তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ২

🟢

হঠাৎ এমন আক্রমনাত্মক কথায় প্রথমে ভড়কে গেলেও পরে রাগ হলো কেন যেন! তাই রায়ানের উত্তরটাও কিছুটা ত্যাড়া গোছেরই হলো,

“তুমিতো আমার থেকে ছোটই হবে। আর দেখেও বিশ-বাইশের বেশি মনে হচ্ছে না! এরকম পুঁচকে মেয়েকে আপনি বলব কেন?”

একেতো বাবার উপরে রেগে আছে এই ছেলে আজই আসবে তা ওকে জানায়নি বলে, অন্যদিকে এক অচেনা অজানা ছেলে ওকে পুঁচকে বলেছে বিষয়টা ঠিক হজম হলো না নবনীর!

দ্বিগুণ আক্রমনাত্বকভাবে উত্তর দিল,

“অপরিচিত প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের আপনি বলতে হয়, অবশ্য আপনার মতো ডিসকারটিয়াস লোকের কাছ থেকে আর কী আশা করা যায়? আপনার জেনে রাখা উচিত, আমি মোটেও বছর বিশ-বাইশের কেউ নই।”

হতভম্ব হয়ে গেছে রায়ান, একেবারে প্রথম আলাপে কেউ কারও সাথে এভাবে কথা বলতে পারে? অবিশ্বাস্য! মাথা আর কপালের শিরা দপদপ করছে ওর। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি তো আছেই, এরমধ্যে এই অসভ্য মেয়েটার কথার বাণে জর্জরিত হয়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে।

“আপনি বুঝি খুব পোলাইট, ডিসেন্ট? গেস্টকে বাড়ির বাইরে এতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে তাকে এরকম জ্ঞান দেওয়া কোন সভ্যতার অংশ আমাকে বলবেন আপনি?” তাচ্ছিল্যের সুরে ক্যাটক্যাটিয়ে হেসে 'আপনি' শব্দটায় বাড়তি জোড় দিয়ে বলল রায়ান।

রায়ানের এই হাসি ওর কাছে স্রেফ ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কিছু মনে হলো না।

পূর্ণ দৃষ্টিতে রায়ানকে একবার জরিপ করল শুধু। কোনো ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন ম্যাগাজিনের কাভার থেকে উঠে আসা সুপার মডেল বলে ভ্রম হচ্ছিল! অসম্ভব হ্যান্ডসাম আর ওই অদ্ভুত সুন্দর মায়াময়, গভীর চোখের যে দীর্ঘদেহী, সুবেশী অবয়বটা রাজকীয় ভঙ্গিতে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে যে অনেক ললনার ঘুম হারাম করেছে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়! কিন্তু নবনীর মনে হলো এর ঔদ্ধত্যের প্রধান কারণই এই সৌন্দর্য। চারপাশে সুন্দরী মেয়েদের আনাগোনাই যে এই ছেলের মধ্যে এমন দাম্ভিকতা এনে দিয়েছে সে বিষয়ে নবনী একেবারে সুনিশ্চিত হয়ে গেল যেন!

তবে এই বাহ্যিক সৌন্দর্য ছাড়াও রায়ান যে ইতিমধ্যেই ওর একটা অন্যতম প্রধান গুণের প্রকাশ ঘটিয়েছে এটা নবনীর একেবারেই দৃষ্টিগোচর হয়নি। আজন্ম ভীনদেশে লালিত এক ছেলে পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছে এটা নিশ্চয়ই বিশাল বড় দক্ষতা! ওর যেখানে বেড়ে উঠা সেখানে এসব আপনি তুমির কায়দা-কানুন না জানা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এটা নবনীও খুব ভালো করে জানে। আর এই এই কথার লড়াই নবনী জেনে বুঝেই শুরু করেছে, রায়ান এখানে শুধুই প্রতিউত্তর দিয়েছে। তাসত্ত্বেও কেন যেন রাগে ভেতরটা ফুঁসে উঠল। তবে এ যাত্রায় ক্ষান্ত দিল, কারণ সত্যিকার অর্থেই ছেলেটাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। আর নবনী কোনোভাবেই অমানবিক নয়। দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“আসুন, ভেতরে আসুন। আর একটা কথা, গেস্ট যদি এমন ঝগড়াটে হয় তবে আমার কী দোষ বলুন তো?”

রায়ান জানে এর উত্তর দিতে গেলে আবার উল্টোদিক থেকে কথা আসবে, তাই আপাতত সুবোধ বালকের মতো হার মেনে নিল। এখন এই মুখরা, অভব্য মেয়েটার সাথে ফালতু বিষয়ে কথা খরচ করার কোনো মানেই হয় না। আগে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে লম্বা একটা ঘুম দেয়া বেশি প্রয়োজন ওর জন্য। এই মেয়ের তীক্ষ্ণ কথার বাণের জবাবে তীর ছোঁড়ার সময় বয়ে যাবে না নিশ্চয়ই! সামনে অবারিত সময় পড়ে রয়েছে।

শুধু একবার অগ্নি দৃষ্টি মেলে নবনীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“চলুন।”

আপাতদৃষ্টিতে সাদামাটা মনে হলেও মেয়েটার মধ্যে অদ্ভুত এক কাঠিন্য আছে, সেই সাথে হাঁটাচলা আর অভিব্যাক্তিতে ফুটে উঠছে প্রখর ব্যাক্তিত্বের ছটা! এখন আর সাদামাটা মনে হচ্ছে না, কোনো তরুণী প্রথম আলাপে এতটা কাঠিন্য ধরে রাখতে পারে না। এতক্ষণ অতিবাহিত হলেও একমুহূর্তের জন্যও ওকে হাসতে দেখেনি রায়ান। সৌজন্যতার হাসিও নয়! কিছুটা কৌতুহল জন্ম নিল ওর মনে, নিজের অজ্ঞাতসারেই!

রায়ানকে ওর রুম দেখিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল নবনী।

“কে আসল গো, আফা?”

“বাবার বন্ধুর ছেলে।”

কোনোরকম দায়সারা গোছের উত্তর দিয়েই রান্নায় মনোযোগ দিল ও। চামেলির বকবক শুনতে ভালো লাগছে না। মেয়েটা কথা বলতে বড্ড পছন্দ করে, যেটা এই মুহূর্তে নবনীর অসম্ভব বিরক্ত লাগছে!

বাবা এলেন এরইমধ্যে, নবনীর থমথমে মুখ দেখে ভেতরে ভেতরে বিচলিত বোধ করলেন। নবনী একেবারে ঠাণ্ডা গলায় প্রশ্ন করল,

“আজই যে উনি আসবেন, এটা তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন, বাবা? রান্নারও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি?"

আফজাল সাহেব বুঝতে পারলেন ভুল করে ফেলেছেন, এদিকটা ভেবে দেখেননি একেবারেই। এসব সাংসারিক বুদ্ধি কিংবা অতিথি আপ্যায়নে তিনি ভীষণ অপটু। আগে এদিকটা মা আর অবনীই দেখত। আর প্রায় কৈশোর থেকেই পুরো সংসার নবনীই সামলেছে, বেশ দক্ষ হাতেই সামলেছে।

অবনী খুব ভালোবাসত নিজের হাতে রান্না করে সবাইকে খাওয়াতে, তৃপ্তি পেত খুব। কিছুদিন পরপরই তাই এই বাসায় চাঁদের হাঁট বসত। ও মারা যাওয়ার পরে আর তেমন করে কোনো আসর বসেনি। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক নিংড়ে, সময় সবকিছু কেমন বদলে দেয়! যাকে ছাড়া একদিন চলতে পারতেন না, তাকে ছাড়া দিব্যি দেড় যুগ কাটিয়ে দিলেন!

“আসলে আমি ভেবেছিলাম তুই হয়তো শুধু শুধুই রেগে যাবি! একেবারে ছেলেটা আসুক, পরেই নাহয়...”

নীচুস্বরে এটুকু বলতেই নবনীর কথায় থেমে গেলেন,

“আমাকে কী মনে কর তুমি? আমি কি সারাদিন শুধু রাগই করি? আমি তো সেদিন বললামই যে আমার কোনো সমস্যা নেই, তবুও এত লুকোচুরি কেন, বাবা?”

“এই যে, তুই এইভাবে তাকাস, আমার কলিজা শুকিয়ে যায়। এভাবে আমার দিকে তাকাবি না তো!”

বাবার এমন কথায় নবনীর কপালের ভাঁজ সরে গেল, মুখে ফুটে উঠল মুচকি হাসির রেখা।

“বাবা, তুমি একেবারে যা তা!”

“আর তুই একেবারে আমার মা।”

এবার সশব্দে হেসে উঠল নবনী, সাথে বাবাও। কথাটা একেবারে মন থেকেই বললেন, মা'ই তো। দুষ্টু ছেলেদের যেমন মা শাসন করেন, তেমনি মায়ের মতোই নবনীর এই মিষ্টি শাসন খুব উপভোগ করেন তিনি। এই মেয়েই তো তাঁর পৃথিবী!

“আরে ইয়াংম্যান, এদিকে এসো। ওখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”

আসলে দূর থেকে নবনী আর বাবার মিষ্টি খুঁনসুটি উপভোগ করছিল ও। মেয়েটাকে আসার পরে যেরকম দেখেছে তার সাথে এখনকার নবনীর যেন কোনো মিলই নেই, আচমকা ভোজবাজীর মতো বদলে ফেলেছে নিজেকে। সব বাবার সাথেই সন্তানদের সম্পর্ক এত মিষ্টি-মধুর হয় না কেন? বুকে অদ্ভুত এক হাহাকার তৈরী হলো রায়ানের।

দ্রুত সামলে নিয়ে হেসে উত্তর দিল।

“না না, আঙ্কেল। সব ঠিকঠাক ছিল। অনেকদিন পরে আপনাকে দেখে খুব ভালো লাগছে। আপনি এই বয়সেও এতটা ফিট কী করে সেই টিপস কিন্তু দিতেই হবে!”

“যার এমন একটা মেয়ে আছে, সে ফিট না থেকে পারে! এটা খাও, ওটা খেয়ো না, এখন হাঁটতে যাও, এখন ঘুমাতে যাও! আমার তো নিজেকে নিয়ে ভাবতেই হয় না।"

মেয়েকে নিয়ে উচ্ছ্বাস একেবারে হৃদয় থেকে উৎসারিত হলো যেন! উদ্ভাসিত হাসি আফজাল সাহেবের পুরো অবয়বে! রায়ানের কেন যেন খুব ভালো লাগল বিষয়টা। মন ছুঁয়ে গেল! অজান্তেই ওর মুখেও হাসি খেলে গেল!

আফজাল সাহেব কিছুটা থেমে আবারও বলা শুরু করলেন,

"হ্যাঁ, সেই যে বছর তিনেক আগে একটা সেমিনারে গেলাম, এরপর আর যাওয়া হয়নি।”

দুজনের কথার মাঝেই নবনী তাড়া লাগাল,

“বাবা, খাবার কিন্তু হয়ে গেছে। তোমরা বস, আমি সব নিয়ে আসছি।”

নবনী রান্নাঘরে ঢুকতেই চামেলি বলে উঠল, “আফাগো, এই সেই বিদেশি ভাইজান?”

“তোকে কতবার বলেছি আফা না আপা বলবি।”

“আফা আর আপা যাই কই মানুষটা তো আফনেই, আসল কথা কই, ভাইজানডা যে কী সুন্দর! এক্কেবারে আফনে যে ইংরেজি ফিলিম দ্যাহেন, হেইগুলার হিরুর চাইতে কইলাম কম না!”

কড়া চোখে তাকাল নবনী, তবে চামেলি সেদিকে তোয়াক্কা না করে বলতেই থাকল,

“এক্কেবারে রাজপুত্তুর গো আফা রাজপুত্তুর!”

“তুই কি জানিস যে তুই অতিরিক্ত কথা বলিস। কথা বাদ দিয়ে আমার সাথে সাথে খাবারগুলা টেবিলে নিয়ে আয়।”

এবার শুধু চোখ রাঙানোর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকল না, কড়া করে ধমক লাগাল। এবার কাজ হলো, চামেলি মুখে আঙুল চাপা দিল। এই মুহূর্তে নবনীকে চটানোর মতো বোকামো করতে চায়না ও। এমনিতে ভীষণরকম শান্ত আর চুপচাপ স্বভাবের নবনী রেগে গেলে যে অন্য মানুষ হয়ে যায় এটা ও খুব ভালো করে জানে!

যতক্ষণে টেবিলে খাবার নিয়ে ফিরল নবনী, ততক্ষণে প্রাণবন্ত আলোচনায় মেতে উঠেছে দুজন। ঢাকার রাস্তার বিদঘুটে জ্যাম থেকে শুরু করে আমেরিকার নির্বাচনে কার যেতা উচিৎ ট্রাম্প নাকি বাইডেন? বাদ যায়নি এসব ও!

তরকারির বাটিটা টেবিলে রাখতে রাখতে চামেলির বলা কথাটা পরখ করার জন্য একবার শুধু চোখ তুলে রায়ানকে দেখল এবং না চাইতেও চামেলির সাথে একমত হলো মনে মনে। এই ছেলে সত্যিই অসম্ভব সুদর্শন, আর কথা বলছেও খুব সুন্দর করে, মার্জিত ভঙ্গিতে। তখনকার ঔদ্ধত্যপূর্ণ, দুর্বিনীত ভাবটা একেবারেই নেই।

“কী রে তুই বসছিস না কেন?”

“তোমরা খাও, আমি পরে খাব।”

“তোকে ছাড়া কখনো খেয়েছি আমি? বস, বস। চামেলি, এই চামেলি।”

হাঁক ছেড়ে চামেলিকে ডাকলেন। এই বাড়িতে সবাই একসাথেই খায়। চামেলিও ধীরে ধীরে এই বাবা-মেয়ের সংসারের ক্ষুদ্র অংশ হয়ে গেছে।

ডাকা মাত্র চামেলি এসে হাজির হলো। রায়ানের দিকে তাকিয়ে সবগুলো দাঁত বের করে হেসে হেসে বলল,

“ভাইজান, আমি চামেলি। আফনে ভালা আছেন?”

ভাইজান ডাকায় কিছুটা অস্বস্তিবোধ করলেও, সম্বোধন নিয়ে খোঁচা দেবার পাল্টা সুযোগটা লুফে নিল,

“ভালো। আপনি কেমন আছেন?”

“ও আল্লাহ্‌! ছি, ছি! আমারে আফনে কইরা কইতাছেন কী জইন্যে, আমি কত্ত ছুডো!”

“না, আসলে আমি এখানে এসে প্রথমেই যেটা শিখেছি সেটা হচ্ছে, বয়সে ছোট হলেও সবাইকে আপনি বলতে হয়, এটাই নাকি ভদ্রতা! আমি আবার কুইক লার্নার কিনা! সব দ্রুত শিখে রাখি যাতে সময় মতো তার প্রয়োগটা করতে পারি।”

নবনী সবে প্লেটে ভাত নিচ্ছে, ওর হাত ক্ষণেকের জন্য থেমে গেল। এই ছেলে তো আচ্ছা রকম ত্যাঁদড়! ওকে এভাবে অপদস্ত করার জন্য তলে তলে এমন নীলনক্সা এঁকেছে এটা ও ভাবতেই পারেনি! রাগে কটমটে চোখ করে রায়ানের দিকে তাকাতেই দেখল এই নচ্ছার ছেলে আড়চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। মুখে গায়ে জ্বালা ধরানো হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। রাগে গা রিরি করে উঠল নবনীর, দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল, আর মনে মনে আওড়াল,

“আমিও সবার সব কথা সযত্নে স্টোর করে রাখি, সময় মতো সবটা সুদ সমেত অতি যত্নে ফেরত দেবার জন্য!”

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ২