নবনীর লাইব্রেরী হাতড়ে 'জেমস রোলিন্স' এর 'আমাজনিয়া' বইটা বেছে নিল রায়ান। কিন্তু এমন নেইল বাইটিং থ্রিলারও ওর মনে সেঁটে উঠতে পারল না, একফোঁটাও না! তখন নবনী ওইভাবে বেরিয়ে যাবার পর থেকেই কেমন এক অসহ্য অস্থিরতা গ্রাস করে রেখেছে রায়ানকে! নিজের মনের এই অদ্ভুত আচরণের কোনো কারণ খুঁজে পেল না ও। শেষমেশ বইটা বন্ধ করে ছাদে উঠে এলো, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কিছুটা স্বস্তি পেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন! খোলা প্রান্তরে বুক পাঁজরের বাক্সবন্দী কষ্টেরা যেন নড়েচড়ে বসার প্রয়াস পেল! ওজন হীন কষ্টেরা কী করে জগদ্দল পাথর সম ভার চাপিয়ে দেয় বুঝতে পারে না রায়ান! আকাশে খুব বেশি তারা নেই, কিছু বিক্ষিপ্তভাবে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তবে জোৎস্নার আলো তার মিষ্টি আভা ছড়াচ্ছে স্বমহিমায়! সাথে মৃদুমন্দ বাতাস! কী অদ্ভুত সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে, জোছনার বৃষ্টি!
নবনী দরজা খুলল রাতের খাবারের ঠিক আগে আগে। ভাবলেশহীন অবয়ব, শুধু চোখ কিছুটা লালচে হয়ে ফুলে আছে। এছাড়া সন্ধ্যার ঘটনার আর কোনো চিহ্ন নেই। চামেলি কিছুটা আশ্চর্য হলেও আফজাল সাহেব একেবারেই অবাক হলেন না। মেয়েকে খুব ভালো করে চেনেন বলেই হয়তো! মেয়েটা যে কতটা শক্ত মনের এটা তাঁর থেকে ভালো করে আর কে জানে? তাই কী হয়েছে জানতে ছুটে যাননি, কিছুক্ষণ একা থাকার সুযোগ দিয়েছেন। মানুষের মন মাঝে মাঝেই একাকিত্বের আড়াল খুঁজে, নিজের মনকে টেনে বের করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করে নিতে ইচ্ছে হয়। সেই জায়গাটা মানুষকে দিতে হয়, তাতে কেবল ব্যর্থ হলে তবেই না প্রয়োজন হয় আপনজনের সঙ্গ! ভেতরে ভেতরে বিচলিত হলেও তাই পিছু ছুটেননি মেয়ের।
চামেলির হতচকিত ভাব দেখে ফোঁড়ন কাটে নবনী,
"এভাবে তাকিয়ে কী দেখিস? আমি মানুষই আছি, কোনো ভূত-প্রেত বা অতি মানবী নই!"
চামেলির কপালের ভাঁজ সরল এতক্ষণে,
"কী যে কন গো আফা! আফনে ভূত পেরেত হইতে যাবেন কীসের জইন্যে? তহন ইটটু চিন্তা হইছিল এই!"
"আমাকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আমি খাবার রেডি করছি, তুই তোর প্রিয় ভাইজানের খোঁজ নিয়ে আয়।"
"ভাইজান একটু আগে ছাদ থাইকা নামল। কইল আইজকা এইহানেই খাইব, বেক্কের সাথেই, রুমে দেওনের দরকার নাই।"
"আচ্ছা, তো ডাক উনাকে।"
চামেলি যেতেই বাবার কৌতূহলী চোখে চোখ পড়ল, এতে কিছুটা থমকে গেল নবনী! সামলে নিল মূহুর্তেই, ক্ষীণ হেসে বলল,
"বাবা, তোমাকেও দেখছি চামেলির ভূতে পেয়েছে। আমি ঠিক আছি।"
বাবা হাসি ফেরত দিয়ে বললেন,
"তবুও চিন্তা হয় রে, মা। ভীষণ চিন্তা হয়। একাকিত্ব যে কতটা ভারী, এটা যদি একটু বুঝতি!" শেষের দিকে আক্ষেপ ঝরে পড়ল গলায়।
নিতান্ত অনিচ্ছায় ফুটিয়ে রাখা হাসিটা ম্লান হয় মুহূর্তেই, মুখে কথা যোগাল না, মনে মনে কেবল আওড়ে গেল,
"ও-ই ভারী একাকিত্বের বোঝা তোমার উপরে কিছুতেই চাপাতে পারব না। আমাকে তার ভারমুক্ত করতে গিয়ে নিজে কেন সেই ভার বহন করতে চাও, বাবা?"
চোখে জমা পানিটা ঠিকঠাক গড়িয়ে পড়ার আগেই হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘরের দিকে ছুট লাগাল নবনী।
বাবা ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলেন আকুল নয়নে, মেয়েটার বৈরাগ্য ঘোচাতে পারলেই যে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রশান্তি পাবেন, এটা ও বুঝে কই! মনে মনে প্রার্থনা করলেন,
"পৃথিবীর সকল সুখ তোর উপর বর্ষিত হোক। সুখের বৃষ্টি হোক তোর উপরে, সেই সুখে ভেসে যা, ডুবে থাক! পরমায়ু নিয়ে হাসিমুখে বেঁচে থাক স্বামী সন্তান পাশে নিয়ে!"
***
তামিমকে খাইয়ে দিয়ে ঘুম পারিয়ে দিচ্ছিল রুমু, তখনই ঝুমু এসে বিছানার একপাশে বসল গুটিসুটি মেরে। তামিম যখন ঘুমিয়ে গেছে প্রায় তখনই ধীর স্বরে বলল,
"আপা, আমি আজ তোর সাথে ঘুমাই? কতদিন একসাথে ঘুমাই না!"
রুমু বোনের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো, এত সুন্দর কেন মেয়েটা? অথচ ভাগ্য যেন সকল অসুন্দর এই অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটার জন্য তুলে রেখেছে! বোনের জন্য আফসোসে পুড়ল ভেতরটা!
"আমার সাথে ঘুমাবি? আগে তো তুই একা একাই ঘুমাতে চাইতি সবসময়! মনে আছে, কী ঝগড়াই না করতি আমার সাথে?" কিছুটা বিস্মিত গলা রুমুর।
ম্লান হাসলো ঝুমু, কিন্তু ওর চোখে খেলা করা অদ্ভুত বিষাদ ঠিকই চোখে পড়ে,
"একা একাই তো থাকি সারাক্ষণ। এখন মনে হয় আবার ওই সময়টা যদি কখনো ফিরে পেতাম! ফিরে পেলে কী করতাম জানিস?"
প্রশ্ন করে উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই বলতে শুরু করল,
"প্রত্যেকদিন তোর সাথে ঘুমাতাম, তুই আগে যেমন মাথায় বিলি কেটে দিতি আর আমি ঘুমিয়ে যেতাম, সবকিছু সেভাবেই হতো, কত ভালো হতো বল? সারারাত গল্প করে কাটাতাম। সব হাসি কান্নার গল্পগুলো তোর সাথে শেয়ার করতাম!" উচ্ছ্বাস নিয়ে শুরু করলেও শেষের দিকে গলাটা অসম্ভব কেঁপে কেঁপে উঠছিল ঝুমুর।
নিজেকে সামলে নেবার জন্য ক্ষণকাল বিরতি নিয়ে আবার বলল,
"ভুলগুলো সব ইরেজার দিয়ে ঘষেমেজে মুছে ফেলে জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করা যায় না কেন, আপা?"
হুহু করে কেঁদে ফেলল ঝুমু, ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে ওকে পরম মমতায় জড়িয়ে নিল রুমু। কান্নার শব্দে তামিম নড়েচড়ে উঠল, কিন্তু সেদিকে ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কেঁদেই চলেছে, বহুদিন পরে একটা কাঁধ পেয়ে তা জড়িয়ে নিংড়ে দিচ্ছে ভেতরের গ্লানিটুকু! বহুদিন কেউ ঝুমুর সাথে ভালো করে কথাই বলে না।
"আমার সাথে আজ গল্প করবি আপা? সারারাত?" কী যে কাতরতা মেশানো এই কথায়! রুমুর ভেতরটা কেঁপে উঠল, হুহু করে উঠল!
"তোর মনে আছে ঝুমু আগে বৃহস্পতিবার রাতে কেমন করে রাত জেগে দুজন গল্প করতাম, পরেরদিন স্কুল ছিল না বলে?" মাথায় হাত বুলাতে বুলাতেই বলল রুমু।
ঝুমুর কান্নার দমকটা কমল এবার কিছুটা,
"মনে নেই আবার! মা পাশের ঘর থেকে একটু পরপর সে কী ধমকে দিত! সেই ধমকে খানিকক্ষণ থম মেরে আবারও খোলা হতো মনের ঝুড়ি!" স্বপ্নালু চোখে, আচ্ছন্ন গলায় বলল ঝুমু।
"তুই এখনো আমাকে ঘেন্না করিস, তাই না আপা?"
সহসাই মাথা তুলে সসংকোচে প্রশ্নটা করে বসল ঝুমু।
রুমু সরাসরি ঝুমুর চোখের দিকে তাকাল, ওর কাজের জন্য একসময় ভীষণ রেগে গিয়েছিল ওর উপর, কথাও বলেনি অনেকদিন। তবে ঘৃণা কোনোদিন করতে পারেনি। নিজের রক্তকে কী ঘৃণা করা যায় না ছুড়ে ফেলা যায়? ঘুরেফিরে তো একই শিকড়ের শাখা-প্রশাখা ওরা!
***
নির্বিকার মুখে খাবার পরিবেশন করল নবনী। রায়ানের কিছুটা যেন আক্ষেপ কাজ করছে! তখন একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।
খেতে খেতেই নিজের উদ্দেশ্যটা আফজাল সাহেবের কাছে পেশ করল,
"আঙ্কেল, আমি কিছুদিনের ঢাকার বাইরে যেতে চাইছিলাম!"
ভাতের প্লেটে নবনীর হাত থমকে গেল সহসা, আফজাল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
"হঠাৎ?"
"হঠাৎ নয়, আঙ্কেল। এমনিতেই দেরী হয়ে গেছে কিছুটা। আমি বাংলাদেশের সব সুন্দর জায়গা ফ্রেমে ধরতে চাই। একেবারে হয়তো সব পারব না, দু'একটা জায়গা ঘুরে আবার আসব এখানে। কিছুদিন রেস্ট টেস্ট নিয়ে পরে আবারও বেরিয়ে পরব অন্য কোনো প্রান্তে।" একদমে কথাগুলো বলল রায়ান।
"আচ্ছা, নিশ্চয়ই যাবে। কিন্তু বাবা, তোমার শরীর তো এখন পুরোপুরি ঠিক নেই, আগে হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফিট হও, তারপর নাহয় আমি নিজে সব ব্যবস্থা করে দেব।"
"আমি ঠিক...
" আমি যা বলেছি তাই হবে। আমি কিছু শুনছি না। এটাই ফাইনাল।" অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন আফজাল সাহেব।
রায়ান খানিকটা অবাক হয়েছে, কারণ মানুষটাকে সবসময় হাসিখুশি অবতারেই দেখেছে। আজ প্রথমবার এমন কঠিন হতে দেখল। তবে আফজাল সাহেবের স্নেহ মাখা শাসন ওর ভীষণ ভালো লাগলো। বাবারা বুঝি এমনই হয়! কোমলে কঠিনে মেশানো ভালোবাসাময় একজন মানুষ! ওর জন্য তো এসব অধরাই ছিল, এখন যখন পাচ্ছে তা পায়ে মাড়িয়ে যাবার মতো বোকামি কিছুতেই করবে না রায়ান, সাধ্যই যে নেই ওর!
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই নবনী ওর প্লেটে মাছ ভাজা তুলে দিল। রায়ান তাকাতেই হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
"এটাকে আতিথেয়তা বলে। সহানুভূতি কিংবা করুণা ভেবে ভুল করে বসবেন না যেন!"
রায়ান সহসা কোনো উত্তর খুঁজে পেল না, তাই চুপচাপ খেতে থাকে।
এই মেয়েটা ওর কাছে আগাগোড়াই এক দুর্বোধ্য চরিত্র। একটা রঙ বুঝতে না বুঝতেই আচমকা রঙটা বদলে ফেলে।
ঘড়ি জানান দিচ্ছে রাত এগারোটা বেজে আটচল্লিশ, রায়ান শোবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু কিছুটা গুনগুনানি কানে আসতেই রুম থেকে বের হলো, রান্নাঘরের লাইট জ্বলছে। ও জানে এখন নবনীই থাকবে সেখানে। ওর সাথে কিছু কথা বলা দরকার। সন্ধ্যায় কঠিন কথাগুলো বলার পর থেকে মেয়েটা আর একবারও ওর খোঁজ নেয়নি।
একবার 'স্যরি' বলা উচিত কিনা বুঝে উঠতে পারছে না! তবুও প্রচণ্ড দ্বিধা নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। নবনী চুলা জ্বালিয়ে কেতলি চাপিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর আপনমনে কোনো একটা গানের সুর ভাজছে। সুরটা পরিচিত লাগলেও ধরতে পারছে না পুরোপুরি!
সহসা ঘুরে তাকায় নবনী, আর রায়ানকে দেখে কিছুটা হকচকিয়ে যায়।
"আপনি এখন এখানে? কিছু লাগবে?"
রায়ান এমন আচমকা প্রশ্নের উত্তরে কী বলবে তার খেই ধরতে পারল না, ইতস্ততভাবে বলল,
"আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে। আপনার সময় হবে শোনার?"
"আপনি চা খাবেন?"
অপ্রাসঙ্গিকতায় আবারও বিমূঢ় হয়ে গেল ও, "আমি বলছিলাম আপনার সময়..."
"আপনার মাথায় কী শুধু গোবর পুরা আছে? সহজ কথা বুঝতে পারেন না কেন?" সরাসরি রায়ানের চোখে চোখ রেখে কথাটা বলল নবনী।
আবারও নিজের পুরনো ফর্মে ফিরে গেছে মেয়েটা। রায়ান রীতিমতো অপমানিত বোধ করল,
"দেখুন, আপনি বারবার আপনার লিমিট ক্রস করে যাচ্ছেন। কাউকে এভাবে বলতে পারেন না আপনি!"
রায়ানের রাগের থোড়াই কেয়ার করে নবনী,
"আমি চা নেব তাই আপনাকে চা অফার করলাম, কারণ দুজন কথা বললে একা একা খাওয়াটা শোভনীয় নয়। এই সিম্পল জিনিসটা..."
বাকিটা আর বলল না। রায়ান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে, এটা সত্যিই বোকামোর মধ্যে পড়ে কিনা ভেবে পেল না! এতে আরও অসহায়বোধ করল।
নবনী ওর দৃষ্টি কয়েকগুণ তীক্ষ্ণ করে রায়ানের দিকে তাকাল,
"আপনি তো ভালো রকমের ক্যাবলা কান্ত আছেন! সবাই বলে সুন্দরী মেয়েদের বুদ্ধি নাকি হাঁটুর নিচে থাকে। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, সুন্দর ছেলেদের বুদ্ধিও হাঁটুর নিচেই থাকে! আচ্ছা, এটা নিয়ে কেউ কিছু বলে না কেন জানেন কিছু?"
রায়ানের এবার নিজেকে সত্যি সত্যিই 'ক্যাবলা কান্ত' বলেই মনে হচ্ছে, নয়তো সেধে সেধে এই চূড়ান্ত অসভ্য, ফাজিল মেয়ের সাথে কেউ কথা বলতে আসে!