সেই যে দুপুরে ঘুমিয়েছিল রায়ান, সেই ঘুম ভাঙল একেবারে সন্ধ্যা পেরিয়ে। ঘুম ভাঙার পর খানিকটা সময় লাগল নিজেকে ধাতস্থ করে নিতে, যখন বুঝতে পারল কোথায় আছে তখন চোখ মেলে চারপাশে তাকাল। রুমটা যথেষ্ট বড় আর খুবই পরিপাটি করে সাজানো। জেট লেগ কাটেনি পুরোপুরি, মাথাটা তাই এখনো ঝিম ধরে আছে। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশে ও কখনোই ঘুমাতে পারে না, কিন্তু আজ ঘুমিয়েছে একেবারে নিশ্চিন্তে। চা বা কফি কিছু দরকার এই বিরক্তিকর ঝিমুনিটা কাটানোর জন্য। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল ও। ফ্রেশ হয়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে ইতি-উতি তাকাতে লাগল। চামেলিকে বললে নিশ্চয়ই চায়ের বন্দোবস্ত করে দেবে। কিন্তু আশেপাশে কোথাও ওকে দেখতে পেল না রায়ান। ভাবল রান্নাঘরে আছে কিনা! দুপুরে খাবার সময় নবনী আর চামেলিকে ওদিকটায় আসা-যাওয়া করতে দেখেছিল বলে সেদিকেই পা বাড়াল। রান্নাঘর থেকে গুনগুন ভেসে আসছে,
"আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে"
উঁকি দিতেই নবনীকে দেখল চুলায় কী যেন করছে আর আনমনেই গুনগুনিয়ে গাইছে। মেয়েটার গানের গলা মনে হয় ভালোই! এখন এই মেয়ের মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করছে না বলে ইউটার্ন নিচ্ছিল তখনই পেছন থেকে নবনীর গলা শুনতে পেল,
"আপনি উঠে গেছেন দেখছি। ঘুম কেমন হলো?"
"ফার্স্ট ক্লাস। আচ্ছা, চামেলি কোথায়?"
"চামেলি? ওকে এখন আপনি কোত্থাও পাবেন না। ওর এখন সিরিয়াল সন্ধ্যা চলছে। ক্রেন দিয়ে টেনেও ওকে টেলিভিশনের সামনে থেকে নড়াতে পারবেন না। কিছু লাগলে আমাকে বলতে পারেন।"
"সিরিয়াল সন্ধ্যা মানে?"
"ওই তো, ইন্ডিয়ান সিরিয়াল চলছে। আর চামেলি সেসব গিলে গিলে খাচ্ছে।"
চামেলির আশায় বসে থেকে লাভ নেই জেনে মুহূর্তকাল ইতস্তত করে শেষমেশ বলেই ফেলল রায়ান,
"চা বা কফি কিছু পাওয়া যাবে? না মানে.. আসলে ওই জেট লেগ... আপনি কোথায় কী আছে দেখিয়ে দিলে আমি নিজেই বানিয়ে নিতাম..."
এটুকু বলতেই নবনীর চোখে চোখ পড়ল আর ওখানকার উত্তাপ টের পেয়ে ধপ করে কথা আটকে গেল গলাতেই!
আর অপর প্রান্ত থেকে ওর দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করল কথার মর্টার শেল!
"আপনি কি সবসময়ই এরকম বেশি বোঝেন নাকি?নিজেকে কী মনে হয় আপনার? আপনি একাই সব সভ্যতা, ভব্যতা রপ্ত করেছেন, আর বাকিরা সব অভদ্র, অসভ্য?"
ভীষণ উত্তেজিত গলায় কথাগুলো বলল নবনী। এরপর আচমকা নিজেকে সামলে নিয়ে অসম্ভব ঠান্ডা গলায় বলল,
"যান, ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসুন। আমি আসছি।"
নবনীর হঠাৎ এই রুদ্রমূর্তির সামনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ও, পা যেন নড়ছেই না!
"কী হলো? যান!"
এবার সচকিত হলো কথার বাণে বিদ্ধ রায়ান, টলটলে পায়ে বেরিয়ে এলো সেখান থেকে, গন্তব্য ড্রয়িংরুম। বেচারা এখনো বুঝতে পারছে না ওর ভুলটা কোথায় ছিল!
আর ওদিকে নবনী রাগে গজগজ করছে। নিজের জন্য চা বানাচ্ছিল ও, আর রাতের খাবারের ব্যবস্থা করছিল। আসলে রায়ানের নিজে বানিয়ে নেবার কথাই তাতিয়ে দিয়েছে ওকে। একেতো দুপুরের খোঁচাটা এখনো পুড়াচ্ছে, বাবা ওর দিক যেভাবে তাকিয়েছিলেন, উনি কী বুঝতে কী বুঝেছেন কে জানে! নেহায়েত ভদ্রতা বসত তখনই কিছু বলে বসেননি। তবে এটা নিয়ে যে উনি কথা শোনাবেন, এটা নবনী জানে। তার উপর এখন এরকম কথা! রায়ানের এই নির্দোষ ইচ্ছেটাও তাই ও সহজভাবে নিতে পারল না। বেচারি ভাবল এবারও বুঝি ওর গা জ্বালাতেই ওই কথাটা বলেছে।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই নবনী ট্রে হাতে নিয়ে ড্রইংরুমে এলো। রায়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল ধোঁয়া উঠা মগ। সেটা নিতে নিতে রায়ান বলল,
"আপনি কি সবসময় এমন রেগেমেগে এ্যাংরি বার্ড হয়ে থাকেন নাকি?"
নবনী উত্তর না দিয়ে কটমটিয়ে তাকাল কেবল।
তা দেখে আবারও বলল,
"আসার পর থেকে দেখছি বলেই বললাম। যেকোনো কারণেই হোক, আমাকে আপনার পছন্দ হয়নি, সেটা বেশ বুঝতে পারছি। কিন্তু কারণটা কী তা জানি না। সেটা জানালে এই অধমের জন্য সুবিধা হতো।"
যতটা সম্ভব নমনীয় গলায় বলল ও, ওর মনে নবনী সম্পর্কে একটা ধারণা এরইমধ্যে বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, এই মেয়ের মাথায় বড়সড় গন্ডগোল আছে! কখন কোন কথার কী রিয়্যাক্ট করবে সেটাই ও বুঝে উঠতে পারছে না।
"আপনার সাথে তো আমার বিয়ের কথা হচ্ছে না, যে পছন্দ অপছন্দের বিষয় থাকবে! এসেছেন, কয়েক দিন থাকেন, নিজের কাজ করেন। আমি পছন্দ করলাম কী করলাম না তাতে তো আপনার কিছু আসে যায় না!"
এতটা অকপট স্বীকারোক্তিতে পুরোপুরি অপ্রতিভ বোধ করল রায়ান! ভাষারা যেন হারিয়ে গেছে সেই কোন সুদূরে! ওর এই একত্রিশ বছরের জীবনে বোধশক্তি জাগ্রত হওয়া থেকে শুরু করে আজ অবধি হিসেব করলে, নিজের দিকে মেয়েদের মুগ্ধ দৃষ্টিই অনুভব করে এসেছে বরাবরই! সেটা ওর বাহ্যিক গড়নই হোক কিংবা অভিব্যক্তির জন্যই হোক, এর অন্যথা হয়নি খুব একটা। আজ অবধি এমন চাঁছাছোলা বাক্যবাণ ওর দিকে কোনো তরুণী ছুড়েনি, এটা হলফ করেই বলতে পারে ও। আর বন্ধু মহলে ওর একটা গর্ব ছিল, যে কাউকে কথার জালে পরাস্ত করতে পারে ও! ওর সেই গর্ব এভাবে ভেঙেচুরে ভূলুণ্ঠিত হবে, এটা হয়তো অতি দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি ও! এমনকি ওর শত্রুও ভাবেনি!
বারবার এই মেয়েটা ওকে ভূপাতিত করছে, আর ও কিনা কিছুই বলতে পারছে না! অক্ষম রাগে ফুঁসে উঠছে ভেতরটা!
"এখানে বিয়ের প্রসঙ্গ আসছে কোত্থেকে? আপনার মাথায় যে ছোটখাটো গন্ডগোল আছে এটা কেউ বলেনি আপনাকে?" তীব্র ঝাঁঝের সাথে বলল বিস্মিত রায়ান।
"না তো! আমার মাথায় ছোটখাটো নয়, বড়সড় গন্ডগোল আছে, বিশাল বড়! আপনি এখনো বুঝতে পারেননি?"
নির্লিপ্ত গলা নবনীর। একটু থেমে বলল,
"ও মা! আপনার কফি তো দেখছি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। নিচ্ছেন না কেন? নিন নিন। নয়তো পরে আবার আমাকেই এটা গরম করতে হবে!"
হতভম্ব রায়ানের চোখে এই নবনীকে ঠিক স্বাভাবিক বলে মনে হলো না, কেমন যেন অপ্রকৃতস্থ লাগছে!
এই মেয়ে যা খুশি তাই বলে যাবে, আর ও এসব ফালতু কথা কেন সহ্য করবে? তাই এবার রায়ানও কিছুটা উত্তেজিত গলায় বলল,
"আপনার বাড়িতে থাকছি, আপনার এমন আচরণ কতটা স্বাভাবিক, কতটা শোভন বলতে পারেন? আপনি কি চাইছেন আমি চলে যাই?"
"আপনি ভুল বললেন, বাড়িটা আমার নয়, বাবার। তাই তাঁর ইচ্ছেটাই ইম্পর্ট্যান্ট! আর বাবা আপনাকে পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছে। তাই যাবার কথা ভাববেন না, প্লিজ।"
এখনো গলার স্বরে ধরে রেখেছে আশ্চর্য শীতলতা!
রায়ান আর কথা বাড়ায় না।
সেই রাত কাটল নির্বিঘ্নে, আর কোনো কথা হলো না দুজনের। বাবাও অবশ্য কোনোরকম উচ্চবাচ্য করলেন না। সবাই যার যার মতো ঘুমাতে চলে গেল।
নবনী আজও সেই স্বপ্নটা দেখল। তবে আজ ওর হাত ধরে রাখা লোকটার অস্পষ্ট আর ধোঁয়াটে অবয়ব ফুটেছিল! তবুও ভালো মতো বুঝতে পারেনি অস্পষ্টতার জন্য! বাকি রাত আর ঘুম হলো না, আজ আর উঠতেও ইচ্ছে করল না। এপাশ ওপাশ করেই কাটিয়ে দিল রাতটা। এই স্বপ্নটা দেখলেই ওর মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। বুক নিংড়ে বেরিয়ে আসে অদ্ভুত হাহাকার!
সকালবেলা রায়ান ব্যাকপ্যাক কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ল, হয়তো আজ থেকেই ছবি তোলার কাজ শুরু করতে চায়। বাবাও আজ বেরোলেন, কী জানি একটা কাজ আছে। নবনী ওর লাইব্রেরি ঘরের বইগুলো ঝেড়ে মুছে সাজিয়ে রাখছিল, হঠাৎ ল্যান্ডলাইন ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল।
ফোন ধরতেই ওপাশে অপরিচিত গলা শুনল নবনী।
"হ্যালো, কে বলছেন?"
"আমি আশরাফ বলছিলাম, মা। তুমি নবনী নিশ্চয়ই?" স্নেহার্দ্র কণ্ঠে বললেন।
"আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল। কেমন আছেন?"
"ভালো। আফজাল কোথায়, মা?"
"বাবা একটু বাইরে গেছেন। ফিরলে বলব আপনি ফোন করেছিলেন।"
"আমি আসলে ফোন করেছিলাম রায়ান ঠিকঠাক পৌঁছেছে কিনা জানার জন্য!" গলায় প্রচণ্ড অনিশ্চয়তা ঝরছে উনার।
"সে কী! উনার সাথে আপনার এরমধ্যে কথা হয়নি?" ভীষণ অবাক হয়েছে নবনী।
"ওর সেলফোনে কয়েকবার কল দিয়েছিলাম। ধরল না। কিন্তু সব ঠিকঠাক আছে কিনা, না জানা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছি না! তাই বাধ্য হয়ে তোমাদের বিরক্ত করলাম।" কেমন এক অসহায়ত্ব ফুটল গলায়।
"না না, বিরক্ত হব কেন? আপনি যখন খুশি তখন ফোন করবেন। রায়ান গতকাল এসেছেন, এখন বাসায় নেই। একটু আগেই বেরোলেন।" হন্তদন্ত হয়ে উত্তর দিল নবনী।
"আমি যে ফোন করেছিলাম এটা রায়ানকে বলার দরকার নেই। আমি পরে আবার ফোন করব, মা। ভালো থেকো।"
"আপনি চিন্তা করবেন না আঙ্কেল। উনি ভালোই আছেন।"
"হ্যাঁ, এখন চিন্তামুক্ত হলাম। আমি যদি তোমাকে মাঝেমধ্যে ফোন করি, তুমি কি খুব বিরক্ত হবে?"
আশরাফ সাহেবের এই কথাটা নবনীকে স্পর্শ করল। সন্তানের জন্য একবুক ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছেন, কিন্তু দিতে পারছেন না এক বিন্দুও! এর থেকে অসহায়ত্ব আর কোনোকিছুতেই থাকতে পারে না!
"আমি একফোঁটাও বিরক্ত হব না আঙ্কেল। আপনি তো বাবার মতোই।"
এই কথায় অসম্ভব স্বস্তি নিয়ে ফোন রাখলেন আশরাফ সাহেব।
নবনী ভালোভাবেই বুঝতে পারল বাবা ছেলেতে এক সমুদ্র দূরত্ব! কী এমন কারণ থাকলে বাবা ছেলেতে কথা বলা বন্ধ হতে পারে ভেবে পেল না! রাতে স্বপ্ন দেখার পর থেকে এমনিতেই ওর মনে মেঘের পাহাড় জমেছিল! এখনকার এই ঘটনায় ওর বিক্ষিপ্ত মন দ্বিগুণ বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল! অদ্ভুত এক শূন্যতা যেন গ্রাস করল ওর সমস্ত হৃদয়ে!