তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ২০

🟢

'জোছনা করেছে আড়ি

আসে না আমার বাড়ি,

গলি দিয়ে চলে যায়

লুটিয়ে রূপোলী শাড়ি

জোছনা করেছে আড়ি...'

রায়ান ছাদে উঠার মুখে নবনীর গান শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল, সমস্ত দরদ গলায় ঢেলে দিয়ে গাইছে মেয়েটা। গানের কথাগুলো এতো চমৎকার, মনে হয় নিজের ভেতরকার অনুভূতি তাতে প্রকাশ পাচ্ছে! নবনী কার্নিশের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল, চাঁদের দিকে তাকিয়ে গানটা গাইছিল, তাই নবনীর অবয়বে ফুটে উঠা অভিব্যক্তি দেখতে পেল না রায়ান। তবে গলার অদ্ভুত বিষাদ ঠিকই ওকে ছুঁয়ে গেল।

সহসা গান থামিয়ে ঘুরে তাকালো নবনী,

"ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি? এদিকে আসুন তো। ভয় নেই, ভূত-প্রেত নেই এখানে।"

কথাটা শেষ করেই হেসে উঠল নবনী, রায়ান আবারও কিছুটা অপ্রতিভ বোধ করল। এই মেয়ের আচরণের মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারে না ও। কয়েকদিন থেকেই ওর মনে হচ্ছে, কোথাও একটা অসংগতি আছে যেন! কিন্তু সেটা কী তা ধরতে পারছে না!

"ভূত-প্রেত থাকলেও আমার ভয় নেই, ওদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে নিতাম। আমার সাথে সবার আবার খুব সহজেই ফ্রেন্ডশিপ হয়ে যায় কিনা।"

হেসে উত্তর দিতে দিতে নবনীর পাশে এসে দাঁড়ালো রায়ান।

"শুধু আমার সাথেই কেবল বন্ধুতা হয়নি আপনার, হয়েছে শত্রুতা।" আনমনেই বলে বসল নবনী।

"কারণ আপনি ভূত-প্রেত কিংবা অতি সাধারন কোনো মানুষ নন, অতিমানবী গোছের কেউ একজন!"

দুজনেই হেসে ফেলল, রায়ান ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

"আপনার গানের গলা কিন্তু চমৎকার।"

"আমি জানি সেটা৷ তবুও ধন্যবাদ।"

রায়ান শুধু মৃদু হাসল, কিছু বলল না।

দুজনেই নিজেদের ভেতরের তিক্ততা ভুলতেই হালকা ওয়ার্ম আপ করে নিল, খুব হালকা চালের কথা বলে।

আজ ভরা জোছনা নেই, স্যাঁতসেঁতে ম্লান জোছনা! নবনীর ভাষায় এটা হলো 'বিষাদী জোছনা'! চাঁদটা কেমন মন খারাপ করে থাকে, কিন্তু স্বভাবসুলভ আলো ছড়াতে ভুলে যায় না, হোক তা বিষন্ন, বিমর্ষ আলো!

"এখন শুরু করুন প্লিজ।"

নবনী জানে সব শুনলে রায়ান ঠিক থাকবে না, ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভেঙে পড়বে। তবুও বলতে হবে, সত্য তো সত্যই হয়।

"বলছি, তবে শুরু করার আগে একটা কথা বলে রাখি, মাঝপথে কোনো রিয়েক্ট করবেন না প্লিজ। আগে পুরোটা শুনবেন। হয়তো খুব কষ্ট হবে! তবুও সবটা শুনবেন। এতেই হয়তো সামনে চলার পথে কষ্ট কম হবে। আপনার একলা পথের সহযাত্রী পেয়ে যাবেন!"

নবনীর কথার কোনো অর্থ খোঁজে পেল না, কিন্তু রায়ানের মনে কেন যেন অদ্ভুত একটা আশঙ্কার মেঘ জমলো! মনে হতে লাগল,

"থাক না, শুনে কী লাভ!"

পরক্ষণেই মনে হলো, শুনতেই হবে! কেমন এক অদ্ভুত দোলাচালে দুলতে থাকল মন। শেষমেশ দোটানা ঝেড়ে ফেলে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল নবনীর শর্তে।

একটা বড় করে দম নিয়ে বলতে শুরু করে নবনী,

"আপনি তো প্রথমদিকের ঘটনা জানেনই। আপনার ভুল জানার শুরু যেখান থেকে সেখান থেকেই শুরু করি তাহলে।"

একবার রায়ানের দিকে তাকিয়ে ঘটনায় ডুবে গেল নবনী,

"আশরাফ আঙ্কেল আর রেবেকা আন্টির বিয়ের পর থেকে সময়টা স্বপ্নের মতোই কাটছিল। নতুন জীবনের একটা ঘোর নিয়েই দুই বছর কেটে গেল। এরপর আপনার জন্ম হলো। তখনও সময়টা ভালোই কাটছিল তাঁদের। কিন্তু বিপত্তি ঘটে আরও কিছুটা পরে। আপনার বয়স যখন প্রায় তিন, তখন থেকেই আন্টির মনে কিছুটা পরিবর্তন আসতে শুরু করে। উনার মনে হতে থাকে, উনি একজায়গায় থেমে আছেন, আটকে গেছেন কোথাও। বন্ধন বলি বা পিছুটানই বলি, সবকিছুর প্রতি একটা অনীহা চলে আসে। বলা যায়, হাঁপিয়ে উঠেছিলেন একেবারে। এরজন্য আঙ্কেলকে সারাক্ষণ দোষ দিতে থাকতেন..."

"উনি সব দোষ মায়ের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন?"

নবনীকে মাঝপথে থামিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলল রায়ান।

"রায়ান, আপনি বলেছিলেন পুরো কথা শুনবেন?"

"এসব বাজে কথা শোনার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। তবুও আপনাকে কথা দিয়েছি বলেই কেবল শুনব। তারপর? আর কী কী কাহিনী উনি সাজিয়েছেন বলুন। শুনি সবটা।" একটা তাচ্ছিল্য খেলে গেল রায়ানের গলায়। নুবনী অবশ্য এটা গায়ে মাখল না। ওর মতো বলতে থাকল,

"সবকিছুর উপরে বিরক্ত হয়ে কিছুটা ভায়োলেন্ট হয়ে যেতে থাকেন আন্টি। জিনিসপত্র ছুড়াছুঁড়ি করতেন, চিৎকার চেঁচামেচি করতেন, আর এসব নিয়ে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকত। উনার এমন আচরণে মাঝে মাঝে আঙ্কেলও রেগে যেতেন। ঝগড়া আসলে তখনই হতো।"

"এসব আপনাকে বলে উনি কী প্রমাণ করতে চাইছেন? মা ঝগড়াটে আর উনি কিছুই করেননি, একেবারে নির্দোষ বাচ্চা।" রাগে ফুঁসে উঠল রায়ান।

"নিজের বাবা সম্পর্কে এভাবে বলছেন কেন রায়ান? পরে আবার অনুশোচনায় না দগ্ধে মরেন!" শান্ত গলায় বলল নবনী।

"আপনি প্লিজ এসব নীতি বাক্য বাদ দিন। আমি আমার মাকে কিছুটা হলেও তো পেয়েছিলাম। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে দুজনেই খুব লড়ত। কিন্তু মা এসব.."

রায়ানের গলায় তখন রাগ আর বিষাদ মিলেমিশে একাকার। নবনী ওর মনের অবস্থাটা খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। হাজার হলেও মা তো!

"আন্টি আসলে এসব খুব একটা যে জেনে বুঝেই করেছেন, ব্যাপারটা আসলে তা না। একটা সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম ছিল তাঁর। মেন্টালি স্টেবল ছিলেন না পুরোপুরি।"

"আপনি বলতে চাইছেন, মা পাগল ছিলেন, বদ্ধ উন্মাদ ছিলেন?"

আরেকবার ক্রুদ্ধ হয় রায়ান, জোছনার মরা আলো ওর অভিব্যক্তি আড়াল করে দিয়েছে বলে নবনী ওর অস্পষ্ট অবয়ব দেখছে কেবল। নইলে রায়ানের ক্রোধে উন্মত্ত চেহারা দেখতে পেত।

"আমি এটা বলিনি, আপনি একটুখানি ধৈর্য্য রাখুন, প্লিজ। আমি সবটা এক্সপ্লেইন করছি তো।"

চোখ খিঁচে বন্ধ করে দু'হাতে মাথার চুলগুলো আঁকড়ে ধরে বড় বড় করে কয়েকটা শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে নিল রায়ান।

নবনী অসহায় দৃষ্টি মেলে ঝাপসা আলোয় তা দেখল শুধু। হৃদয়ে কেমন খচখচ করতে থাকল! ব্যথায় টনটন করে উঠল ভেতরটা! ওর যদি ক্ষমতা থাকত, তবে রায়ানের সমস্ত কষ্ট মুছে দিত!

"রায়ান, এখন ঠিক আছেন তো আপনি? শুরু করব?"

"হুম।" এছাড়া আর কোনো ভাষা ওর মুখে চেষ্টা করেও আনতে পারল না।

"উনার যেই সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশন ছিল মেডিকেল সায়েন্সের ভাষায় এর একটা নাম আছে। কিন্তু নামটা আমি ভুলে গেছি। সে যাই হোক, যারা এই সিন্ড্রোমে ভোগে, তাদের মধ্যে কিছু খুব কমন সিম্পটম দেখা যায়। যেমন, কোনো কিছুই বেশিদিন ভালো লাগে না। বা কোনো কিছু পাওয়া হয়ে গেলে ওই জিনিসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আন্টিও হঠাৎ সবকিছু থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করলেন। আঙ্কেলের প্রতি ভালোবাসাও বিলীন হয়ে যেতে লাগল। কিন্তু আন্টির ক্ষেত্রে যেটা হলো সেটা হচ্ছে, উনার অবচেতন মনে ভালোবাসাটা কোথাও থেকেই গেল। সাথে আপনি তো আছেনই। তাই চাইলেও সম্পর্কের সুতোটা কাটতে পারলেন না। কিন্তু পুরোপুরি মেনেও নিতে পারলেন না। এই নিয়েই ডিপ্রেশনে ভুগতে লাগলেন। আঙ্কেল তখনও ব্যাপারটা ধরতে পারেননি, আন্টির এমন আচরণে তাই উনিও রিয়েক্ট করে ফেলতেন মাঝেমধ্যেই। এভাবেই দোলাচালে দুলতে দুলতেই চলছিল সব। কিন্তু এরমধ্যেই সবচেয়ে বড় অঘটনটা ঘটল।"

এটুকু বলেই থামল নবনী, পরেরটুকু কীভাবে বলবে তাই ভাবছে। কারণ এখন সবচেয়ে অপ্রিয় কথাটাই বলতে হবে। সহ্য করতে পারবে তো ছেলেটা?

এখনও চোখ বন্ধ করে অক্ষম রাগে কেঁপে কেঁপে উঠছিল রায়ান। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না, এমনকি একটা কথাও বলছে না ছেলেটা।

নবনী বুক ভরে বাতাস টেনে নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে নিল সবচেয়ে অপ্রিয় কথা বলার জন্য,

"আপনি তখন বছর পাঁচেকের। তখনই আন্টির সাথে দেখা হয়ে যায় তাঁর পুরনো ভালোবাসার মানুষের। ভদ্রলোক বিপত্নীক ছিলেন। আন্টিকে দেখে উনার ফেলে আসা ভালোবাসা যেন জিইয়ে উঠল। আন্টিকে বারবার উস্কাতে থাকলেন। স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে হয়তো এসবে কান দিতেন না! কিন্তু তিনি তখন কোথাও একটা মুক্তি খুঁজছিলেন উনার নিজের মনের বানানো একঘেয়ে জীবন থেকে। কীভাবে কীভাবে যেন সাড়া দিয়ে দিলেন সেই নিষিদ্ধ সম্পর্কে।"

রায়ান এতক্ষণ নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে ধরে রাখলেও এবার আর পারল না। একেবারে ক্ষোভে ফেটে পড়ল, ক্ষুব্ধ রায়ান যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে এটা সেদিন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল নবনী!

"ওই লোককে আমি এতদিন খারাপ ভেবেছি, কিন্তু এতটা জঘন্য সেটা ভাবতে পারিনি। নিজের দোষ ঢাকতে একজন মৃত মানুষের নামে এমন নোংরা মিথ্যা কী করে চাপিয়ে দিতে পারে! ছিঃ! আমি কী করব নবনী? আমাকে কেন এসব আজগুবি কথা বললেন? আমি কেন শুনলাম এসব?"

কেমন উন্মাদের মতো করতে লাগল রায়ান, নবনী ভীষণ আতঙ্কিত হলো। পাগলের মতো কী সব বিড়বিড় করতে করতে বসে পড়ল সেখানেই। ওকে দেখে মনে হচ্ছে পার্থিব কোনো কিছুতেই ওর মন নেই!

নবনীও বসে পড়ল বিধ্বস্ত, দিকভ্রান্ত রায়ানের পাশে। আলতো করে রায়ানের হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল। অসম্ভব কাঁপছে ছেলেটা। ক্রোধ, ক্ষোভ নাকি অন্যকোনো অনুভূতি এমন তাড়িত করছে রায়ানকে জানে না ও! শুধু এটুকু বুঝতে পারছে কতটা ভাংচুর হচ্ছে রায়ানের ভেতরটায়!

আঙ্কেল এটারই ভয় পাচ্ছিলেন। এজন্যই চুপ থেকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন সমস্ত আরোপ। একটা অপরাধবোধ সহসা গ্রাস করল নবনীকে। কেন আগ বাড়িয়ে এসব বলতে গেল? তবে সবটা শুনলে হয়তো ওর মনে জ্বলে উঠা দাবানলের উত্তাপ কিছুটা হলেও কমে আসত। ওর যে এখনো বলা বাকি অনেক কিছুই।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে নবনীর মনে প্রধান যে চিন্তা জায়গা করে নিল তা হলো এই ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া ছেলেটাকে সামলাবে কী করে! ওর তো এমন কোনো জাদুমন্ত্র জানা নেই! রূপকথার কোনো জাদুর কাঠিও নেই!

.........

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ২০