তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ১৭

🟢

"শুনেছিলাম বাবা আর মা বিয়ে করেছিলেন ভালোবেসে। কিন্তু আমি যখন থেকে একটু আধটু বুঝতে শুরু করলাম বা যে অব্দি আমার মেমোরিতে ধরা আছে, সেই ভালোবাসার ছিঁটেফোঁটাও দেখিনি, কখনোই না। উদ্দাম ভালোবাসার অনুভূতি এত দ্রুত বিবর্ণ হয়ে যায় কেন বলতে পারেন নবনী? নাকি সেখানে আদৌ ভালোবাসাই ছিল না?"

কী এক অদ্ভুত কাতরতা মেশানো রায়ানের গলায়। নবনী কোনো উত্তর দিল না, তাকিয়ে রইল কেবল, রায়ানের দিকে চোখ রেখেই কফিতে চুমুক দিল।

রায়ান অবশ্য উত্তরের অপেক্ষায়ও থাকল না, নিজের মতো বলতে থাকল,

"যে সম্পর্কের শেষটা এমন তিক্ত, সেটার শুরুটা ছিল গভীর ভালোবাসার চাদরে মুড়ানো। বাবা পড়াশোনা শেষ করে তাঁর ডিপার্টমেন্টেই যোগ দিলেন লেকচারার হিসেবে। আমার পূর্বপুরুষ ইকোনমিক্যালি এতটা সলভেন্ট ছিলেন না। স্বাভাবিকভাবেই বাবার উপরে পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে। বোনদের বিয়ে দেয়া, বড়ো ভাইকে ওষুধের দোকান চালু করে দেয়া, দাদীর চিকিৎসা সব করতে করতে নিজে তখনো বিয়ে করতে পারেননি। এরমধ্যেই পি.এইচ.ডি করতে চলে গেলেন আমেরিকায়। থাকতেন নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটিতে। দিনের বেশিরভাগ সময় রিসার্চ নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। সময় পেলেই বেরিয়ে পড়তেন ঘুরতে, সেভাবেই মায়ের সাথে পরিচয় হয়। মা প্রায় ছোটোবেলা থেকেই সেখানে থাকতেন পরিবারের সাথে।"

"আমি তো জানতাম আন্টি আর আঙ্কেল দু'জনের সাথেই বাবার বন্ধুত্ব ছিল।"

"হ্যাঁ, বাবার সাথে আঙ্কেলের বন্ধুত্ব ইউনিভার্সিটি

লাইফ থেকেই বা তারও আগে। বাবার আরও একবছর আগে থেকেই আঙ্কেল নিউইয়র্কে থাকতেন। বাবা ওখানে যাবার পর দুই বন্ধু সময় পেলেই একসাথে বেরিয়ে পরতেন। অবশ্য একসাথে সময় বের করাটা মুশকিলই ছিল, কারণ যার যার রিসার্চ ওয়ার্ক নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকতেন। টাইমিং হতো না সবসময়। মা'র সাথে তখনই বন্ধুত্ব হয় বাবার। বিদেশ বিভূঁইয়েতে বাঙালির সান্নিধ্যের লোভে সেটা দ্রুত পাকাপোক্ত হয়। পরে তিনজনেই খুব ভালো ফ্রেন্ড হয়ে গেলেন।"

"তারপর?"

"তারপর বন্ধুতা থেকে ভালোলাগা, ভালোবাসা এরপর পরিণয়। সচরাচর প্রেমে যেমন হয়। সবটা হয় দুই বছরের মধ্যেই। আফজাল আঙ্কেল তখন ওখানে অবনী আন্টিকেও নিয়ে আসেন। সব ভালোই চলছিল। তাঁদের বিয়ের দুই বছরের মাথায় আমার জন্ম হয়। ততদিনে আফজাল আঙ্কেল চলে আসেন বাংলাদেশে। আমার জন্মের কিছুদিন পরে থেকেই ওদের সম্পর্কে চিঁড় ধরতে শুরু করে।"

এটুকু বলে থামল রায়ান, গাঢ় একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক বেয়ে।

এরপরের অংশটুকু নবনী জানে, কিন্তু ও রায়ানের ভাবনাটা জানতে চায়। ও নিশ্চিত রায়ান পুরো সত্যি জানে না। জানলে কোনোভাবেই আশরাফ আঙ্কেলকে ভুল বুঝে দূরে থাকতে পারত না। সেই ভুলের পরিমাণ কতটা তা না জেনে সেটাকে শুদ্ধ করা যায় না।

"আপনি কি বিরক্ত হচ্ছেন? আসলে আমি খুব একটা গুছিয়ে কথা বলতে পারি না, খাপছাড়া ভাবে বলছি হয়তো।"

"একদমই বিরক্ত হচ্ছি না, আপনি বলুন।"

মনে মনে বলল, "আপনার সব এলোমেলো কথা আমি মনে মনে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে পারি। এসব তো বলা কথা! আপনি তো জানেন না, আমি আপনার না বলা কথাগুলোও হৃদয় দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করি, খুব করে চেষ্টা করি।"

রায়ান বলা শুরু করতেই সহসা মনোযোগী শ্রোতা বনে গেল নবনী,

"আমি যখন একটু একটু বড়ো হচ্ছিলাম, কিছুটা বুঝতে শুরু করি তখন থেকেই দেখতাম একজন আরেকজনের পিছু লেগে থাকত। একজন ইট ছুড়লে অন্যজন সাথে সাথে পাটকেল ছুঁড়ে মারত, এদিক থেকে কামান দাগালে ওদিকে বুলডোজার রেডি। আমি খুব ভয় পেতাম, জানেন? চিৎকার করে কেঁদে উঠতাম ভয়ে। তখন ওরা কিছুটা থামত। মাঝে মাঝে ঝগড়ার শব্দে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেত আমার। ভয়ে সিঁটিয়ে যেতাম।"

রায়ানের গলা ধরে আসছে, ছয়-সাত বছরের একটা বাচ্চার জন্য এটা কতটা অসহনীয় সেটা নবনী খুব ভালো করেই বুঝতে পারে।

"আপনার বলতে কষ্ট হচ্ছে মনে হয়। আজ থাক নাহয়!"

"না না, আমি আজই বলতে চাই। যেদিনই বলব সেদিনও সমান কষ্টই হবে। কষ্টটা একদিনেই পাই নাহয়!"

রায়ানের গলার হাহাকার নবনীকে স্পর্শ করল ভীষণভাবে।

রাতের সাথে পাল্লা দিয়ে ঠান্ডা বাড়ছে, কিছুটা শীত শীত লাগছে এখন। রায়ান আবারও বলা শুরু করল,

"মা স্বাধীনচেতা ছিলেন, জীবনটা নিজের মতো দেখতে চাইতেন। কিন্তু বাবা কেন যেন সেটা পছন্দ করতেন না। ধরে বেঁধে শেকল পড়াতে চাইতেন। এটা নিয়েই ঝগড়া হতো। মা ওখানে বড়ো হলেও দেশের প্রতি একটা অদ্ভুত টান ছিল, বইয়ের তাক ভর্তি বাংলা বই ছিল, রবীন্দ্রসংগীতও গাইত। বাংলার প্রতি মা'র এই টান দেখে দেখেই কিনা আমিও বাংলাটা ভালোবেসে ফেলি।"

ক্ষণেক থেমে আবারও বলতে শুরু করল রায়ান,

"ওরা ঝগড়া করলেও আমাকে আঁকড়ে ধরতে চাইত দুজনেই। এভাবেই সময় কাটছিল। আমার বয়স যখন নয় বছর, তখন বাবার জীবনে এলো ন্যান্সি আন্টি।"

নবনী চমকে উঠল, এজন্যই তবে এক সমুদ্র দূরত্ব বাবা ছেলেতে! কিন্তু সত্যিটা তো অন্য।

"আপনি সব ঠিকঠাক জানেন তো?" প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল নবনী।

"হ্যাঁ, খুব ভালো করেই জানি। এসব নিয়েই তো অশান্তি আরও বেড়ে গেল। শুধু হাতাহাতিটাই বাকি ছিল। এরপর সেই ভয়াবহ রাত!"

চাঁদের আবছা আলোয় খুব একটা স্পষ্ট দেখা না গেলেও রায়ানের অবয়বে ফুটে উঠা প্রগাঢ় ব্যথা ঠিকই উপলব্ধি করতে পারল নবনী।

"আমার তেরোতম জন্মদিনেও তুমুল ঝগড়া হয় দুজনের। অন্যসব দিনের থেকে মারমুখী ছিল দুজনেই। কিন্তু আশ্চর্য কী জানেন? এরপরে কয়েকদিন একেবারে শান্ত হয়ে যায় সব। অতিরিক্ত শান্ত। তখন বুঝিনি যে এটা বিশাল ঝড়ের পূর্বাভাস ছিল।"

রায়ানের গলাটা একেবারে ভাঙা শোনাল, ওর জন্য যে প্রগাঢ় মায়া জমেছিল নবনীর মনে সেটা ক্রমাগত কেবল বাড়তেই থাকল। রায়ান তখন অন্য ঘোরের জগতে যেন! কিছু বলে তাতে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইল না ও।

"সেই রাতের ঠিক পাঁচদিন পরে সকালে আমি মায়ের ঘরে যাই। প্রতিদিন সকাল সাতটার মধ্যে মা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলত। সেদিন আমার ঘুম ভাঙতেই দেখি আটটা পেরিয়ে গেছে। মা যে আমাকে আর কোনোদিন ডাকবে না সেটা তখনও জানতাম না। দরজা ভেজানো ছিল শুধু, ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। আর আমি দেখলাম মা ফ্যানের সাথে..."

আর বলতে পারল না রায়ান, ভেঙে পড়ল একেবারে। মনের সমস্ত শক্তি একসাথে জড়ো করেও শেষ রক্ষা হলো না, হুহু করে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল,

"আমি দৌড়ে গিয়ে পা উঁচু করে ধরতে চাইলাম, এতো ঠান্ডা পা। আমি চিৎকার করে ডাকছিলাম মাকে। মা সাড়া দিল না। আমার চিৎকারে বাবা ছুটে এলো তাঁর রুম থেকে। সেই শেষ দেখা মা'কে।"

কান্না আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ছেলেটা। নবনী ছুটে এলো রায়ানের কাছে, ওর ভীষণ ইচ্ছে হলো জড়িয়ে ধরতে, ওর সব কষ্টগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করে নিতে। কিন্তু সেটা তো পারবে না, তাই নিজেকে শক্ত করে রায়ানের কাঁধে একটা হাত রাখল শুধু আলতো করে।

"কান্না আটকাবার চেষ্টা করবেন না। কাঁদুন প্লিজ। ভেতরের যত ক্লেদ আছে, কষ্ট ব্যথা আছে সব চোখের জলে বের করে দিন। মাঝে কাঁদতে হয়, খুব করে কাঁদতে হয়। ভেতরটা হালকা লাগে তাতে।"

ছেলেদের কাঁদতে নেই, এই কথার সাথে একমত নয় নবনী। বেদনার ছেলে মেয়েতে বিভেদ হয় না। কষ্ট সবারই সমান হয়। কান্না সবসময় দুর্বলতার প্রকাশ নয়, ভেতরের চাপা যন্ত্রণা বের করতেও এটা ভীষণ সাহায্য করে। নবনী জানে এরপরে রায়ান প্রায় বছরখানেক ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছিল। ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠত। সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কাউন্সিলিং করে করে স্বাভাবিক হয়েছে, অনেক সময় লেগেছিল সেটা কাটিয়ে উঠতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নবনীকে অবাক করে দিয়ে একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গেল রায়ান।

"মা চলে যাবার এক বছরের মাথায় বাবা বিয়ে করেন ন্যান্সি আন্টিকে। উনি সবসময় সিম্প্যাথি দেখাবার চেষ্টা করতেন, অথচ সব তার জন্যই হলো। আমি এসব একেবারেই নিতে পারতাম না। খুব রাগ হতো। মায়ের সাথে বাবার সারাক্ষণ ঝগড়াঝাটি লেগে থাকত, উনার সাথে বাবা কী হেসে হেসে কথা বলত! তখন আমার মনে হতো পুরো পৃথিবীটাই বুঝি করুণা করছে আমাকে আর মাকে।"

"আপনি কী কখনো আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন রেবেকা আন্টি এমন করেছিলেন?"

"কেন জিজ্ঞেস করতে যাব? সবটা তো আমি নিজেই দেখেছি।" জেদি গলা রায়ানের।

"সব দেখা কী সবসময় সত্যি হয়? খালি চোখের দেখায় কত যে ভুল থাকে সেটা জানেন না?"

"আমার দেখায় কোনো ভুল নেই। আর উনার যদি ভুল না থাকত উনি কেন নিজেকে ডিফেন্ড করতে আসেননি এতো বছরে?"

নবনীর ইচ্ছে করল সব সত্যিটা বলে দিতে, কিন্তু নিজের মায়ের সম্পর্কে এমন কিছু শুনলে ছেলেটা আরেকবার ভেঙে গুড়িয়ে যাবে। আঙ্কেলও সেজন্যই কিছু জানাননি। সব দায় নিজে নিয়েছেন, তবুও ছেলেটা ভালো থাক। আবার ভেঙে যাবার চাইতে আশরাফ আঙ্কেল দূরত্বকেই বেছে নিয়েছেন।

"এই যে ভরা জোছনা চারপাশে দেখছেন, কী অদ্ভুত সুন্দর আলো। এই আলোর ছিঁটেফোঁটাও আমার ভেতরে প্রবেশ করে না। আমার ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা একটা কৃষ্ণগহ্বর!"

হাহাকার মেশানো গলায় বলল রায়ান।

"সেটা তো আপনি চাঁদের উল্টো পিঠে আছেন বলে। চাঁদের উল্টো পিঠে জোছনা থাকে না, ঘুটঘুটে আঁধারে ঘেরা থাকে। একটু চেষ্টা করে এপাশটায় আসুন, দেখবেন আপনার হৃদয় কতটা আলো ঝলমলে হয়ে উঠবে। কৃষ্ণগহ্বর মিলিয়ে গিয়ে সূর্য উঁকি দেবে।"

উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে নবনীর দিকে তাকাল রায়ান, নবনীর কথায় ভরসা করতে ইচ্ছে করছে ভীষণভাবে!

আর নবনীর ইচ্ছে করছে রায়ানের হৃদয়ের গহীনে প্রবেশ করে সমস্ত কান্না নিজের করে নিতে। রায়ানের কষ্টগুলো যদি নিজের হৃদয় বিছিয়ে দিয়ে সেখানে জমাতে পারত! কিন্তু ও তো নিরুপায়। অক্ষম অসহায়ত্বে সমস্ত হৃদয় হুহু করে উঠল নবনীর। চোখের জলে একাকার হচ্ছে বারবার! ভালোবাসা মানুষকে এত অসহায় করে দেয় কেন?

..........

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ১৭