তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ১৬

🟢

রায়ান প্রায় সারাদিন অপেক্ষা করল, কিন্তু নবনীর দেখা পেল না। রাতে খাবার পরেও আর বের হলো না নিজের রুম থেকে। রায়ান মনে মনে কিছুটা অস্থিরতা অনুভব করল। মেয়েট কি বেশীই অভিমান করেছে? শেষে নবনীর দেখা না পেয়ে নিজের তোলা ছবি নিয়ে বসল, অনেক কাজ জমে আছে। কিন্তু কাজেও মনোযোগ দিতে পারল না। সিদ্ধান্ত নিল নবনীকে সব খুলে বলবে, ওর দুঃখ, ব্যথা মেলে ধরার মতো একজন বন্ধু দরকার। সেইসাথে নবনী হয়তো বুঝতে পারবে কেন ওর অ্যাটেনশনকে করুণা বলেছিল! নবনী কি শুনতে চাইবে সব? দ্বিধা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল রাতে।

নবনী সেদিনও সারারাত ঘুমাতে পারল না। নিজের মধ্যে ডুবে যেতে চাইলেও ওর চরম অবাধ্য মন বারবার চলে গেল লাইব্রেরীর পাশের ঘরটায় থাকা মানুষটার কাছে। হৃদয়টা খুলে ছুড়ে ফেলে দিতে পারলে কিছুটা শান্তি হতো ওর। কেন ওরই বিরোধিতায় লেগে গেল মনটা? কান্না পেয়ে গেল সহসা, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, একসময় ক্লান্ত হয়ে ফোঁপানো বন্ধ হলো ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গুমরে গেল সারারাত। ভেতরে জমা এক সমুদ্র আবেগের জলে কতবার যে ডুবল!

পরেরদিন রায়ান বাসায়ই থাকল, দুপুরে রান্না করার সময় যে করেই হোক ওকে ধরতেই হবে। সফল হলো অবশেষে। রায়ান যখন রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়াল, নবনী তখন কড়াইয়ের তেলে সবজি ঢেলে দিল। এক মনে নাড়াচাড়া করতে লাগল। অনেকক্ষণ ধরে আগুনের পাশে আছে বলে কপালের কাছে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। পৃথিবীর সব মায়া যেন মিশে আছে মুখটায়। ভীষণ অন্যরকম লাগছে, কাঠিন্যের ছিঁটেফোঁটাও নেই সেখানে, বরং একরাশ মমতা মাখা আছে যেন! কেমন বউ বউ লাগছে দেখতে। রায়ানের সহসা মনে হলো এই মেয়েকে যে বিয়ে করবে, সে ভীষণ ভাগ্যবান হবে। বউ এতো ভালোবেসে সেই লোকের জন্য খাবার বানালে, এমন হাজারটা ঝাড়িও ভালোবেসে সহ্য করতে নিতে পারবে ওর স্বামী বেচারা। আনমনেই একটা সরু হাসি ফুটল রায়ানের অবয়বে।

"কী ব্যাপার? আপনি এখানে কী করছেন?"

আচমকা নবনীর গলা পেয়ে সচকিত হলো রায়ান।

আবারও অপ্রস্তুত ভাবটা ফিরে এলো ওর মধ্যে, মেয়েটা এতো কঠিন কেন?

"আসলে আপনার সাথে কিছু কথা ছিল আমার, না বললেই নয়।"

নবনী কঠিন চোখে তাকাতেই রায়ান তড়িঘড়ি করে বলল,

"আসলেই ইমারজেন্সি। যদি সময় দিতেন..."

নবনী নির্বিকার মুখে আবার তাকাতেই একেবারে গোবেচারা মুখ করে রায়ান বলল,

"প্লিজ..."

নবনী সবজি নাড়তে থাকল, ভাবলেশহীন অবয়ব,

"আপনি কি আমাকে ভয় পান?"

এই মেয়েটা সবসময়ই এমন গা জ্বালানো কথা বলে, চাইলেও মেজাজ ঠিক রাখা যায় না! তবে এবার রায়ান নিজেকে সামলে নিল,

"ভয় কেন পাব? আপনি তো রক্তমাংসের মানুষই। বাঘ, সিংহ বা পেত্নী তো নন!"

"পেত্নী নই বলেই বেঁচে গেলেন, নয়তো সবার আগে আপনার ঘাড়টা মটকে দিতাম।"

হেসে হেসেই বলল নবনী।

অপ্রতিভ রায়ানের হাতটা সহসা নিজের ঘাড়ে চলে গেল, করুণ মুখে বলল,

"সব কথার এমন ত্যাড়াব্যাঁকা। উত্তর দেন কেন?"

"কারণ আমি মানুষটাই ত্যাড়া ব্যাকা! সামনে কোন সোজা জিনিস দেখলে সহ্য হয় না। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে সোজা জিনিসটা বাঁকা করতে হাত নিশপিশ করে!"

রায়ানের উত্তর না পেয়ে সেদিকে তাকিয়ে ওর অসহায় মুখ দেখে সশব্দে হেসে উঠল নবনী।

রায়ানের হঠাৎ কী হলো কে জানে, সেই হাসিতে ডুবে গেল, বুঁদ হয়ে গেল!

হাসতে হাসতে সেই ঘোরলাগা দৃষ্টিতে চোখ পড়তেই সহসা থমকে গেল নবনী, হাসি হারিয়ে গেল, মুখে ফিরে এলো চির চেনা কাঠিন্য।

"কী যেন বলবেন বলছিলেন?"

রায়ান ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো, অস্বস্তি বেড়ে কয়েকগুণ হলো।

"এখন বলা যাবে না, সময় নিয়ে বলতে হবে। রাতে সময় হবে আপনার?"

"রাতে কেন?" কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল নবনী।

"কারণ আমি আপনাকে যে কথাগুলো বলব, আমি চাই না আমার সেইসময়কার অভিব্যক্তি আপনি দেখুন।"

"মানে কী?"

"আপনি সময় দিতে পারবেন কিনা বলুন, আমি আমার জীবনের অন্ধকার সময়টা আপনাকে বলতে চাই।"

নবনী আর কথা বাড়ায় না, কারণ ও জানে রায়ান ওকে ঠিক কী বলতে চায়। কারও দূর্বলতা নিয়ে মজা করতে জানে না নবনী।

"আচ্ছা, খাবার পরে ছাদে চলে যাবেন, আমি সেখানেই অপেক্ষা করব।"

রায়ান আর কথা না বাড়িয়ে নিজের রুমে চলে এলো, ওর এই বিষন্ন মুখটা এখন নবনীকে দেখাতে ইচ্ছে করছে না। অপেক্ষা করতে লাগল রাতের, নিজের মনের আগল যে খোলা হবে তখনই।

***

ঝুমু মাকে জড়িয়ে ধরে সকাল থেকে কাঁদছে, মা'য়ের চোখও মাঝে মাঝে আর্দ্র হচ্ছে, আচল দিয়ে সেই বাষ্প মুছে ফেলছেন একটু পরপর। এই মেয়েটা তাঁদের বড়ো আদরের ছিল, অনেক ঝড়ঝাপটা সহ্য করে জন্মেছিল বলেই কিনা জানেন না সাফিয়া।

টানাটানির সংসারে চতুর্থবারের মতো মা হতে যাচ্ছেন, মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে মনসুর আলীর তখন একটা কী এলিগেশনে সাময়িক সাসপেনশনে আছেন। চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন স্বামী স্ত্রী। সাফিয়া বেগমের শাশুড়ি তখন জীবিত ছিলেন। খবর পেয়ে ছেলে আর ছেলের বউকে ডাকলেন, সাফিয়া বেগমের হাত ধরে তিনি বললেন,

"বউমা, আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। বাচ্চাডা তুমি রাখ। অভাব তো আর সারাজীবন থাকব না, তহন পস্তাইবা।"

আরও কিছু কথা বলেছিলেন এতদিন পরে সবটা মনে নেই। তবে এটা স্পষ্ট মনে আছে, নিজের হাতের বালা খুলে তুলে দিয়ে বলেছিলেন,

"এই বালা জুড়া বেচার ব্যবস্থা কর। দরকারের সময় যদি এগুলা কোনো কামেই না আসে, তাইলে এইগুলা দিয়া কাম কী! দিন রাইত আল্লার কাছে দোয়া করি মনসুরটার চাকরি ঠিক হউক। তুমি মনে আফসোস রাইখ না মা। আমি খাস দিলে দিছি তোমারে।"

শাশুড়ির এই মমতায় চোখে পানি এসে পড়েছিল সাফিয়ার। শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদেছিলেন সেদিন।

সাফিয়া বেগম খুব যত্নে সেই মমতা আগলে রেখেছেন। বাবার দেয়া অল্প কিছু গয়না থেকে সেদিন কিছু বিক্রি করেছিলেন। পথটা তো দেখিয়ে দিয়েছিলেন শাশুড়ি। এরপর আরও অনেক টানাটানি গেছে, নিজের অন্যসব গয়নাও গেছে তাতে, কিন্তু সেই বালা জোড়া এখনও আছে সযত্নে। এগুলো তাঁর কাছে আশীর্বাদ।

ঝুমু আসার দুমাস আগে শাশুড়ি মারা যান৷ মেয়েটার চোখেমুখে পুরো দাদীর আদল বসানো, টকটকে গায়ের রঙ, পটলচেরা চোখ। ঝুমু হবার ঠিক দু'দিনের মাথায় মনসুর আলীর অফিস থেকে জানানো হয় দ্রুত যোগ দিতে। আবারও সুদিন ফিরে এসেছিল তখন।

জন্মের আটমাসের মাথায় ভীষণ জ্বরে পরে ঝুমু। টাইফয়েড। কিছুদিন প্রায় ছোটোখাটো যুদ্ধের পরে সুস্থ হয় মেয়েটা, সবার মুখেই হাসি ফুটে।

মেয়েটা ভুল করেছে, তার যথেষ্ট শিক্ষাও পেয়েছে, এই ভেবে মন থেকে মাফ করে দিলেন সাফিয়া বেগম। অনেক তো হলো। এবার একটা গতি করে দিতে পারলে মরলেও শান্তি পাবেন।

কিন্তু সেই ঘটনা জানাজানি হওয়ায় বিয়ে আসা বন্ধ হয়ে গেল, যে অল্প কিছু প্রস্তাব আসে শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসে। পড়াশোনাও আর করেনি ঝুমু। কোনোরকমে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় অ্যাটেন্ড করেছিল, পাসও করেছিল। কিন্তু মানুষকে এড়িয়ে মুখ লুকাতে ইচ্ছে হতো বলে আর পড়াশোনা করেনি।

দুই মেয়েকে থিতু করে তবেই নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান, এর আগে নয়। এটাই এখন তাঁর প্রার্থনা।

***

খাবার পরে ছাদে চলে এলো রায়ান, ঠান্ডা বাতাস গায়ে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। এই মৃদুমন্দ বাতাস ভালোই লাগছে ওর। অন্ধকারের খোঁজে এসেছিল, কিন্তু আকাশে এক ফালি উজ্জ্বল চাঁদ। আলোয় আলোয় উদ্ভাসিত চারপাশ।

"আপনি আগেই চলে এসেছেন দেখছি!"

নবনীর কথায় পেছনে ফিরল ও। শাল গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে মেয়েটা, হাতের ট্রে-তে দুটো ধোঁয়া উঠা মগ। কফির ঘ্রাণ আসছে সেখান থেকে।

"রুমে বসে বিরক্তি চলে আসল, তাই মুক্ত বাতাসে চলে এলাম আগেভাগেই।"

মৃদু হেসে বলল রায়ান।

কিছুটা দূরত্ব রেখে পাশাপাশি বসল ওরা। নবনীই মুখ খুলল প্রথম,

"জোৎস্না ভালো লাগে আপনার?"

"কার না লাগে বলুন? কেন আপনার ভালো লাগে না?" পাল্টা প্রশ্ন রায়ানের।

"খুব ভালো লাগে। জোছনার জল গায়ে মাখি মাঝেমধ্যে।"

"জোছনার জল?"

"হ্যাঁ, এই যে চাঁদ থেকে মেঘ বেয়ে বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, জল নয়তো কী? এই জল শরীর ভেজায় না ঠিকই, কিন্তু মনটা ঠিকই ভিজিয়ে দেয়।"

মৃদু হাসল দুজন। নবনীর কাছে সবটা কেমন অপার্থিব মনে হলো, এই যে অপূর্ব জোছনা, মৃদুমন্দ বাতাস, পাশে রায়ান। ইশ! আর কী চাই। রায়ান ওর জীবনে না আসুক, তবুও আজকের এই বিলাসী জোছনা রাত ওর মনে সারাজীবন গেঁথে থাকবে।

"আমার কথা শুনতে এসে চাঁদে ডুবে গেলেন, এবার একটু ভাসুন দয়া করে। আমি একটু সুযোগ পাই তাহলে।"

ঠাট্টাচ্ছলে কথাটা বলল রায়ান, নবনী ওর দিকে তাকাল ঘোরলাগা দৃষ্টিতে। মনের ভেতরে বসে থাকা নবনীর সত্তা ওকে বলল,

"তোমাতে তো আমি আকুণ্ঠ ডুবে গেছি, ডুবে গিয়ে সাঁতার কাটতেই ভুলে গেছি। সেখান থেকে ভাসতেই তো চাঁদটাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছি।"

"কী হলো আপনার? ঠিক আছেন? আমি ভুল কিছু বলেছি?"

নবনীর সেই দৃষ্টিতে রায়ান কিছুটা ভড়কে গিয়ে একসাথে এতগুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।

নবনী আচমকা ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো, দ্রুত কফি মগ টা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কার্নিশের কাছাকাছি চলে গেল।

আকাশের দিকে তাকিয়েই বলল,

"আপনার জীবনের কোনো একটা কিছু শোনাবেন বলে ডেকেছিলেন আমায়। নিন শুরু করুন।"

রায়ান আচমকা নবনীর মুড সুইংয়ে ভীষণ অবাক হলো, এই মেয়ের মনের আকাশে এই মেঘ তো এই রোদ্দুর! ক্ষণেই বৃষ্টি, ক্ষণেই আবার প্রখর সূর্যালোক! বড্ড আনপ্রেডিক্টেবল!

রায়ান ডুবে গেল ওর ছেলেবেলায়, ওর বাবা-মায়ের ভালোবাসা আর মন্দবাসার গল্পে। ওর একাকিত্বের গল্পে। এটাকে কী গল্প বলা যায়, এটা তো ওরই জীবনের অংশ!

........

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ১৬