সেই যে রায়ানের তেরো তম জন্মদিনেই যত অনর্থের শুরু হয়েছিল! 'আনলাকি থার্টিন'! ওর চির সংস্কার বাদী মনটাও এই টার্মটা কেন যেন বিশ্বাস করতে চায়! পাশের রুমে বাবা-মায়ের ঠোকাঠুকি রীতিমতো অসহনীয় হয়ে উঠেছিল ওর কাছে। সবে সম্পর্কের মানে বুঝতে শিখছিল ও, নিজের বাবা-মায়ের শীতল সম্পর্কটা তখনই চোখে পড়ে। এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেই রাতে নিজের রুমের দরজায় গা এলিয়ে মেঝেতেই বসে ছিল সারারাত, তাঁদের চিৎকার চেঁচামেচি ওর ভেতরটা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল বারবার! তীব্র ভয়ের স্রোত বারবার আছড়ে পড়ছিল ওর কোমলমতি হৃদয়ে! ভেতর থেকে উথলে উঠা কান্নার দমক কী অদ্ভুত শক্তিতে যে রুখতে পেরেছিল রায়ান! এর ঠিক পাঁচদিন পরেই...
বাকিটা আর মনে করতে চায় না ও, এক মুহূর্তের জন্যও না! আজ এতবছর পরেও, এতটা পরিণত হয়েও ওই ঘটনা ওকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। ওকে দুমড়ে মুচড়ে গুড়িয়ে দেয়, এক নির্জলা অসহায়ত্ব গ্রাস করে! ডুবে যায় গভীর অতলে! ওর জীবনটাই যে বদলে দিয়েছিল তা!
এই যে নিজের তুখোড় আড্ডাবাজ হাসিখুশি ইমেজ, এটা কী সত্যিই ও নিজে? নিজের আয়নায় চোখ রেখে যখন নিজের আসল রূপ দেখে, কী যে ভীষণ দমবন্ধ করা অনুভূতি হয়! নিজের ভেতরে আর বাইরে কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! পারফেক্ট মিরর ইমেজ! মানুষ আয়নায় চোখ রাখলে যেমন উল্টো প্রতিবিম্ব দেখে, ওর ভেতর-বাহির ঠিক তেমন। নিজের কাছে নিজে একজন মুখোশ আবৃত মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়! মা'য়ের পরে একমাত্র ফটোগ্রাফিটাই ওর ভালোবাসা, প্যাশন! সেটাই আঁকড়ে ধরেছে মনেপ্রাণে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চোখ রেখে মনে হলো, আজকের আকাশটাও ঠিক ওর মতো, বড্ড ফিঁকে, বড্ড ধূসর! ওর ভেতরটাও ঠিক এরকমই কৃষ্ণপক্ষের মরা আলোয় ঘেরা! মনের গহীনে যেন চাপা পরে আছে কতগুলো কৃষ্ণগহ্বর! দু'হাতে মাথা চেপে ধরে, চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নেবার প্রাণান্তকর চেষ্টা করল, খুব একটা লাভ হলো না তাতে।
সারাদিন কষ্টগুলো বোতল বন্দী করে রাখলেও, রাতে ছিপি খুলে ঠিকই দলবেঁধে হুড়োহুড়ি করে বেরিয়ে আসে ওরা, ওর হৃদপিণ্ডকে খুঁচিয়ে মারে প্রবল পরাক্রমে! কষ্টের সাথে লড়াই শেষে গোঁ হারা হেরে অসহায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা থাকে না!
মানুষ যে জিনিসটা ভুলতে চায়, ছুঁড়ে ফেলতে চায় সেটাই কেন যেন বারবার ফিরে ফিরে আসে! অন্য অনেক কিছু ভুলে গেলেও যেটা ভুলে যাবার, সেটাই মনে গেঁথে থাকে! এটাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। রায়ানও ভুলতে পারেনি, কেউ পারে না!
রায়ান বেরিয়ে যাবার পর মুহূর্তকালের জন্য যেন থমকে গিয়েছিল নবনী! গত দু'দিনের দেখা ছেলেটার সাথে আজকের দেখা রায়ানের কোনরূপ সাদৃশ্য পাওয়া যায়নি। সদা হাস্যোজ্বল, প্রাণবন্ত একজনকেই দেখে এসেছে গত দু'দিনে, ওর তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে কিছুটা হয়তো ক্ষোভের ছায়া পড়েছিল, কিন্তু আজ সে যেন আমূল বদলে নতুন মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে। সৌম্য, শুভ্র, উদ্ভাসিত হাসিমুখের অসম্ভব সুদর্শন ছেলেটার অবয়বে এক পৃথিবী বিষাদ জমা হয়েছিল যেন! নবনী নিজেই নানাভাবে ওকে কথার তীর ছুঁড়ে গেছে, তাতেও হাসি ম্লান হয়নি ছেলেটার। অথচ আজ...
নবনী নিজের রুমে গিয়ে দেয়ালে ঝুলানো ঘড়িতে চোখ রেখে দেখল বারোটা বেজে তেইশ মিনিট। বাবার কাছ থেকে রায়ানের ব্যাপারটা জানতে হবে, হঠাৎই কৌতূহল বোধ করছে নবনী, তীব্র কৌতূহল! শুয়ে শুয়ে সকালের অপেক্ষা করতে লাগল, ঘুম আর এলো না, পুরো রাত কেটে গেল এপাশ ওপাশ করেই।
সকাল সকাল রায়ানের অবয়বে কষ্টের কোনো ছাপ দেখা গেল না, স্বভাবসুলভ হাসিমুখে সবার সাথে ভীষণ স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা চালিয়ে গেল, খাবার টেবিলেও এক্কেবারে সহজাত আচরণ থাকলেও চোখের হাসিটা আজ দেখা যায়নি। নবনী আগেই খেয়াল করেছিল রায়ানের হাসি অসম্ভব সুন্দর, ছেলেটার হাসির বিশেষত্ব হচ্ছে মুখের হাসি চোখেও প্রবলভাবে ধরা পড়ে! কিন্তু আজ তা অনুপস্থিত! সকালের নাস্তা সেরে পার্কের মেয়েটির সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল রায়ান আর নবনী গেল ওর বাবার কাছে নিজের কৌতূহল মেটাতে।
বাবার ঘরে ঢুকতেই দেখল তিনি পান চিবুচ্ছেন, জর্দার গন্ধ নাকে তীব্রভাবে ধাক্কা দিল, আর ও রেগে গেল ভীষণ! আফজাল সাহেবও মেয়েকে দেখে হকচকিয়ে গেলেন! এইসময় নবনী এই রুমে আসেই না বলা যায়। তাই মনের আনন্দে নিশ্চিন্তে জর্দা দেয়া পান চিবুচ্ছিলেন।
ছোট বাচ্চারা কোনো দুষ্টামি করে বড়দের কাছে ধরা পড়ে গেলে যেমন করে হাসে, তিনিও নবনীর দিকে তাকিয়ে সেই হাসিটাই দিলেন, আর মনে মনে কথা গুছিয়ে নিতে থাকলেন। কী অজুহাতে মেয়েকে মানানো যায়, তাই ভেবে যাচ্ছেন। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য! কোনো কথাই মনপুত হচ্ছে না! মেয়ের এই রুদ্রমূর্তিকেই কিঞ্চিৎ ভয় পান তিনি।
চোখ নাচিয়ে নবনী প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল বাবাকে,
"বাবা, তুমি আবারও জর্দা খাওয়া শুরু করেছ? তুমি কি ছোট্ট বাচ্চা, এসব তোমার স্বাস্থ্যের জন্য কতটা হার্মফুল, সেটা তুমি বুঝতে পার না কেন?"
তাঁর সেই হাসি যে কোনো কাজেই আসেনি, এটা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারলেন আফজাল সাহেব।
"চুপ করে আছ কেন? এসব কাজ কেন করো, বাবা, যার কোনো উত্তর থাকে না?" তেজোদ্দীপ্ত গলায় বলল নবনী।
"তোকে বলেছি না, এরকম করে কথা বলবি না। কলিজা কেঁপে উঠে আমার। একদিনই তো খেলাম। কী এমন হবে তাতে?"
"একদিন খেলে না কয়দিন খেলে সে তো আর আমি দেখিনি, তোমার চোখই বলে দিচ্ছে তুমি সত্য বলছ না।" তীক্ষ্ণ নজরে অবলোকন করে বলল ও।
"হ্যাঁ, তুই তো একেবারে জ্যোতিষী হয়ে গেছিস, চোখ দেখলেই সব বলে দিতে পারিস? এক কাজ করি বাসার সামনে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেই, বড়ো করে লেখা থাকবে 'এখানে চোখ দেখেই মনের কথা বলে দেয়া হয়'। হুহু করে বিজনেস হবে। বিশেষ করে যেসব তরুণ তরুণী বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছে, এরা হবে তোর টার্গেটেড ক্লায়েন্ট। একবার হুজুগ পড়ে গেলে এক লাফে কোটিপতি!"
মেয়ের প্রশ্নবাণে বিপর্যস্ত পিতা পাল্টা আক্রমণের কৌশল বেছে নিলেন। এতে যদি কিছুটা নিস্তার মেলে!
"এই বয়সে এসব ফিচলে মার্কা কথা কোথায় শিখলে, বাবা?"
"হ্যাঁ, এখন তো এসব বলবিই, বুড়ো হয়ে গেছি, চুল টুল পেকে যাচ্ছে, আরও কত-কী! বলি, চুল কী বাতাসে পেকেছে? কী কথা বলব না বলব তাও এখন বয়স ধরে বলতে হবে, হ্যাহ্!"
আক্ষেপের সুরে অসহায় গলায় বললেন আফজাল সাহেব। পান মুখে থাকায় কথাগুলো এতটা স্পষ্ট হলো না। গাল ফুলিয়ে অভিমানী মুখে বসে রইলেন।
বাবার এই অদ্ভুত ছেলেমানুষীতে সশব্দে হেসে ফেলল নবনী। বাবা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন! যাক, বিপদ কাটল তবে!
সহসা হাসি থামিয়ে নবনী বলল,
"হেসেছি বলে ভেব না ভুলে গেছি। আমি এখন থেকে প্রত্যেকদিন খেয়াল রাখব।"
"সে না-হয় রাখলি। এখন বল, এইসময় তোকে এখানে দেখি না কখনো। আজ হঠাৎ কী মনে করে?"
বাবার প্রশ্নে এখানে আসার হেতু মনে পড়ল,
"একটা কথা জানতে এলাম।"
কিছুটা ইতস্তত করে বলে ফেলল,
"রায়ানের নিজের মা কি ওদের সাথেই থাকেন নাকি ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল?"
নবনীর প্রশ্নে আফজাল সাহেবের মুখ থেকে হাসি বেমালুম গায়েব হয়ে গেল, এমন প্রশ্নের জন্য উনি তৈরি ছিলেন না। কিছুক্ষণ থমকে থেকে যে কথাটা বললেন, তাতে নবনীর কানে যেন বোমা বিস্ফোরিত হলো,
"রেবেকা সুইসাইড করেছিল।"
"সে কী! কেন? কী হয়েছিল?" ভীষণ চমকে গেছে মেয়েটা!
"কারণটা জানি না, আশরাফও কখনো সেভাবে কিছু বলেনি, আমিও আগ বাড়িয়ে ওর ক্ষতে খোঁচাতে যাইনি। শুনেছিলাম ওদের বনিবনা হয়নি, দুজনেরই বন্ধু ছিলাম বলে দুজনেই অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ করত সেসময়। এরমধ্যেই মেয়েটা ওরকম একটা স্টেপ নিল। ফ্যানের সাথে ঝুলে পড়েছিল!" আফসোস ঝরে পড়ল গলায়।
মুহূর্তকাল থেমে আবারও বলতে শুরু করলেন,
"রায়ানই প্রথম দেখেছিল রেবেকাকে, ঝুলন্ত অবস্থায়! কতটুকুই বা আর বয়স ছিল ওর তখন? ওই বয়সে নিজের মাকে ওভাবে দেখে ট্রমাটাইজড হয়ে গিয়েছিল ছেলেটা! অনেকদিন কারও সাথে কথা পর্যন্ত বলেনি। ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠত। এটুকুই জানি। কিন্তু রেবেকা হঠাৎ কেন ওরকম একটা কাজ করল তা জানি না?"
নবনী স্তব্ধ হয়ে গেছে যেন! মা না থাকার ব্যথাটা ও খুব ভালো করে বোঝে। আর রায়ান তো নিজের চোখের সামনে এরকম একটা বিভীষিকাময় ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। তাও আবার ওরকম ছোট বয়সে! না জেনেই রায়ানের ক্ষতকে খুঁচিয়ে বের করে এনেছে ও। এতক্ষণ কিছুটা খারাপ লাগা কাজ করলেও, এসব শোনার পরে তীব্র অপরাধবোধ গ্রাস করল চারপাশ থেকে!
"ছেলেটা সেই বিভীষিকা পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পেরেছে এই অনেক। আশরাফ অবশ্য এখনও অনেক চিন্তা করে রায়ানকে নিয়ে।" ভারী হয়ে আছে আশরাফ সাহেবের গলা।
"আঙ্কেলের সাথে উনার সম্পর্ক কেমন যেন, তাই না বাবা?" আচ্ছন্নের মতো প্রশ্ন করল নবনী।
"কই? তেমন কিছু তো দেখিনি! তবে কিছুটা দূরত্ব থাকাটা তো অস্বাভাবিক না!"
নবনীর এখন কিছুটা সময় একেবারে একা কাটানোর প্রয়োজনবোধ করল। তাই আর ঘাটাল না। বাবা কথা বলার সময়ই নবনী উঠে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এলো, বাবার পিছুডাক ওর কানেই ঢুকল না। চোখে ঘোরগ্রস্ত দৃষ্টি!
নিজের রুমে এসেই দরজার ছিটকিনি আটকে দিল। আলমারি খুলে মায়ের পুরনো শাড়ি থেকে একটা বেছে নিয়ে বুকে চেপে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠল। নাকে চেপে মায়ের ঘ্রাণ নেবার বৃথা চেষ্টা করল। ওই শাড়িতেই যেন মিশে আছে মায়ের অস্তিত্ব! বুক নিংড়ে বেরিয়ে আসা হাহাকার কান্না হয়ে ঝরতে থাকল দুচোখ বেয়ে! নিঃশ্বাস আটকে আসছে ক্রমশ, হিঁচকি দিয়ে মুখ চেপে কাঁদছে নবনী। মায়ের সাথে কাটানো ঝাপসা হয়ে আসা স্মৃতিরা ওর মানসপটে ভেসে উঠতে থাকল ক্রমাগত! গলা দিয়ে কেবল অস্ফুট স্বরে একটা শব্দই বেরিয়ে এলো,
"মা..."