তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ২১

🟢

"রায়ান, আমার কথা শুনুন, রায়ান..."

অনবরত ডেকে যাচ্ছে নবনী, কিন্তু রায়ানের সেদিকে কোনো হেলদোল নেই, কেমন একটা নির্বিকার, ভাবলেশহীন অবয়ব ওর! সেখানে কোনো দুঃখ নেই, ব্যথা নেই, জাগতিক কোনো অনুভূতির ছায়া সেখানে নেই! দৃষ্টি জুড়ে কেবলই এক পৃথিবী শূন্যতা!

রায়ানকে ধাতস্থ হবার জন্য কিছুটা সময় দিল নবনী। এই সময়টা যেন পুরোপুরি নৈশব্দকে দৃঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নিয়েছে, মাঝেমধ্যে কিছুটা দূরের রাস্তা থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। ওটাই শুধু একমাত্র শব্দ এই নির্জলা নৈশব্দের মাঝে। নবনীও যেন নিজের মনকে কিছুটা গুছিয়ে নেবার অবসর পেল।

"উনি নিজে ন্যান্সি আন্টির সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন, সেটা আড়ালে রেখে মা'র উপরে এসব চাপিয়ে দিয়েছে!"

খুব আস্তে কিন্তু দৃঢ় গলায় কথাটা বলল রায়ান, গলাটা ভীষণ ভারী হয়ে আছে। তবে প্রথম ধাক্কাটা যে কিছুটা কাটিয়ে ধাতস্থ হয়েছে এতেই কিছুটা স্বস্তি পেল নবনী।

"এখানেও আপনার জানার ভুল আছে।"

"হুহ্! আপনি ওই লোকের কথায় হিপনোটাইজড হয়ে আছেন।"

"আমি কারও কথায় এতটুকুও ইনফ্লুয়েন্সড হইনি। বরং আপনি ভুল জিনিসে, ভুল ভাবনায় তলিয়ে আছেন।"

"আপনি কী বলতে চাইছেন বলুন তো? আপনার মহৎপ্রাণ আঙ্কেল একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারবেন, বউ মারা যাবার পরে বছর না ঘুরতেই আরেকটা বিয়ে করতে পারবেন, উনার জন্য সাত খুনও মাফ। আর এরজন্য..."

রায়ানকে থামিয়ে দিল নবনী,

"ন্যান্সি আন্টি শুধু শুধু আঙ্কেলের লাইফে আসেননি। আপনি তো জানেন যে ন্যান্সি আন্টি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। এখন দেখুন তো দুইয়ে দুইয়ে চার মিলছে কিনা?"

রায়ান এবার আচমকাই যেন শান্ত হয়ে গেল, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নবনীর দিকে তাকাল।

"রেবেকা আন্টির সমস্যাটা বুঝতে আঙ্কেল অনেক দেরী করে ফেলেছিলেন। আন্টি পুরনো ভালোবাসার মানুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যাবারও অনেক পরে। ওই সম্পর্কটাও হুট করে বিষিয়ে উঠে উনার কাছে। আপনি তখন বছর ছয় কী সাতেকের! আঙ্কেল ওই সম্পর্কের কথা জানতে পেরেছিলেন তখনই। সেটা নিয়েও দুজনের মধ্যে অশান্তি হতো তখন। এদিকে আন্টির সাব-কনশাস মাইন্ড হয়তো উনাকে ভুলটা দেখিয়ে দিতে চাইছিল। কিছুটা যেন বুঝতেও পারলেন তখন। বেরিয়ে এলেন সেই অযাচিত সম্পর্ক থেকে। ভালোবাসায় পূর্ন একটা সংসার, এতটা ভালো আর নির্ভরযোগ্য জীবনসঙ্গী আর ফুটফুটে একটা সন্তান রেখে পা হড়কেছিল বলে চরম অনুশোচনায় ডিপ্রেশন বেড়ে গেল কয়েকগুণ। বেশিরভাগ সময় ঘর অন্ধকার করে বসে থাকতেন, অকারণে মেজাজ হারাতেন, ঘুম থেকে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠতেন মাঝরাতে। সেই সময়ই প্রথমবার উনি সুইসাইড এটেম্পট নিয়েছিলেন!"

চমকে তাকাল রায়ান, সহসা খুব ঝাপসা একটা স্মৃতি ওর মানসপটে ভেসে উঠল। প্রায় ছটফট করতে থাকা ভীষণ অসুস্থ মা'কে নিয়ে এম্বুল্যান্সে তোলা হচ্ছিল। সেই রাতে রায়ান ওর বাবার কোলে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল। ওইদিনের স্মৃতি বলতে ওটুকুই, তাও খুব ঝাপসা। ভুলেই তো গিয়েছিল, কীভাবে যেন সহসা জেগে উঠল আজ! অবচেতন মনের কোথাও ওই ঘটনাটা সংরক্ষিত ছিল হয়তো! সময় বুঝে বেরিয়ে এলো।

"আন্টি সুস্থ হয়ে বাসায় আসার পরে আবারও শুরু করেন পাগলামো। একবার একজন সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হন আঙ্কেল। কীভাবে যেন আন্টি সেটা বুঝে গেলেন, আর লঙ্কাকাণ্ড শুরু করেন সেখানেই। এতটাই ভায়োলেন্ট হয়ে যান যে রেগে গিয়ে পেপার ওয়েট ছুড়ে মারেন, আঙ্কেলের কপালে লেগে রক্তারক্তি পর্যন্ত হয়েছিল। আন্টি দিনদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিলেন। তখনই উনার এক কলিগের রেফারেন্সে ন্যান্সি আন্টিকে এপয়েন্ট করেন। আন্টি বুঝতে পারলে আরেকবার কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে বলে নিজের বন্ধু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন রেবেকা আন্টির সাথে।"

এটুকু বলে বড় করে শ্বাস টানল নবনী, রায়ানকে দেখে মনে হচ্ছে সে আবারও চলে গেছে ওর শূন্য জগতে। এই মরে আসা আলোতেও রায়ানের অবয়বে ফুটে উঠা প্রগাঢ় কষ্টের ছাপ ধরা পড়ল নবনীর তীক্ষ্ণ চোখে। মনে মনে আওড়াল,

"আল্লাহ, এই সুন্দর হৃদয়ের ছেলেটা যেন সবটা সামলে নিতে পারে। ওকে সহ্য শক্তি দাও নইলে ওর সমস্ত কষ্ট আমাকে দিয়ে দাও।"

"রায়ান, আপনি কি শুনছেন?"

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে আসেপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে সে বিষয়ে ঠিক অবগত নয় সে। কিন্তু মাথা নেড়ে জানান দিল শুনছে ও। নবনীও চলে গেল ঘটনার পরের অংশে,

"ন্যান্সি আন্টি রেবেকা আন্টির মনে কোনো ধরনের সন্দেহের উদ্রেক না করে পেশেন্ট হিসেবে না ট্রিট করে ফ্রেন্ডের ওয়াইফের সাথে যেমন আচরণ করা উচিত তেমনটাই করলেন। হুটহাট বাসায় এসে গল্প জুড়ে দিতেন রেবেকা আন্টির সাথে। টুকরো টুকরো আলাপের মাধ্যমে উনার সাইকোলজি বোঝার চেষ্টা করতেন। দুজনের বন্ধুত্বও হয়ে যায় খুব দ্রুতই। কিন্তু এভাবে প্রায় কয়েক মাস চলার পরে রেবেকা আন্টির মন আরেকবার বেঁকে বসে। ন্যান্সি আন্টি আঙ্কেলকে সব ধরনের সাইকোলজিক্যাল আপডেট দিতেন, লুকিয়ে যোগাযোগ হতো এসব কারণে। কিন্তু রেবেকা আন্টির মনে হলো বুঝি তারা দুজন প্রেমে জড়িয়েছেন। কোনো কিছু সহজভাবে চিন্তা করতে পারতেন না। আঙ্কেলকে এসব নিয়ে বলতেন সারাক্ষণ। নিজের উপরে এমন ব্লেইম আসায় আঙ্কেল মাঝেমধ্যেই মেজাজ হারিয়ে ফেলতেন। আপনি যদি রেবেকা আন্টির ঘটনায় আঙ্কেলকে দায়ী করতে চান, তবে তাঁর দায় এটুকুই যে মেন্টালি ইমব্যালেন্সড জেনেও মাঝে মাঝে মেজাজ ধরে রাখতে পারতেন না। তুমুল কথা কাটাকাটি লেগে যেত। তাছাড়া তাঁর আর কোনো দায় ছিল না। তবে এটা মনে রাখতে হবে উনিও মানুষ, অপর পাশের এমন আচরণে তাই ধৈর্য্য রাখাটা যথেষ্ট কঠিনই।"

ন্যান্সি আন্টিকে নিয়ে বাবা মায়ের ঝগড়াঝাটি এখনো রায়ানের মনে গভীর ছাপ ফেলে রেখেছে। সেসময় ও নয় দশ বছরের। পুরোপুরি না বুঝলেও অনেকটাই বুঝতে পারত। কিন্তু সবটা তলিয়ে দেখার মতো বয়স অবশ্যই ছিল না সেটা।

"ন্যান্সি আন্টি দুই বছর আন্টির চিকিৎসা করেন। অবস্থা বেগতিক হতে দেখে আঙ্কেল ন্যান্সি আন্টির আসল উদ্দেশ্য বলে দেন। এতে ফল হয় উল্টো। সন্দেহ বাতিক আরও বেড়ে যায়। তাঁর মনে হতে থাকে উনাকে পাগল প্রমাণ করে আঙ্কেল বুঝি ডিভোর্স দেওয়ার প্ল্যান করছেন, যাতে ন্যান্সি আন্টিকে বিয়ে করতে পারেন। একজন স্বাভাবিক মানুষ এভাবে চিন্তা না করলেও তিনি এসবই চিন্তা করতেন। সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি তাঁর মধ্যে থাকায় আঙ্কেল সবসময় চোখে চোখে রাখতেন। এতে উনার মনে হতো তাঁর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, সন্দেহ করা হচ্ছে। নিজের একটা ভুলের জন্য ভেতরে ভেতরে পুড়ছিলেন এমনিতেই, আর সেই সাথে যোগ হলো ভালোবাসার মানুষের অবিশ্বাস। আদতে এমন কিছু ছিলই না আঙ্কেলের মনে, যা ছিল সেটা শুধুই দু'জনে একসাথে বাঁচতে চাওয়ার একটা প্রচেষ্টা মাত্র! কিন্তু উনার মনে নানারকম কমপ্লেক্সিটি কাজ করতো বিধায় না চাইতেও এসবই ভেবে বসতেন। আন্টির এমন চিন্তার জন্য আঙ্কেল কিছুটা ছাড় দিয়েছিলেন নজর রাখায়। একসময় আন্টি আলাদা রুমেও থাকা শুরু করেন। আর তাতেই শেষমেশ শেষ রক্ষা হয়নি। আঙ্কেলের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে আন্টি..." বাকিটা আর মুখে বলল না ও, দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে গেল।

রায়ান নির্বাক শ্রোতা হয়ে বসে আছে, বহুক্ষণ পেরিয়ে গেছে, এরমধ্যে একটা কথাও বলেনি। নবনী উঠে ফ্লাস্কে ভরে আনা চা কাপে ঢালল। বাড়িয়ে দিল ওর দিকে। কিন্তু রায়ান তেমনই স্থানুবৎ বসে আসে, কোনো নড়াচড়া নেই। একটা নির্জীব পাথার যেন!

"এটা নিন, মাথার জট কেটে যাবে। মাথা ব্যথা হচ্ছে নিশ্চয়ই? এটা আমার স্পেশাল চা। কিছুটা হলেও খারাপ লাগা কমবে।"

তবুও হেলদোল নেই রায়ানের,

"দেখুন, যা হয়েছে সেটা তো আর বদলাবে না। এটা নিয়ে পড়ে থেকে সামনের দিনগুলো কেন বিষাদে ডুবে কাটাবেন? বরং নিজেকে শক্ত করে সত্যকে গ্রহণ করুন। মেঘ কেটে যাবে। আপনার মনে যে সেই জোড় আছে এটা আমি জানি।"

কথাটা শেষ করেই আবারও বাড়িয়ে দিল কাপটা। এবার নিল সেটা। খুব ধীরলয়ে চুমুক দিল তাতে। চা শেষ করে কাপটা পাশে রেখে নবনীর দিকে তাকাল,

"এতই যখন ভালোবাসতেন মা'কে, তবে বছর না ঘুরতেই ন্যান্সি আন্টিকে বিয়ে করে কেন?" সহসা প্রশ্ন করে বসে দ্বিধাগ্রস্ত রায়ান।

"আপনি সেই সময় ডীপ ট্রমার মধ্যে ছিলেন। আঙ্কেল একদিকে নিজের স্ত্রী কে হারিয়ে বিপর্যস্ত, আরেক দিকে আপনার ওরকম সিচুয়েশন। তাঁর নিজেরও মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না খুব একটা। একেবারেই ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সেসময় ন্যান্সি আন্টি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভঙ্গুর একটা মানুষকে গড়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাছাড়া আপনার কাউন্সিলিং প্রথম দিকে তিনিই করতেন। দুজনের বন্ধুত্ব গাঢ় হতে থাকে, আপনার জন্য একজন মায়ের অভাববোধ করেন তিনি। পৃথিবীতে এখনো কিছু পিউর হার্টেট মানুষ থাকলে ন্যান্সি আন্টি অবশ্যই তার মধ্যে একজন। কোনোকিছু না ভেবে বিয়েতে সম্মতি দেন।"

রায়ানের মনে আছে বিয়ের পরে ন্যান্সি আন্টি ওকে সামলানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু রায়ান কিছুতেই সহ্য করতে পারত না তখন। কখনোই পারেনি।

"রেবেকা আন্টিকে আমার খুব দুর্ভাগা মনে হয়। এতো ভালোবাসা উনি বুঝতেই পারলেন না। উনার জন্য আঙ্কেলের মনে পৃথিবী সমান ভালোবাসার সিকিভাগও না নিয়েই চলে গেলেন এক বুক অভিমান নিয়ে।" কিছুটা থেমে আবারও বলল,

"আপনার জন্যও কষ্ট হয় খুব। এতো ভালোবাসা পায়ে মাড়িয়ে কী করে কাটাচ্ছেন জীবনটা? নিজের বাবাকে এবার অন্তত একটু বুঝতে চেষ্টা করুন রায়ান। আপনাকে সব তো বলেই দিলাম। নিজের বিবেক বুদ্ধি দিয়ে একটু ভেবে দেখুন না, সবটাই সত্যি। ভালোবাসা সত্যি, সম্পর্ক সত্যি, উনার কষ্টটাও নির্জলা সত্যি! এবার নিজের গোয়ার্তমি ঝেড়ে ফেলে ভালোবাসাটা নিন। এক সমুদ্র ভালোবাসা চারপাশে ফেলে রেখে এত কাঙালপনা কেন করছেন?"

রায়ান ফ্যালফ্যাল করে তাকায় নবনীর দিকে, ওর চিন্তা-ভাবনা কিছুই ঠাহর করতে পারল না নবনী।

"নবনী, আমি কিছুটা সময় একা থাকতে চাই। আপনি কি আমাকে সেই সুযোগটা দেবেন?"

প্রায় অস্ফুটস্বরে বলল রায়ান।

নবনী রায়ানের দিকে একবার পূর্ণদৃষ্টি মেলে উঠে দাঁড়াল। ওর এই মুহূর্তে রায়ানের পাশে থাকতে ভীষণ ইচ্ছে করছিল। কিন্তু সে তো ওকে পাশে চাইছে না। নিজের চেনা জগৎ, চেনা ধ্যানধারণায় আজ বিশাল ধাক্কা লেগেছে। থাকুক নাহয় কিছুটা সময় একা! যদি সামলে নিতেই পারে, কিন্তু মনের ভেতরে উল্টোস্রোত বইছে! কেমন একটা ভয় পাক খাচ্ছে হৃদয়ে! সবটা সামলে নিতে পারবে তো রায়ান? নাকি...

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ২১