"ভালোবাসেন কাউকে?"
সহসা নবনীর এই প্রশ্নটা রাতের নৈশব্দকে খানখান করে দিল যেন!
রায়ান এমন প্রশ্নের কোনো হেতু খোঁজে পেল না ঠিকই, কিন্তু ওর মন যেন আজ 'সব বলে দেব' এমন একটা পণ করে বসে আছে!
ওরা চুপচাপ বসে ছিল প্রায় বহুক্ষণ, এই অদ্ভুত সুন্দর জোছনা রাতে নিজের মনের প্রগাঢ় কষ্টগুলোকে এভাবে বিছিয়ে দিতে পেরে যেন হালকা লাগছে অনেক! মিষ্টি আলোটা ওর হৃদয়ের ক্ষতগুলোয় প্রশান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে যেন! সামনে দাঁড়ানো এই কঠিন হৃদয়ের মেয়েটাও যে লুকানো সমস্ত মায়া দিয়ে রায়ানের ভেতরে জমা ব্যথার উপশম ঘটাবার চেষ্টায় মাতবে এটা ও ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি।
"ওদের ভালোবাসার ওরকম পরিণতি দেখে কখনো সাহস পাইনি। তবে চেষ্টা যে করিনি তা না। রিলেশনশীপে ছিলাম, মন থেকে সাড়া পাইনি কেন যেন! পরে আরেকবার চেষ্টা করেছিলাম। সেইম রেজাল্ট। এরপর আর সে মুখো হইনি। তাছাড়া মনের বাইরে গিয়ে শুধু শুধু সম্পর্ক বহন করার কোনো মানে হয় না।"
রায়ানের গলাটা কী কিছুটা কেঁপে উঠল?
নবনী এমনিতে ভয়ংকর সাহসী মেয়ে, কিন্তু রায়ানকে এখনি সত্যিটা বলার সাহস করে উঠতে পারল না। কারণ সত্যটা স্পোর্টিংলি রিসিভ করার কতটা ক্যাপাবিলিটি ছেলেটার আছে এটা সম্পর্কে ও এখনো যথেষ্ট সন্দিহান! এসব বলে এই গুড়িয়ে যাওয়া হৃদয়কে আরেকবার চূর্ণ করে দিতে চায় না ও। ভালোবাসার মানুষের ভেঙেচুরে গুড়িয়ে যাওয়া দেখার মতো এতটা সাহস এখনো মেয়েটার হয়নি।
ভরা জোছনা যেন আজ বান ডেকেছে, এই জোৎস্নালোকের একটা বিশেষত্ব আছে, সবকিছু যেন বড্ড বেশিই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, কিন্তু সূক্ষ্মভাবে কোনোকিছু দেখতে গেলেই সব কেমন অস্পষ্ট, ঝাপসা। একইসাথে স্বচ্ছতা আর অস্বচ্ছতা মেলানো মেশানো। কী অদ্ভুত কম্বিনেশন!
এই অস্পষ্ট স্পষ্ট আলোতেও রায়ানের অবয়বে ফুটে উঠা অবর্ণনীয় কষ্টের ছাপ নজর এড়ালো না নবনীর।
"আমি জানি অবনী আন্টিকে নিয়ে আপনার কষ্ট আছে, মা হারানো সবার কষ্টটা আমি ঠিকই উপলব্ধি করতে পারি। কিন্তু আপনার নিজের চোখের সামনে নিজের মায়ের ওমন ক্ষয়ে ক্ষয়ে চলে যাওয়া দেখবার অসহনীয় কোনো স্মৃতি নেই। তাছাড়াও আপনার মাথার উপরে 'বাবা'র শক্ত হাত ছিল। আমার পাশে কেউ ছিল না, নিজে নিজেই ভেঙেছি, নিজে নিজেই জুড়েছি, এরপর আবার ভেঙে গিয়েছি।"
কী এক অদ্ভুত বিষাদী সুরে কথাগুলো বলল রায়ান।
"আশরাফ আঙ্কেল সবসময় আপনার পাশে থাকতে চেয়েছেন, ভালোবেছেন। কিন্তু আপনি তাঁকে কতটা সুযোগ দিয়েছিলেন?"
"এতকিছুর পরেও কেন সুযোগ দেব আমি। সে একটা খুনী। আত্মহত্যায় প্রভোক করাটাকে আমি খুন বলেই মনে করি। যতবার উনি আমার সামনে আসেন, আমার চোখে মায়ের সেই দুঃসহ ছবিটাই বারবার ভেসে উঠেছে।" ক্ষ্যাপাটে গলা রায়ানের।
নবনী চমকে গেল, এতটা দায় নিয়েও কেন ছেলেকে সব বলছে না আশরাফ আঙ্কেল? ওর যেন সহসা রোখ চেপে গেল,
"আপনি কিচ্ছু জানেন না রায়ান। কখনো জানার চেষ্টাও করেননি। সারাজীবন নিজের একপেশে ধারণাকে পুষে রেখেছেন। আর দায়ী করেছেন এমন একজনকে যার আদতে খুব একটা দোষ নেই।" জেদি গলায় বলল নবনী, রাগ মাথায় উঠলে নিজের মধ্যে থাকে না ও।
"কী বলতে চাইছেন স্পষ্ট করে বলুন।" খেঁকিয়ে উঠল রায়ান।
"বলতে চাইছি আপনি একটা ভুলে ভরা জগতে বিচরণ করছেন। চোখে একটা ঠুলি পরে আছেন, নিজেকে সব সত্য থেকে গুটিয়ে রেখেছেন। দৃষ্টি প্রসারিত করেন, অনেক কিছু জানতে পারবেন।"
"হেঁয়ালি আমার একেবারেই পছন্দ নয় নবনী। কথা শেষ করুন।" রায়ানের গলায় নাছোড়বান্দা সুর।
"ওই খুনী লোকটা..." শেষ করতে পারে না রায়ান, তার আগেই খিঁচিয়ে উঠল নবনী,
"আশরাফ আঙ্কেলের দোষ ছিল না। সমস্যা ছিল রেবেকা আন্টির। মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন তিনি আর তাঁর অন্য একজনের..."
"আর একটাও বাজে কথা শুনতে চাই না আমি। আমি কী করে ভেবেছিলাম আপনি আমার বন্ধু হবার যোগ্য? আপনার কাছে ঝগড়ায় জেতাটাই বেশি ইম্পর্ট্যান্ট, আমাকে খোঁচাতে পারাটা ইম্পর্ট্যান্ট। এরজন্য কারও দুর্বলতা নিয়ে ফালতু মজা করতেও বাঁধে না, তাই না?"
উঠে কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে দু'হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল ক্ষিপ্ত রায়ান। রাগে দপদপ করছে মাথাটা।
রায়ানের এমন ভাবনায় নবনী ভীষণ আহত হলো, হৃৎপিণ্ডে খচখচ করতে লাগল। অনেক চেষ্টা করেছিল এসব কথা এখন না তোলার। কেন যে আটকাতে পারল না নিজেকে, ঝোঁকের মাথায় রায়ানের কাছ থেকে সযত্নে লুকিয়ে রাখা সত্যটা বলে দিয়েছে। এখন তো পুরোটা বলতেই হবে পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই।
"আপনার মনে হচ্ছে আমি এতটা খারাপ যে কারও মাকে নিয়ে জমানো অনুভূতি নিয়ে মজা করতে পারি? মা কেমন হয় সেটাও খুব বেশি মনে পড়ে না। আমার কাছে বাবাই মা, আবার বাবাই বাবা। তবে মা তো মা'ই হয়। পৃথিবীর কোনো মা'কে আমি কীভাবে ছোটো করব রায়ান?"
নবনীর গলাটা ধরে এলো, চোখ বেয়ে কখন কষ্ট গড়িয়ে পড়া শুরু করল নিজেও জানে না নবনী।
"আমি শুধু এটাই চেয়েছিলাম যে যেই লোকটা আপনাকে অসম্ভব ভালোবাসেন, কিন্তু আপনি পর্যন্ত সেই স্নেহ ভালোবাসা পৌঁছে দিতে পারছেন না, সেটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে তাঁকে এই অসহায়ত্ব থেকে একটু উদ্ধার করুন। আর আপনিও কিছুটা তাঁর সান্নিধ্য পান।"
"আর তাই এমন মনগড়া বাজে কথা বলছেন।"
"একটাও বাজে কথা আমি বলিনি। সত্যটাকে এক্সেপ্ট করে নিতে শিখুন। যত কঠিনই হোক সত্যকে এক্সেপ্ট করে নেয়ার মানসিকতা রাখুন। আপনি একটা ম্যাচিউরড মানুষ, এমন চাইল্ডিশ ভাবনা আপনার মাথায় কী করে এলো?"
"চুপ করুন। যথেষ্ট বলেছেন। আমি আর কিচ্ছু শুনতে চাই না, কিচ্ছু না।"
চেঁচিয়ে উঠল রায়ান। নবনীর কাছ থেকে বাকিটা শোনার প্রয়োজন বোধ করল না, ওর অপেক্ষাতেও থাকল না। গটগট করে চলে গেল সিঁড়ি বেয়ে। এসেছিল নিজেকে হালকা করতে, কিন্তু তা তো হলোই না, উল্টো পাথর ভার আরও সহস্রগুণ বেড়ে গেল।
নবনী স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে রইল, নিজেকে যে কী ভীষণ রিক্ত, নিঃস্ব মনে হতে লাগল! সেখানেই বসে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল নবনী। এটুকুতেই এমন রিয়্যাক্ট করেছে বাকিটা শুনতে পারবে তো রায়ান! কেঁপে উঠল ওর ভেতরটা। ভালোবাসা বুঝি এভাবেই ভেঙেচুরে গুড়িয়ে দেয়!
***
রুমু প্রতিদিনের মতো সকালেই উঠল ঘুম থেকে। মা ফজর নামাজ পড়ে আবার কিছুক্ষণ ঘুমান। ঝুমুর ঘুম ভাঙে আটটার পরে। হাত-মুখ ধুয়ে নিজের জন্য চা বানিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ভোরবেলার একটা অদ্ভুত প্রশান্তি আছে, মন ভালো করে দেয়। তামিমটাও ঘুমিয়ে আছে, ছেলেটা ঘুমালেও চোখের পাতা পুরোপুরি বন্ধ হয় না, হালকা খোলা থাকে। ওর ইচ্ছে হলো ছেলের সাথে এই মিষ্টি ভোরের পরিচয় করিয়ে দিতে। কিন্তু কী মনে করে আর ডাকল না।
বিয়ের প্রথম দিকে এমন ভোরগুলো ওর কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। শাফায়াত ওকে নিয়ে বাইরে হাঁটতে চলে যেত, ফিরে আসত শ্বশুর বাড়ির বাকি সদস্যের জাগার আগেই। খালি পায়ে শিশির ভেজা সবুজ ঘাসের চাদরে হাঁটতে বড়ো ভালো লাগত। কতো কতো রঙিন স্বপ্নের বুনন এঁকেছিল দু'জনে। সেই স্বপ্নের রঙগুলো কোথায় হারিয়ে গেল জানে না রুমু!
সকাল দশটা গড়াতেই ঝুমু এসে খবর দিল শাফায়াত এসেছে। কোত্থেকে দৌড়ে নাঈম চলে এসে জড়িয়ে ধরল মাকে। কয়েকদিন পরে ছেলেকে দেখে নিজেকে সামলাতে পারল না রুমু। চোখে মুখে স্নেহার্দ্র চুমু খেতে লাগল ছেলের।
"মায়ের কথা এতদিনে মনে পড়ল বাবা?"
কিছুটা অভিমানী গলা রুমুর।
"আমার তো সবসময় মনে পড়ে। আব্বু বলে, তুমি নাকি রাগ করেছ, আমাকে দেখতে চাও না। আম্মু এটা কি সত্যি?"
এতটুকু ছেলের মাথায় এসব কী ঢুকিয়েছে শাফায়াত! ঘৃণায় মুখ কুঁচকে গেল রুমুর।
ছেলেকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল রুমু,
"আমি একটুকুও রাগ করিনি তোর উপরে, বাবা। তোর মনে হচ্ছে আমি রেগে আছি?"
দু'পাশে মাথা নাড়াল নাঈম।
"আমার কাছে থাকবি তো বাবা?"
"আমি দুই জনের সাথেই থাকতে চাই আম্মু। তুমি বাসায় চলে আসো।"
আদুরে গলায় বলল নাঈম। তামিমের হাত ধরে বেরিয়ে গেল খেলতে। রুমু গেল শাফায়াতের সাথে কথা বলতে, কিছু কড়া জবাব দিতেই হবে আজকে।
ড্রইংরুমে বসে আছে শাফায়াত। শাফায়াতের সুন্দর মুখটা রুমুর চোখে কী ভীষণ কুৎসিত লাগছে! মনের সৌন্দর্য আর কদর্যতা দুটোই অবয়বে ছাপ ফেলে। একটা সুন্দর মনের মানুষ দেখতে যেমনই হোক, দেখতে সুন্দর লাগে। আবার অসুন্দর মনের মানুষকে আপাত সুন্দর লাগলেও, তার ভেতরের রূপটা উন্মুক্ত হলেই সেই বাহ্যরূপ ঢাকা পড়ে গিয়ে ভেতরের ঘৃণ্য রূপটা অবয়বে প্রতিফলিত হয়। আজ সেটা স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারছে রুমু।
"নাঈমকে এসব আজেবাজে মিথ্যা বলেছ কেন শাফায়াত?"
"তুমি বেশি বেশি করছো তাই বলেছি এসব। শেষবার জিজ্ঞেস করছি তুমি যাবে কিনা বলো?"
"আমার ডাল মেমোরিতে যতদূর মনে পড়ে তুমি এর আগে আরও দুই বার বলেছে 'শেষবারের মতো' কথাটা। তোমার শার্প মেমোরি আজকাল অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছে দেখা যায়!"
কটাক্ষ করে বলল রুমু।
"আমার এতো ঠেকা নেই, তোমাকে নেয়ার জন্য। নেহায়েত ছেলেগুলা কষ্ট পাচ্ছে তাই এসেছিলাম। তোমার তো আবার সেসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই।" কিটকিটিয়ে বলল শাফায়াত।
"ছেলেদের চিন্তা কবে থেকে শুরু করেছ তুমি? নাকি তোমার সেই কলিগ, কী যেন নাম? রিতা না কী যেন? সে বুঝি আর পাত্তা টাত্তা দিচ্ছে না?"
একেবারে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল রুমু, শাফায়াত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
..........