তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ২৫

🟢

'অনুভূতি সব ইচ্ছে ডানায় উড়িয়ে দেব

ফানুশের মতো খোলা আকাশে ভাসবে ওরা,

মেঘ ছুঁয়ে দেবে সেই ভেসে বেড়ানো অনুভূতিদের!

মেঘের স্পর্শ মেখে ওরা আপন নীড়ে ফিরবে যখন

হৃদয়ে মেঘ এভাবেই খুব জমাব তখন!'

এটুকু লিখেই হেসে ফেলল নবনী, কী যে কিশোরী সুলভ বোকা বোকা অর্থহীন কথা লিখে ফেলল! ইদানীং নিজের হৃদয় যন্ত্রের উপর একফোঁটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না ও। হৃদয়ে জমা সাত সমুদ্র আবেগের জল আর সেখানে জমে থাকতে চাইছে না। চন্দ্র সূর্যের প্রভাবে যেমন জোয়ার উঠে, ওর মনেও এখন উত্তাল জোয়ার চলছে। সেখানে জমা আবেগের জল ফুলে ফেঁপে ছলকে ছলকে বেরিয়ে আসতে চাইছে হুড়োহুড়ি করে। অথচ সব কেমন জমে বরফ হয়ে ছিল! কবে থেকে সেই বরফ গলতে শুরু করল জানে না ও! এখন তো হৃদয়ে এক সমুদ্র উত্তাল আবেগের জল! সে জলেই তো ডুবে যাচ্ছে ক্রমশ! নিজের হৃদয়ে জমা আবেগের জলে নিজেই না ডুবে মরে কবে!

আজ অনেক দিন পরে কাগজে কলমে কাটাকুটি করছিল, আর তাতেই এসব কিশোরী সুলভ ভাবাবেগে উড়ে গেল, ভেসে গেল, হয়তো ডুবেও মরল!

আজ রায়ানের ফেরার কথা ছিল, কিন্তু কাজ নাকি শেষ হয়নি। আরও কিছু ভালো জায়গার সন্ধান পেয়েছে, হয়তো আরও তিন কী চার দিন লেগেই যাবে! বাবার কাছ থেকেই এসব জেনেছে নবনী। অপেক্ষা বড় হওয়ায় তৃষ্ণাও প্রগাঢ় হচ্ছে ওর! বুকে এক সমুদ্র জল নিয়েও কী করে এমন তৃষ্ণা পায় ভেবে পায় না নবনী!

***

মৃদুল এই নিয়ে তিনবার কল করেছে, একবারও ধরেনি ঝুমু। সেদিন ও যখন কল দিয়েছিল তখন তো সে উপেক্ষা করেছিল, তবে ও কেন ধরবে? কিছুতেই ধরবে না। উপেক্ষা উপেক্ষায় কাটাকাটি!

কিন্তু অপর প্রান্তের মানুষটা বোধহয় উপেক্ষা উপেক্ষা খেলাটা ধরতে পারেনি কিংবা ধর্তব্যে নিচ্ছে না! সে অনবরত কল করেই যাচ্ছে। শেষে বাধ্য হয়ে কলটা ধরল ঝুমু, মৃদুলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রূঢ় গলায় বলল,

"এতবার কেন কল দিচ্ছেন? আপনি কী ভেবেছেন আপনার যখন সময় হবে তখন সবাই আপনার সাথে গদগদ হয়ে কথা বলবে? কী প্রমাণ করতে চান? আপনি একাই ব্যস্ত, আর সবাই গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়?"

"রেগে আছ? আসলে সেদিন তুমি যখন ফোন করেছিলে আমি সত্যিই ব্যস্ত ছিলাম। অনেক পরে দেখেছিলাম, তাই ভেবেছিলাম দেরী যেহেতু হয়েছেই একেবারে গুছিয়েই নাহয় তোমার মুখোমুখি হই!" অত্যন্ত শান্ত গলায় কথাটা বলল মৃদুল।

"রেগে থাকব কেন? আপনি তো আমার তেমন কেউ নন যাদের সাথে রাগ দেখানো যায়! আরেকটা কী বললেন যেন? কী গুছিয়ে নেবেন?"

"আমার কিন্তু উল্টোটাই মনে হচ্ছে, তুমি ভয়ংকর রেগে আছ, আর আমাকে খুব কাছের..."

"আপনি মহা ত্যাঁদড় প্রজাতির লোক, এটা জানেন?"

"হ্যাঁ, মাত্রই জানলাম!"

রাগে ফুঁসে উঠল ঝুমু, মাথা ফেটে যাচ্ছে যেন! মৃদুল সশব্দে হেসে উঠল। ফোনের অন্য প্রান্তে থাকা ঝুমুর মনে হলো হাসির দমকে বুঝি দুনিয়া কেঁপে উঠছে!

সেদিনের মতো আজও বারান্দায় বসেছে ঝুমু আর মৃদুল। আজ শাড়ি পরেনি মেয়েটা, মৃদুলও একাই এসেছে। চোখ-মুখ শক্ত করে বসে আছে ঝুমু, তখনকার রাগটা এখনো আছে কিছুটা। দেখতে ভদ্রশিষ্ট মনে হলেও এই ছেলে মারাত্মক ফিচলে আর মহা ত্যাঁদড়।

"কেমন আছ ঝুমু?"

"আমার তো খারাপ থাকার কোনো কারণ নেই! ভালোই আছি। আপনি?"

"আমার বুঝি খারাপ থাকার কারণ আছে?"

ঝুমু এখানে বসার পরে থেকে এই প্রথম পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল মৃদুলের দিকে। মৃদুল প্রায় পুরো সময়টাই ঝুমুর দিকে তাকিয়ে ছিল। এখনো অব্যাহত রেখেছে তা, চোখাচোখি হলেও চোখ সরিয়ে নেয়নি মৃদুল। দৃষ্টির মুগ্ধতাও আড়াল করেনি একফোঁটাও। ঝুমু ভেতরে ভেতরে লজ্জা পেল ভীষণ, কিন্তু সেটা প্রকাশ করল না। সেভাবে তাকিয়েই প্রশ্নের তীর ছুঁড়ে দিল,

"আজ কোনো লুকোচুরি করবেন না প্লিজ, আমি সব শুনতে চাই।"

"আমিও বলার জন্যই এসেছি। নিজেকে কিছুটা হালকা করতেও হয়তো!"

এই প্রথম যেন ছেলেটাকে গম্ভীর অবয়বে দেখল ঝুমু! হাসলে যতটা উচ্ছল মনে হয়, গম্ভীর হলে পুরো ভারিক্কি গোছের মনে হয়। দুটোতেই ব্যক্তিত্বের প্রখরতার প্রকাশ পায় প্রবলভাবে।

"তুমি রূপকথার রাখাল বালকের গল্প পড়েছিলে ঝুমু? ওই যে, যে সুন্দরী রাজকন্যার প্রেমে পড়ে যায়? আমি নিজেকে সেই রাখাল বালক মনে করি।"

কোথাও যেন একটা বিষাদ জমে আছে গলায়।

"কিন্তু আমি তো রাজকন্যা নই!"

"হয়তো, হয়তো নও। তবে আমার হৃদয়ে তুমি রাজকন্যা ই ছিলে, এখনো তাই আছ। যেটা বলছিলাম সেটাই শেষ করি নাহয়?"

মুহূর্তকালের জন্য থামল মৃদুল, ঝুমু সম্মতি দিতেই শুরু করল,

"তুমি তখন সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। প্রাণবন্ত টিনএজ মেয়ে। তোমাদের কলেজের একেবারে উল্টোদিকেই যেই বাসাটা ছিল, ওই বাসার দোতলায় আমি পড়াতাম একটা বাচ্চাকে। একেবারে জানালার পাশেই টেবিলটা ছিল। সেখান থেকে বাইরে তাকালে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যেত।"

"তো এভাবে মেয়েদের দেখতেন, এটা বলতে লজ্জা করল না?"

"লজ্জা কেন করবে? সত্যি কথা বলছি। আর তুমি যেভাবে ভাবছ এটা তেমন নয়। আমি মেয়েদের দেখিনি তখন। একদিন সহসা একটা উচ্ছ্বসিত হাসি শুনে বাইরে তাকাই, আর তোমার হাসিতে আটকে যাই। শুনতে হয়তো ফিল্মি শোনাবে, বোকা বোকা শোনাবে কিন্তু এটাই সত্যি, একেবারে নির্জলা সত্যি। সেই হাসিই আমায় শেষ করে ফেলল, তোমাতে যে ডুবে মরলাম আর উঠতেই পারলাম না। কী ছিল তোমার হাসিতে?"

ঝুমু কেবল সলজ্জ অবয়বে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, মূক হয়ে গেছে মনে হয়!

"এরপর তোমাকে দূর থেকে ফলো করতাম, প্রায় প্রতিদিনই। ওই বাসার জানালা থেকেও দেখতাম। মনে হতো ওই হাসিটা আমাকে দেখতেই হবে। তোমার হাসিটায় কী যে এক সম্মোহনী শক্তি ছিল জানি না, আমি কেবল মোহাবিষ্ট হয়ে দেখতাম!"

"সামনে আসেননি কেন কখনো?"

"সাহস হয়নি, বললাম না রাখাল বালক! এমন নিঃস্ব, রিক্ত একজন ছেলে কী করে তোমাকে চাইবার মতো দুঃসাহস করতাম? তাই সামনে আসিনি কখনো।"

"তাহলে এতদিন পরে কেন এলেন? সিম্প্যাথি দেখাতে?"

"ওই সময় দেখলাম তুমি কেমন যেন বদলে যেতে লাগলে! আমার ভয় বাড়তে থাকল। কিন্তু একসময় জানলাম তুমি কাউকে ভালোবাস। সাথে আরও কিছু কথাও জানলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম সব রিউমার। কিন্তু যেদিন একটা ছেলের হাত ধরে ওই ছেলের গাড়িতে গিয়ে বসতে দেখলাম বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, আমি ভেতরে ভেতরে ভেঙেচুরে গিয়েছিলাম! কোনো পিছুটান যেহেতু ছিল না, তাই চলে গেলাম এখানকার সব ছেড়ে। শুধু সাথে নিয়ে গেলাম একটা স্নিগ্ধ হাসিমুখ!"

বাইরে ততক্ষণে গোধূলির লালচে সূর্য ডুবি ডুবি করছে। বেলা শেষের ডাকে সূর্য মেঘের আড়ালে পাড়ি জমাবে খানিক পরেই। ঝুমুর মনটায় কেমন টনটনে একটা ব্যাথা বাজতে লাগল! কী ভীষণ সূক্ষ্ম অথচ প্রগাঢ় একটা ব্যাথা!

"কেন একটু সাহস করে তখন সামনে আসেননি? তাহলে হয়তো সব এমন এলোমেলো হয়ে যেত না! চলেই তো গিয়েছিলেন, এখন তবে কেন এলেন? এতদিন পরে?"

"আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো এতদিনে বিয়ে করে সংসার করছ। তাই আর বিরক্ত করতে আসিনি। কিন্তু মেঘে মেঘে বেলা তো অনেক হলো, আল্লাহর রহমতে খুব ভালো বন্ধু পেয়েছিলাম কিছু। যারা সারাক্ষণ আমাকে আগলে রাখত। ওরাই বারবার বলছিল আমার নাকি মুভ অন করা উচিত। ধরে বেঁধে কিছু মেয়েও দেখায়, কিন্তু কোথাও না কোথাও তোমার সেই হাসিটা বারবার মস্তিষ্কে খোঁচাতে লাগল। এত দীর্ঘ সময়েও যা আমি এতটুকুও ভুলতে পারিনি! ভাবলাম শেষবারের মতো দূর থেকেই নাহয় ওই হাসিটা দেখে আসব। প্রথমে এখানেই এসেছিলাম, ভেবেছিলাম তুমি কোথায় থাক সেই খোঁজ নেব। কিন্তু..."

"কিন্তু?"

"যে হাসি দেখতে এখানে এসেছি, সেই হাসিটা আর হাসে না ওই মুখটা। হাসিটা না দেখে আমি কী করে যাই বলো তো? তোমার জীবনের পরের ঘটনাটা আমি এবার এসেই জানতে পারলাম। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া হাসিটা আবার খুঁজে পেতে চাই, তোমার পাশে থেকে সেই হাসির উৎসও হতে চাই। সুযোগটা পাব তো?" অদ্ভুত একটা কাতরতা ফুটে উঠল গলায়।

"যদি ভালোবেসে চান তবে অবশ্যই পাবেন, কিন্তু যদি করুণায় ভালোবাসাটা ঢাকা পড়ে যায় তখন কোনো সুযোগ পাবেন না। এখনো ভাবুন, আমার আর কোনো শক্তি নেই আরেকটা ধাক্কা সামলাবার। এবার কিছু হলে একেবারে গভীর খাঁদে পড়েই মরব হয়তো!"

"আমি শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগমুহূর্তে তোমার মুখটা দেখে মরতে চাই ঝুমু!"

গলাটা কী অদ্ভুতভাবেই না কেঁপে উঠল মৃদুলের।

"যাহ্! এমন সত্যিই হয় নাকি? সিনেমার স্ক্রিনে কিংবা বইয়ের পাতায় হয়।"

"আমরা নাহয় নিজেরাই একটা গল্প হব, সত্যিকারের গল্প!"

ঝুমুর মুখে হাসি ফুটে উঠল, সেই হারিয়ে যাওয়া উদ্ভাসিত হাসি। চোখের পানিও সেই হাসিকে একফোঁটা ম্লান করতে পারল না। অদ্ভুত অশ্রুসিক্ত হাসিমুখের পানে মোহাবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে রইল মৃদুল! কতদিন, কত মাস আর কত বছর পরে ওর অসুখের প্রতিষেধকের দেখা পেল!

.........

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ২৫