যায়। তোর এই শাড়ি কী সেই কলঙ্ক ঢাকতে পারবে?"
কথাটা বলতে গলাটা ভীষণ কেঁপে উঠল ঝুমুর।
আর রুমু যেন সহসা থমকে গেল, মাত্র কয়েক শব্দেও বুঝি এতটা গভীর কথা বলে ফেলা যায়!
"এভাবে দুঃখী দুঃখী মুখ করে তাকিয়ে থাকিস না তো, আপা। বের হ রুম থেকে। আমি শাড়ি পড়ব এখন। রূপ দিয়ে পাত্রের মাথা ঘুড়িয়ে দিতে হবে তো!"
শেষ কথাটা হেসে হেসে বললেও ভেতরের কষ্টকে চাপা দিতে পারেনি পুরোপুরি। প্রচণ্ড মন খারাপ হয়ে গেল রুমুর।
"কী যে আজেবাজে কথা বলিস না তুই! আমি যাচ্ছি, তুই রেডি হয়ে নে।"
যেতে যেতে মনে মনে আওড়াল,
"আল্লাহ, এই মেয়ে দেখতে যেমন সুন্দর, ওর জীবনটাও তেমন সুন্দর করে দাও।"
ছেলে পক্ষ চলে এলো দুইটা বাজার আগেই, খাওয়া পর্ব শেষ হতেই ডাক পড়ল ঝুমুর। শাড়ি পরেছে মেয়েটা, গাঢ় নীল রঙের তাঁতের শাড়ি। চোখে কাজলের রেখা টেনেছে। এমনিতেই চোখধাঁধানো সুন্দরী, আজ যেন রূপ ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে! সাফিয়া বেগম মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন মেয়ের দিকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেন পরম মমতায়।
তারা মোটে পাঁচজন এসেছে। ছেলের এক দুঃসম্পর্কের মামা, আর দুই জন বন্ধু, এরমধ্যে একজন আবার সস্ত্রীক, আর ছেলে নিজে। ঝুমু ওদের সামনে আসতেই শুনল অনেক ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে সবার মধ্যে। এসব কথাবার্তা থেকে ও জানতে পারল ছেলের নাম মৃদুল। ছেলের তিন কূলে কেউ নেই, একটা গ্যাস ফিল্ডে চাকরি করছে কয়েক বছর থেকে। একবার চোখ তুলে ছেলেকে দেখল ঝুমু। কিছুটা চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু কোথায় দেখেছে সেভাবে মনে করতে পারল না! এক নজর তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল, কারণ ছেলেটা ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল।
দু'জনকে একা কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়া হলো, রুমুর ঘরের বারান্দায় দু'টো কাঠের চেয়ার রেখে আসল ওর ভাইয়ের ছেলেটা। ঝুমু বারান্দায় গিয়ে বসল, কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল ওর। একটু পরে ছেলেটাও এসে দাঁড়ায় সেখানে।
"ঝুমু আমি কি তোমার পাশে বসতে পারি?"
"আমি যদি না বলি, তবে বসবেন না?" জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় ঝুমু।
"তুমি মনে হয় আমাকে চিনতে পারনি!"
মৃদুলের মুখে চাপা হাসির রেশ।
"আপনাকে কি আমার চেনার কথা ছিল?"
"নাহ্! আমি তোমার জন্য তেমন ইম্পর্ট্যান্ট কেউ নই।"
"তবে জিজ্ঞেস করলেন কেন?"
"এমনিতেই। ছাড়ো সেটা। তোমাকে লাল শাড়িতে দারুণ মানায়। এটাতেও ভালো লাগছে অবশ্য।"
ঝুমু এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারল না কোথায় দেখেছে। আর শাড়ি তো আগে মাঝে মাঝেই পরত। মন চাইলেই শাড়ি পরত ও।লাল শাড়িও অনেকবার পড়া হয়েছে তখন। এখন শুধু পাত্র পক্ষের সামনে যাবার জন্যই শাড়ি পরে, এছাড়া পরা হয় না। কী করে পরবে, ওর সমস্ত রঙই তো হারিয়ে গেছে!
"আপনি আমাকে কখন দেখেছেন? আরেকটা কথা, আমার চেহারা দেখে গলে যাবেন না যেন! আমার একটা ভয়ংকর খারাপ অতীত আছে।"
ঝুমু ভেবেছিল এবার এই ব্যাটা নিশ্চয়ই চলে যাবে, কিন্তু ওর প্রেডিকশন পুরোপুরি ভুল। ছেলেটার হাসি বরং আরও বিস্তৃত হলো, ঝুমুর থেকে প্রায় হাত তিনেক দূরত্বে রাখা চেয়ারটায় বসে পড়ল, বেশ আয়েস করেই বসল।
"আপনি আমাকে কোথায় দেখেছেন বলুন তো? আগে থেকেই যে চেনেন আমাকে এটা বুঝতেই পারছি।"
"বলব তো অবশ্যই। তবে আজ নয়, পরে একদিন বলব।"
"আপনি বলতে চাইছেন এর পরেও আমাদের দেখা হবে? আমি আপনাকে সব বলি আগে, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।"
ঝুমু নিজেকে লুকিয়ে রেখে বিয়ে করতে চায় না। তাই ওর এই উদ্বেগ!
হাসল মৃদুল, নিতান্তই সাদামাটা চেহারার একটা ছেলে, তবুও কোথাও যেন একটা দৃঢ়তা আছে অবয়বে, প্রবল আত্মবিশ্বাসের ছাপ সেখানে। এটাই হয়তো ওকে আলাদা করেছে অনেকের মধ্যে।
"তোমার এত উতলা না হলেও চলবে। আমি জানি সব। আলাদা করে কিছু বলতে হবে না।"
"সব জেনে তো সবাই বিয়ে ভেঙে দিয়ে চলে যায়। আপনি দয়া করতে চাইছেন কেন?"
"দয়া? তোমাকে দয়া করার সাধ্য আমার নেই। তোমার কাছ থেকে বরং দয়া গ্রহণ করতে পারি।"
কথা বলার মাঝেই ডাক পড়ল ওদের, মৃদুল হাতের ঘড়িতে দেখল প্রায় বিশ মিনিট পার হয়ে গেছে।
"যাচ্ছি, ভালো থাকবে। আবার দেখা হবেই, তখন সময় নিয়ে কথা বলব।"
মৃদুল উঠে চলে আসতে গেলেও আবার ঘুরে ঝুমুর কাছাকাছি গেল,
"একটা কথা ঝুমু, আমি কখনো চেহারায় গলে যাই না। বাহ্যরূপের খুব একটা কদর আমি করি না।"
বলেই চলে গেল দ্রুত, আর ঘোরগ্রস্ত হয়ে বসে রইল ঝুমু। ব্রেইন স্টর্মিং করে যাচ্ছে অনবরত, কে এই ছেলে?
***
সব জানার পর দুই দিন চলে গেছে, রায়ান যেন একেবারে ডুবে ছিল নিজের মধ্যে। ওর আশেপাশে আরও কিছু মানুষ আছে, তাও যেন ভুলে গেছে। কোনোরকম যন্ত্রের মতো এসে খেয়ে আবার নিজের ঘরে গিয়ে দরজা এঁটে বসে ডুবে যায় নিজের জগতে। এমনকি আঙ্কেলের সাথে দাবার আসরেও যোগ দেয়নি দু'দিন। আফজাল সাহেব কিছুটা চিন্তায় পড়ে যান, নবনী ওষুধ দিতে এলেই জিজ্ঞেস করলেন,
"ছেলেটার হঠাৎ কী হলো রে? কিছুই বুঝতে পারছি না। তুই কী কিছু জানিস?"
নবনী কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে যায়,
"বাবা, জানো তো, মানুষের কখনো কখনো নিজেকে খুঁজে পেতে নিজের গভীরে ডুব দিতে হয়, তলিয়ে যেতে হয়। উনারও হয়তো নিজের ভেতরটা নতুন করে দেখতে ইচ্ছে করছে!"
আফজাল সাহেব মেয়ের কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলেন না,
"তাই বলে এমন হাসিখুশি ছেলেটা এমন নিশ্চুপ হয়ে গেল! চিন্তা হয় রে মা। ওদিকে আশরাফকে কী বলব তাই ভাবছি!"
"আশরাফ আঙ্কেলকে এখন কিছু বলতে হবে না বাবা। তুমি চিন্তা করো না তো। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
বাবাকে চিন্তিত না হবার কথা বললেও নবনী নিজে নিশ্চিন্ত হতে পারছে কই? এরমধ্যে বেশ কয়েকবার রায়ানের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু ওপাশ থেকে সেভাবে সাড়া আসেনি। সংক্ষিপ্ত দুই এক কথার উত্তর পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে ওকে। ওই ছেলের মনে আর মগজে কী চলছে, কিছুই বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই! এটাই ভাবনায় ফেলে দিয়েছে ওকে।
রায়ানের আবার বেরিয়ে যাবার কথা ছিল বাংলাদেশের কোনো এক প্রান্তে, কিন্তু মনের এই অবস্থায় কাজে মগজ গলাতে পারবে না একেবারেই। গত দু'দিন শুধুই ভেবেছে রায়ান। নিজের কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো স্মৃতি নবনীর বর্ননার সাথে জুড়ে দিয়ে এটাই উপলব্ধি করতে পেরেছে সবটা সত্যি। কী এক ভ্রমের জগতে তলিয়ে ছিল ও এতদিন! ওর জানা ভুল, ধারণা ভুল এমনকি পুরো জগৎ ভুল!
তীব্র একটা অপরাধবোধ ঘিরে ধরেছে, এখান থেকে কিছুতেই বেরুতে পারছে না। সারাজীবন এমন একটা মানুষকে গালমন্দ করে এসেছে, যার কোনো ভুল নেই। আর যাকে দায়ী করেছে সে হাসিমুখে তা মেনে নিয়েছে। এটাই তো ভালোবাসা! সারাজীবন ভেবে এসেছে মায়ের ভালোবাসার প্রতিদান বাবা দিতে পারেননি, একফোঁটাও না! অথচ সেখানে এতটা ভালোবাসা ছিল যতটুকুর বেশি ভালোবাসা থাকা সম্ভবই নয়!
রায়ান ভেঙে পড়বে ভেবে যতটা না লুকিয়ে ছিলেন, তারথেকে বেশি এই ভেবে লুকিয়েছিলেন যাতে ভালোবাসার মানুষটার গায়ে এতটুকু দাগ না লেগে যায়! ছেলে যেন ভুল করেও মাকে একফোঁটা ভুল না বুঝে ফেলে!
রায়ানের বুক নিংড়ে বেরিয়ে আসে দলা পাকানো কষ্ট! নিজের বলা কটু কথাগুলো বারবার ওকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারছে, দহনে দগ্ধ করছে। কী কী না বলেছে ও! নিজের বিবেকের কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছে বারবার।
দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে বাবার সাথে চাইলেও কথা বলতে পারছে না ও। আশরাফ সাহেব এরইমধ্যে সব সময়ের মতো ফোন করে গেছেন। কিন্তু কী এক অদ্ভুত সংকোচে ফোনটা ধরতে পারেনি সে! এসব ভাবনায় ডুবে ছিল, তখনই আবার ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কল কেটে গেল। তবে এবার অপেক্ষা করতে লাগল আরেকবার ফোনটা বেজে উঠার। কিন্তু ওকে হতাশায় নিমজ্জিত করে কলটা আর এলো না।
শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিল নিজেই কল করবে। নাম্বারটা ডায়াল করতে যেতেই বুঝতে পারল হাত অনবরত কাঁপছে, হৃদপিণ্ড যেন দুমদাম শব্দে মেতেছে। কোনোরকমে ডায়াল করল নম্বরটাতে। রিং হচ্ছে আর সেইসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ওর উদ্বেগ। কত বছর, কত মাস, কত দিন পেরিয়ে গেছে, সবটা বৃথা ভ্রান্তিবিলাসে ডুবেই কেটে গেছে!
ওপাশ থেকে ফোন তুলতেই বলল,
"রায়ান, বাবা। তুই ঠিক আছিস তো? তুই নিজে কল করেছিস? কী হয়েছে বাবা?"
বাবারা বুঝি এমনই হয়, প্রিয় সন্তানের কাছ থেকে এত গ্লানি উপহার পেয়েও তারজন্যই আশীর্বাদের ডালা সাজিয়ে বসে থাকে।
রায়ানের গলায় কথারা আটকে যায়, অদ্ভুত একটা ফোঁপানি ছাড়া আর কিছুই বের হচ্ছে না।
"বাবা, বল না! এমন করছিস কেন? আমি ভয় পাচ্ছি তো! বল..." উদ্বিগ্ন গলাটা থেমে যায় সহসা!
"বাবা..."
কেবল অস্ফুট কাতর গলায় এটুকুই বলতে পারল রায়ান। এরপর হাজার চেষ্টা করে আটকে রাখা কান্নারা হুড়োহুড়ি করে বেরিয়ে এলো, কান্নায় ভেঙে পড়ল রায়ান।
তবুও এই কান্নার মধ্যে কোথাও যেন একটা অদ্ভুত প্রশান্তি মনকে আচ্ছন্ন করছে। এই প্রশান্তির অপেক্ষাতেই তো এতদিন ছিল ওর স্নেহ বুভুক্ষু হৃদয়। অথচ সেটা কত কাছেই না ছিল! ও দেখতে এত দেরী কেন করে ফেলল তবে?
........