আজ আশরাফ আঙ্কেল দেশে আসছেন, কিন্তু রায়ান সকাল থেকেই কেমন গুম হয়ে আছে। হয়তো নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছে বাবার মুখোমুখি হবার জন্য। এই কয়েকদিনে ফোনে যতই সহজভাবে কথা বলুক সামনা-সামনি নতুনভাবে শুরু করতে কিছুটা জড়তা কাজ করাটাই স্বাভাবিক। এতটা ভুল বুঝেছিল বলে নিজের মধ্যে কিছুটা হীনমন্যতাও কাজ করছে।
নবনী যেন রায়ানকে পড়তে পারল,
"এত চিন্তার কিছু নেই। আঙ্কেলকে আপনার মুখে কিছু বলতে হবে না। শুধু শক্ত করে একবার জড়িয়ে ধরবেন, তাতেই সব বলা না বলা প্রকাশ হয়ে যাবে। বাবারা নিজের ভেতরে এক পৃথিবী ভালোবাসা জমিয়ে রাখেন, সেই ভালোবাসার ক্ষমতা এতই বেশি যে কিছু ঠুনকো মান অভিমান খড়কুটোর মতো তার প্রবল স্রোতে ভেসে যায়, বিলীন হয়ে যায়। সেই ভালোবাসাটাকে নিজের উপরে বইতে দিন শুধু।"
রায়ান ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কেবল, কিছুই বলল না মুখে। নবনীকে ওর অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে যদিও। কিন্তু এভাবে বলতে চায় না, কথাগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে তবেই বলবে নাহয়!
নবনী ওর আশেপাশে থাকলে ভীষণ প্রশান্তিতে সমস্ত হৃদয় ভরে উঠে, খুব করে কথা বলতে ইচ্ছে হয়। নিজের ফেলে আসা ভুলে ভরা জীবনের গল্পের মতো অন্য গল্পগুলোরও ঝাঁপি খুলে দিতে ইচ্ছে হয়। নবনীর ভেতরটাও জানতে ইচ্ছে হয় ভীষণভাবে, ওই অতল হৃদয়ের গহীনে কী লুকানো আছে তাও জানার কৌতূহল তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। সহসা নিজের এমন ইচ্ছের কোনো যুক্তি খুঁজে পেতে ব্যর্থ রায়ান। এটা কী নিছকই কৌতূহল নাকি অন্য কোনো পিছুটান ওকে প্রবলভাবে টানছে কিছুই বুঝতে পারে না! তাই আগে নিজের মনকেই কিছুটা সময় দেয়, নিজের মনের আসল চাওয়াটা কী তা আগে ঠিকঠাক বুঝে শুনে তারপর পা ফেলতে চায়! এটা কী কেবলই মোহ, ঘোর নাকি আসলেই মায়ার টান? এই উত্তর পাওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এটুকু সাবধানী তো এবার হতেই হবে!
চামেলি মাঝে দু'দিন এসেছিল, সে কী কান্নাকাটি ওর! অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করা গেছে ওকে। রায়ান তো রীতিমতো বিব্রত হয়েছিল এমন কান্নায়। ওকে নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসে মেয়েটা। এত স্নেহ ভালোবাসায় অনভ্যস্ত বলেই হয়তো লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল বেচারা। তবে চামেলির এই নিঃস্বার্থ আবেগ ওর খুব ভালোও লেগেছে। কিছু কিছু মানুষ অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকে, ওরাই জীবনে দারুণ সুখী হতে পারে।
হাসপাতালের এই কেবিনের দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ি জানান দিচ্ছে রাত দশটা বিয়াল্লিশ। আফজাল সাহেব মাত্র কল করে জানালেন পৌঁছে গেছেন প্রায়, মিনিট কয়েক লাগবে আর। নবনী ভীষণ আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করছে সুদীর্ঘ বিচ্ছেদের পরে বাবা ছেলেতে মিলে যাবার মুহুর্তের সাক্ষী হবার জন্য। আর রায়ানের মনে তীব্র এক উৎকন্ঠা চেপে বসেছে। ভীষণ অস্থিরতা অনুভব করছে, একেকটা ক্ষণ পেরুচ্ছে ওর উৎকন্ঠার মাত্রা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
সহসা ভারী পায়ের আওয়াজে সচকিত হলো রায়ান। এই তো একজন ভেতরে ঢুকলেন, ভীষণ পরিচিত, ভীষণ কাছের অথচ কতটা দূরে তাঁর বাস ছিল। এই পাহাড় প্রমাণ দূরত্ব কী করে এই কয়েকটা মুহূর্তে কাটবে?
রায়ান বসেই ছিল, নামার চেষ্টা করতেই আশরাফ সাহেব ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এলেন, ক্ষতটা এখনো শুকায়নি বলে নড়াচড়া করলেই তীব্র ব্যথা টের পাওয়া যায়। ক্ষত বাঁচিয়ে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরলেন ছেলেকে। রায়ান যেন তখন অবুঝ শিশু। নিজের বয়স, স্থান, কাল পাত্র ভুলে বাবার বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। আশরাফ সাহেব শুরুতে কিছুটা ভড়কে গেলেও দ্রুত সামলে নিলেন নিজেকে, চোখ ভিজেছে তাঁর ও। ছেলেকে জড়িয়েই এক হাতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, মুখে কিছু বললেন না।
কথাগুলো নাহয় নৈশব্দেই হোক, নৈশব্দের ভাষা কখনো কখনো প্রকাশিত শব্দের চেয়ে সহস্রগুণ শক্তিশালী আর প্রগাঢ় হয়। এখন যেমন হচ্ছে।
একটা অদ্ভুত তৃপ্তির ছটা খেলে গেল তাঁর অবয়বে। কখনো ছেলেটাকে এতটা কাছে টেনে নিতে পারবেন জীবদ্দশায় এই আশাটুকু প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতিদিনের ফরিয়াদ শুনেছেন এবং উত্তম প্রতিদান দিয়েছেন। ছেলেকে বাবার কোলে ফিরিয়ে দিয়েছেন। মনে মনে কতবার যে শুকরিয়া আদায় করলেন নিজেই জানেন না! আর্দ্র চোখে ছেলেকে আঁকড়ে বসেই থাকলেন কেবল। কত দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এমন ক্ষণ এলো, মাহেন্দ্রক্ষণ!
***
প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে, রুমু ডিভোর্স ফাইল করেছে। শাফায়াত রীতিমতো হুমকি ধামকি দেয়া শুরু করেছে। কীকরে ছেলেদের নিজের কাছে রাখতে পারে রুমু তাই দেখবে সে। এককালে সক্রিয় ছিল ছাত্ররাজনীতিতে। সেই সুবাদে কিছু বড় বড় আমলাদের সাথে উঠা বসা আছে ভালোই। তাই এই আস্ফালন ঝরছে ওর মুখে। ওর এসব ধামকি তে রুমু কিছুটা শঙ্কায় আছে। কারণ ওর নিজের এত ক্ষমতার দৌড় নেই। আসলে একমাত্র মনোবলকে সঙ্গী করেই যুদ্ধে নেমেছে ও! নিজেকে ঢাল তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সর্দার বলেই মনে হচ্ছে রুমুর।
তবে এরমধ্যে অপ্রত্যাশিত একজনের সাপোর্ট পেলো একেবারে হুট করেই। একদিন শাশুড়ির কল পেল রুমু, ওকে অবাক করে দিয়ে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে বললেন,
"রুমু, তোমারে অনেক উল্টাপাল্টা কথা বলছি মাঝেমইধ্যে। মনে কিছু রাইখ না মা। আমার ছেলে যে একটা কুলাঙ্গার হইছে এইটা আগে বুঝি নাই। তোমার মতো এমন ভালো একটা বউ পাইল কিন্তু ধইরা রাখতে পারল না। আমারও ওরে ঠিকঠাক শাসন করার দরকার ছিল।"
"মা, আপনিও মনে কিছু রাখবেন না। আর এভাবে বলবেন না। আপনি আমার আরেকটা মা'ই। নিজের যত্ন নেবেন মা। আর হয়তো কথা হবে না এভাবে। সম্পর্ক বদলে যাবে।"
শাশুড়ির সাথে সবসময় একটা দূরত্ব ছিল রুমুর। হয়তো মায়ের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে না করে ওকে বিয়ে করেছিল বলেই সবসময় একটা দেয়াল তুলে রেখেছিলেন চারপাশে। মাঝেমধ্যে কিছু কটু কথাও শুনিয়েছেন। কেমন একটা নির্লিপ্ত ব্যবহার করেছেন সবসময়, অথচ আজ একেবারে শেষ মুহূর্তে একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে এসব বলে কেমন একটা সূক্ষ্ম মায়ায় বেঁধে নিলেন। সম্পর্ক শেষ করতে চাইলেই কী এত সহজে শেষ হয়ে যায়? কত স্মৃতি, কত স্বপ্ন সব তো এক নিমিষেই গুড়িয়ে দেওয়া যায় না, তা যতই তিক্ততায় শেষ হোক, কষ্ট সমানই হয়।
"আমার দোয়া সবসময় তোমার সাথে থাকব মা। তামিম আর নাঈম তোমার কাছেই ভালো থাকব আমি জানি। কোনো মায়ের কাছেই তার সন্তান খারাপ থাকে না। আমি চেষ্টা করব শাফায়াতরে বোঝানোর, বাপ হয়ে ছেলেদের ক্ষতি হবো এমন কিছু যাতে না করে। এইটা অন্যায় হবে, মহা অন্যায়।"
শাশুড়ি কেঁদে ফেললেন, রুমুর চোখও ভিজে আসল। এই স্নেহের দেখা একেবারে শেষ মুহূর্তে কেন পেল ও? মায়ার বোঝাটা আরও ভারী হলো, ভীষণ ভারী।
"আমার নাতি দুইটারে মাঝেমাঝে আমারে দেখায়ে নিয়ে যাইয়ো মা। ওদের বইলো ওদের একটা দাদী ছিল, আমারে ভুইলা যাইতে দিও না। আমি খুব খারাপ শাশুড়ি ছিলাম, কিন্তু ওদের তো আদরে কোনো কমতি করি নাই, করছি? তুমি বলো?"
সব বাঁধ ভেঙে হুহু করে কেঁদে ফেললেন তিনি, এটা একেবারে সত্যি, রুমুকে পছন্দ না করলেও নাঈম আর তামিমকে বাস্তবিকই অগাধ স্নেহ, মমতা দিয়েছেন তিনি। এই কান্নায় কোনো কৃত্রিমতা নেই, সত্যিকারের বুক ভাঙা আর্তি।
রুমুর বুক নিংড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, এই মাতৃসম মানুষটাকে নিরাশ করতে ইচ্ছে হলো না। কথা দিল যোগাযোগ রাখবে। ওর ছেলেরাই কেবল এই সম্পর্কের সুতো! ডিভোর্স হয়ে গেলে রুমু আর ওই বাড়ির কেউ না, কিন্তু ওর সন্তানদের শরীরে তো ওই বাড়িরও রক্ত বইছে। এটা তো অস্বীকার করা যায় না! তবে শাফায়াত ওকে হারাতে কী কী করে না করে এটাই শঙ্কার!
***
রায়ান এখন পুরোপুরি সুস্থ, নিজের কাজও শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু সবাই মিলে ধরে বেঁধে ওকে ঢাকার বাইরে যেতে দেয়নি। ওর বাবা তো রীতিমতো ধমকেছেন। যতবার বাবা স্নেহের হাত বাড়ায় ততবারই যেন ও নিজের কাছেই ছোট হয়ে যায়। এমন বাবাকেও ভুল বোঝা যায় বুঝি!
বাবা ফিরে যাবেন দ্রুতই, তিন সপ্তাহ হয়ে গেছে এসেছেন তিনি। আর এক সপ্তাহ আছেন। রায়ানের কাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে। এমনিতেই নানা ঝামেলায় পিছিয়ে পড়েছে। এই তিন সপ্তাহে দুই বন্ধু ভীষণ নস্টালজিক হয়ে পড়েছেন, নিজেদের ফেলে আসা রঙিন মুহূর্ত ক্ষণে ক্ষণে উঠে আসছে আড্ডায়। রায়ান, নবনী আর চামেলি সেই তুমুল আড্ডার নির্বাক দর্শক মাত্র। নির্বাক হবে না-ই বা কেন, তাঁদের কথার মধ্যে কথা বলার কোনো সুযোগ পেলে না কথা বলবে!
মাঝে চন্দ্রকে স্কুলে ভর্তি করে এসেছে। চন্দ্রর মায়ের কন্ডিশন খারাপের দিকে। ডাক্তার বলেছে আশা কম। খুব বেশি সময় নেই। রায়ান এটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়েটাকে জানাতে পারছে না। মায়ের মৃত্যু সন্তানের উপর কতটা প্রভাব ফেলে এটা ও খুব ভালো করেই জানে। তবে বলতে তো হবেই।
আজ বেরুচ্ছিল তখন নবনী সহসা পথ আটকে দাঁড়ালো,
"আমিও যাব আপনার সাথে। কোনো বাহানা শুনব না। আপনার ফ্যাচফ্যাচে এক্সকিউজও শুনব না।"
দৃঢ় গলায় বলল নবনী, রায়ানকে সম্মতি দিতেই হলো।
নবনীর দিকে চোখ তুলে তাকাতেই সহসা থমকে গেল। শাড়ি পরেছে মেয়েটা, কালো রঙের তাঁতের শাড়ি। কী দারুণ মানিয়ে গেছে। চোখের কাজল যেন ওকে একেবারে আলাদা করে দিয়েছে। কয়েকদিন থেকে খুঁচিয়ে মারছে অন্য এক অনুভূতি। সেজন্যই কি ওর চোখে মেয়েটাকে এমন মায়াময় লাগছে! জানে না রায়ান, চোখ নামিয়ে নিল দ্রুত।
নবনীর প্রতি ওর সদ্য জন্মানো একান্ত অনুভূতিগুলো একেবারেই মনের গহীন থেকে উৎসারিত কিনা তাই দেখতে চায় ও, শুধু চোখের ভালোলাগার গুরুত্ব আপাতত একেবারেই দিতে চায় না রায়ান। তাই চোখের এই তাৎক্ষণিক অবনমন। নবনীকে সঙ্গী করে পা বাড়াল ওর গন্তব্যে।
কিন্তু ওর ভেতরে এক ভয়ংকর দ্বিধা আসন গেড়ে বসে আছে, এই পাথর হৃদয় মেয়েটা ওর প্রতি যে অনুগ্রহ কিছুদিন থেকে দেখাচ্ছ, রায়ানের অনুভূতি জানলে ওই অনুগ্রহ চিরতরে হারিয়ে যাবে না তো! এই ভাবনা ঠেলে সরিয়ে দিল, আগে নিজের কাছে তো পরিষ্কার হোক, বাকিটা নাহয় পরেই ভাবা যাবে!
...........