তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ৮

🟢

মাথার উপরে লালচে সূর্যটা যখন প্রায় ডুবি ডুবি, দূরের মসজিদে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে, সেই সন্ধ্যার মুখে বাসায় ফিরল রায়ান। আজ চামেলি খুলেছে দরজা। ওর স্বভাবসুলভ চপলতায় হড়বড় করে কথার তুবড়ি ছুটিয়েছে। রায়ানের কানে সেসব ঢুকেও যেন ঢোকেনি! অন্যান্য দিনের মতো প্রাণ খুলে সেসবের জবাব দিতে গেল না আজ। কোনোরকমে হ্যাঁ-বোধক আর না-বোধক মাথা নেড়ে নিজের রুমে চলে এসেছে। ব্যাকপ্যাকটা কাঁধ থেকে নামিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়, কপাল চেপে ধরল দু'হাতে। প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় শিরাগুলো দপদপ করছে। মনে হচ্ছে মগজ ফেটে সব বেরিয়ে আসবে। একে তো রাতে ঘুম হয়নি এক ফোঁটাও, তার উপরে পার্কের ঘটনাটা ওর ভেতরের ক্ষতটাকে জাগিয়ে দিয়েছে। মাথাব্যথাটাকে যখন কোনোভাবেই কমাতে পারল না, তখন উঠে বাথরুমে ঢুকে গেল গোসল করতে। শাওয়ার বেয়ে নেমে আসা পানিতে যদি কিছুটা উপশম হয়। এভাবে এই পানিতে যদি বাহ্যিক জঞ্জালের সাথে সাথে হৃদয়ে লুকোনো কষ্ট, বিষাদও ধুয়ে মুছে ভেসে যেত!

ভিজতে ভিজতে একটা হিম হিম শীতলতায় একসময় পুরো গা কেঁপে উঠল, তখন বেরিয়ে এলো গোসল শেষ করে। তারপর থেকেই হাঁচি আসতে থাকল অনবরত, ঠান্ডা লেগে একাকার।

বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছাদেই কাটায় নবনী। সোনা রঙা গোধূলির লালচে আভা ওর ভীষণ পছন্দের। সারাদিনের তপ্ত সূর্যটা শেষ বিকেলের বিদায় বেলায় কী ভীষণ মায়া মায়া! কী অদ্ভুত সুন্দর এক রূপান্তর!

মায়াময় সূর্যটা যখন একেবারে ডুব দেয়, ওর মনটা কেমন যেন টনটন করে উঠে, এক নিঃসীম শূন্যতা গ্রাস করে! শূন্যতায় পুরো হৃদয় পূর্ণ হবার জন্য ঠিক কতটা শূন্যতার দরকার হয়? মানুষের হৃদয় তো পুরো পৃথিবীর সমান, শূন্যতা কি পৃথিবীর থেকেও দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বড় যে পুরো হৃদয় ভরিয়ে রাখে? জানা নেই নবনীর!

নবনী ছাদ থেকে নামতেই চামেলি জানাল রায়ান এসেছে বাইরে থেকে।

"আফা, ভাইজানরে আইজকা কেমুন জানি মনে হইল?"

"কেমন জানি আবার কেমন?"

"চুপচাপ, অসুখ বিসুখ করছে মনে হয়!" চামেলির জবাব।

"সে কী? কী হয়েছে উনার?" উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল নবনী।

"ভাইজান তো আমারে কিছু কয় নাই। হের মুখ দেইখা মনে হইল! যাই কন, ভাইজানের মনডা কিন্তু ভালা, এক্কাবারে ফকফকা পরিষ্কার!"

নবনীর মধ্যে হালকা অপরাধবোধ সহসা ফিরে এল। তবুও স্বাভাবিক গলায় বলল,

"দুই কী তিনদিন ধরে চিনিস তাকে, এরমধ্যেই কারও মুখ দেখেই বলে দিলি মন পরিষ্কার?"

"জীবনে মানুষ তো আর কম দেহি নাই, আফা। কিছু কিছু মাইনষেরে দেখলেই বুজা যায় সাফ দিলের মানুষ, আবার কাউরে দেখলেই মনে হয় এক্কেবারে শয়তান! ভাইজান দিল সাফ মানুষ!"

কিছুক্ষণ থেমে আবারও নিজের বলল,

"মানুষ চিনতে আমার ভুল হয় না গো, আফা। জীবনে একবারই মানুষ চিনবার পারি নাই। হের মাশুলও দিছি।"

চামেলির কথায় নবনী যেন কিছুটা থমকাল। ওর দিকে চোখ পড়তেই দেখল সোজা তাকিয়ে আছে সামনে। কিন্তু আদৌ কিছু দেখছে না সেই চোখে। কেমন ঘোলাটে দৃষ্টি! চামেলি সম্পর্কে আর কতটাই বা জানে নবনী? শুধু জানে দু'বার ডিভোর্স হয়েছে, স্বামী ওকে ফেলে আরেকটা বিয়ে করেছে, এর বেশি কিছু ও জানে না। চামেলিও বলেনি আর এই তিনবছরে নবনীও আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেনি কখনো। সারাক্ষণ ইয়ার্কি, ফাজলামো ধরনের কথা বলে বলেই কিনা ওকে গভীরতাহীন বলেই ধরে নিয়েছিল! কিন্তু সব মানুষের ভেতরেই যে কিছু গভীর বিষাদ ছাপ ফেলে যায়, তা ভেবে দেখেনি।

আজ কেন যেন জানতে ইচ্ছে করল নবনীর, কিন্তু এটা সঠিক সময় নয়। আগে রায়ানের খোঁজ নেয়া বেশি প্রয়োজন, আসলেই শরীর খারাপ করল কিনা কে জানে! দুপুরে খেয়েছে কী খায়নি তারও ঠিক নেই! রায়ানের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েও থেমে চামেলিকে প্রশ্ন করল,

"আমাকে তো অনেক দিন ধরে চিনিস? আমার দিল সাফ না কাঁদা মাখা সেটা বল তো?"

চামেলির ঘোলাটে দৃষ্টি স্বাভাবিক হলো, হেসে বলল,

"আফনের মাথা কিঞ্চিৎ গরম হইলেও, ভালা মানুষ। খাস দিলের মানুষ আফনে!"

নবনী হেসে ফেলল, চামেলি মেয়েটা সহজ সরল। ওকে একটু ভয় হয়তো পায়, কিন্তু ভালোও বাসে! নবনী সেটা ভালোই বুঝতে পারে।

***

রুমু হাসপাতাল থেকে ওর মাকে নিয়ে মায়ের বাসাতেই এসেছে। ওর মা সাফিয়া বেগমের সাথে ছোট বোন ঝুমু থাকে। দুই ভাই-ই আলাদা বাসায় থাকে নিজেদের স্ত্রী আর বাচ্চাদের নিয়ে। আজ অবশ্য সবাই এসেছে এই বাসায়। ঝুমুর বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, চোখ ধাঁধানো সুন্দরী বলতে যা বুঝায় তাই। কিন্তু ওদের সবথেকে চিন্তার কারণ ঝুমুই, ওকে পাত্রস্থ করার চিন্তায় সাফিয়া বেগমের দু'চোখের পাতা এক হয় না। ঝুমু যেটা করেছিল একে ঠিক ভুল বলতে নারাজ সাফিয়া বেগম, এটাকে উনি বলেন জেনেশুনে বিষপান!

এরমধ্যে বড় মেয়ে রুমু যখন জানাল স্বামীর সাথে ঝগড়ার কথা, তিনি পড়ে গেলেন অকূল পাথারে! তাঁর সংসারে কার নজর লাগল, এটা বোধগম্য হচ্ছে না।

আর রুমু এতদিন ধরে লুকানো কষ্টগুলো মায়ের কাছে মেলে ধরে যেন কিছুটা স্বস্তি পেল!

কী ভীষণ গ্লানি নিয়ে যে এতদিন ওই লোকের সাথে একই ছাদের নিচে বাস করেছে, এটা শুধু রুমুই জানে! নিজের স্বকীয়তা হারাতে হারাতে কখন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে, বুঝতেই পারেনি। মানিয়ে নিতে নিতে ও বড্ড ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত! তবুও অপরপ্রান্তের মানুষটার মনটা ছুঁতে পারেনি ও, আদৌ কি ওই লোকের মধ্যে মন বলে কোনো বস্তু আছে? শুধুই মরীচিকার পিছু ধাওয়া করে গেছে, মনে হয়েছে ওইতো সুখ, আর কয়েক কদম সামনেই। কিন্তু সহস্র কদম এগিয়েও সেই সুখের দেখা পায়নি আর না ভালোবাসার! সবটা শুধুই প্রবঞ্চনাময়!

আজ একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে, অন্তত মিথ্যে আশায় বুক বাঁধতে হবে না। মরিচীকার ধোঁকায় আর পড়তে চায় না ও। নিজের ছেলেটাকে নিয়ে শুধুই সামনে এগুতে চায়। একসময় তুখোড় ছাত্রী ছিল, সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময়ই বিয়ে হয়ে যায় ওর। এতে অবশ্য ওরও দায় ছিল, প্রেমে অন্ধ হয়ে বিয়ে করে সংসারী হয়ে যায়। শাফায়াতের পরিবারের ইচ্ছায় তখন আর পড়াশোনা আগায়নি।

মা অবশ্য সেসময় অনেক বলেছিলেন,

"পড়াশোনা অন্তত শেষ কর। তোর মাথা ভালো। হুট করে ছাড়িস না। অন্তত অনার্সটা শেষ কর।"

কিন্তু সেসময় এসব কথা কানে তুলেনি। বছর খানেকের মধ্যেই চোখ থেকে ঠুলি সরে গেল, নিজের ভুলটা বুঝতে পারল হাড়েমজ্জায়। কিন্তু পড়া আর শুরু করা হলো না। বড় ছেলে নাঈম আসল কোল জুড়ে, নাঈম জন্মাবার বছর দেড়েকের মাথায়, তামিম চলে এলো। ততদিনে সংসারের জালে আরও জড়িয়ে গেল আষ্টেপৃষ্ঠে। নিজের জন্য ভাবার ফুরসৎ আর পেল কই!

***

নবনী কড়া করে এক কাপ চা বানিয়ে রায়ানের দরজায় কড়া নাড়ল। রায়ান গোসল করে এসে আবার গা এলিয়ে দিয়েছিল বিছানায়। শব্দ পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে একটা টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলতেই নবনীকে দেখে ভীষণ অবাক হলো!

"কী ব্যাপার! ভূত দেখছেন মনে হয়!" সহজ ভঙ্গিতে বলল নবনী।

"সত্যিই আপনি এসেছেন?"

"না, আমার ভূত এসেছে। এই নিন আপনার চা।"

চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,

"মুখ দেখে মনে হয় না দুপুরে খেয়েছেন। আপনি ঠিক আছেন তো?"

নবনী আসলে এসেছে সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে। রায়ানের মায়ের ব্যাপারে কৌতূহল হলেও, জিজ্ঞেস করে ব্যথা জাগিয়ে তুলতে চায় না। কোনো একসময় নাহয় রায়ান নিজে নিজেই বলবে। তবে যে ঠোকাঠুকি ও জেনে-বুঝে শুরু করেছিল, তার ইতি ঘটানোর প্রয়োজন বোধ করল দ্রুতই! কিন্তু সব কিছু তো আর ওর ছকে চলবে না। অপরপক্ষেরও সমান ইচ্ছে থাকতে হবে।

"বাহ্! কী সৌভাগ্য আমার! আপনি আমার জন্য চা নিয়ে এসেছেন নিজের হাতে! আবার আমার খোঁজ খবরও নিচ্ছেন। একসাথে এতগুলো সারপ্রাইজ নেয়াটা একটু টাফ হয়ে যাচ্ছে আমার পক্ষে!"

ক্যাটক্যাটিয়ে হেসে কথাগুলো বলল রায়ান।

"আবার কী নিয়ে কথা শোনাবেন বলুন তো? নতুন ইস্যুটা কী হবে একটু জানিয়ে দেবেন প্লিজ? আমিও একটু প্রিপেয়ার্ড হয়েই না-হয় মাঠে নামতাম। বারবার হেরে যেতে কারই বা ভালো লাগে বলুন তো?"

দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলল রায়ান।

ওর স্নায়ু ঠিকঠাক কাজ করছে না, নয়তো নবনীর গলার আন্তরিকতা আর বন্ধুত্বের আহবান ধরতে পারত। কিন্তু প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ ঘন্টার ঘুমহীনতা আর সারাদিনের ঘটনাপ্রবাহে ও পুরোপুরি বিপর্যস্ত। এতদিন থেকে জমানো ক্ষোভ একসাথে উগড়ে দিল।

আর নবনী রায়ানের এমন কথায় একেবারে হকচকিয়ে গেছে, এই ছেলে তো এমন না। ওর মনে হলো এখানে আসাই ভুল হয়েছে। এরকম ত্যাঁদড়ের সাথে যেমন আচরণ করে এসেছে, সেই ঠিকঠাক ছিল। যেচে পড়ে কেন যে আসতে গেল ভাবতেই রাগে ফুঁসে উঠছে ভেতরটা।

"আপনার চা টা নিন। এটা সারাদিন ধরে বইতে পারব না আমি। আপনি আমার বাসার গেস্ট, সারাদিন ছিলেন না। আমার রেসপনসিবলিটির মধ্যে পড়ে এটা। তাই এসেছিলাম। কী হলো ধরুন?"

অত্যন্ত চড়া গলায় কথাগুলো বলে রায়ানের হাত টেনে কাপটা ধরিয়ে দিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল।

রায়ানের নিজের উপরেই ভীষণ রাগ হলো, এসব বলার কোনো মানে হয়। এসব কিছুই আর ভালো লাগছে না ওর। সবকিছুই অসহ্য, অসহনীয় লাগছে! চায়ের কাপ টেবিলে রেখে শুয়ে পড়ল। ঘন্টাখানেক পরেই বুঝতে পারল গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে। চারপাশে সব ঝাপসা আর অস্পষ্ট লাগছে। মাথা চেপে আসছে দু'দিক থেকে!

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ৮