অবশেষে ভোর হলো, একটা মিষ্টি দিনের শুরু। চারপাশ পাখির কিচিরমিচির ধ্বনিতে মুখরিত। রায়ানের ঘুম ভেঙে গেল একটা হিম শীতল হাতের স্পর্শে, এই স্পর্শটা ভীষণ মায়া মায়া। জ্বরের ঘোর এখনও রয়ে গেছে বলে স্বপ্ন নাকি বাস্তব সেই দোলাচালে দুলতে থাকল মন! দ্বিধা থাকলেও খুব ভালো লাগছে, এমন মায়া মাখা স্পর্শ বহুদিন পায়নি ওর স্নেহ-ভালোবাসা কাতর বুভুক্ষু হৃদয়! চোখ খুললেই যদি এটা সুখ স্বপ্নের মতো হারিয়ে যায়! হাতটা সরে যেতেই ঘোর কাটল কিছুটা। আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকাল রায়ান। তাকাতেই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল! নবনী! যে মেয়ের কাছ থেকে কাঠিন্য ছাড়া অন্য কিছু পায়নি, সে ওর প্রতি এতটা সদয় হতে পারে এটা যেন বিস্ময়েরও অতীত!
"আপনার ঘুম ভেঙে গেছে দেখছি। জ্বর টাও কমেছে অনেক। বাবাকে জানিয়ে আসি ভীষণ টেনশনে ছিলেন।" রিনরিনে মিষ্টি গলায় বলল নবনী, মুখে মৃদু হাসি থাকলেও চোখে ক্লান্তির আভাস। তবুও কিছুটা স্বস্তি যেন ফুটে আছে অবয়বে!
"এখন কেমন লাগছে আপনার?"
"ভালো।" অস্ফুট স্বরে বলল রায়ান।
নবনী বেরিয়ে যেতেই রায়ানের ভীষণ মন খারাপ হলো। করুণা জিনিসটা ওর কেন যেন একেবারে সহ্য হয় না। বালতি, মগ আর টেবিলে ওষুধপত্র সেই করুণার স্বাক্ষী বহন করছে।
এসব এলেবেলে ভাবনায় যখন বুঁদ হয়ে আছে, তখনই আফজাল সাহেব আসলেন ওর কাছে। কপালে, গলায় হাত বুলিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন।
"বাবা, এখন কেমন লাগছে তোমার? আমি ভাবছিলাম হসপিটালে ভর্তি করাব কিনা! যাক, জ্বরটা কমেছে, আলহামদুলিল্লাহ।"
গলায় প্রগাঢ় স্নেহ হৃদয় স্পর্শ করল রায়ানের। নবনীকে ভীষণ হিংসে হলো, কী অসম্ভব ভালো পিতৃ ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে মেয়েটা! ওর ভাগ্যই কেবল কার্পণ্যে ভরা!
"আঙ্কেল, আপনি টেনশন করবেন না। আমি একদম ঠিক আছি। এক্কেবারে ফিট। এখন স্প্রিন্টে নামলে স্বয়ং উসাইন বোল্টকেও হারিয়ে দিতে পারব!" আফজাল সাহেবের চিন্তাক্লিষ্ট মুখ দেখেই হালকা রসিকতা করল রায়ান।
তিনিও হেসে ফেললেন, রায়ানের কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, সেইসাথে চুলেও বিলি কাটছেন। এই অকৃত্রিম স্নেহময় পরশে হৃদয়ের সাথে সাথে চোখেও আর্দ্র হয়ে এলো ওর। কী এক গভীর ভালোলাগা ছেয়ে গেল পুরো হৃদয়ে!
***
রুমুর জন্যও এক নতুন সকাল, সাধারণ সকালের থেকে এই সকাল অনেক বেশি সুন্দর। আজকের সকাল টায় ওর কোনো গ্লানি নেই! রাতের আঁধার কেটে গিয়ে যেমন ঝকঝকে সূর্যালোক পুরো পৃথিবীতে আলো ছড়িয়ে দেয়, তেমনি ওর জীবনের সকল কালো ছুড়ে ফেলে ভালোকে সাথে নিয়েই সামনে চলার প্রতিজ্ঞা করেছে ও।
মনে আছে রুমুর প্রথম বিবাহবার্ষিকীর দিনে সারাদিন শাফায়াতের পছন্দের খাবার রান্না করল মেয়েটা। শাশুড়ির বাঁকা দৃষ্টি ঠিকই বুঝতে পেরেছিল ও। সন্ধ্যা হতেই শাড়ি পরে সেজেগুজে অপেক্ষা করতে থাকল, সাজগুজ বলতে নিজেকে কিছুটা পরিপাটি করে নেয়া। বাইরে যাওয়া হবে না এটা ও জানে। তাই তেমন আশাও করেনি। ওর পছন্দের খাবার খাইয়ে খুশি করতে চেয়েছিল, ওর ভালোবাসার ছোট্ট একটা প্রয়াস। ছয়মাসের প্রেগন্যান্সি নিয়েও সব হাসিমুখেই করেছিল। বিনিময়ে পাল্টা একটু খানি ভালোবাসাই তো চেয়েছিল আর চেয়েছিল একটু মুগ্ধ দৃষ্টি! কিন্তু শাফায়াত সেদিন এসেছিল এগারোটা পেরিয়ে। অথচ প্রতিদিন আটটার মধ্যেই আসত তখন।
রুমু ভেতরে ভেতরে মন খারাপ করে থাকলেও মুখে কিছু বলেনি সেদিন। সবাই খেলেও ও অপেক্ষা করল শাফায়াত আসার। শাশুড়ি শেষমেশ বলেই বসলেন,
"এইসব বিয়ে বার্ষিকী, অমুক বার্ষিকী, তমুক বার্ষিকী, যত আদিখ্যেতা! আমরা তো আর সংসার করিনি! কই এমন ফালতু আদিখ্যেতা তো করিনি! আমি কিন্তু বলে দিলাম, এগুলা করতে গিয়ে বাচ্চার যদি কিছু হয়, তোমাকে কোনোদিনও মাফ করব না!" কর্কশ গলায় বললেও ওর খারাপ লাগেনি, ভেবেছিল স্নেহ করেন বলেই এসব বলছেন। কোনো প্রতি উত্তর দেয়নি ও, কখনোই দেয় না।
শাফায়াত বাইরে থেকে এসে ফ্রেশ হতে হতেই রুমু টেবিলে খাবারগুলো সাজিয়ে ডেকেছিল ওকে।
নির্বিকার মুখে খাবার মুখে পুরছিল শাফায়ত, রুমুর গলা দিয়ে খাবার নামছে না, অভিমান হয়েছিল খুব।
"খাবার কেমন হয়েছে বললে না তো? সব খাবার আমি রান্না করেছি।" শেষ একটা আশা নিয়ে জিজ্ঞেস করল রুমু।
"কেমন আবার হবে? তুমি তো নতুন নতুন রান্না করছ না যে প্রত্যেকদিন আলাদা আলাদা কমপ্লিমেন্ট দিতে হবে!" তিক্ত গলায় শাফায়াতের উত্তর।
"প্রত্যেকদিন আর আজ কি এক?"
"আলাদা আবার..."
বলতে বলতে মনে পড়েছিল আজ ওদের বিবাহবার্ষিকী ছিল।
"শোন রুমু, তোমাকে একটা কথা বলি, আমি কত ব্যস্ত থাকি তুমি তা জানো না। সারাদিন ঘরে বসে বসে গেলা ছাড়া আর তো কোনো কাজ নাই তোমার। মস্তিষ্কটা একটু উর্বর কর। সারাদিন পরে বাসায় এসে এইসব আজাইরা ফ্যাচফ্যাচ ভাল্লাগে না।"
অপমানে রুমুর চোখে জল চলে এসেছিল। পড়াশোনা তো ও করতেই চেয়েছিল, শাফায়াত আর ওর মা'ই তো বাঁধা দিলেন। এধরণের নিম্নস্তরের কথা যে কোনোদিন শাফায়াতের মুখে শুনতে হবে, এটা ওর দুঃস্বপ্নেও ছিল না। খাবার না খেয়েই উঠে চলে এসেছিল সেদিন। একটু হাসিমুখ দেখতে চেয়েছিল শুধু, এই ছোট্ট চাওয়ার পাল্লাটা কি খুব বেশিই ভারী হয়ে গিয়েছিল?
অথচ বিয়ের আগে কত কী না বলতো, কত-শত স্বপ্ন! বিয়ের আগে বলেছিল, "আরে দিন ধরে ধরে ওসব একদিনের সেলিব্রেশনের কী দরকার, প্রত্যেকদিনই একটা স্পেশাল দিন হবে, ভালোবাসা ময় দিন হবে! অন্য কিছুর কমতি হলেও আমাদের ভালোবাসার কোনো কমতি হবে না! তুমি দেখে নিও।"
স্বপ্নভঙ্গের সেই শুরু হয়েছিল, এটা তো খুব সাধারণ ঘটনা। এরপর এমন আরও কত সহস্রবার যে ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গুড়িয়ে গেছে তার স্বাক্ষী শুধু আর শুধুমাত্র রুমু।
চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল মুছে নিল নতুন শুরুর প্রত্যয়ে। জানে প্রচণ্ড কঠিন হবে, তবুও হাল ছাড়বে না।
***
নবনী দুপুরের রান্নার আয়োজন করছিল, ভাতের চাল ধুয়ে নিচ্ছিল আর চামেলি মাছ কাটছে তখন।
"আফা, একটা কতা কবার চাইতাছিলাম, আফনে যদি রাইগ্যা যান তাই কইতে ডরাইতাছি.."
"কী বলবি বল, এসব ভণিতা রাখ।"
"হায় আল্লাহ! এইগুলা কী কন আফা! আমি ভাণ ভণিতা কিচ্ছু বুজি নাহি।" গলায় বিস্ময় ঝরল চামেলির।
নবনী ভীষণ বিরক্ত হলো, এত নাটকীয়তা করতে পারে মেয়েটা, মাঝে মাঝে পিত্তি জ্বলে যায়!
ভাতের পাতিল চুলায় দিয়ে বলল,
"বলবি তো সরাসরি বল আর না বললে বলিস না। তোর একটা কথার আগে এমন হাজারটা আজেবাজে কথা থাকে যে আসল কথাটাই হারিয়ে যায়।"
নবনীর ধমকে চামেলির আরও কিছু অদ্ভুত কথা মনে এলেও বলে না, তবে আসল কথাটা আজ বলেই ফেলবে। কাচুমাচু মুখে বলা শুরু করে,
"খালু আফনেরে নিয়ে ম্যালা চিন্তা করে। এইবার আল্লাহর নাম নিয়া বিয়াডা কইরা ফালান, আফা।" বিশাল এক রাম ধমক খাবার প্রস্তুতি নিয়েই কথাটা বলেছে ও। কিন্তু ধমক তখনও আসল না, তবে কড়া গলার প্রশ্ন আসল,
"বাবা বলেছে এসব?"
"তওবা, তওবা, খালু কিছু কয় নাই আমারে। হের মুখ মাজে মইদ্যে ভার ভার থাহে। এমনেই বুজন যায়। সব কতা খুইলা না কইলেও চলে।"
উৎকণ্ঠিত গলায় চামেলি উত্তর দেয়।
চামেলি আফজাল সাহেবকে 'খালু' বলেই সম্বোধন করে, কয়েকবার বলেও নিরস্ত করা যায়নি।
"তোর কী মনে হয়, বিয়ে ভালো জিনিস না খারাপ?"
এই প্রথম নবনীকে বিয়ের কথা বলতেও রাগে ফুঁসে উঠল না, খুব নরম গলায় পাল্টা প্রশ্ন করল।
"খারাপ হইতে যাইব কী জইন্যে। ভালাই তো।"
"আচ্ছা, তোর বিয়ে নিয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। তারপরও ভালো বলছিস কীভাবে?"
চামেলির চেহারার চিরাচরিত উচ্ছ্বাস ম্লান হলো কিছুটা। তবে তা ক্ষণেকের জন্য। ম্লান হেসে বলল,
"কী যে কন আফা! আমার সংসার হয় নাই বইল্যা কী দুনিয়ার সক্কল পুরুষ মাইনসে খারাপ হইব? তাইলে এত মাইনসে সুখ-দুখ্যে সংসার করবার পাইত? ভালা আর কালা দুই মিল্যাই তো দুনিয়াগো, আফা।"
নবনী মুহূর্তকাল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল চামেলির দিকে। প্রায় নির্বোধ আর অসম্ভব বোকা-সোকা ধরনের মেয়েটার কী সহজ অথচ গভীর জীবনবোধ। পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের কাছেই কত কী-ই না শেখার আছে, জানার আছে! একজীবন কেটে যায় শিখতে শিখতে, জানতে জানতে! তবুও কত কী অজানা, অচেনা থেকে যায়, থেকে যায় দৃষ্টির অগোচরেই!
রায়ান সকালে খেয়ে টেয়ে শুয়ে আছে। জ্বর নেমে গেলেও মাথা ব্যাথাটা এখনো আছে। চামেলির কাছে শুনেছে সারারাত বাবা আর মেয়ে মিলে ওর পাশে থেকেছে। অদ্ভুত স্নেহ প্রবণ লোকটা আর কাঠিন্যের খোলসে তীব্র মায়ায় পুরো হৃদয় পূর্ণ করে রাখা মেয়েটার কাছে ভীষণ বড়ো একটা ঋণ থেকে গেল! স্নেহের ঋণ, ভালোবাসার ঋণ আর...
বাকিটা জানে না রায়ান।
আশরাফ সাহেব এরমধ্যে অগুণতিবার কল করে গেছেন, রায়ান ধরেনি। এখনও অনবরত বেজে যাচ্ছে ফোনটা। তাই বাধ্য হয়ে ধরল,
"রায়ান, বাবা। তোর শরীর ঠিক আছে তো এখন?"
"আমি ভালো আছি। শোনা তো হয়েই গেছে আপনার। এবার রাখছি..."
"রাখিস না। একটা মিনিট একটু কথা বলি, প্লিজ!"
উনার আকুলতা দেখে সহসা ফোন কাটতে পারল না।
"বলুন।"
"শরীরের ঠিকঠাক যত্ন নিস। এবার একটু নিজের দিকে তাকা! এভাবে..."
"আমার কথা ভেবে সময় নষ্ট করবেন না। আপনার স্ত্রী আর সন্তানদের নিয়ে ভাবুন না-হয়।" বলেই খট করে কলটা কেটে দিল।
ওর সুন্দরভাবে শুরু হওয়া সকালটা নিমিষেই বিষিয়ে গেল।
আর আশরাফ সাহেব এই ভেবে আস্বস্ত হলেন, ছেলেটা তাঁর সাথে কথা বলেছে, সে রেগেই হোক আর যাই হোক! কথাটা তো হলো! ভীষণ উৎকণ্ঠায় কেটেছে পুরো রাত। বন্ধুর সাথে কথা বলে কিছুটা চিন্তা কমলেও, ছেলের সাথে কথা না বলে একফোঁটাও স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। ছেলেটাকে যদি সবটা খুলে বলে ফেলতে পারতেন, তবে হয়তো এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটতো! কিন্তু সে তো সম্ভব নয়, কোনোভাবেই সম্ভব নয়! একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক নিংড়ে! হাহাকার করে উঠল সমস্ত হৃদয়। একজীবনে এতো দায় কেন তাঁর?