তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ১৩

🟢

"আপনার সাথে কথা বলার চাইতে শক্ত কংক্রিটের দেয়ালে একশ বার মাথা ঠুকে মাথা ফাটিয়ে মগজ গলিয়ে ফেলাও পানির মতো সহজ!"

দাঁতে দাঁত চেপে বলল রায়ান, কথা শেষ করতে যত দেরী হয়েছে, প্রতি উত্তর আসতে তার ন্যানোসেকেন্ড সময়ও হয়তো লাগল না!

"তো পানির মতো সহজ কাজটাই করুন না। কংক্রিটে মাথা ফাটান নয়তো এক বস্তা ইট দিয়ে নিজের মাথায় বাড়ি দিন! আমি তো আপনাকে সেধে সেধে আনিনি কঠিন কাজ করতে। আপনার পা ধরে বলিনি, 'আসেন আসেন আমার সাথে কথা বলেন। আপনি কথা না বললে আমি মরে যাচ্ছি!' বলেছি কি? বরং আপনি নিজেই যেচে এসেছেন আমার কাছে।"

রাগে রায়ানের মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, একটু পরে হয়তো মগজ গলে চুয়ে চুয়ে পড়া শুরু করবে!

"আপনি একটা মহা ফাজিল মেয়ে। আপনার মতো অসভ্য মানুষ আমি আমার সারাজীবনে একটাও দেখিনি। দ্যাটস ফর সিউর।"

গলা না চড়িয়েও তীব্র ঝাঁঝ ঢেলে বলল রায়ান।

চুলার কাছ থেকে সরে এগিয়ে এসে রায়ানের থেকে প্রায় হাত দেড়েক দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রায় নির্লিপ্ত গলায় নবনী বলল,

"এখন তো দেখলেন! দেখুন, দেখুন আরও ভালো করে দেখুন। দেখে দেখে চোখজোড়া ধন্য করুন। কারণ এমন কাউকে আর কখনো দেখবেনও না। এই সুযোগ হেলায় হারানো কি ঠিক হবে?"

রায়ানের ইচ্ছে হলো নিজের মাথাটা সত্যি সত্যি পাশের দেয়ালে ঠুকে দিতে! সামনের চুলায় যতটা আগুন জ্বলছে এর সহস্রগুণ আগুন ওর মাথায় দাউদাউ করে জ্বলছে! জেনে শুনে জ্বলন্ত উনুনে কেউ নিজের হাত দেয়!

নিজের মনে গজগজ করতে করতে রুমে এসে প্রায় খটাশ শব্দে দরজা বন্ধ করে, নিজের মাথা দু'হাতে চেপে ধরে বসে রইল। কিছুতেই মাথার ভেতরে জ্বলতে থাকা ভিসুভিয়াস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না! শেষে পরাস্ত হয়ে শুয়ে পড়ল মাথায় বালিশ চাপা দিয়ে, একসময় ঘুমিয়েও গেল।

নবনী কিছুক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল, কিছুটা খারাপ লাগলেও পাত্তা দিল না, ঝেটিয়ে সরিয়ে দিল সকল মন খারাপের রঙকে। এরপর একেবারে নির্লিপ্ত মুখে কাপে চা ঢেলে নিজের রুমে গেল।

ও তো সন্ধি করতেই চেয়েছিল, রায়ানই সেটাকে করুণা বলে ওর অনুভূতিকে খাটো করেছে। তাই রায়ানের প্রতি নিজের এই আচরণ নিয়ে একফোঁটাও অনুশোচনা হলো না। ভাবল যে যেভাবে চায়, বা যার যা প্রাপ্য তাই তাকে ফিরিয়ে দেবে, গুনে গুনে হিসেব করে। অযাচিত কিছু করে নিজের অনুভূতির অপচয় করবে না, বিন্দু পরিমাণও না!

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে 'সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কাঁচের দেওয়াল' বইটা খুলে পড়তে শুরু করল। সকল পার্থিব চিন্তা, লৌকিকতা, দুঃখ, বিষাদ সব দূরে ঠেলে ডুবে গেল বইয়ের জগতে।

***

দুই বোন রাতে খুলে বসল নিজেদের জীবনের কিঞ্চিৎ সুখ আর সমুদ্র সমান বিষাদের ঝাঁপি।

আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো ওদের জীবনও টানাপোড়েনে ভরা। এই সুখ তো এই দুঃখ, এই রোদ, এই ছায়া আবার ক্ষণেক পরেই ঘুটঘুটে আঁধারে ঢাকা! দুই ভাই আর দুই বোন, সাথে বাবা-মা মিলিয়ে ছয়জনের মোটামুটি বিশাল পরিবার। ওদের বাবা মনসুর আলী একটা ছোটখাটো সরকারি চাকরি করতেন, তাতেই চলে যেত। মাসের অর্ধেক যেতে না যেতেই টানাটানি শুরু হয়ে যেত। তবুও একটা শান্তি শান্তি আবহ থাকত। রাতে পুরনো ডাইনিং টেবিলটায় খেতে বসেও সুখদুঃখের ভাগাভাগি চলত।

রুমু কিছুটা জেদি হলেও ভীষণ শান্ত, ধীরস্থির। পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান, সবার বড় ভাই, আর সবচেয়ে ছোটো ঝুমু। ঝুমু কিছুটা রগচটা গোছের ছিল। দুটো ভাইয়ের কেউ-ই ডানপিটে ছিল না, ভদ্র শিষ্ট ছিল। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় মেয়েদের সাথে বাবার বন্ডিং একটু বেশি ভালো থাকে, ছেলেদের সাথে মায়ের। কিন্তু ওদের ক্ষেত্রে বাবা-মা দু'জনেই যেন মেয়েদেরই বেশি ভালোবাসতেন। এটা নিয়েও খুঁনসুটি চলত ওদের মধ্যে।

রুমুর চান্স হলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমেস্ট্রিতে। এরপরই ওর জীবনে সবকিছু উল্টেপাল্টে দিয়ে এসেছিল প্রেম, উদ্দাম হাওয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অন্য কোনো জগতে। শাফায়াত ওর ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র বড়ো ভাই ছিল, ছাত্র রাজনীতি করত টুকটাক। রুমু কোনো একটা সমস্যায় পড়ে এক বড় আপুর মাধ্যমে শরণাপন্ন হয়েছিল শাফায়াতের। সাড়াও মিলেছিল। সেই সূত্রেই পরিচয়, আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব। একসময় সেই বন্ধুত্ব ভালোলাগা পেড়িয়ে ভালোবাসায় রূপ নেয়।

রুমু যখন সেকেন্ড ইয়ারে উঠল ঝুমু তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। ও দিনদিন কেমন বদলে যেতে থাকে। হয়তো সঙ্গ দোষে! মাঝে মাঝে এমন কিছুর আবদার করে বসত যেটা ওদের সাধ্যের বাইরে। মনসুর আলী কিনে দিতে পারতেন না তা, এরজন্য খুব আফসোস করতেন। রাতে শুয়ে শুয়ে স্ত্রীর কাছে বলতেন,

"জানো সাফিয়া, আমার যে কতো ইচ্ছে হয় ওদের সব চাহিদা পুরণ করার! কিন্তু আল্লাহ আমাকে সেই সাধ্য দেয় নাই। কিছু চাইলে যখন দিতে না পারি খুব কষ্ট হয়। বুকে কেমন চিনচিনে একটা ব্যথা হয়!"

সাফিয়া স্বামীর এই অসহায়ত্বে কষ্ট পান, চোখ বেয়ে পানি নেমে এসে। সেই অশ্রু দ্রুত লুকিয়ে ফেলে তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন। মানুষটা যে বড়ো ভালো!

এই যে এতো অল্প আয়ে সংসার চলত এটা তো সাফিয়া বেগমের জন্যই। ভীষণ হিসেব করে ছক কেটে টাকা খরচ করতেন। কিভাবে কিভাবে যেন কিছু টাকা জমিয়েও ফেলতেন!

ঝুমুর সেসময়কার আচরণ উনাকে বিচলিত করছিল।

কিছু উগ্র বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে গেল, এরমধ্যে কয়েকজন ছিল অতি প্রশ্রয়ে গোল্লায় যাওয়া পয়সাওয়ালা বাবা মায়ের সন্তান। তখন ঝুমুর কাছে সহসা দুনিয়াটা রঙিন মনে হতে লাগল। মনে হতো চারপাশ কত সুন্দর, কত প্রাচুর্যে ভরা ওরই শুধু কপাল খারাপ!

চোখ ধাঁধানো সুন্দরী হওয়ায় অনেকের মুগ্ধ দৃষ্টি নিজের উপর টের পেত সবসময়। সব দৃষ্টিতে যে মুগ্ধতা ছিল তা তো নয়, কিছু দৃষ্টি আদতে কুদৃষ্টি ছিল। কিন্তু ওর উড়ুউড়ু টিনএজ মন সেটা তখনও বুঝতে পারেনি! কী এক প্রলোভন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল তখন! আর তাতেই পা গলিয়ে দিল, পড়ল ভুলের ফাঁদে! যার মাশুল ও তো দিয়েই ছিল, ডুবে গিয়েছিল অতলে সাথে ডুবেছিল গোটা পরিবার! হাসিখুশি পরিবারটা এক নিমিষেই আচমকা ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল!

***

মাঝে দুই দিন কেটে গেলেও নবনী কিংবা রায়ান কেউ কথা বলেনি কারও সাথে। দু-পক্ষ থেকেই প্রাণপণে এড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টা। শুধু খাবার টেবিলেই যা দু'একটা ফর্মাল কথা হতো, তাও আফজাল সাহেব সামনে আছেন বলে। আদতে কেউ কারও মুখদর্শন করতে রাজি নয়। রায়ান কালই বেরিয়ে যাবে প্রায় সপ্তাহ খানেকের জন্য।

"তোমার যে-কোনো সমস্যা আমাকে অবশ্যই জানাবে। কোনো দ্বিধা সংকোচ রাখবে না মনে।"

রায়ান সম্মতি জানালো, ছোটো বাচ্চারা বাইরে খেলতে যাবার আগে বাবা-মা যেমন সাবধান করে তেমন লাগল ব্যাপারটা। এই যে স্নেহ, এটারই তো বড্ড কমতি ওর জীবনে, বলতে গেলে একেবারেই নেই! বাংলাদেশে এসে ওর সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি এটাই স্নেহ, প্রগাঢ় স্নেহ!

মাঝে আবারও গিয়েছিল সেই পার্কটায়। এবারে নিরাশ হতে হয়নি, পেয়েছিল মেয়েটাকে। মেয়েটার নাম চন্দ্র, পূর্নিমা রাতে জন্মেছিল বলে ওর মা ভীষণ শখ করে এই নামটা দিয়েছিল। সেইসাথে ফুটফুটে মিষ্টি চেহারা ছিল। এখন রোদে পুড়ে মলিন হয়েছে যদিও। এসব তথ্য চন্দ্রের মা দিয়েছে। মায়ের অসুস্থতার জন্য এখন ঠিকমতো কাজে আসতে পারে না, আবার না আসলেও চলে না। তাই রায়ান চন্দ্র'র সাথে পাশের বস্তিতে গেল। ওখানেই থাকে ওরা। সেখান থেকে মা মেয়েকে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে সব ওষুধপত্র কিনে দিয়ে এসেছে। তবে ডাক্তার গুরুতর কিছুরই আশঙ্কা করছেন। ওর মা এত অসুস্থতা নিয়েই মেয়ের স্তুতি গাইলেন, শুকনো প্রায় হাড্ডিসার অবয়বেও হাসি ঝিলিক দিয়ে গেল সেসময়। রায়ানের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, ঘুরেফিরে তার প্রকাশে রায়ান ভীষণ বিব্রত বোধ করছিল।

একটা স্কুলেও কথা বলেছে, ডিসেম্বরের শেষে ভর্তি শুরু হলে চন্দ্রকে সেখানে ভর্তি করবে, এতে অবশ্য আফজাল আঙ্কেলের সাহায্য পেয়েছে ও।

এবার রাতটা কাটলেই বেরিয়ে পড়ার অপেক্ষা, নিজের প্রফেশনাল কাজের পাশাপাশি দেশটাকে আরও কাছ থেকে চোখ ভরে দেখার অপেক্ষা।

সকালে উঠে নাস্তা করে সব ঠিকঠাক গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল রায়ান। আফজাল সাহেব নানারকম উপদেশ দিলেন। চামেলির কাছ থেকেও বিদায় নেওয়া হলো, কিন্তু নবনীকে কোথাও দেখল না। নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ওকে খুঁজল ঠিকই। চামেলি যেন কিছুটা আঁচ করেই বলল,

"আফা তো বাসাত নাই। সক্কাল সক্কাল খাইয়াই বাইর হইল তাড়াহুড়া কইরা। কী জানি জরুরী কাম আছে!"

রায়ান কিছু বলল না আর, তবে কেন যেন ভেতরে ভেতরে হালকা অভিমান হলো! কেন জানে না!

পা বাড়ালো নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, নতুন কিছু আবিষ্কারের তাড়নায়!

নবনী আসলে বাইরে গিয়েছিল রায়ানকে এড়াতেই। গতকাল রাতে সেই ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন আবারও দেখেছে। একেবারে হুবহু আগের মতোই। আঁধার ঘিরে ধরছে বাবার চারপাশে, নবনী সামনে যাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু একটা হাত ওর হাত আঁকড়ে ধরে আছে। কিছুতেই বাবার কাছে যেতে পারছে না, বাবা ক্রমশ আঁধারে ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন।

তবে এবার হাত ধরে রাখা ব্যক্তির দিকে তাকাতেই স্পষ্ট হলো অবয়ব। স্বপ্নের মধ্যেও ভয়ংকর চমকে গেল। আর ঘুম ভেঙে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে, হাঁপাচ্ছে অনবরত। হৃদপিণ্ডে কেউ যেন দুমদাম আঘাত করছে! এই স্বপ্নের কি আদৌ কোনো ব্যাখ্যা আছে নাকি শুধুই অর্থহীন এক স্বপ্ন।

রায়ানকে কেন দেখল তবে? এরসাথে ওর কী সম্পর্ক? বাকি রাত এপাশ ওপাশ করে এসবই ভেবেছে, কিন্তু এই সমীকরণের সমাধান করতে পারেনি। তবে আপাতত রায়ানের মুখোমুখি হতে চায়না ও, কারণ একটা মনগড়া সমাধান নিজের মনে সাজিয়ে নিয়েছে ও।........

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ১৩