তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ১৪

🟢

ঝুমুর পরিবর্তিত আচরণে সবাইকে কিছুটা অবাক করে। হঠাৎ করে ভীষণ চুপচাপ হয়ে যায় মেয়েটা, জিজ্ঞেস করলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। ভ্যাপসা গরমেও চোখ-মুখ ঢেকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকে। পরিবারের বাকি সদস্যরা চিন্তিত হয়, কী এমন হলো যে এমন ডানপিটে মেয়েটা নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকল? সবাই জিজ্ঞেস করে করে হাল ছেড়ে দিল।

সপ্তাহখানেক পরে রুমু ঘুমাতে আসতেই ঝুমু বলছিল,

"আপা, তোমার সাথে আমার কথা আছে।"

রুমু হাই তুলতে তুলতে বলেছিল,

"তোর কথা কাল শুনব ঝুমু। আমি ঘুমাব, ঘুমে আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসছে।"

"খুব জরুরী কথা আপা। এখন না শুনলে হয়তো আর কখনো বলাই হবে না!"

ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখেই রুমু বলে,

"কী বলবি বল? শর্টকাটে বলবি কিন্তু।"

ঝুমুর একবার মাথায় কিছু চাপলে সেটা ও করবেই, এরজন্য মাঝে মাঝে এমন ভড়কে দেবার মতো অনেক কথাই ও বলে থাকে। তাই প্রথমে খুব একটা পাত্তা দিল না।

মুহূর্ত কয়েক কেটে গেলেও ঝুমু কথা শুরু করল না, মাথা নীচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। উড়নার কোণা দু'হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বসে ছিল। বোনের এমন হাবভাব দেখেই রুমুর ঘুম সহসা উড়ে গেল, ঝুমু ভীষণ স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড। যা মনে হয় মুখের উপর ধাপ করে বলে দেয়, কাকে বলছে সেটার তোয়াক্কা করে না। সেই মেয়ে যখন এভাবে কাঁচুমাচু মুখে বসে থাকে তখন ব্যাপারটা সাংঘাতিক না হয়েই যায় না! ঝুমুর পাশ ঘেঁষে বসে উৎকন্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করল রুমু,

"তোর কী হয়েছে রে ঝুমু?"

চোখ তুলে একবার বোনের দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল ও।

"আমি খুব খারাপ একটা কাজ করে ফেলেছি আপা। জঘন্য কাজ! আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। তোরা সবাই বলতি, আমি নাকি খুব সাহসী! তোরা সবাই ভুল বলতি। আমার একফোঁটাও সাহস নেই। নইলে মরতে পারলাম না কেন?"

রুমু বিস্ফোরিত চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে, এসব কী আজেবাজে কথা বলছে মেয়েটা! ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত ভয় এসে ভর করছে!

"এসব কী বলছিস? কেন বলছিস? আল্লাহর ওয়াস্তে বল কী হয়েছে।" ঝুমুর কাঁধ ঝাকিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠে রুমু।

ভয়ার্ত দৃষ্টিতে রুমুর দিকে একবার তাকিয়ে নিজের পেটের উপরে হাত রেখে একেবারে ক্ষীণ স্বরে বলে,

"এখানে বেড়ে উঠছে আরেকটা প্রাণ, আরেকটা অস্তিত্ব! বল না আপা, আমি কী করব? মরে যাব?"

রুমুর মাথা ঝিম ধরে আছে, নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। গা গুলিয়ে আসছে, এত বোকা তো ঝুমুকে কোনোদিন মনে হয়নি ওর। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সেই ভয় আরও বেড়ে গেল সাফিয়া বেগম হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকতেই! ঠান্ডা মেজাজের মা'কে কখনোই এমন রেগে যেতে দেখেনি ওরা। তিনি ঝুমুর হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে এলোপাথারি মারতে লাগলেন। রুমু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকল কেবল। মনসুর আলী সহ ওর ভাইয়েরাও চলে এসেছে ততক্ষণে। সেদিন সাফিয়ে বেগম রাগে অন্ধ হয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে কেবল মেরেই গেলেন। ঝুমু ছোট মেয়ে হওয়ায় সবার খুব আদরের। কোনোদিন মার খায়নি। প্রথমবার ওরকম মার খেয়েও নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে রইল। হয়তো সব অনুভূতি মরে গিয়েছিল!

ভাইয়েরা অনেক চেষ্টায় সরিয়ে নিয়েছিল মা'কে। আর মনসুর আলীর বুকের ব্যথা আচমকা বেড়ে গেল।

সাফিয়া বেগমকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন, রুমে ঢুকে বিছানায় বসে পড়লেন। উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কেবল অস্ফুট গলায় একটা কথা বলছিলেন,

"আমি শেষপর্যন্ত একজন ব্যর্থ পিতা হয়ে গেলাম, সাফিয়া। আমি ওদের ঠিকঠাক শিক্ষা দিতে পারিনি। আমাদের ভুলটা আসলে কোথায় ছিল বলতে পার?"

বুকে ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকল, সাফিয়া বেগম হাজারটা ঝড়-ঝঞ্ঝা সামলেও কখনো ভেঙে পড়েননি, সেই রাতে তিনি ভেঙে গুড়িয়ে গেলেন।

ঝুমুকে ফেলে মনসুর আলীকে নিয়ে সবাই ছুটে গেল হাসপাতালে।

সেই রাতের কথা মনে হতেই রুমু আবারও শিউরে উঠল। কী এক অশুভ রাত! এতদিন পরেও সেই অনুভূতি ফিরে আসল কেন যেন! তামিম ঘুম ভেঙে মা'কে ডাকতেই সচকিত হলো ও। নিজেকে ধাতস্থ করে ছেলের কাছে গেল। ভাগ্য ছোট্ট নিষ্পাপ ছেলেটার জীবন শুরু হওয়ার আগেই 'মা নাকি বাবা' এমন কঠিন দোলাচালের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে চাইছে। ছেলেরা মাকে বুঝতে পারবে তো? কী ভীষণ নিরুপায় হয়ে ওকে এই পথে হাঁটতে হচ্ছে, সেটা অনুধাবন করতে পারবে তো?

***

"বাবা, ওষুধ খাওনি কেন এখনো?"

"এই তো এখনই খাব। তুই এদিকে আয় তো, আমার পাশে একটু বস।"

নবনী হেসে বাবার পাশে বসল।

"বলো কী বলবে?"

"তোর অনেক তাড়া মনে হচ্ছে!"

"না না, তেমন কিছু না। তোমার ঘুমানোর সময় হয়ে যাচ্ছে তাই।"

"কয়েকদিন ধরে দেখছি তুই কিছুটা চুপচাপ। কী হয়েছে বলবি?"

নবনী মুখে অপ্রস্তুত একটা হাসি ফুটিয়ে বলল,

"বাবা! তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি যেন খুব বাচাল গোছের মেয়ে, সারাক্ষণ কথাই বলি! আমি তো এমনই।"

"না, তবুও। তোকে খুব ভালো করে চিনি তো। এরজন্যই মনে হলো সারাদিন কিছু একটা চিন্তা করিস। সেটা কী নিয়ে, তাই জানতে চাই?"

মুহূর্তেই হাসি মিলিয়ে গেল, এমন একটা সূক্ষ্ম জিনিসও কী করে বাবার চোখে পড়ল? নাকি নিজেকে পুরোপুরি লুকাতেই পারেনি। উত্তর না পেয়ে বাবা আবারও বললেন,

"মা রে! বিয়ে নিয়ে এবার একটু ভাবা যায় না?" গলায় কী যে কাতরতা!

নবনী বাবার দিকে তাকাল, ভালোভাবে দেখল একবার। এরপর ওর সমস্ত কাঠিন্য গলায় ঢেলে ঠান্ডা গলায় বলল,

"আমাকে তাড়ানোর এত তাড়া তোমার? এই যে নিজের ওষুধটাও ঠিক মতো মনে করে খেতে পার না, আমি চলে গেলে কী করে চলবে তোমার?"

বাবার চোখ সহসা ভিজে উঠল, এত ভালোবাসার ভার তিনি নিতে পারছেন না। তাঁর জন্যই যে মেয়েটা সামনে এগুতে পারছে না, নিজের জীবন সাজানোর চিন্তা করার বদলে তাঁর জন্যই ভাবছে! এটা তিনি ভালোভাবেই জানেন। নিজেকে কেন যেন সহসা ভারী এক বুঝা মনে হতে লাগল! শুধু কষ্ট না, ভালোবাসাও মাঝেমধ্যে হৃদয়ে পাথর ভার চাপিয়ে দেয়, কষ্টের কারণ হয়!

দু'দিন পরের এক সন্ধ্যায় চামেলি ডাইনিং টেবিলটা গুছিয়ে রান্না ঘরে এসে ছোটোখাটো একটা ধাক্কার মতো খেল! নবনী চুলায় দুধ চাপিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। দুধ উথলে পড়ছে, আর নবনী স্থির দৃষ্টিতে কোথাও তাকিয়ে আছে, আদৌ কিছু দেখছে বলে মনে হচ্ছে না! সামনে তাকিয়ে থাকলেও দৃষ্টি যেন অন্য কোনো জগতে। চামেলি প্রায় দৌড়ে এসে চুলা বন্ধ করতেই নবনী সম্বিতে ফিরল।

"আফা, আফনের কী শরীল খারাফ লাগতাছে?"

চামেলির জিজ্ঞাসু দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে অপ্রস্তুত হেসে বলল,

"হ্যাঁ রে, মাথাটা ধরেছে একটু। এটা একটু পরিস্কার করে নে। আমি গেলাম।"

নবনীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল বিস্মিত চামেলি। নবনীর এমন উদাসীনতা কোনোদিন দেখেনি ও, রান্নার সময় তো নয়ই! ভীষণ মনোযোগ দিয়ে কতটা যত্ন রান্নায় ঢেলে দেয় তা ও জানে।

ঠিক এর পরেরদিন দুপুরে সহসা নবনীর প্রশ্নে চমকে উঠল চামেলি। চিরচেনা নবনীর কাছ থেকে এমন প্রশ্ন কখনো আশা করেনি ও।

"তুই কখনো কাউকে ভালোবেসেছিলি?"

পেঁয়াজ কাটছিল ও, হাত থেমে গেল একেবারে। যাকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছিল, বিয়ের একবছরের মাথায় সে আরেকটা বিয়ে করে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিল। ওর বিশ্বাস, ভালোবাসা সব পায়ে দলে। আর কখনো ভালোবাসার সাহস করেনি। পরে অবশ্য আবার ঘর বেঁধেছিল, কিন্তু সেটাও টেকেনি বেশিদিন। নেশাখোর স্বামীর স্বেচ্ছাচারিতা আর মারধরে বীতশ্রদ্ধ চামেলি সেই যে বেরিয়ে এলো, আর কোনোদিন সংসার গড়ার কথা ভাবেনি। এরপরই তো এই নিরাপদ আশ্রয়টা জুটলো কপালে। এই বাবা মেয়েই তো ওর সব বর্তমানে। রক্তের সম্পর্ক না থেকেও তার চাইতেও কাছের, সম্পর্কটা আত্মিক!

সেসব দুঃসহ স্মৃতি আর মনে করতে চায় না ও,

"আমগোরে মন থাকলে না ভালোবাসা থাকপ আফা। আমি হইলাম জলে ভাসা পদ্ম গো আফা। ভাসতে ভাসতেই নাই হয়ে যাই। কোনো দাম নাই দুনিয়াত।"

চোখের পানিতে গাল ভেসে যাচ্ছে, অথচ হাসার চেষ্টা করছে মেয়েটা।

"আইজকার পিঁয়াইজডার তেজ দেখছেন গো আফা, চোক্ষের বেবাক পানি বাইর কইরা দিতাছে!"

নবনীর ভীষণ মন খারাপ হলো, কান্না পাচ্ছে কেন যেন! চামেলি তো কান্নার দায় পেঁয়াজের ঘাড়ে চাপিয়ে দিল, ওর তো সেই উপায়ও নেই!

যেদিন থেকে ভীষণ লম্বা একটা সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে সেদিন থেকেই কেন যেন একটা উৎকন্ঠা ঘিরে ধরেছে! দিন গুনে চলছে নিজের অজ্ঞাতেই! নিজের মনের এই আচমকা উদ্ভব আচরণের কোনো ব্যাখ্যা নেই ওর কাছে। প্রাণপণে এটাই চাপা দিতে চেষ্টা করে চলছে অনবরত!

ঠিক নয় দিনের দিন দুপুরের আগে আগে বাসার কলিং বেল বেজে উঠল। বাবা বাসায় নেই, চামেলি ছাদে কাপড় মেলে দিতে গেছে। অগত্যা নবনী কেই যেতে হলো দরজা খুলতে।

দরজা খুলতেই কেন যেন হৃদয় যন্ত্রের গতি বেড়ে গেল হুড়হুড়িয়ে! চেয়েও সেটার নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয় নবনী! আপাদমস্তক রায়ান দাঁড়িয়ে আছে সামনে।

সুন্দর মুখটা ক্লান্তিতে কিছুটা মলিন হয়ে আছে, স্বভাব সুলভ হাসিটাও অনুপস্থিত। ঘন পাপড়ির গভীর কালো চোখ জোড়ায় রাজ্যের ক্লান্তি ভর করে আছে যেন! রায়ানের জন্য সহসা মায়া অনুভব করল, প্রগাঢ় মায়া!

.............

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ১৪