তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ৫

🟢

সন্ধ্যার পরেই আফজাল সাহেব দাবা বোর্ড সাজিয়ে খেলতে বসেন। এটা উনার প্রাত্যহিক কাজের অংশ, খাওয়া, ঘুম আর দাবা! নবনী এই খেলার প্রতি কেন যেন কোনো আকর্ষণবোধ করে না! ক্রিকেটে ছাড়া আর কোনো খেলাই অবশ্য ওকে টানে না খুব একটা! তাই বাবাকে এই সময় সঙ্গ দেয়া হয় না। একা একাই খেলেন, এবং অত্যন্ত আগ্রহের সাথেই খেলেন। নিঃসঙ্গতা তাঁর উৎসাহে ভাটা টানতে পারে না। আজ অবশ্য একা একা খেলতে হচ্ছে না, রায়ান যোগ দিয়েছে সাথে। পার্টনার হিসেবে রায়ানকে যোগ্য বলেই মনে হচ্ছে, কারণ খেলা বেশ জমে উঠেছে!

চাল দিতে দিতেই আফজাল সাহেব বললেন,

"তোমার মনে হয় একজন গাইড সাথে রাখা উচিত। এরকম ঘটনা আবারও ঘটা অসম্ভব কিছু নয়।"

"গাইড লাগবে না, আঙ্কেল। শুধু মাঝেমধ্যে কিছু ইনস্ট্রাকশন দরকার হতে পারে। সে আমি নিজেই ম্যানেজ করে নিতে পারব। আপনি চিন্তা করবেন না।"

বলতে বলতে পরের চালটা দিয়ে দিল রায়ান।

"তোমার যেভাবে সুবিধা হয়। কোনো ঝামেলায় পড়লে আমাকে অবশ্যই জানাবে, কোনোরকম সংকোচ করবে না।"

রায়ান সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালে উনি আর ঘাটালেন না ব্যাপারটা।

খেলাটা যখন চরম উত্তেজনাপূর্ন হয়ে উঠল, তখনই নবনী এলো ঝালমুড়ি নিয়ে। ওদের তখন নবনীর দিকে তাকানোর সময় নেই, সমস্ত মনোযোগ নিবন্ধ দাবার বোর্ডে! আগামাথা না বুঝলেও বসে রইল নবনী। শেষ হাসি হাসলেন বাবাই। কী ভীষণ খুশি যে হয়েছেন উনি, চোখেমুখে বাচ্চা ছেলের উল্লাস! টাইম ট্রাভেলে চেপে এক নিমিষেই কোনো মায়াবলে যেন ফিরে পেয়েছেন নিজের হারানো শৈশব! বাবার অমূল্য শিশুসুলভ হাসি নবনীর মন ভালো করে দিল এক তুড়িতে!

"আঙ্কেল, আপনি দারুণ খেলেন, বলতেই হচ্ছে!" রায়ানের গলায় মুগ্ধতা।

"আপনি জানেন না? বাবাকে দাবায় হারানো প্রায় অসম্ভব! আজ পর্যন্ত কেউ পারে নি শুধু একবার একজন গ্র‍্যান্ডমাস্টারের সাথে খেলেছিল, সেবার একটুর জন্য হেরেছিল!"

পিতৃ গর্বে গরবিনী হয়ে বলল নবনী।

"তাই তো দেখছি।"

"তুমিও খুব ভালো খেল, রায়ান। কিন্তু শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছ, কী আর করা!"

আফজাল সাহেব উদ্ভাসিত হাসিমুখে বললেন।

রায়ান হেসে মাথা নাড়াল। নবনী উঠে চলে গেল চা আনতে। আফজাল সাহেবের সহসা কিছু মনে পড়ল এমন ভঙ্গিতে বললেন,

"আমি বুঝতে পেরেছি নবনী তোমাকে কিছু একটা বলেছে। যাই বলুক, তুমি কিছু মনে করো না, বাবা! মেয়েটা হুটহাট রেগে যায়, আবার একটু পরেই যখন রাগ পড়ে যায়, তখন গিল্টি ফিল করে, নিজে নিজেই কষ্ট পায়। খুব চাপা স্বভাবের কিনা! কষ্টগুলো বেরোতে দেয় না। ভেতরেই আটকে রাখে।"

একটু আগের উল্লসিত চেহারা ম্লান হয়ে গেছে, সেখানে মেয়েকে নিয়ে ফুটে উঠেছে গভীর চিন্তার ছাপ!

"উনি তেমন কিছু বলেননি, আঙ্কেল। আমি কিছু মনে করিনি। আপনি টেনশন করবেন না, প্লিজ।"

নবনীর উপর কিছুটা রাগ জমে থাকলেও এই অদ্ভুত স্নেহপরায়ণ লোকটিকে সেসব বলে বিচলিত করতে চায় না ও। আফজাল মাহমুদ হয়তো কিছুটা আস্বস্ত হলেন!

সন্ধ্যার পরের এই সময়টাকে নবনী নাম দিয়েছে 'মন খারাপের প্রহর'। এই সময়টায় ও একেবারে একা হয়ে যায়, বাবা দাবা খেলায় মগ্ন আর চামেলি মগ্ন থাকে সিরিয়ালে। একটা অদ্ভুত মন খারাপের বাতাস যেন আলতো করে ছুঁয়ে যায় ওর মনকে! মনের কোনো এক কোণে সুক্ষ্ম মন খারাপ আঁকিবুঁকি দাগ কেটে যায়! পুরনো ভুলের ক্ষতকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে আনতে চায় যেন! কৈশোরে তীব্র আবেগের বশে ভুলের পথে পা বাড়িয়ে দিয়েও সেখান থেকে ফিরতে পেরেছিল ও, কিন্তু সেই ভুলটা বিষ কাঁটার মতো ওর হৃদপিণ্ডকে আজও খুঁচিয়ে মারে! সেই ঘটনা বাবাকেও জানায়নি নবনী। তখনই ডিলিট করে ফেলেছিল মন থেকে, তবে সেটা সমূলে নষ্ট হয়নি। মনের রিসাইকেল বিনের কোনো এক কোণায় এখনো পড়ে আছে হয়তো! সেই ভুলটা ওর মনে এক গভীর ছাপ ফেলে গেছে! ওকে শিখিয়ে গেছে, সকলেই বিশ্বাস নামক শব্দটার যোগ্য নয়!

আজ সারাদিন বিশাল ধকল গেছে রায়ানের। বলা যায় দৌড়ের উপরে ছিল! ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, অবশ্য দাবা খেলার সময়টা চমৎকার কেটেছে ওর। খাবার টেবিলেও জমেছিল রাজ্যের আলোচনা, দেশ-বিদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে শুরু করে ফুটবলে লিওনেল মেসি সেরা নাকি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সেরা সে নিয়েও বিতর্ক জমেছিল ভালোই! দাবাতে রায়ান কিছুটা পিছিয়ে পরলেও এখানে দু'জনেই লড়েছে সমানতালে! তাই এই লড়াই শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। ধুন্ধুমার আড্ডার সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, একটা টপিকে কথা আটকে থাকে না, কথারা নিজেরাই ডালপালা মেলতে থাকে যেন! প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গ বদলে যেতে থাকে অনবরত, আলোচকের মর্জির বাইরে ওদের একান্ত নিজস্ব ছকে, নিজের মর্জিতে!

"নবনীকে দেখে আমার মনে হতো ইয়াং জেনারেশন বুঝি হাসতে খেলতে ভুলে গিয়েছে। কিন্তু তোমাকে দেখে আমার সেই চিন্তাটা কাটল, বুঝলে!"

হেসে হেসে বলেছিলেন আফজাল সাহেব।

"উনার সাথে আপনি পুরো জেনারেশনকে মেলাতে যাবেন না, আঙ্কেল! আপনার মেয়ে পুরো পৃথিবীতে একটাই, এমন স্ট্রেঞ্জ ক্যারেক্টার আর কোত্থাও খুঁজে পাবেন না!"

বেফাঁস বলেই নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করেছিল ওর।

আফজাল সাহেব ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন, কিন্তু যাকে নিয়ে এই কথা সে কটমটে চোখ করে দু'জনের দিকে তাকাল কেবল, রায়ানের দিকে তাকিয়েছিল অগ্নি দৃষ্টিতে, ওই আগুনের ক্ষমতা থাকলে রায়ান এতক্ষণে ভস্মীভূত হয়ে যেত! জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেত! তবে সেই দৃষ্টিতে যে ভাষা ছিল তা রায়ান পড়ে ফেলেছে। সেখানে ওর জন্য স্পষ্ট হুমকি লেখা ছিল যেন,

"তোমার লেজ বেশি লম্বা হয়ে গেছে, বৎস। লেজটা ঘ্যাঁচ করে কেটে দিলে আর বাঁদর সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না! বাকি জীবন লেজকাটা টিকটিকি হয়ে টিকটিকি সমাজে ঘুরতে হবে!"

নিজের বিপন্ন ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভীষণ শঙ্কিত হলো রায়ান! কেন যে এই মেয়ে সম্পর্কিত কথাবার্তা বলতে যায়! মনে মনে নিজের গালেই চপেটাঘাত করল সহস্রবার।

রাতে কিছু কাজ জমেছিল, সেগুলো শেষ করে কিছুক্ষণ ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করল। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে একসময় বিরক্ত হয়ে উঠে পড়ল রায়ান। ভাবল পাশের ঘরের খোলা দরজা দিয়ে বইয়ের তাক দেখেছিল। সেখান থেকে পছন্দসই কোনো বই আনবে কিনা! উঠে এসে দরজায় দাঁড়াতেই মাথায় ঢুকল একরাশ দ্বিধা! নবনী নিশ্চয়ই রেগে যাবে, আর তাছাড়াও বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়ে ওদের ব্যক্তিগত বইয়ের তাক ঘাটাঘাটি করা শোভা পায় কিনা তাও ভাবল! সাতপাঁচ ভেবেও যখন মনস্থির করতে পারল না, তখন নবনীর ডাকে চমকে গেল!

"কী করছেন এখানে?"

"না, আসলে সময় কাটছিল না। ভাবলাম বই পড়লে হয়তো সময় কাটবে! তাই ভাবলাম..."

"বই নিবেন, ভালো কথা। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন কেন? অনেকক্ষণ ধরে দেখছি!"

নবনীর দুচোখে ঘোরতর সন্দেহের দোলা দেখল রায়ান! নিজেকে ভীষণ বোকা বোকা মনে হলো! কথাবার্তায় ভীষণ অকপট রায়ান এই মেয়ের প্রগাঢ় দৃষ্টির সামনে কেন যেন বড্ড বেশি নিষ্প্রভ হয়ে যায়! কারও দৃষ্টি এতটা অন্তর্ভেদী হতে পারে ভেবে পায় না ও!

"ভাবছিলাম পারমিশন ছাড়া ঢুকে পড়াটা ঠিক হবে কিনা!"

"যখন খুশি এখানে আসতে পারেন, গোপন কিছু নেই এখানে। তালা দেয়া যেহেতু নেই, এতটা সংকোচের কারণ দেখছি না।"

দৃষ্টি কিছুটা নরম হলো বলে মনে হলো রায়ানের।

নবনী ঢুকে গেল লাইব্রেরি ঘরে, পেছনে ঘুরে বলল,

"কী ব্যাপার, এখনো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আসুন।"

ওর পিছু নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বিস্ময়ের ছোটোখাটো একটা ধাক্কা লাগল রায়ানের। এত এত বই, থরে থরে সাজানো। কার বই নেই এখানে? দেশি সাহিত্য থেকে শুরু করে পশ্চিমা সাহিত্যের নানা ধাঁচের, নানা জনরার বই এখানে আছে! ওইতো বঙ্কিমচন্দ্র, রবী ঠাকুর, শরৎচন্দ্র, নজরুল, বিভূতিভূষণ, ছফা থেকে হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল, সমরেশ, শীর্ষেন্দু, সুচিত্রা, সুনীলে সাজানো অর্ধেকটা। বাকিটা জুড়ে রয়েছে ড্যান ব্রাউন, মারিও পুজো, কেন ফলেট, ফ্রানৎস কাফকা, নাগিব মাহফুজ, জুলভার্ন, জেকে রাউলিং, জেফরি আর্চার, চিনুয়া আচেব, আর্থার কোনান ডয়েল, আগাথা ক্রিস্টি, গেব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ, মার্ক টোয়েন, জেন অস্টিন, জেমস প্যাটারসন সহ আরও অসংখ্য লেখকের বই! সেইসাথে কিছু রেয়ার বইও রয়েছে, যেগুলো সচরাচর পাওয়া যায় না। বইগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা, কোথাও ধূলো জমে নেই, বোঝাই যায় নিয়মিত পরিচর্যা পায় এরা। কে করে সেটা অজানা নয় রায়ানের।

বিস্ময় চাপতে না পেরে প্রশ্ন করেই ফেলল রায়ান,

"সব আপনার কালেকশন?"

"বেশিরভাগই আমার। পুরনোগুলো কিছু মা'য়ের আর কিছু বাবার। দাদীরও কিছু আছে। সবটা আমি কালেকশনে রেখেছি।"

কিছুটা থেমে আবার বলল,

"আপনার যখন খুশি, যে বই খুশি নিতে পারেন। তবে পড়া শেষ হলে যেভাবে ছিল, সেভাবেই গুছিয়ে রাখবেন। বইয়ের অযত্ন আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না।"

"অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আমি গুছিয়েই রাখব।"

"আর একটা কথা, আমি যে স্ট্রেঞ্জ ক্যারেক্টার সেটা খুব ভালো করে জানা আছে আমার। আপনার আমাকে নিয়ে কোনো ধরনের কমপ্লিমেন্ট দিতে হবে না! ভালো-মন্দ কোনোটাই না। মনে রাখলেই ভালো করবেন।"

রায়ান সেকথা কানে তুলল না। এত অল্পের উপর দিয়ে গেল বলে মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মুখে বলল,

"অবশ্যই মনে থাকবে। আমার ঘাড়ে একটাই মাথা, সেটা বেঘোরে খোয়ানোর ইচ্ছে একেবারেই নেই!"

নবনীর জ্বলে উঠা চোখ অগ্রাহ্য করে বই দেখায় মন দিল ও। এবারের মতো আর পালটা উত্তর এলো না ওপ্রান্ত থেকে!

রায়ান ঘুরেফিরে দেখতে দেখতে শরৎচন্দ্রের 'গৃহদাহ' বইটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। নবনী বিস্মিত গলায় বলল,

"আপনি বাংলা বই পড়েন?"

"মা পড়ত খুব। মায়ের বইয়ের তাক থেকে নিয়ে পড়েছি একসময়। অনেকদিন যদিও পড়া হয় না!" রায়ান বলল ঘোরলাগা দৃষ্টিতে।

"আন্টি বাংলা বই পড়েন? বাহ্! উনি বাঙালি না হয়েও বাংলা বই পড়েন জেনে খুব ভালো লাগল।"

রায়ানের চোখেমুখে লেগে থাকা হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল, এক অদ্ভুত অবর্ননীয় ছাপ পড়ল অবয়বে! এটা কীসের ছাপ, রাগ না কষ্টের নবনীর বোধগম্য হলো না!

রায়ান কেবল অস্ফুটস্বরে বলল,

"উনি আমার মা নন। বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী!"

গলাটা ভীষণ ভাঙা শোনাল, কণ্ঠে কী যে কষ্টের প্রকাশ!

কোনোমতে উত্তরটা দিয়েই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল রায়ান, আর ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকল বিস্মিত, হতভম্ব নবনী!

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ৫