তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ১৯

🟢

"রিতা শুধুই আমার কলিগ, আর কিছুই না। অবশ্য তোমার মেন্টালিটিতে এমন চিন্তা করা খুব স্বাভাবিক।"

শাফায়াতের দৃঢ় গলার কাউন্টার অ্যাটাক রুমুকে মুহূর্তের জন্য থমকে দিলেও বিভ্রান্ত করতে পারল না একেবারেই। এই লোক পুরোটাই একটা রক্তমাংসের খোলস পরে থাকে, তাই সহসা ঠাহর করা মুশকিল হয়ে যায়। কিন্তু একবার সেটা উন্মোচিত হয়ে গেছে, তাই সেটার ছলা কলায় রুমুকে এখন আর ভোলানো যায় না।

"চোরের মায়ের বড় গলার কথাটা সারাজীবন শুনে এসেছি। তোমাকে দেখে প্রমাণও পাচ্ছি। আর কী যেন বললে? শুধু কলিগ?" তাচ্ছিল্যের হাসি ঝরল রুমুর।

"কলিগের সাথে বুঝি প্রতিদিন অফিস আওয়ারের পরে দুই তিনঘণ্টা ধরে শপিং মলে ঘুরতে হয়, রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে হয়, বিভিন্ন অকেশনে শাড়ি অর্নামেন্টস গিফট হিসেবে পাঠাতে হয়? আরও কী কী কর সেসব বলতে আমার রুচিতে বাঁধছে বলে বলতে পারছি না।" দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলল রুমু।

"মুখ সামলে কথা বল রুমু। নিজের দোষ ঢাকতে আমার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলতে চাইছ?"

রাগে ফেটে পড়ছে শাফায়াত। হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে রীতিমতো চিৎকার করছে সে।

"তুলতে চাইছি না, তুলছি। কারও চুপ থাকাকে তার দুর্বলতা ভেবে ফেল না। আমি বিশাল বড় ভুল করেছি এসব কথা আগে না বলে। সব সামনে আসার পরেও কী করে পারছ এখনো নিজেকে ডিফেন্ড করতে? গলায় আটকে যাচ্ছে না? আর কত নির্লজ্জ হবে তুমি?"

রুমুও তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠে, শাফায়াত কিছু একটা বলতে যেতেই পাশের রুম থেকে ঝুমু ছুটে আসে।

"কী করছ তোমরা? বাচ্চারা শুনতে পাবে তো। প্লিজ আস্তে কথা বল।"

দুজনের দিকে একবার তাকিয়েই চলে যায় ঝুমু।

"তুমি অতিরিক্ত উড়াউড়ি শুরু করেছ। ডানাটা কাটা পড়লে মধ্যগগন থেকে একেবারে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যাবে, সেই চিন্তাটা মাথায় রেখো।"

শাফায়াতের হুমকিতে রুমু এখন আর ভড়কে যায় না।

"ডানা তো অনেক আগেই কেটেছিলে। আমার পড়াশোনাটা এরজন্যই তো শেষ করতে দাওনি, যাতে তুমি ছাড়া আর কোনো গতি না থাকে। শেষমেশ সব সহ্য করে তোমার কাছেই পড়ে থাকতে হয়! তাই তো ছিলাম এতদিন। কিন্তু এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, হয় দেয়ালের সাথে পিষে মরতে হবে নয়তো সামনে আগাতে হবে। আমি পিষে মরার চাইতে সামনে এগুনোর রাস্তাটাই বেছে নিয়েছি। কিছুটা হলেও আত্মসম্মানবোধ অবশিষ্ট আছে এখনো।"

রুমুর গলায় আশ্চর্য দৃঢ়তা, দূর্বল চিত্তের রুমু কোন মন্ত্রবলে এতটা দৃঢ়তা নিজের মধ্যে ধারণ করেছে নিজেই জানে না!

"আমিও দেখব কীভাবে সামনে যাও। তোমার বড়সড় বুলি কপচানো যদি আমি বন্ধ করতে না পারি আমার নামও শাফায়াত না!"

কথাটা বলেই হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল সে, নাঈমকে অনেক বলে কয়েও সাথে নিতে পারেনি, আজকে সে মায়ের কাছেই থাকতে চায়। তামিমও যেতে রাজি হয়নি।

শাফায়াত চলে গেলে আজ আর ভেঙে পড়ল না রুমু, একফোঁটা চোখের পানিও ঝরতে দিল না। ওর অশ্রুবিন্দু আর অপাত্রে অপচয় করবে না, ঘুরে দাঁড়াতেই হবে রুমুকে, নিজের সন্তানদের জন্য হলেও।

সারাটা সকাল দুই ছেলেকে জড়িয়ে মায়ের কাছে বসে রইল রুমু। শাফায়াত এতো সহজে ওকে ছোটো করার সুযোগ হাতছাড়া করবে না, এটা খুব ভালো করেই জানে ও। সাফিয়া বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তাঁর দুই মেয়ের জীবনই ভুলে পূর্ণ, সন্তান ভালো না থাকলে মা ভালো থাকেন কী করে? তিনিও ভালো নেই, সারাক্ষণ মাথায় একটাই চিন্তা এদের দাঁড় করিয়ে দেবার।

বিকেলে তামিম আর নাঈমকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে ঝুমুর কাছে গেল রুমু। ওকে দেখেই ঝুমু বলল,

"আয় আপা তোর চুলে তেল দিয়ে দেই।"

"তোকে তেল দিয়ে দিতে বললে আগে কত বাহানা করতি। আজ নিজে নিজেই দিয়ে দিতে চাইছিস যে?"

"সময় তো কতকিছুই বদলে দেয় আপা, এটা তো সামান্য একটা অভ্যাস! তুই তো জানিস না আপা, আমি পুরোটাই পাল্টে গেছি! আগে যদি এখনকার মতোই সব বুঝতাম, তাহলে সব এভাবে এলোমেলো হয়ে যেত না!" কম্পিত গলা ঝুমুর।

রুমুর ভীষণ মায়া হয় সহোদরার জন্য, হৃদয়ের সমস্ত মায়া ঢেলে বলল,

"তুই সেদিন জিজ্ঞেস করলি না, ইরেজার দিয়ে জীবনের ভুলগুলো কেন মুছে ফেলা যায় না?"

ঝুমু সম্মতি সূচক মাথা নাড়ায়।

"ইরেজার দিয়ে ভুল মুছা যায় না ঠিকই, কিন্তু জীবনের খাতাটা তো বিস্তৃত, বিশাল। কেন শুধু শুধু প্রথম কয়েকটা ভুলে ভরা পাতায় কাটাকুটির চেষ্টা করছিস। এর চাইতে যে বিস্তৃত খালি পাতা পড়ে রয়েছে সেখানে নতুন করে সব গুছিয়ে লিখে ফেল। সবটা তোর মতো করে। দেখবি জীবনটা আবার নতুন লাগবে, পৃথিবীটা খুব সুন্দর রে রুমু, খুব সুন্দর!"

ঝুমু বড় বোনের দিকে নিখাঁদ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে, ওর সহজ সরল আপাটা কবে এমন জীবনবোধ বুকে ধারণ করে ফেলল তা ভেবে!

আর রুমু! সে ঝুমুকে এসব বললেও কথাটা তো ওর নিজের জন্যও প্রযোজ্য। জীবনের খালি পাতাগুলো আর কোনো ভুলে সাজাবে না, ভুল মানুষের জন্য পাতা আর কালি কিছুই খরচ করবে না। ভেবেচিন্তে খুব সাজিয়ে গুছিয়ে রঙিন কলমে জীবনের বাকি গল্পটা লিখবে ও।

***

সেই রাতের পরে কেটে গেছে তিনদিন। এই তিনদিনে দুই একটা ফর্মাল কথাবার্তা ছাড়া আর কোনো কথার আদান-প্রদান হয়নি রায়ান আর নবনীর মধ্যে। রায়ানের ট্রেডমার্ক হাসিটাও দেখা যায়নি, আফজাল সাহেবের সামনে মুখে একটা হাসি ধরে রাখলেও ওর সেই গভীর চোখে সেই হাসির ছিটেফোঁটাও রেশ দেখা যায়নি। বরং সেখানে কী এক অদ্ভুত, গাঢ় বিষাদ জায়গা করে নিয়েছে!

এই ছেলের অতল চোখেই মনের অনুভূতি প্রকাশ পায়, ভাষায় প্রকাশের প্রয়োজন হয় না। নবনীর ভীষণ মায়া হয়, বুকে টনটনে ব্যথা হয়। তবে ঝগড়া জেতার খুঁটি হিসেবে রায়ানকে সেসব বলেছে বলায় ওর মনে একটা সূক্ষ্ম অভিমান জন্মেছে। ও কি এতটাই সেলফিশ! রায়ান ওকে কেন এমন ভাবল তবে?

সবকিছুর মধ্যে রায়ান একটা জিনিস ঠিকঠাক করছে, তা হলো আফজাল আঙ্কেলের সাথে দাবা খেলা। খেলায় ডুবে গেলে কিছুটা সময়ের জন্য সব ভুলে যায় ও। আসলে আঙ্কেলের সঙ্গটাই দারুণ উপভোগ্য হয়। সব বিষয়ে জ্ঞান রাখেন তিনি, সেই প্রস্তর যুগের স্লেজ টানা গাড়ি, কবুতরের পায়ে চিঠি বাঁধা থেকে শুরু করে এখনকার ভার্চুয়াল জগতের সমস্ত খুঁটিনাটি তাঁর নখদর্পনে। তাই শুধু বয়সের ব্যবধানের জন্য আড্ডায় একঘেয়েমি আসার কোনো প্রকার সুযোগ নেই। সেন্স অফ হিউমারও ভীষণ টনটনে তাঁর। সময়টা তাই অসম্ভব ভালো কাটে।

রায়ান অপেক্ষায় থাকে কখন সন্ধ্যা হবে আর দাবার বোর্ড ঘিরে তাদের আড্ডা জমবে। দাবায় যদিও ও হেরেই যায় সবসময় তবুও আঙ্কেলের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ একেবারেই হাতছাড়া করতে চায় না, আজীবনের না পাওয়া স্নেহ ভালোবাসার লোভ ওর বড্ড বেশি!

নবনীও এসে বসে থাকে সেসময়। আগে খেলার সময় খুব একটা এমুখো হতো না মেয়েটা, ইদানীং রোজ এসে বসে থাকে। রায়ানের মনে হয় নবনী ওকে কিছু বলতে চায়। মেয়েটা ভীষণ কঠিন হৃদয়ের হতে পারে, মুখের উপরে অপ্রিয় কথা চট করে বলে ফেলতে পারে, পায়ে পা বেঁধে ঝগড়া করতে পারে, তবুও এরকম মিথ্যাচার করতে পারবে বলে মনে হয় না ওর।

একটু মাথা ঠান্ডা হবার পরেই বুঝতে পেরেছে রায়ান, এখানে নবনীর খুব একটা ভুল নেই। হয়তো রায়ানের বাবাই ওকে উল্টাপাল্টা বলেছে, আর ও তাই সত্যি ভেবে নিয়েছে। বাবার প্রতি রাগ যেন আরও কিছুটা গাঢ় হলো ওর।

তবে এবার একটা সিদ্ধান্ত নিল, নবনীর কাছে ওর বাবা ঠিক কী কী আজেবাজে কথা বলেছে তা শোনার। নিজের দোষ ঢাকতে লোকটা ওর মা'কে নিয়ে কী কী গল্প ফেঁদেছেন তাই শুনতে আগ্রহী হয়ে উঠে রায়ান। সবটার জবাব দেবার জন্য হলেও ওকে শুনতে হবে।

পরেরদিন দুপুরে নবনীর সুপারভাইজার স্যার ফোন করলেন। নবনীর পেপার পাবলিশড হয়েছে রেপুটেড একটা জার্নালে। স্যারের সাথে কথা বলে ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে গ্লাসে ঢালছিল। রায়ানের ডাকে সচকিত হলো,

"নবনী, আমার কিছু কথা ছিল।"

"বলুন।"

"প্রথমে স্যরি বলে নিচ্ছি, সেদিন অনেক আজেবাজে কথা বলে ফেলেছি আপনাকে।"

নবনী ফ্রিজে বোতলটা রেখে রায়ানের দিকে ঘুরল, দেখল অপরাধবোধ ঠিকরে বেরোচ্ছে অবয়বে। ছেলেটা ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ, মনে হলো নবনীর। আজ আর কথার শেল ছুড়তে ইচ্ছে হলো না। স্বাভাবিকভাবেই বলল,

"আমি আপনার মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরেছি। স্যরি বলার দরকার নেই।"

রায়ান এবার চোখ তুলে নবনীর দিকে তাকাল, ও কথার অগ্নিবাণে বিদ্ধ হবার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তেমন কিছু না হওয়াতে অনেকটা বিস্মিত হয়। এতো সহজে মাফ পেয়ে যাবে ভাবেনি ও। তবে আর কথা বাড়াল না এটা নিয়ে। কে জানে এই মেয়ের কখন মতিভ্রম হয়!

"আমি আসলে জানতে চাই ওই লোকটা মা'র সম্পর্কে আর কী কী বলেছে?"

ভ্রু কুঁচকে রায়ানের দিকে তাকায় নবনী,

"ওই লোকটা মানে?"

রায়ান কিছুটা থতমত খেয়ে গেল, ইতস্তত করে বলল,

"আপনার আশরাফ আঙ্কেল। উনি ঠিক কী বলেছে আপনাকে তাই শুনতে চাই।"

"আপনার বাবা হন তিনি, একটু রেস্পেক্ট তো শো করবেন, নাকি?"

রায়ানের অবয়বে তীব্র বিরক্তির একটা ছাপ পড়ল, তবে সেটাকে পাশ কাটিয়ে বলল,

"আপনি কী বলবেন নাকি বলবেন না?"

নবনী ভাবল এবার যদি সবটা বলা যায় তবে রায়ানের এই ভ্রান্তিবিলাস ঘুচবে, হয়তো বিষাদ বিদায় নেবে!

তাই রাজি হয়ে যাওয়াই মনস্থির করল,

"ঠিক আছে, আজ রাতেই বলব নাহয়। ছাদে?"

রায়ান মাথা নেড়ে চলে যায়।

দুজনেই অধীর আগ্রহে বসে রইল রাতের অপেক্ষায়।

...............

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ১৯