ছেলের মুখে বহু আকাঙ্ক্ষিত বুলি শোনার পর একদিকে যেমন প্রগাঢ় একটা প্রশান্তিতে সমস্ত হৃদয় আচ্ছন্ন হয়ে উঠল, অন্যদিকে এক গভীর উদ্বেগ এসে ভর করল! কী এমন হলো যে ছেলে বহুদিনের তৈরী করা প্রাচীর ভেঙে ফেলল? ভাবনায় ছেদ পড়ল রায়ানের কথায়,
"স্যরি বাবা। সবকিছুর জন্য স্যরি। আমি জানি আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইবারও যোগ্য নই। তবুও..."
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলা ছেলের কথাগুলো যেন তাঁকে একেবারে ভেঙেচুরে দিল! অথচ প্রিয় সন্তানের মুখে 'বাবা' ডাক শোনার জন্য হৃদয়ের গহীন অরণ্যে কতই না চাপা আকুলতা পুষে রেখেছিলেন! তবে কী ছেলে সব জেনেই গেল?
"রায়ান, বাবা, কী হয়েছে বল না? তোর কথা কিছু বুঝতে পারছি না!"
"আমাকে কেন সব আগে বলনি বাবা? মা'র কথাগুলো আমাকে.."
রায়ান শেষ করার আগেই আশরাফ সাহেব অস্থির চিত্তে বলে উঠলেন,
"তোর মাকে ভুল বুঝিস না, বাবা। এসব তো ওর ইচ্ছাকৃত ছিল না।"
রায়ান যেন এসব শুনতেই পেল না, নিজের মতো কেবল বলেই যাচ্ছে,
"তোমার মনে আছে বাবা, একবার তুমি আমাকে সাইকেল কিনে দিয়েছিলে? অনেক ভালোবেসে কিনেছিলে তাই না? আমি তো সেটা বুঝতেই পারলাম না। তোমার সামনেই ওটা ভেঙে গুড়িয়ে ফেললাম। কত আজেবাজে কথাই না বললাম! তোমার খুব কষ্ট হয়েছিল আমি জানি। আরও কত-শতবার যে বাজে আচরণ করেছি! তখন কেন তোমাকে একটু বুঝলাম না বাবা? তাহলে তো এমন বাজে আচরণ আমি করতাম না।"
আত্মদহনে পুড়ছে ছেলেটা, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। আত্মদহনের মতো বড় পীড়ন আর কী আছে?
"কিচ্ছু হয়নি বাবা, শান্ত হ। আমি তোকে এভাবে দেখতে চাইনি। বি স্ট্রং মাই চাইল্ড।"
"আমার কৈশোরে মনে হতো এই বুঝি সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে, তুমি এসে আমাকে হাতে ধরে ধরে সব শেখাবে, তোমার চোখ দিয়ে দুনিয়াটা চিনতে শিখব। তোমার ভাবনা আমার ভাবনার সাথে মিলিয়ে জীবন আঁকব। কিন্তু তুমি কাছে এলেই কেন যেন আমার ভেতরে অসহ্য যন্ত্রণা হতো। তার উপর ভাবতে লাগলাম তোমার জন্যই বুঝি মা চলে গেছে অভিমানে! তোমার কষ্টে নীল হয়ে যাওয়া মুখটা এখন আমার চোখে ভাসছে, কিন্তু তখন মনে হয়েছিল পুরোটা উপহাস। এত কষ্টেও কেন আমকে সমস্তটা জানতে দাওনি বাবা?"
রায়ানের কন্ঠে বাবা ডাকটা কানে যেন এক অপূর্ব সুধা ঢেলে দিচ্ছে! কিন্তু ওর ব্যথার প্রগাঢ়তাও হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারছেন তিনি।
"তখন তোর বয়স অনেক কম ছিল। অনেক জটিল জিনিস তুই বললেও বুঝতে পারতি না। হয় আরও বেশি করে ভেঙে পড়তি নয়তো মাকে ভুল বুঝতি। কোনোটাই আমি মানতে পারতাম না রে।"
ক্ষণেক থেমে আবারও বললেন,
"কখনো কাউকে মন থেকে ভালোবাসলে বুঝতে পারবি, একটু হাসিমুখ দেখার জন্য নিজের জীবনটাও হেসে খেলে বাজি ধরা যায়। উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরিতে দাঁড়িয়েও হাসিমুখের জয়োৎসবে মেতে উঠা যায়। আমার দুনিয়া তো তোরাই ছিলি। তোদের ভেঙেচুরে দিয়ে আমি কীসের উল্লাস করতাম বল তো?"
গলার স্বরে কীসের যেন একটা অদ্ভুত আর্তি, রায়ান ঠিক বুঝতে পারে না, বিষাদের, শূন্যতার নাকি আজকের এই বহু আকাঙ্ক্ষিত অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা প্রাপ্তির!
"কিন্তু তোমার এই ভালোবাসার গভীরতা না মা বুঝতে পেরেছিল কোনোদিন আর না আমি বুঝলাম। আমাকে মাফ করতে পারবে না বাবা?"
"বারবার মাফ চেয়ে আমাকে দূরের মানুষ প্রমাণ করতে চাইছিস? আর দূরে ঠেলে আমাকে আরও শূন্য করে দিস না বাবা। ভালোবাসা কেউ নাহয় নাই বুঝল, আমি তো ভালোবেসে গেলাম। যেখানে প্রতিদানের আশা থাকে সেখানে কি আদৌ ভালোবাসা থাকে রে?"
বাবার কথাগুলোয় কী যেন একটা ম্যাজিক্যাল ব্যাপার আছে, চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছে রায়ানকে! ওর অসম্ভব ভালো লাগছে। দীর্ঘদিনের মান অভিমানের পালা চুকিয়ে বুকিয়ে দিয়ে এরপরই নেমে গেল খুঁনসুটিতে। হাত বাড়ালেই ভালোবাসার পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল ধরা দেবার জন্য অথচ সেটা খুঁজে পেতেই কতটা সময় বয়ে গেল। বৃথা ভুলে ভরা সময়! কেন যে মানুষ ভালোবাসা চিনতে এতো দেরী করে ফেলে কে জানে!
***
রাত থেকে তামিমের জ্বর এসেছে, ছেলেটা কী যে হয়েছে! বাপের মতো ঠান্ডার ধাত পেয়েছে একেবারে। নাঈম আর ওর ভাইয়ের বাচ্চাদের সাথে গতকাল বৃষ্টিতে ঝাঁপাঝাপি করেছে সে, সবাই ঠিক আছে আর সে বেচারাই ঠান্ডা জ্বর বাঁধিয়ে একাকার। তামিমের মাথায় পানি ঢালছিল রুমু, এরমধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে ঝুমু এলো প্রায় ঝড়ের গতিতে।
"আপা, এই মৃদুল লোকটার কাহিনী কী বল তো?"
বোনের দিকে বিস্মিত দৃষ্টি মেলে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল রুমু,
"মৃদুলের আবার কী ব্যাপার থাকবে। তোকে দেখে ওর পছন্দ হয়েছে। চাইছে বিয়েটা করে ফেলতে।"
"উফ! এসব আমি জানি আপা। যেটা জানি না সেটা বল। তোরা জানিস কিছু?"
"কী বারবার ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে একই কথা বলছিস! কানের মধ্যে ভ্যাজর ভ্যাজর করিস না তো। ছেলেটার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কী করি বল তো?"
"পুড়বে না? বানিয়েছিস তো ননীর পুতুল। এখন ঠ্যালা সামলা?"
কথা শেষ করে তামিমের গায়ে হাত দিয়ে দেখল, জ্বর ভালোই, তবে এত চিন্তারও কিছু নয়।
"আপা, কিছুই করতে হবে না, কিছু খাইয়ে একটা ওষুধ খাইয়ে দে। জ্বর বাপ বাপ বলে পালাবে। এত চিন্তা করার মতো কিছু হয়নি।"
"তুই কীভাবে বুঝবি? আগে তোরও একটা দুটা হোক তবেই বুঝতে পারবি।"
কথাটা বলেই বুঝতে পারল ভুলভাল বলে ফেলেছে। ঝুমুর মুখের হাসিটা যেন ম্লান হয়ে গেছে মুহূর্তেই! প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে তড়িঘড়ি করে বলল,
"মৃদুলের ব্যাপারটা আমি জানি। তোর বহু পুরনো রোমিও। বাকিটা যার কথা তাকেই জিজ্ঞেস করিস নাহয়। সেই ভালো হবে। আমি আর বলতে পারব না আগ বাড়িয়ে।"
"হুহ! তা ওই রোমিও ব্যাটাকে কই পাব?"
হাসল রুমু, যাক মেঘটা গেড়ে বসেনি তবে।
"ওয়ার্ডরোবের উপরে দেখ একটা প্যাড আছে, ওখানে তোর ওই রোমিও ব্যাটার নাম্বার লেখা আছে।"
"আমার এত ঠ্যাকা নেই তাকে কল দেবার জন্য। আমার কিছু ডাউট ক্লিয়ার করার জন্যই কথা বলাটা দরকার বলেই কল করব।"
"আমি মনে হয় প্রেমালাপ করার কথা বলেছি তোকে?"
"আপা, তুই এই বয়সে এমন ফিচলে টাইপের কথাবার্তা কীভাবে শিখলি?"
"কেন বুড়ি হয়ে গেছি নাকি? চুল কিন্তু এখনো পাকেনি।"
ঝুমু হেসে ফেলল, স্নিগ্ধ প্রাণবন্ত হাসি!
নম্বরটা নিয়ে বোনের সামনে থেকে বেরিয়ে গেল ও, আর রুমু না চাইতেও ডুবে গেল বিষাদে। শাফায়াতের সাথে কতই না স্বপ্নের বুনন এঁকেছিল। ছোট ছোট স্বপ্ন কুড়িয়ে কুড়িয়ে সুঁই সুতো দিয়ে স্বপ্নের মালা গেঁথেছিল। মালা ছিঁড়ে গেছে অল্পতেই। কী করে টেকসই হবে, সুতোটাই যেখানে ছিল বড্ড দুর্বল, ভঙ্গুর!
ঝুমু প্রথমবার কল করল, কেউ ধরল না, আবারও করল। কিন্তু ফলাফল একই। খুব রাগ হলো ওর। সেধে সেধে কল করেছে বলে নিজের উপরেই মেজাজ খারাপ হলো। কিন্তু ওরই বা কী করার আছে? জীবনে বারবার ঠকে যেতে চায় না ও। একেবারে যাচাই-বাছাই করে তারপরই সামনে এগুতে চায়। নতুন করে কোনো হাসি মুখের ছলনায় প্রলুব্ধ হতে চায় না, কোনোভাবেই না!
আরেকবার ভেঙেচুরে গেলে আর নিজেকে জুড়তে পারবে না। তবে সবকিছুর শেষে একটা কথা ওর মনে হয়, যাই হোক আর যেই হোক, কারও উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হবে না ও। নতুন জীবন শুরু করার আগে নিজে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে ও, প্রাণপণ চেষ্টা। দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল অবয়বে।
***
হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই দু'দিন থেকে ঝুপঝাপ বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। অসময়ের বৃষ্টি, শীত আসি আসি করছে, এরমধ্যে বৃষ্টির হানা। কী অদ্ভুত ব্যাপার!
এই হিমশীতল বৃষ্টিতে বহুক্ষণ ভিজল নবনী। বৃষ্টির কান্না কী সুন্দর করে ওর কান্না লুকিয়ে ফেলল। প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে ছাদে এসেছিল, কিন্তু ভিজতে ভিজতে অভিমান আর মন খারাপ কী সুন্দর করে ধুয়ে মুছে গেল! চোখ বন্ধ করে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠল,
'আমার সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ বৃষ্টি
তোমাকে দিলাম।
শুধু শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু তোমার কাছে চেয়ে নিলাম...'
রায়ান ছাদে আসছিল তখনই। বাবার সাথে কথা বলে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। বহুদিন পর কী একটা প্রশান্তির ঘুম হয়েছে, পুরোপুরি ঝরঝরে লাগছে। অপরাধবোধের ছিটেফোঁটা এখন ওর মনের মধ্যে নেই। বাবা কী অদ্ভুতভাবেই না ওকে সামলে নিয়েছেন!
ঘুম ভাঙতেই বৃষ্টি পড়ছে বুঝতে পারল। নিজের দেশের বৃষ্টি গায়ে মাখতে ইচ্ছে হলো খুব করে। তাই ছাদের দিকে পা বাড়ালো। সিঁড়ির শেষ ধাপে এসেই গান শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল রায়ান। অজান্তেই কয়েক পা এগিয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে বৃষ্টিকে উপলব্ধি করার চেষ্টারত নবনীকে কী যে অদ্ভুত রহস্যময়ী লাগছে! কী ভীষণ অপার্থিবই না লাগছে ওর চোখে!
নিমিষেই কোথা থেকে আচমকা একরাশ ভালো লাগার বাতাস যেন ওকে ছুঁয়ে গেল, প্রশান্তির বাতাস!
মুহূর্তেই ওর মনে একটা ভাবনার উদয় হলো, জীবনানন্দ দু'দন্ড শান্তি খুঁজে পেয়েছিল বনলতায়। আর ও নবনীর সাথে পরিচয়ের পরেই নিজেকে খুঁজে পেয়েছে, সেই সাথে প্রশান্তি তো বটেই!
হাল ভাঙা পথিকের মতোই দিশা খুঁজে ফিরছিল ক্লান্ত শ্রান্ত রায়ান, নবনীই তো ওকে হালটা শক্ত করে ধরতে শেখালো, সঠিক পথের সন্ধান দিল। নিজেকে জীবনানন্দ ভেবে নিয়ে নবনীকে বনলতা ভাবতে যেন ভীষণ ভালো লাগল ওর! মোহাবিষ্টের মতো তাকিয়ে রইল সামনের বৃষ্টি কন্যার পানে!
.........