দুই কী তিনদিন পরের এক সন্ধ্যায় সাফিয়া বেগম দুই মেয়েকেই কাছে ডাকলেন। একটা ভীষণ জরুরী কথা নাকি বলার আছে! বিছানায় বসে পানের বাটা থেকে পান সাজিয়ে বেশ আয়েস করে মুখে পুরলেন। রুমু একটা চেয়ার টেনে মায়ের কাছাকাছি বসল, ঝুমু বিছানায় বসল, একেবারে মায়ের গা ঘেঁষে।
সাফিয়া বেগম পান চিবুতে চিবুতেই বললেন,
"তোদের দুই জনকেই কয়েকটা কথা বলা দরকার। এগুলো বহু আগে বলা দরকার ছিল, কিন্তু বলি নাই। এখন মনে হচ্ছে বলা উচিত।"
"কী কথা মা? তুমি যা বলবে সরাসরি বলো তো! ধৈর্য্য রাখতে পারছি না, মনে হচ্ছে একটা সাসপেন্স মুভি দেখছি, ক্লাইম্যাক্স আসি আসি করে আসছে না!" ঝুমু বলল কিছুটা আদুরে গলায়।
"ধৈর্য্য তো সব কাজেই ধরতে হয়। সামান্য কথা শুনতেই তোর ধৈর্য্য শেষ, জীবনে কী করবি বল তো?"
মেয়ের কথায় যেন কিছুটা হতাশা ঝরল সাফিয়া বেগমের স্বরে।
"মা, তুমি এত সিরিয়াস হয়ে গেছ কেন? আমি তো এমনিই বললাম। তুমি বলতে থাক যা বলতে চাও।"
"এই যে জীবনে ভোগান্তিতে পড়ে গেছিস, এটার বেশিরভাগ দোষ কিন্তু তোদের নিজেদেরই। আমাদের তো আর অজস্র টাকা পয়সা নাই যে ওটার উছিলায় সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা একটা সম্পদ তোদের দিতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু একজনও নিজের ভালো বুঝলি না, পড়াশোনাটা শেষই করলি না।" একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
কিছুক্ষণ থেমে পান চিবানোয় মনোযোগ দিলেন, দুই বোন আগ্রহ নিয়ে বসে আছে মায়ের কথা শোনার জন্য। কথা কোনদিকে যাচ্ছে এর কিছুটা আঁচ করতে পারছে ওরা। তাই চুপচাপ থাকায় শ্রেয় মনে করল।
"ঝুমুর নাহয় পড়াশোনায় আগে থেকেই মাথা কম, তুই তো এত ভালো রেজাল্ট করলি রুমু, ভালো ইউনিভার্সিটিতেও চান্স পেলি। এরপর তো বড় হয়ে গেলি, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেয়া শিখলি। তখনও তোরে বলেছিলাম যা করবি বুঝেশুনে কর। ধাপ করে সেকেন্ড ইয়ারেই বিয়ে করলি। মেনে নিলাম, কী আর করা, মেয়ের পছন্দ! একদিন বললি আর পড়বি না। তোর শ্বশুর বাড়ির মানুষ নাকি পছন্দ করে না। আমি কিন্তু তখনও বলেছি চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নে। তখনও তুই ওদের কথাই শুনলি। শাফায়াত যে একটা অতি স্বার্থপর ছেলে এটা আমি আগেই বুঝেছিলাম। এই চোখে এখনও অনেক কিছু খালি চোখেই ধরা পড়ে। বয়সের একটা ওজন তো আছেই।"
আবারও কিছুটা থামলেন তিনি। এখন একটানা বেশি কথা বললেই মনে হয় খুব বুঝি পরিশ্রম করে ফেলেছেন। ওরা তখন কেবল মৌন শ্রোতা মায়ের কথার।
"ভালোবাসায় অন্ধ হওয়া কোনো কাজের কথা না। তোরা দুই জনই কেন যে এটা বুঝলি না। ঝুমু, তোর কথা আর কী বলব! এখন যে বুঝতে পেরেছিস এটাই শুকরিয়া। মৃদুল ছেলেটা ভালো।"
এবার ঝুমু মায়ের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। মা নিজের মতো বলতেই থাকলেন,
"এবার একটা কিছু অন্তত ঠিকঠাক কর। একটা ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমি আমার জীবনে তোদের বাপের মতো একটা সাদা মনের মানুষ পেলাম। কত বড় সৌভাগ্য আমার বল? লোকটার অনেক ইচ্ছা হতো তোদের সুখ সাচ্ছন্দ্য দেবার, সব চাহিদা পূরণ করার। কিন্তু আল্লাহ তাকে সেই সামর্থ্য দেয় নাই। তোরা কোনো আফসোস রাখিস না মা!"
এটুকু বলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। ঝুমু মাকে জড়িয়ে ধরল, রুমুও চেয়ার থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠে মায়ের আরেক পাশে বসে দু'হাতে জড়িয়ে ধরল। সর্বশেষ কবে ওরা সাফিয়া বেগমকে কাঁদতে দেখেছে, সেটা সেভাবে মনে পড়ে না। ভীষণ শক্ত মা কতটা ভেঙে গেলে এভাবে কাঁদতে পারে এটা ভালোই উপলব্ধি করতে পারল রুমু আর ঝুমু। সহসা নেমে আসা নীরবতা যেন আশ্চর্য একটা নৈশাব্দিক পরিবেশ তৈরী করেছে। অনেক সময় কথা বলে যা করা যায় না, একটুখানি আঁকড়ে ধরাতেই যেন এর সহস্রগুণ অনুভূতির প্রকাশ হয়ে যায়। দুই মেয়ে তাঁকে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরায় খুব সাহস পেলেন, হারিয়ে ফেলা মনের জোড় যেন নিমিষেই ফিরে এলো নিজের জায়গায়!
"শোন, এভাবে তো জীবন চলে না। আমি সারাজীবন থাকব না, তোদের নিজেদের নিজের পায়ে ভর দিয়েই সামনে চলতে হবে। সামনের রাস্তাটা তোদের নিজেদেরই বানিয়ে নিতে হবে। আমি হয়তো কিছুটা যোগান তোদের দিতে পারব, কিন্তু মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে সমস্ত উপাদান যোগাড় করে মসৃণ একটা রাস্তা তোদেরই বানাতে হবে। এমন করে বানাতে হবে যেন ঝড়-ঝাপটা যাই আসুক ওটা মসৃণই থাকে। ক্ষয়ে না যায়।"
মায়ের কথার মর্মার্থ ওরা খুব ভালো করে বুঝল, কিন্তু বলার উদ্দেশ্যটা ওরা জানে না।
"একবার খুব টানাটানিতে পড়ে গেলাম। ঝুমু তখন পেটে এসেছে কেবল। তোদের দাদী আমাকে তাঁর হাতের বালা দু'টা খুলে দিয়েছিল। ওটা বিক্রি করে যেন আপাতত চালিয়ে নেই, অভাব তো আর সারাজীবন থাকবে না। কিন্তু আমি বিক্রি করতে পারলাম না। আমার আব্বা কিছু গয়না দিয়েছিল, তোদের বাবাও ছোটখাটো গয়না দিয়েছিল বিয়ের পরপর। নানা অভাব অনটন আর টানাটানির মধ্যে সবগুলা একটু একটু করে বিক্রি করলাম, তোদের বাবা খুব আফসোস করত। আমার হাত ধরে বলত,
'সাফিয়া, তুমি আমার সংসারে খালি কষ্টই করে গেলা, তোমারে কিছুই দিতে পারলাম না।' আমি তারে বলতে পারি নাই, তাঁর চাইতে বড় পাওয়া আমার জীবনে কিছু নাই, কিছু হতেও পারবে না। তাঁকেই তো পেলাম, আর কী চাই। কিন্তু বলতেই পারি নাই।"
বলতে বলতে আবারও ভাবালুতায় ডুবে গেলেন সাফিয়া বেগম, স্বামীকে নিয়ে তাঁর গর্বের সীমা নেই।
"এরপরে গয়না বিক্রি করেছি লুকিয়ে লুকিয়ে, লোকটা শুধু শুধু কষ্ট পায় তাই। মানুষটা নিজেই তো কত বড় অলঙ্কার আমার জন্য, সামান্য একটু সোনার আর কী ক্ষমতা! তুচ্ছ বই তো কিছু নয়। সেগুলা তো আসবে যাবে। সব গয়নাই আস্তে আস্তে কাজে লাগালাম সংসারের। মানুষটার উপরে চাপটা কিছুটা তো কমত। কিন্তু শাশুড়ির সেই বালা আমি হাতছাড়া করতে পারি নাই। সেটা আশীর্বাদ ছিল আমার জন্য। হয়তো এখন কাছে লাগবে বলেই!"
আর্দ্র চোখে বিস্ময় নিয়ে মাকে দেখতে থাকল ওরা। ছোট ছোট স্যাক্রিফাইস সংসারকে কতটা পরিপূর্ণ করে এটা কী দারুণভাবেই না উপলব্ধি করল! কোনোদিন বাবা কিংবা মাকে কোনো আক্ষেপ করতে দেখেনি ওরা এই এত বছরের জীবনে। শুধু ঝুমুর ওই সময়টাই কেবল সব ভেঙ্গেচুরে দিয়েছিল।
মেয়েদের মাঝখান থেকে উঠে গেলেন, আলমারি খুলে একটা গয়নার বক্স বের করলেন। সেখান থেকে বালা জোড়া বের করে নিয়ে আবার বিছানায় বসলেন।
"এটা তোরা নে। বিক্রির ব্যবস্থা কর। যেটুকু টাকা পয়সা আসবে সেটা থেকে ছোট করে হলেও কিছু একটা শুরু কর। চেষ্টা করতে তো দোষ নাই।"
"কিন্তু মা, এটা আমরা কীভাবে নেব? দাদীর আশীর্বাদ এতবছর আগলে রেখেছ, এখন আমরা এটা বিক্রি করতে পারব না। তুমি রেখে দাও মা।"
রুমু সংকোচ নিয়ে বলল, ঝুমুও আপত্তি জানাল সাথে। কিন্তু সাফিয়া বেগম নাকচ করে দিলেন,
"পড়াটা শেষ করলে একটা কিছু করতে পারতি। এই যুগে ইন্টারমিডিয়েটের যোগ্যতা নিয়ে কী করতে পারবি? তামিম, নাঈমকে নিয়ে তোর চলতে হবে। মৃদুল ভালো ছেলে জানি, কিন্তু তবুও নিজের একটা পরিচয় তো থাকতে হবে। সময় কাকে কোন জায়গায় দাঁড় করায় কেউ জানে না রে, কেউ জানে না! তোরা আপত্তি করিস না আর। আর আম্মা তো এটা যাতে কাজে লাগে সেজন্যই দিয়েছিলেন। ধর, ধর।"
"কিন্তু মা..."
"আমি নিতে বলেছি কিন্তু, এবার আমার কথা শোন।"
মায়ের ধমকে মেনে নিল ওরা। সাফিয়া বেগম স্বস্তি পেলেন। সামনে ওদের কী হবে তিনি জানেন না, কিন্তু উনার যেটুকু সামর্থ্য আছে সবটা দিয়ে দিতে তিনি পিছপা হবেন না, সর্বস্ব দিতেও না! লাভ হবে না ক্ষতি সেই চিন্তা করলে জীবনে নতুন করে কিছু শুরুই হতো না, এত এত আবিষ্কার কোনোটাই সম্ভব হতো না।
একবার পথ তৈরী হয়ে গেলে গন্তব্য খুব বেশি দূরে থাকে না, কোনোভাবে না কোনোভাবে ঠিক পৌঁছে যাওয়া যায় কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে! তাঁর মেয়েগুলোও পৌঁছাতে পারুক আরাধ্য গন্তব্যে।
***
চামেলি আজ ভীষণ খুশি, রায়ান ওর ছবি তুলে দিয়েছে। ছবিগুলো ওর মনে ধরেছে খুব। রায়ান অবশ্য আজই বেরিয়ে গেছে, এবার দেশের আরেক প্রান্তে। তবে এবার সে ভীষণ ফুরফুরে মেজাজে আছে। প্রাণভরে শ্বাস টেনে নিতে পারছে, সহসা জীবন যেন রঙের পসরা নিয়ে এসে ওকে ভরিয়ে দিয়েছে! জীবন সত্যিই দারুণ, শুধু উপভোগ করতে জানতে হয়।
নবনীকে অবশ্য এখনো প্রাপ্য ধন্যবাদ জানানো হয়নি। ভেবেছে ফিরে এসেই বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেবে। হোক রাগী কিংবা প্রস্তর কঠিন, তবুও হৃদয়ে একটা টলটলে স্বচ্ছ মায়া বয়ে বেড়ায় মেয়েটা। নবনী ওর আঁধার ঘেরা জীবনে আলো জ্বেলেছে। ওর জীবনে যদি কাউকে 'লেডি উইথ দ্যা ল্যাম্প' বলা যায়, তা অবশ্যই নবনী, রায়ানের জীবনের বাতিঘর।
আজ ভীষণ আশ্চর্য একটা ব্যাপার ঘটলো, চামেলি ওর সিরিয়ালের সময়টায় নবনীর ঘরে এসেছে গল্প করতে। এই সময়ে ওকে ক্রেন দিয়েও টেনে তোলা যায় না অন্যসময়।
"আফা গো, আমি তো জানিই আমি ম্যালা সুন্দর, কিন্তু ভাইজান যেই ফডো তুইল্যা দিছে হ্যানে এক্কেবারে পরীর ছাও দেহা যাইতাছে আমারে।"
গলায় প্রবল উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ছে। চামেলির ছেলেমানুষিতে হেসে ফেলল নবনী।
"ভালোই তো। সুন্দরী মেয়েদের ছবি সুন্দর ই তো হবে, সেটা যেই তুলুক।"
"আফনেও কয়ডা তুইল্যেন, তাইলে বুজবার পারবেন। আর যাই কন ভাইজানের লাহান ভালা ফডো এই দুনিয়ার কেউ তুলবার পারব না।"
রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল মেয়েটা।
নবনী তর্কে গেল না, যার যার বিশ্বাস তার তার কাছে। যার গন্ডি যতটুকু, তার চিন্তাও ততটুকুতেই বিস্তৃত। এটা ভেবে সে যতটা উচ্ছ্বসিত হয়ে আছে, সেটাকে খাটো করার সাধ্য কারও নেই।
"তাই নাকি? আচ্ছা সেটা দেখা যাবে।" এটুকুতেই উত্তর সারল।
নবনীর হৃদয়ের গহীন কোণে কিঞ্চিৎ মেঘ জমেছে। এই কয়েকদিনে রায়ানের ওকে কিছুটা এড়িয়ে যাবার প্রবণতাই এটার কারণ। সবার সাথে ভীষণ খোলা মনে মিশে যাচ্ছে, হাসছে, খেলছে। এমনকি ওর বাবার সাথেও এখন খুব সহজ। শুধু ওর সাথেই কীসের যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছে! নবনী ভেতরে ভেতরে ভীষণ তৃষিত হয়ে ছিল রায়ানের সাথে সহজভাবে দু'টো কথা বলতে। কিন্তু ওর আচরণে মনে হচ্ছে সবকিছুর জন্য নবনীই দায়ী যেন! ওর ঘোর কাটলো চামেলির কথায়,
"আফা, ছোড মুহে একখান বড় কতা কই, ভাইজানের সাতে আফনেরে কইলাম মানাইবো। এক্কেরে খাপে খাপ। চিন্তা কইরা দেইহেন আফা।"
প্রথমদিকে সংকোচ থাকলেও পরেরদিকে হড়বড়িয়ে বলে গেল, মুহূর্তেই নবনীর কান গরম হয়ে উঠল, হৃদয় যন্ত্রে কী যেন একটা হলো, মনে হলো কোথাও প্রবল শব্দে ধাক্কা খেয়েছে এটা। তবে সামলে নিল মুহূর্তেই,
"আরে ধূর, তোর ভাইজান হলো একেবারে পক্ষীরাজে চড়ে বেড়ানো রাজকুমার, আর আমি ওর পাশে গল্পের সেই কুশ্রী হাঁসের ছানা। এত অমিলে কখনো পাশাপাশি মানায় কাউকে?"
হেসে হেসে ঠাট্টাচ্ছলে বলল কথাগুলো, কিন্তু ভেতরে থেকে দুমড়ে মুচড়ে গেল যেন!
"আফা, আফনে যে কত সুন্দর এইটা নিজেই জানেন না। আর যদি শইল্যের চামড়ার কতা কন, তাইলে কমু চামড়া দিয়া ভালোবাসা হয় না। আমার তো চামড়া সাদাই আছিল, কিন্তু হে আমারে ছাইড়া দিয়া আবার বিয়া করল কালা চামড়া মাইয়ারে। রঙ দিয়া হইলে তো সে আমারে ছাইড়া যাইতো না আফা। চক্ষের মইদ্যে আমিই থাইক্যা যাইতাম।"
একটা বুক চাপা যন্ত্রণা বেরোল চামেলির গলা দিয়ে।
নবনী ভাবতে লাগল আসলেই কী তাই? ওর এই শ্যামবর্ণই তো ওকে রূঢ় বাস্তবতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সেই কবে! ঘর পুড়া গরু ও, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই বিচলিত হয় খুব।
পরমুহূর্তেই নিজের এহেন ভাবনার জন্য নিজেকেই চপেটাঘাত করতে ইচ্ছে হলো, কারণ বাবার হাসি মুখটা ভেসে উঠল ওর মানসপটে।
..........