তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ২৬

🟢

রায়ানের অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে 'নাইভস আউট' মুভিটা দেখতে শুরু করেছে নবনী। ডেনিয়েল ক্রেইগ আর ক্রিস ইভান্স দুজনেই ওর পছন্দের অভিনেতা। মূলত এজন্যই দেখা শুরু করেছিল, কিন্তু এখন গল্পেই আটকে গেছে। রায়ান পৌঁছাতে পৌঁছাতে মাঝরাত পেরিয়ে যাবে। বাবাও অপেক্ষা করছিলেন, নবনী তাঁকে ঘুমাতে পাঠিয়েছে। চামেলি তো এগারোটার পরেই ঘুমিয়ে কাদা। ছবির সাসপেন্স যখন চরমে তখনই ওর ফোনটা বেজে উঠল। এতরাতে কে কল করবে ভেবে ফোনটা হাতে নিতেই যেন জমে গেল সহসা! রায়ান বাসায় এসে পৌঁছেছে হয়তো ভেবে ধরল ফোনটা। মেইন গেটের চাবি তো রায়ানের কাছে একটা আছে। তবে..

সাতপাঁচ ভেবে কলটা ধরল ও।

"হ্যালো, নবনী...

"রায়ান, কী হয়েছে? আপনার গলা এমন শোনা যাচ্ছে কেন?"

রায়ানের কাতর স্বর উদ্বেগ বাড়ালো নবনীর।

"আসলে একটা ছোট এক্সিডেন্ট..."

নবনীর ভেতরে হঠাৎ প্রবলভাবে ভাঙচুর হতে লাগল যেন!

"রায়ান, কী হয়েছে বলুন..."

"আপনি এত টেন্সড হবেন না, প্লিজ। এত চিন্তা করার মতো কিছু হয়নি। এখন ঠিক আছি..."

ভেঙে ভেঙে বলল রায়ান, কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে ওর।

"আপনি তো ঠিকমতো কথাই বলতে পারছেন না! ঠিক কীভাবে আছেন? কোথায় আছেন সেটা বলুন তো?"

"আমি তো রাঙামাটি থেকে ফিরছিলাম, প্রায় ঘন্টা তিনেক যাবার পর বাস থেমে যায়। হঠাৎ একটা গণ্ডগোল শুরু হয়। আমি মাঝামাঝি পড়ে যাই, আর ছুড়ির আঁচড় লেগে যায়। এখন স্থানীয় একটা হসপিটালে আছি। সকাল সকাল ঠিকঠাক চলে আসব। আঙ্কেল চিন্তা করবে বলেই আপনাকে বললাম।"

এতগুলা কথা একটানা বলে রীতিমতো হাঁপাচ্ছে ছেলেটা। আঘাত যে সামান্য নয় এটা এত দূরত্বে থেকেও ঠিকই বুঝতে পারল নবনী।

"জায়গাটা কোথায় সেটা বলুন? ভোর হবার খুব বেশি দেরী নেই, আমরা আসছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আর এক কাজ করুন এড্রেসটা নাহয় টেক্সট করে দিন।"

"শুধু শুধু ঝামেলা করে আসতে..."

"একদম বেশি বোঝার চেষ্টা করবেন না। ফোন রেখে এড্রেসটা পাঠান। আমি কিছুক্ষণ পরে আবার কল করব। চার্জ আছে ফোনে?"

"হ্যাঁ, তা আছে। আমি চলে আসতাম সকাল হলে!"

"আপনি সহজ কথা বোঝেন না? সবসময় বেশি বোঝেন কেন? আপনার কি মনে হয় দুনিয়ার সবাই আপনার জন্য ড্রাম ভর্তি সিম্প্যাথি নিয়ে বসে আছে? সময়মতো টুপ করে ঢেলে দেবার জন্য?"

বেশ রূঢ় গলায় বলল নবনী, ওর তেজোদ্দীপ্ত কথা শুনে রায়ান আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। এই মাথা খারাপ মেয়েটা কোন কথার কোন অর্থ দাঁড় করিয়ে ওকে অপ্রতিভ করে দেবে সেটা আগে থেকে একেবারেই বোধগম্য হয় না ওর কাছে! তাছাড়া মেয়েটা যে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এটাও উপলব্ধি করল রায়ান, তাই চুপচাপ মেনে নেয়াই সমীচীন মনে করল। খুব একটা শক্তিও পাচ্ছে না কথা বলার মতো।

রায়ানের আঘাতটা তেমন গুরুতর না হলেও খুব একটা হালকাও নয়। এরকম মারামারি সামনাসামনি দেখে অভ্যস্ত নয় রায়ান। রাস্তায় স্থানীয় দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল, ওদের বাসটা শুরুর দিকেই ছিল। কয়েকজন তাড়া খেয়ে হুট করে বাসে উঠে পড়ে, আর ওদের ধাওয়া করে আরও কয়েকজন উঠে আসে। বাসের ভেতরেটা নিমিষেই একটা ছোটখাটো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। রায়ান জানালার পাশের সিট মিস করেছে, তাই ভেতরের দিকের সিটেই বসতে হয়েছে। এক পর্যায়ে ছুড়িটা রায়ানের পাজরের নিচে লেগে যায়। নবনীকে সামান্য আঁচড় বললেও ক্ষতটা বেশ গভীরই। প্রচুর রক্তক্ষরণও হয়েছে। ভাগ্য ভালো কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ চলে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় রায়ানসহ সব হতাহতের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবস্থা খুবই নাজুক, একটা ওয়ার্ডে প্রায় গাদাগাদি করে নানাধরণের রোগী আছে। রায়ানের মনে হচ্ছে এখানে থাকলে সুস্থ হবার চাইতে আরও বেশি করে অসুস্থ হবার সম্ভাবনাই বেশি। এই দিকটায় কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া খুব জরুরী বলে মনে হচ্ছে ওর। তবে ডাক্তার ভদ্রমহিলা বেশ আন্তরিক ব্যবহার করেছেন ওর সাথে। এটাই স্বস্তির। ঘুমাবার চেষ্টা করল কিন্তু ব্যর্থ হলো। যত সময় গড়াচ্ছে পাল্লা দিয়ে ব্যাথাও বাড়ছে।

এখন মনে হচ্ছে নবনী আর আঙ্কেল এলে মন্দ হয় না খুব একটা। একবার ভাবল বাবাকে জানাবে কিনা! কিন্তু সাথে সাথে নাকচ করে দিল এই ভাবনা। শুধু শুধু তাঁকে চিন্তায় ফেলে লাভ নেই। সারাজীবন অনেক ভুগিয়েছে বাবাকে, এবার আর ভোগাবে না। জীবনের অর্ধেকটা তো ভুলে ভুলেই কেটে গেল, বাকিটা নাহয় একেবারে সংশোধিত হোক, শুদ্ধ হোক।

***

নবনী ফোন রেখে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল, ভেতরে কেমন যেন সব গুলিয়ে আসতে লাগল। কয়দিনেরই বা পরিচয় ওর রায়ানের সাথে! এত অল্প সময়ে হৃদয়ের এত কাছাকাছি আসা যায় বুঝি! অল্প দিনের পরিচিত এক যুবকের জন্য ভেতরটায় কেন এমন শূন্যতা তৈরী হয়? হৃদয়টা কেন এমন খাঁখাঁ পুড়ছে, জ্বলছে, লণ্ডভণ্ড হচ্ছে ভেবে পায় না নবনী!

কোনো কোনো মানুষ খুব কাছাকাছি থেকেও হৃদয়ের নাগাল পায় না, আঁতিপাঁতি ঘুরে মরে। আবার কেউ কেউ সহস্র ক্রোশ পথ প্রগাঢ় ভালোবাসা নিয়ে এক নিমিষেই ডিঙিয়ে হৃদয়ে আসন গেড়ে বসে যায়। হাজার চেষ্টা করেও তা দমানো যায় না। ভালোবাসা কী যে এক অদ্ভুত সমীকরণ! খুব কম মানুষই এই সমীকরণের সমাধান করতে পারে। নবনী তো অংকটা শুরুই করেনি ভয়ে, যদি উত্তরটা না মেলে!

দ্রুত পায়ে বাবার ঘরে গিয়ে তাঁকে ডেকে তুলল। মেয়ের চিন্তাক্লিষ্ট মুখ দেখে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন আফজাল সাহেব।

"কী হয়েছে রে মা? এমন লাগছে কেন তোকে?"

এতক্ষণ আটকে রাখা কান্নাটা এবার হুটোপুটি করে বেরিয়ে এলো, মেয়েকে এভাবে কাঁদতে দেখে ভারী বিচলিত হলেন তিনি।

"বাবা, আমাদের এক্ষুণি বেরোতে হবে। রায়ান..."

"রায়ান? রায়ানের কী হয়েছে? বল?"

অস্থির হয়ে পড়লেন সহসাই। বাবাকে আস্বস্ত করতে নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে নবনী বলল,

"এখন মোটামুটি ঠিক আছেন উনি। কিন্তু আমাদের যত দ্রুত সম্ভব বেরোতে হবে।"

নবনীর কাছে সবটা শুনে কিছুটা আস্বস্ত হলেন তিনি, ফজরের আযান হচ্ছে। আফজাল সাহেব উঠে নামায পড়লেন, নবনীও। চামেলিকে ডেকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে এক পৃথিবী চিন্তা মাথায় নিয়ে বাবার সাথে বেরিয়ে পড়ল নবনী!

***

আজ একটা জুয়েলারি শপে এসেছিল রুমু আর ঝুমু। দাদীর বালা বিক্রি করে বের হবার মুখে আচমকা শাফায়াতের সাথে দেখা হয়ে গেল। ওদের দেখে খুব বিশ্রী ভঙ্গিতে ক্যাটক্যাটিয়ে হেসে এগিয়ে এলো এদিকে।

"ঝুমু, কেমন আছ? শুনলাম বিয়ে করছ?"

রুমু খুব কঠিন চোখে শাফায়াতের দিকে তাকাল। ঝুমু অবশ্য এসব পাত্তা দিল না। কিন্তু শাফায়াতের পরের কথায় আর চুপ করে থাকতে পারল না,

"দেখে তো মনে হচ্ছে গয়নার দোকান থেকে বের হলে। বাব্বাহ্! রুমু, তোমাকে তো এমনি এমনি আমার ঘাড়ে গছিয়ে দিয়েছিল তোমার মা আর ভাইয়েরা। আরেক জনকে দেখি গয়না টয়না সব দেয়া হচ্ছে। এটা নিশ্চয়ই তোমার বোনের কীর্তিকলাপ ধামাচাপা দিতে, তাই না?"

দুজনেরই রাগে অপমানে গা গুলিয়ে এলো, কোনো মানুষ এতটাও নোংরা হতে পারে!

"আপনাকে কোনোদিন দুলাভাই বলে ডেকেছিলাম ভেবে নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হচ্ছে। একজন মানুষ তার আশেপাশের মানুষদের মানুষই মনে করে। আর মানুষরূপী অমানুষরাও নিজের আশেপাশের সবাইকে অমানুষ বলেই ভেবে নেয়। যার মনে নর্দমার ময়লা জমে থাকে সে আশেপাশের ভালো কিছুতেও ওই নোংরা ময়লাই দেখে। কারণ মনের ময়লা তার দৃষ্টিকে কলুষিত করে দেয়। সুন্দর কিছুতেও ময়লা দিয়ে দৃষ্টি ঢেকে যায়। তখন নোংরা নর্দমা ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। নিজেকে একটু বদলান, দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যাবে।"

কথা শেষ করে আর একমুহূর্তও দাঁড়ালো না দুই বোন। দৃঢ় পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে গেল। পেছনে ফেলে গেল ক্রোধে উন্মত্ত শাফায়াত কে। সারাজীবন ডমিনেট করে এসেছে সে, এখন ডিভোর্সের বেলায় সিদ্ধান্তটা রুমুর দিক থেকে আসায় ওর ইগোতে লেগেছে ভীষণভাবে। ভাবখানা এমন যে রুমুকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলবে, ইচ্ছেমতো পিষে মারবে। কিন্তু রুমু কিছু করতে পারবে না। উল্টো কেঁদে বুক ভাসাবে। কিন্তু এর একেবারে উল্টোটা হওয়ায় ও মেনে নিতে পারছে না। মেরুদণ্ড ভেঙে দেবার পরেও কী করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভেবে পেল না শাফায়াত। এটা ওর কাছে বিশাল এক পরাজয়। এটাই এভাবে ফুঁসে উঠার প্রধান কারণ!

***

রায়ানের মনে হলো সাদা পোশাকে আবৃত এক মায়াবতীর অস্পষ্ট ঝাপসা অবয়ব ওর দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, এটা কী কোনো ভ্রম! তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ, এদিকে ওই রহস্যময়ীর অবয়ব স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। ওর মনে হলো বুঝি বনলতা! না না, এই তো চিনতে পেরেছে। বনলতা নয় নবনী!

ধীরে ধীরে ভ্রমের জগত থেকে বাইরে বেরোল রায়ান, চোখ খুলে তাকাল। সত্যিই নবনী ওর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওর কৌতূহলী চোখ যেন ওকে নীরিক্ষণ করছে। পাশে একটা চেয়ারে আঙ্কেল বসে আছেন। দুজনেই ভীষণ চিন্তিত। কোনটা সত্যি আর কোনটা ভ্রম এটাই গুলিয়ে যাচ্ছে বারবার! এখন কেন যেন সহসা দুর্বলতা বেড়ে গেল ধাপ করে। গলা দিয়ে একটা কথাও বের হলো না। শুধু অস্ফুটস্বরে একটা কথাই বলল,

"পানি..."

এরপর আবার তলিয়ে গেল অতল গহ্বরে, যেখানে ঘুটঘুটে আঁধারের চাদরে মোড়া সবকিছু। পুরোপুরি আঁধারে তলিয়ে যাবার আগে একটা খুব পরিচিত গলার আর্তিতে নিজের নামটা শুনতে পেল কেবল।

.........

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ২৬