তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ৯

🟢

রাতে খাবার টেবিলে আফজাল সাহেব আর নবনী অপেক্ষা করছিল রায়ানের জন্য। চামেলি ডাকতে গেছে ওকে। কিন্তু চামেলি বাইরে থেকে কয়েকবার ডেকেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পেল না, দরজা মৃদু ধাক্কা দিতেই খুলে গেল, ভেজানো ছিল শুধু। উঁকিঝুঁকি মেরে ভেতরে ঢুকতেই চোখ গেল বিছানায় অবিন্যস্ত ভাবে শুয়ে থাকা রায়ানের দিকে। ওর যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ দেখে প্রায় আঁতকে উঠে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো ওদের কাছে,

"আফাগো, ভাইজান জানি কেমুন করতাছে! তাড়াতাড়ি চলেন?"

নবনী আর আফজাল সাহেব ছুট লাগালেন সেদিকে। গুটি-শুটি মেরে শুয়ে আছে প্রায় অচেতন রায়ান, কিছুক্ষণ পরপর অস্ফুট কাতর ধ্বনিটাই কেবল জানান দিচ্ছে প্রাণের। কপালে হাত রেখে উত্তাপটা টের পেল নবনী।

"চামেলি, থার্মোমিটারটা নিয়ে আয় তো। ওষুধের ঝুড়িতেই মনে হয় রেখেছিলাম!"

থার্মোমিটারে চোখ রেখে ভীষণ চিন্তিত হয়ে গেল নবনী, পারদ তখন একশ তিনের মাত্রা ছাড়িয়েছে! আফজাল সাহেব পড়ে গেলেন মহা টেনশনে, ঘড়ির কাঁটা দশটা পেরিয়েছে, ছেলেটাকে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার দেখানো উচিত। তিনি গায়ের জামাটা বদলে বেরিয়ে গেলেন।

একটা কম্বল গায়ে চাপিয়ে দিল নবনী, চামেলি বালতিতে পানি এনে দিল। আপাতত মাথায় পানি দিয়ে কিছু খাইয়ে যদি ওষুধটা খাওয়ানো যায়, সেই চেষ্টাই করতে হবে। নিবিষ্ট মনে রায়ানের মাথায় পানি ঢালতে লাগল নবনী।

হয়তো একটু বেশিই রূঢ় আচরণ করেছে ও ছেলেটার সাথে, এতটা রূঢ়তা সত্যিই প্রাপ্য ছিল না। মাঝে মাঝে কী যে হয় ওর! বাবা বিয়ে বিয়ে করেন সবসময়, এইসময় নিজের বন্ধুর ছেলেকে বাসায় থাকতে দেয়া, দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ভেবে নিয়েছিল ওকে গলায় ঝুলিয়ে দিতেই বুঝি বাবার এই বন্দোবস্ত। বাবার মনে একেবারে কিছুই যে নেই, এটা বিশ্বাস করে না ও। তবুও এমন আচরণে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাচ্ছে বারবার, কেমন দংশিত হচ্ছে বিবেকবোধ!

আর বাবার অভিসন্ধি থাকলেও রায়ান হয়তো সেসবের কিছুই জানে না। তেমন হলে তো অবশ্যই নবনীকে ইমপ্রেস করার ধান্দা করত! তেমন কিছু কখনোই দেখেনি ও।

***

রুমু ঘুমন্ত তামিমের গায়ের উপরে একটা হাত রেখে অন্য হাতে চুলগুলো নাড়িয়ে দিচ্ছিল। মায়ের জীবনে বয়ে যাওয়া ঝড়ের বিন্দুমাত্র বোঝার বয়স হয়নি এখনো। রুমুর মাথায় পাহাড় প্রমাণ চিন্তা! অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ চিন্তা করে শিউরে উঠছে বারবার। নাঈম ওই বাসাতেই আছে। শাফায়াত গা বাঁচিয়ে চললেও নাঈমটা কেন যেন বাবাকেই বেশি পছন্দ করে!

ভাইয়েরা আজ যেভাবে বলল,

"সবসময় খামখেয়ালি করে চলবি? বিয়ের সময় তো আমাদের কথা শুনলি না, তাহলে এখন এসব ছিঁচকাঁদুনে প্যানপ্যান আমাদের কাছে করছিস কেন?"

আর মা যে ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে, এটা তো মুখ দেখলেই বোঝা যায়।

শাফায়াত কয়েকবার অবশ্য কল করেছিল, ধরবে না ধরবে না করেও পাঁচবারের সময় ধরে বসল, আর ধরতেই বুঝতে পারল এমন লোকের কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশা রাখাটা চরম ভুল।

"তুমি কিন্তু অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করছো রুমু। তুমি যদি মনে করে থাক, আমি তোমার হাত পা ধরে নিয়ে আসব, তবে ভুল করছ। ভালোই ভালোই কালকের মধ্যে বাসায় চলে আসবা। যদি না আসো, আর কোনোদিনও আসার দরকার নাই।"

নিজের কথা হড়বড় করে বলেই লাইন কেটে দিয়েছিল, রুমু কিছু বলার সুযোগই পায়নি। লোকটা সবসময়ই এমন, কেবল নিজের ভালো মন্দ ওর ঘাড়ে চাপিয়ে গেছে। ওর কিসে ভালো, কিসে মন্দ সেসবের দিকে ফিরেও তাকায়নি! অথচ বিয়ের আগে কী মিষ্টি মধুর রসালো কথা শুনিয়েছে! বিয়ের পরেও তো ভালই ছিল, অন্তত প্রথম বছরে। পরে কি শাফায়াত ওকে একটা বস্তু হিসেবেই ধরে নিয়েছিল? পাওয়ার আগে যে তীব্র আকর্ষণ ছিল, পাওয়া হয়ে গেছে বলেই এত অনীহা! বাচ্চারা যেমন খেলনার বায়না করে নাছোড়বান্দা হয়ে, কিনে দেবার পর কয়েকদিন সেটাকে কী ভীষণ যত্নে আগলে রাখে, কাছ ছাড়া করতে চায় না এক মুহূর্তের জন্যও! কিন্তু দু'দিন পরে ফেলে রাখে একেবারে অবহেলায়, বড্ড অযত্নে। হয়তো আর ফিরেও তাকায় না একসময়ের আরাধ্য খেলনার দিকে!

ও কি এতটাই সহজলভ্য? নাকি মেনে আর মানিয়ে চলতে চলতে নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে খেলো করে ফেলেছে নিজেকে? শাফায়াতের এই স্পর্ধায় ওই কি প্রচ্ছন্ন ইন্ধন যুগিয়ে গেছে? হিসেবের খাতায় এতটা গরমিল হয় কারও! দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক বেয়ে!

আজ নিজের পায়ের নিচে দাঁড়াবার মতো শক্ত মাটি নেই বলে কী যে আক্ষেপ জন্মাল! তবুও বিদ্রোহ করে বসল সমস্ত সত্তা, চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি মুছে প্রতিজ্ঞা করল, নিজেকে আর কিছুতেই অপমানিত হতে দেবে না, কোনোভাবেই না!

***

রাত প্রায় দেড়টা। চামেলি ঘুমে ঢুলছিল বলে ওকে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বলেছে নবনী। রায়ানকে কোনোরকমে খাইয়ে ওষুধ দিয়ে দেয়া হয়েছে। আফজাল সাহেব বিছানার একটা কোণায় বসে আছেন, অবয়বে স্পষ্ট দুঃশ্চিতার ছাপ। আর নবনী একটা চেয়ার পেতে বিছানার পাশেই বসেছে।

"বাবা, এত রাত জাগাটা তোমার শরীরের জন্য ভালো নয়। তুমি গিয়ে ঘুমাও। আমি তো জেগেই থাকি। একটু পরপর এসে দেখে যাব।"

"মা রে, সন্তানের অসুখ বিসুখ করলে বাবা মা'র যে কেমন লাগে, তুই এটা এখন বুঝবি না। আশরাফ ফোন করেছিল ছেলের খোঁজ নিতে। ওকে কীভাবে যে জানিয়েছি!"

"না জানালেই পারতে, বাবা। টেনশন করবেন নিশ্চয়ই। আর এটা তো সাধারণ জ্বরই।"

আফজাল সাহেব ম্লান হাসলেন,

"তোর মনে আছে, একবার তোর যে কী ভীষণ জ্বর এসেছিল? নাইনে কী টেনে পড়িস তখন! স্কুল থেকে এলি রীতিমতো কাঁপতে কাঁপতে। তোর কপালে হাত বুলিয়ে আমি তো অস্থির। সে রাতে তোর জ্বর এত বেড়ে গেল, কপালে হাত দেয়া যায় না এমন তাপ। প্রায় বেহুঁশ পড়ে থাকলি, জ্বরের ঘোরে নানারকম আবোল তাবোল কথা বললি সারারাত।"

নবনীর রক্তের কণিকাগুলোও যেন ছলকে উঠল। এটা ওর আস্তাকুঁড়েতে ফেলে আসা সময়টার কথা। আর শুনতে চাইল না ও,

"বাবা, ঘুমাতে যাও না! শরীর খারাপ করবে তো।"

কিন্তু বাবা ওর কথা কানে তুললেন না, নিজের মনেই বলতে থাকলেন,

"আমি তো তখন পাগলপ্রায়, কোনোভাবেই জ্বর নামে না। অবনী যেবার চলে গেল সেইবারও তোর এমন জ্বর এসেছিল। তারপর বহুদিন পরে আবার ওমন হলো। আমি সারারাত আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করলাম, তুই ছাড়া আমার তো আর কেউ নেই। আল্লাহ আমার ডাক শুনলেন। তিনদিন জমে মানুষে টানাটানি করে তবেই তুই সুস্থ হলি। আর আমারও যেন ঘাম দিয়ে জ্বর নামল! তোর জ্বর ছিল বাইরে আর আমার মনে!"

সেইসময়কার যন্ত্রণা এতবছর পরেও একইভাবে বাবার চোখেমুখে ফুটে উঠতে দেখল নবনী। বাবার প্রগাঢ় ভালোবাসা আবারও হৃদয় দিয়ে অনুভব করল! মুহূর্তকাল থেমে কিছুটা ইতস্তত করে বললেন,

"তোকে একটা কথা বলি শোন। কেউ যদি তোকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভেঙে ফেলে, এতে নিজেকে প্রতারিত ভেবে হীনমন্যতায় ভুগবি না। এতে তোর কোনো দায় ছিল না। বরং এটা ভাববি জীবন তোকে একজন প্রতারকের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে একটা শ্বাস টেনে সামনে এগিয়ে যা, জীবনটা ভীষণ সুন্দর, আর এই অপার্থিব সৌন্দর্যের প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করা উচিত। তুই খুব শক্ত মনের, আমি জানি এটা তুই পারবি।"

অশ্রুসিক্ত চোখে কথাগুলো বললেন আফজাল সাহেব।

নবনী বুঝতে পারল কিছুই গোপন নেই বাবার কাছে। নিজের সেইসময়কার করা ভুলের জন্য আবারও দগ্ধ হলো অনুশোচনায়। ছোট হয়ে গেল নিজের কাছেই, মনে হলো এরথেকে বুঝি মরণও ভালো! বাবার চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারল না। চোখ নামিয়ে বলল কেবল,

"বাবা তুমি..."

"তোকে কিছু বলতে হবে না। তোর প্রতি কোনো রাগ নেই আমার। জ্বরের ঘোরে বলে ফেলেছিলি সব। আমি জানতাম তুই নিজেকে সামলে নিতে পারবি। আমি ব্যাপারটা জানি এটা ভাবলে তোর হয়তো সংকোচ কাজ করবে, তাই কখনো বলা হয়নি। আমকে অবাক করে দিয়ে তুই অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সামলে নিলি নিজেকে। তোর ওই ক্ষতটা এখন শুকিয়ে টনটনে হয়ে গেছে বলেই কথাটা বললাম। যেটুকু ঝুলে আছে সেটুকুও ছুঁড়ে ফেল। ভেতরে আর কোনো গ্লানি রাখিস না, মা।"

সত্যিই তো, ওর তো এতে কোনো দায় ছিল না, তবে কেন এত দীর্ঘদিন ধরে তা মনে পুষে রাখল ও! আজ যেন সবটা এক ফুঁৎকারে উড়ে গেল! এখন আর চাপা যন্ত্রণাটা নেই। কোনো এক মন্ত্র বলে হাওয়া হয়ে উবে গেছে যেন! বাবা নামক মন ভালো করার 'ম্যাজিক বক্সে'র পরশে দুঃখ, গ্লানি সব এক নিমিষেই ভ্যানিশ! বাবা-মেয়ে উভয়ের চোখই ভিজে আসল ক্রমশ! এই জল কষ্টের নয়, স্বস্তির! অনেক পুরনো এক দায়মুক্তির!

রায়ান সারারাত যেন ভিন্ন জগতে বিচরণ করল, মাথার ওজন যেন বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে গেছে। চেতনা আর অর্ধচৈতন্যের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলছিল বারবার। মনে হচ্ছিল একটা হাত পরম মমতায় ওর মাথায় স্পর্শ করছে! কতদিন পরে এমন মমতা মাখা স্পর্শ পেল মনে করতে পারল না। সেই যে কবে মা স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিত, তারপর...

আবার আবছা হয়ে আসা দৃষ্টিতে দেখল কোনো এক মায়াবতী যেন হৃদয়ের সমস্ত মায়া ঢেলে দিচ্ছে ওর গভীর বিষাদে নিমজ্জিত হৃদয়ে! ইশ! কী শান্তি! চোখ বন্ধ হয়ে এলো ক্রমশ।

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ৯