তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ১৫

🟢

"তোমারে একটা কথা বলি রুমু, মন দিয়ে শোনো। শাফায়াত পুরুষ মানুষ। ওদের এমন একটু আধটু দোষ, ঘাড়ত্যাড়ামি থাকবেই। তুমি ওর বউ, তোমার উচিত মানিয়ে চলা। এই যে তেজ দেখায়ে ঢ্যাংঢ্যাং করে বাপের বাড়ি চলে গেলা, বাড়ির বউয়ের এত তেজ ভালো না। তোমার মা তোমারে জন্ম দিছে ঠিকই, কিন্তু আদব-কায়দা শিখায় নাই।"

চুপচাপ শাশুড়ির বলা কথা হজম করছিল রুমু, কিন্তু শেষের কথাটায় আর চুপ করে থাকা সম্ভব ছিল না। ওই বাড়িতে থাকতে দিনে একবার হলেও ওকে এসব শুনতে হতো, দুই একবার উত্তর দেবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু উল্টো আরও কথা হজম করতে হতো। তাই আর কখনোই এসবের জবাব দেয়া হয়নি। আজ ফোন করেও এসব বলায় এতদিনের জমিয়ে রাখা অপমান এক লহমায় বেড়িয়ে আসতে চাইল,

"পুরুষ মানুষ বলে তার সব অন্যায় আচরণ জায়েজ হয়ে গেছে, আম্মা? সে বাইরে যা খুশি তাই করে আসবে, ঘরে এসে অশান্তি করবে আর আমি বউ হয়েছি বলে তারে নমঃনমঃ করব? আপনি তো জানেন আমি কত চেষ্টা করেছি, তারপরও এই কথা কীভাবে বলেন আম্মা?"

শাশুড়ি কিছুটা যেন নরম হলেন,

"এই যে তামিমরে নিয়া গেলা, ওর কি বাপের কাছে থাকতে ইচ্ছা করে না? বাপের কাছ থেকে পোলারে আলাদা করতেছ কী জন্যে?"

"এটাই আপনার চোখে পড়ল আর নাঈমকে যে আপনার ছেলে ওর কাছে রেখে দিল, মায়ের কাছ থেকে আলাদা করল, এটা দেখেন নাই?"

"তোমার তেজ কমাও, বাসায় আস। মেয়েদের এত জেদ দেখাইলে চলে না। ক্ষতিটা কিন্তু তোমারই বেশি হবে!"

রুমুকে এসব কথা এখন আর বিস্মিত করে না, পুত্র স্নেহে অন্ধ মা সব চোখের সামনে দেখেও যেন দেখেন না। তাঁর সব কথা, সব যুক্তি শেষ হয়, 'ছেলে মানুষ' এমন করতেই পারে। আর ও মেয়ে বলে যেন ওর কোনো মন নেই, প্রাণ নেই, আত্মসম্মানবোধ নেই! দম দেয়া এক পুতুল যেন!

"আম্মা, কতদিন আগে ছন্দা ওর শাশুড়ির সাথে ঝগড়া করে চলে আসল। তখন আপনি ওকে কী বলেছিলেন মনে আছে?"

"কী বলতে চাইতেছ?"

"তখন কিন্তু আপনি ওকে শেখালেন অধিকারের কথা, ছাড় না দেয়ার কথা। আপনি তো আমার মায়ের মতোই, নিজের মেয়ের বেলায় যেটাকে ঠিক বলে ভাবেন, আমার বেলায় উল্টা কেন, আম্মা। অন্যের মেয়ে বলে? আমি তো প্রথম থেকে আপনাকে আমার আরেকটা মা'ই ভেবে নিয়েছিলাম, আপনি কেন আমাকে মেয়ের মতো ভাবতে পারলেন না আম্মা?"

শাশুড়ি সহসা উত্তর দিতে পারলেন না। উত্তর দেবার মতো মুখও নেই। কী বুঝলেন রুমু জানে না তবে তিনি যে কথা বাড়াননি তাতেই স্বস্তি পেল। এভাবে কথা বলে ওর খারাপ লাগছে, কিন্তু কখনো কখনো মানুষকে ভুলগুলো দেখিয়ে দিতে হয়। মুখ বুঁজে আর কত সহ্য করা যায়?

নাঈমকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব, এতদিনে শুধু দুইবার কথা হয়েছে বড়ো ছেলের সাথে। ওরা আসতে দেয়নি নাকি ও নিজেই আগ্রহ দেখায়নি জানে না রুমু। নাঈম হবার সময় কী যে কমপ্লিকেশনস দেখা দিল, ব্লাড প্রেসার বেড়ে গেল, হিমোগ্লোবিন লেভেল নেমে গিয়েছিল, আরও কিছু ইন্টারনাল সমস্যা। কতটা ভুগতে হয়েছিল ওর, প্রথমবার সন্তানের মুখ দেখে সেইসব ক্লান্তি এক নিমিষেই মিলিয়ে গিয়ে এক অপার্থিব আনন্দ ঘিরে ধরেছিল ওর মন জুড়ে! কোলে নিয়ে মনে হয়েছিল এই জীবন্ত পুতুলটা ওর নিজের অংশ! কী ছোটোছোটো হাত-পা, ছোট্ট একটা শরীর! না মেলা চোখও যেন বড্ড মায়াময়। শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল বুকের সাথে! অথচ সেই ছেলের মুখে ওকে ছেড়ে সারাদিন 'আব্বু আব্বু' বুলি, যে বাবা লোক দেখানো কিছু ফরমালিটিজ ছাড়া আর কিছুই করেনি, না পালন করেছে সন্তানের প্রতি কোনো দায়িত্ব। গভীর বিষাদে ছেয়ে গেল ভেতরটা। সব দায় যেন ওর একার!

শাশুড়ির সাথে কথা শেষ করে ঝুমুর রুমে গেল রুমু, মেয়েটা এখনো ঘুমিয়ে আছে। বোনের জন্য আর্দ্র হলো ভেতরটা। মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহার্দ্র কণ্ঠে ডাকল ওকে। চোখ পিটপিট করে তাকাল ঝুমু, এরপর আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল।

"উঠ, একসাথে খাব সবাই। মা বসে আছে টেবিলে।"

"মা বসে আছে? সত্যি বলছিস আপা?"

"হ্যাঁ রে। তাড়াতাড়ি আয়।"

ঝুমুর বিষন্ন মুখে সহসা একটা হাসি খেলে গেল, তড়িঘড়ি করে বলল,

"তুই যা, আমি হাত-মুখ ধুয়ে আসছি।"

কতদিন পরে মায়ের সাথে বসবে? মা-মেয়ে একই ছাদের নিচে থেকেও কত যে দূরে এটা কেবল ওরাই জানে। একেবারে দুই মেরুর মানুষ যেন! সেই অশুভ রাতের পরে মা আর ওর সাথে কথা বলেননি।

সেই রাতে সবাই মনসুর আলীকে নিয়ে হাসপাতালে চলে গেল, পুরো বাড়িতে ঝুমু একা। প্রতারিত হয়ে বাসায় ফিরেই ভয়ংকর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারপরের দিনই মায়ের প্রেসক্রিপশন চুরি করে দুটো ফার্মেসি থেকে কয়েকটা ঘুমের ওষুধ কিনেছিল, কিন্তু সাহসে কুলায়নি। জীবন যতই বিষিয়ে উঠুক, এর মায়া কাটানো প্রচণ্ড কঠিন, দুঃসাধ্যই। এত বড়ো ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা মানুষকে দেননি।

ওষুধ গুলো লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল নিজের কাছে

সেগুলো বের করে নিল, ওষুধের ঝুড়িতে পেয়ে গেল আরও কয়েকটা। পাতা থেকে ছাড়িয়ে গুনে গুনে সতেরোটা বাম হাতের মুঠোয় নিল, ডান হাতে পানি ভর্তি গ্লাস। ঘড়িতে দুটো তেতাল্লিশ। পানি মুখে দিয়েও সেগুলো মুখে দিতে পারল না। শুধু পানিই গিলে ফেলল। সবচেয়ে কাছের মানুষরাই ওকে সহ্য করতে পারছে না, বাকি দুনিয়া কীভাবে পারবে? কাছের মানুষের প্রবল ঘৃণা নিয়ে বাঁচতে পারবে না ও।

সেভাবেই বসে রইল আরও কতক্ষণ। কতটা সময় চলে গেল জানে না। দেয়ালের ঘড়িটা ঢনঢনিয়ে উঠে জানান দিল চারটা বেজে গেছে। শেষবার পেটে একবার হাত বুলিয়ে নিল, নিজের ভেতরকার অস্তিত্ব সেখানে বেড়ে উঠছিল। গ্লাসটা তুলে নিয়ে ঢকঢক করে পানি ঢেলে ওষুধ গুলো পুড়ে দিল মুখে। এরপর বারান্দায় দাঁড়িয়ে শেষবার সুন্দর পৃথিবীটা দেখে নিজের বিছানায় এসে বসল, চোখ ভারী হয়ে আসছিল ক্রমশ, ওইতো দূর থেকে ফজরের আযান ভেসে আসছে, কিন্তু ওর উঠার শক্তি ছিল না। এক পৃথিবী গ্লানি আর এক আকাশ অপূর্ণ স্বপ্ন বুকে চেপে হারিয়ে যাচ্ছিল পৃথিবী থেকে!

মনসুর আলী আর ফিরলেন না, সবাই একেবারে ভেঙে পড়ল। ভোরের দিকে বাসায় ফিরল সবাই, ঝুমুর কথা তাই তখন সেভাবে কারও মনে পড়ল না। কান্না আহাজারির মাঝে প্রতিবেশীরা আসতে শুরু করল। এরমধ্যে ঝুমুর এক বান্ধবী ছিল, ওদের একেবারে পাশের বাসায় থাকত। সে এসে ওকে খুঁজতে খুঁজতে ঝুমুর রুমে গেল। ওর চিৎকারে সবাই ছুটে এলো, সাথে সাথে আবারও হাসপাতালে ছুটল। সাফিয়া বেগম আর রুমু বাসাতেই থাকল। তিনি স্বামীকে হারিয়ে মূর্ছা যাচ্ছিলেন বারবার। এসবের জন্য ঝুমুকেই দায়ী মনে হতে লাগল তাঁর।

সে যাত্রায় ঝুমু বেঁচে ফিরলেও ওর ভেতরের ছোট্ট প্রাণটাকে বাঁচানো যায়নি।

এসব খবর বাতাসের আগে ছড়ায়, ওরটাও জানাজানি হয়ে গেল। ঝুমু নিজেও নিজেকেই দায়ী মনে করে, ওর মনে হয় সেদিন বুঝি ও মরে গেলেই ভালো হতো! এরপর ওর মনোজগতে বিশাল পরিবর্তন এলো।

***

"কী ব্যাপার! আমি যতদূর জানি আজ কোনো ভুল করিনি। আজ কীসের শাস্তি দিচ্ছেন বাইরে দাঁড় করিয়ে?"

মৃদু হেসে বলল রায়ান। নবনীর চোখ আজ যেন কিছুটা সহজ!

এই ছেলের হাসি মারাত্মক! আগে সেভাবে খেয়াল করেনি নবনী। রায়ানের কথায় ভেতরে ভেতরে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও বুঝতে দিল না একফোঁটাও। দরজা থেকে সরে গিয়ে জায়গা করে দিল, জোড় করে ফিরিয়ে আনল কাঠিন্য।

"আসুন। আপনি তো স্কুলের বাচ্চা না আর আমিও আপনার টিচার নই যে শাস্তি দেব।"

মনে মনে আওড়াল,

"আমার মনের বারোটা বাজানোর জন্য পারলে শাস্তি দিতাম আপনাকে, কঠিন শাস্তি।"

"উফ! পরম সৌভাগ্য আমার!"

মুখের সাথে সাথে চোখেও হাসি ফুটল ছেলেটার।

"সৌভাগ্য কেন?"

"এই যে আপনি আমার টিচার নন, এইজন্য।"

"ফাজলামো করেন?"

কপট আঁৎকে উঠল রায়ান,

"না না, আপনার সাথে ফাজলামো করার দুঃসাহস আমার নেই ভাই। আমি আরও অনেক দিন বাঁচতে চাই।"

রায়ানের কথায় নবনী না চাইলেও কাঠিন্য পালিয়ে গেল, ফিক করে হেসে ফেলল ও।

হাসল রায়ানও, খেয়াল করল নবনীর হাসিটা ভীষণ মিষ্টি। এই প্রথম ওর কোনো কথায় হেসেছে মেয়েটা। ভালোলাগার একটা রেশ ছুঁয়ে গেল মনে।

"কী হলো? এবার কিন্তু আপনি নিজেই দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে। ভেতরে আসুন।"

নবনী ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে গেল, আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পা চালিয়ে চলে গেল।

নবনীকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে দেখে কিছুটা আহত বোধ করল রায়ান। জ্বরের সময় মেয়েটাকে অনেক কথা শুনিয়েছিল, সেটা হয়তো এখনো ধরে বসে আছে মেয়েটা। নাহ্! এবার 'স্যরি' বলেই দেবে ও। একবার বলতে গিয়ে তো প্রায় ধুন্ধুমার লেগে গেল, তাই আর বলা হয়নি। যাবার দিনও দেখা পায়নি নবনীর।

ওদিকে মনের লাগাম দখলে রাখতে পারছিল না বলেই ওর এই দ্রুত প্রস্থান। সেদিন আশরাফ আঙ্কেলের কাছে সবটা শোনার পর থেকেই ভীষণ একা এই ছেলেটার জন্য অসম্ভব এক মায়া তৈরী হয়। কেমন যেন শূন্যতা গ্রাস করে। রায়ানের ভুল জগতটা শুদ্ধ করে দিতে ইচ্ছে হয় নবনীর। ওর মনের কষ্টগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে মমতার প্রলেপ বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়, খুব করে হয়। কিন্তু এটা করতে গেলে বাবা শূন্য হয়ে যাবে। ও মরে গেলেও এটা করতে পারবে না।

এভাবে চলতে পারবে না নবনী, মনের রাশ টেনে ধরতেই হবে এবার, একেবারে শক্তভাবেই! এতদিনের গড়া দুর্ভেদ্য প্রাচীর কোনো ভাবেই ভেঙে পড়তে দেবে না ও, ইমারত টাকে আরও মজবুত করতেই শুরু হলো রায়ানকে এড়িয়ে চলা।

...........

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ১৫