তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ২৯

🟢

"আমি একটা জায়গা চিনি, আমি নিশ্চিত সেখানে আপনি আপনার এক্সিবিশনের জন্য দারুণ কিছু ছবি ফ্রেমে ধরতে পারবেন। ঢাকার বাইরে অবশ্য। যাবেন?"

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল নবনী।

"কিন্তু এতদূর গিয়ে ফিরতে ফিরতে তো রাত হয়ে যাবে!" দ্বিধা নিয়েই বলল রায়ান।

"আপনি যতটা দূরে ভাবছেন আসলে এটা তত দূরে নয়। আর আমরা বাবার গাড়ি নিয়ে যাব। বাবাকে বলেছি আমি। আটটার আগেই ফিরতে পারব।"

রায়ান মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই নবনী বলল,

"আজাদ ভাইকে আজকে ছুটি দিয়ে দেই তাহলে। চলুন বেরোই, নয়তো আরও দেরী হয়ে যাবে।"

তাড়া লাগায় নবনী। আজাদ ওদের ড্রাইভার হিসেবে আছে তিন বছর প্রায়। ছুটি পেয়ে নিজের বাসায় চলে গেল, ছুটিটা ওর খুব দরকার ছিল, ওর ছয় বছর বয়সী মেয়েটা দু'দিন থেকে বাবার সাথে ঘুরতে যাবার বায়না ধরেছে, আজ নিয়ে যেতে পারবে।

জ্যাম পেরিয়ে ঢাকা ছাড়তেই দুপুর গড়িয়ে গেল প্রায়। গন্তব্যে যখন পৌঁছাল তখন প্রায় তিনটা বেজে গেছে। নবনী এখানে আগে এসেছিল কয়েকবার, হাতেগোনা যে দুই তিনটা ফ্রেন্ড ওর আছে ওদের সাথেই এসেছিল। সাথে ওদের আরও কিছু বন্ধুরা। জায়গাটা ওর এত ভালো লেগেছিল যে পরে বাবাকে নিয়েও এসেছিল একবার। এত দূরে বলে সচরাচর আসা হয় না ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও।

আজ ওর খুব ইচ্ছে করছিল ওর প্রিয় এই জায়াগায় নিজের সদ্য প্রিয় হয়ে উঠা মানুষটার সাথে কিছুটা সময় কাটাতে। নিজের ছোট্ট ভালোলাগাগুলোর সাথে একটুখানি পরিচয় করিয়ে দিতে। কখনো রায়ানের সাথে নিজেকে বাঁধতে পারবে কিনা জানে না নবনী, তাই টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি জমানোটাই ওর উদ্দেশ্য, যে স্মৃতি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাকি চলার পথের সঙ্গী করতে পারবে।

রায়ান এখানে নেমে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেল, জায়গাটা সত্যিই ভীষণ সুন্দর, একেবারে প্রকৃতির কাছাকাছি। রায়ান যে নিজের কাজের প্রতি কতটা প্যাশনেট এটা ওর ছবি তোলার ভঙ্গি দেখেই আঁচ করল নবনী। নিচে সবুজ ঘাসের চাদর আর চারপাশে নানা রকমের গাছপালায় ভর্তি। দূরের আকাশটা যেন গাছের সবুজের উপরে নীলচে চাদর বিছিয়ে রেখেছে। রায়ান সেটাকে ফ্রেমবন্দী করতে ব্যস্ত হয়ে গেল। ফটোগ্রাফির সময়টায় পুরো বুঁদ হয়ে থাকে ছেলেটা, যেন ওর ক্যামারায় ফোকাস করা অংশটা ছাড়া বাকি কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই পৃথিবীতে। নবনীর সহসা মনে হলো এই ছেলের জন্মটা বুঝি ক্যামেরার শাটার টেপার জন্যই হয়েছে!

রায়ানের এই একান্ত মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় নবনী,

"শুধু ছবি তুলেই পেট ভরবে বুঝি! চলুন আগে খেয়ে নেই। একটু পরেই আকাশ তার আসল সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হবে, সেটাকে ফ্রেমে ধরতে হবে তো?"

রায়ান মৃদু হেসে সম্মতি জানাল। নবনী যে আজ ওর সাথে আসার আগে বেশ প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে এটা বেশ বুঝতে পারল, খাবারের বক্স ভর্তি প্রায় টাটকা খাবারের ঘ্রাণ নাকে এসে লাগল। মেয়েটা সকালে উঠে রান্না করেছে এসব, আবার নিজে তৈরী হয়েছে। রায়ান কৌতূহল দমাতে না পেরে বলেই ফেলল,

"ওহ্ মাই গড! আপনি এতসব কখন করেছেন বলুন তো?"

"এত অবাক হচ্ছেন কেন? আর এতকিছু কোথায় দেখলেন? চামেলি সব গুছিয়ে দিয়েছে আমি কেবল রান্নাটাই করেছি। আর আমার রেডি হতে খুব একটা সময় লাগে না, আধাঘন্টা বড়জোর!"

অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে কথা বলল নবনী।

আজকের দিন রায়ানের জন্য আরও কত বিস্ময় জমা করে রেখেছে এটা এখনো জানে না ছেলেটা। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ওরা কিছুটা হেঁটে একটা দীঘি পেল, সেখানেই পার ঘেঁষে একটু দূরত্ব রেখে বসল দুজন। খুব বেশি লোক সমাগম এখানে হয় না এখানে। হালকা কোলাহল থাকলেও সেটা খুব একটা কানে লাগে না, সবমিলিয়ে দারুণ শান্ত একটা জায়গা বলাই যায়। দুজনের মনেই অজস্র না বলা কথারা যেন ছিপি খুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু দুজনেই সেটাকে চেপে রাখার চেষ্টা করছে প্রাণপণে।

দীঘির জলে ওদের ফুটে উঠা অবয়বে তাকিয়ে ছিল রায়ান আর নবনী আশেপাশে তাকিয়ে কিছুক্ষণ প্রকৃতিতে অনুভব করছিল। আচমকা রায়ানের বলা কথায় সচকিত হয় নবনী।

"আমার আপনাকে খুব করে জানতে ইচ্ছে করে নবনী।"

কথাটা যেন নবনীর ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল, কী যেন এক প্রলয় তুলল! তবে নিজেকে লুকানোর এক দারুণ প্রতিভা নিয়ে জন্মেছে মেয়েটা, তাই সামলে নিল সহসাই।

"কেন জানতে ইচ্ছে করে?"

একেবারে নির্লিপ্ত গলা ওর, ভেতরে বয়ে যাওয়া ঝড়ের বিন্দুমাত্র আভাস কন্ঠে নেই।

নবনীর এমন নির্লিপ্ততায় রায়ান কিছুটা দমে গেলেও নিজেকে থামাতে পারল না,

"আমার একেবারে ভেতরের চাপা যন্ত্রণা আপনার সাথে শেয়ার করেছি। কিন্তু কী আশ্চর্য দেখুন তো, আপনার কোনোকিছুই আমি জানি না! নিজেকে একটা শক্ত খোলসে মুড়িয়ে রাখেন সবসময়, ওই খোলসের ভেতরে যেই সত্যিকারের আপনি ঘাপটি মেরে আছেন, সেই আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে!"

ঘোরগ্রস্ত রায়ান একটানা বলল কথাগুলো, উত্তরটা এলো তাৎক্ষণিকভাবেই,

"আমার চারপাশে কোনো খোলস নেই, আপনি যেমন দেখছেন তেমনটাই আমি। রসকষহীন কাঠখোট্টা একটা মেয়ে আমি। এর বাইরে আর কিছুই নেই।"

বহুবছর পরে নিজের আত্মবিশ্বাসে কিছুটা যেন ভাটা পড়ল নবনীর, রায়ানের তীক্ষ্ণ নজরে এই কিঞ্চিৎ পরিবর্তন ঠিকই ধরা পড়ল।

"আচ্ছা এই প্রসঙ্গ থাক নাহয়। কিন্তু এছাড়াও আর একটা প্রস্তাব আছে আপনার জন্য, যদি অভয় দেন তবে সাহসে ভর করে বলে ফেলতে পারি।"

"কেন? ভয় পান নাকি আমাকে?" কিছুটা হেসে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ফিরল ও।

"ভয় না পেয়ে উপায় আছে কোনো?"

"আমি বুঝি এতই ভয়ংকর? ভূত-পেত্নীর মতো ঘাড় মটকে দেই নাকি রক্ত খেকো ভ্যাম্পায়ারের মতো রক্ত শুষে নেই? নই তো? তবে কীসের এতো ভয় আমাকে?"

ভীষণ সিরিয়াস গলায় কথাগুলো বলল নবনী। তবে রায়ান এবার আর অপ্রতিভ হলো না, অত্যন্ত সহজভাবে কপট ভীত হবার ভঙ্গি করে বলল,

"আপনি তার চাইতেও ভয়ংকর, কথার অগ্নিবাণ ছুঁড়ে দেন, সেই বাণ আমাকে একেবারে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দেয়।"

সহসা হোহো শব্দে হেসে উঠল নবনী, ওর হাসিতে যেন পুরো জায়গাটাই কেঁপে উঠল, সাথে আকাশ কাঁপল, বাতাসও কাঁপল! এবার রায়ান সত্যি সত্যি অপ্রতিভবোধ করল। এই মেয়ের সামনে কখনোই নিজেকে প্রকাশ করতে পারবে না এটাই মনে হলো ওর।

"আপনার প্রস্তাবটা কী সেটা নির্ভয়ে বলুন, আমি অভয় দিচ্ছি আপনাকে!"

হাসতে হাসতেই বলল নবনী।

রায়ান তবুও কিছুটা ইতস্তত করল, এই মেয়েটা আবার কীভাবে ওকে নাজেহাল করে তাই ভেবেই ওর এই সংকোচ!

"আরে বলুন না? বললাম তো আমি কোনো অগ্নিবাণ ছুঁড়ব না, দরকার হলে বরফের বাণেই কাজ চালাবো। আচ্ছা বরফের বাণ পাওয়া যায় তো? এস্কিমোদের ওখানে হয়তো পাওয়া যাবে, তাই না? আমি আসলে জানি না তো। তাই আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম।"

রায়ান বিস্মিত দৃষ্টিতে নবনীর দিকে তাকিয়ে থাকল, এই মেয়েটার সত্যিই মাথা খারাপ। সাথে এটাও বুঝতে পারল নবনী ইচ্ছে করেই এসব বলছে যেন রায়ান ওর ট্র‍্যাক থেকে ছুটে যায়। ওর কাছ থেকে কিছুই শুনতে চায় না মেয়েটা। ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত অভিমান হলো রায়ানের, কিছুটা রোখ চেপে গেল বলা যায়!

"জানি না কোথায় পাওয়া যায়। আপনি কি আমার কথাটা শুনবেন নাকি শুনবেন না?"

রায়ানের গলার স্বরে উপচে পড়া অভিমান নবনীকে স্পর্শ করল ভীষণভাবে।

"আচ্ছা, স্যরি। বলুন কী বলবেন?"

সবুজ সংকেত পেয়েও কিছুটা সময় নিল রায়ান। এরপর প্রায় হুড়মুড়িয়ে বলল,

"আপনি আমার সাথে বন্ধুত্ব করবেন নবনী? সত্যিকারের বন্ধুত্ব? আমার অগুণতি বন্ধু আছে, কিন্তু কখনো কারও সাথে প্রাণের বন্ধুত্ব হয়নি, যাকে নিজের ভেতরটা খুলে দেখানো যায়। আপনার কাছেই একমাত্র নিজেকে এক্সপ্রেস করেছি। কেন যেন খুব কাছের মনে হয় আপনাকে! হবেন আমার বন্ধু?"

রায়ানের কাতরতা নবনীকে যেন ছুঁয়ে গেল, খুব কষ্ট হলো ওর জন্য। একজীবনে মানুষের মনে কতগুলো হাহাকার জমে?

"করতে পারি, কিন্তু বন্ধুত্বে তো আপনি হয় না। এখন থেকে তুমি ই বলবে আমাকে। বুঝেছ?"

রায়ান নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারল না সহসা, প্রথমদিন এই 'আপনি' 'তুমি' বিতণ্ডায় কথা শুরু হয়েছিল ওদের। তখনো বুঝতে পারেনি ওরা যে এই সম্পর্কটা কখনো বন্ধুত্বে গড়াবে।

"আপনি আবার সেদিনের মতো ঝাড়ি দেবেন না তো?"

দ্বিধা পুরোপুরি সরে না রায়ানের।

"বন্ধুত্বের প্রস্তাব আপনার দিক থেকেই এসেছে কিন্তু। এখন দেখছি আপনারই অনীহা। থাক তবে!"

"আরে, তেমন কিছু না। তুমি যদি আবার বেঁকে বসো তাই বলা!"

"তুমি দেখছি এখনো আমাকে ভয় পাচ্ছ। বললাম তো আমি ভয়ংকর কিছু নই, রক্তমাংসের মানুষই।"

"মাঝে মাঝে কনফিউজড হয়ে যাই এটা নিয়ে, সত্যি সত্যিই তুমি রক্তমাংসের মানুষ তো?"

এবার নবনী কঠিন চোখে তাকাতেই রায়ান সশব্দে হেসে উঠল, রায়ানের হাসি যেন ছন্দ তুলল নবনীর কানে। এত সুন্দর করে কেউ হাসতে পারে জানা ছিল না ওর! হাসি ভর্তি শিশুসুলভ সরলতার ছাপ, সেই সারল্য হাসিকে যেন আরও মহিমান্বিত করেছে! নবনী মোহাবিষ্টের মতো তাকিয়ে রইল রায়ানের সেই অদ্ভুত সুন্দর হাসিতে!

মনে মনে ঠিক করল ওর জীবনের তিক্ত ঘটনাটা রায়ানকে বলবে এবার!

............

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ২৯