তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ৪

🟢

আজ নবনীর ভীষণ মন খারাপ। মন খারাপ থাকলে রুমের দরজা বন্ধ করে সাজগোজ করে ও। এতে মনের উপর জমে থাকা মেঘ সরে যায়! আজও তাই করছিল। কিন্তু চোখে কাজল লাগাতে পারছিল না কিছুতেই। যতই চেষ্টা করে ততই চোখের পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। চোখের নিচ থেকে একেবারে গাল পর্যন্ত কাজল লেপ্টে একাকার। ছোপ ছোপ কাজল লেগে আছে পুরো গালে। তাতেও যেন ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সেই লেপ্টে যাওয়া অশ্রুসিক্ত চোখেই আবারও কাজল আঁকার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে! এই সময়টা শুধুই ওর নিজের, একান্ত একার!

ওদিকে কলিংবেল বেজেই যাচ্ছে, অনবরত কড়া নাড়ার শব্দে সচকিত হয় নবনী। চামেলিটা যে কাজের সময় কোন পাতালে থাকে আল্লাহ্ মালুম! প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে কোনোরকমে মুখে পানি ছিটাল, তাতেও কাজল উঠল না, লেগেই রইল! এখন তোলার সময় নেই, দরজার ওপাশে যে আছে, সে ধৈর্য্য নামক শব্দের সাথে ঘুণাক্ষরেও পরিচিত নয় বলেই মনে হচ্ছে! তাই সেভাবেই ছুট লাগাল সেদিকে! প্রচণ্ড রেগে দরজা খুলতেই মোটামুটি বিধ্বস্ত রায়ানকে দেখে কিছুটা চমকাল নবনী, গুরুতর কোনো ব্যাপার ভেবে আপাতত রাগটা প্রকাশ করল না, চেপে রাখল ভেতরেই!

"আপনাকে এরকম লাগছে কেন? কী হয়েছে?"

"পরে বলছি, আগে কিছু টাকা দিন, বাইরে সি.এন.জি. দাঁড়িয়ে আছে। ভাড়াটা দিয়ে বেচারাকে বিদায় করতে হবে।" এখনো হাঁপাচ্ছে রায়ান।

কৌতূহল আপাতত চেপে রেখে ওর রুমে চলে গেল নবনী, ড্রয়ার থেকে টাকা বের করে চামেলিকে খুঁজে নিচে পাঠিয়ে দিয়ে ড্রইংরুমে ফিরল ও। রায়ান সোফায় মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। ভীষণ পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছে ওকে!

"ভাড়া পাঠিয়ে দিয়েছি, এখন বলুন কাহিনী কী?"

"আমি ছবি তুলছিলাম, আজকের রোদটা ভীষণ চড়া ছিল, কিছুটা টায়ার্ড লাগছিল বলে পার্কের একটা বেঞ্চিতে বসলাম। একটু পরেই একটা বাচ্চা মেয়ে আসল, মেয়েটার হাত ভর্তি ফুল। কী ভীষণ মিষ্টি মুখ! দেখে ভারী মায়া লাগল! আমি ফুলসহ ওর কিছু ছবি তুললাম।"

কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল, "এত ছোট্ট একটা মেয়ে কিনা ফুল বিক্রি করে সংসার চালায়! কতই বা বয়স ওর? খুব বেশি হলে নয় কিংবা দশ। জীবনটাই এখনো শুরু হয়নি, অথচ কী অবলীলায় জীবনের হিসেব-নিকেশ করতে শিখে গেছে! বেঁচে থাকার জন্য স্ট্রাগল করছে প্রতিটা মুহূর্তে!"

যেভাবে বসে ছিল সেভাবেই বসে রইল রায়ান, শুধু চোখ খুলে ম্লান হাসল কেবল, গলাটা ভীষণ ভারী। নবনীর মনে হলো আজ বুঝি মন খারাপের দিন! সব মন খারাপের মেঘ যেন একসাথে ধেয়ে আসতে শুরু করেছে ওর দিকে!

নবনী কিছু না বলে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কেবল! কিছুটা থেমে সোজা হয়ে বসে আবারও বলতে শুরু করল রায়ান,

"অথচ ভাবুন তো, ওর এখন বয়সটা বইখাতা নিয়ে স্কুলে যাবার, হেসে খেলে বেড়ানোর! আমি ওকে খাওয়ানোর জন্য রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেতে চাইলাম, কিন্তু কিছুতেই রাজি হলো না। ঘরে অসুস্থ মা'কে রেখে ও খাবার মুখে তুলবে না। ওখান থেকেই বাদাম, টাদাম হালকা খাবার খাওয়াম। আর ভাবলাম ওকে কিছু টাকা দিয়ে দিই। পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল, ওয়ালেট কিচ্ছু পেলাম না। আশেপাশে সব জায়গায় খুঁজলাম, কোথাও নেই! বুঝতে পারলাম হারিয়ে ফেলেছি।"

কিছুটা বিচলিত হলো নবনী, "ওতে নিশ্চয়ই আপনার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল?"

"ক্রেডিট কার্ড আর কিছু টাকা ছিল। প্রয়োজনীয় বলতে সেসবই। তবে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, এপর্যন্ত কী করে আসব তা ভেবে! মোবাইলটাও পাচ্ছিলাম না, প্রথমে ভেবেছিলাম ওটাও বুঝি গেছে!"

"মোবাইল পরে ফেরত পেলেন কীভাবে?"

"মোবাইলটা হারায়নি। ব্যাকপ্যাক থেকে ক্যামেরা বের করার সময় একটা কল এসেছিল, তাড়াহুড়োয় ওখানেই রেখেছিলাম সেটা। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম একেবারে।"

"তারপর কী হলো?"

"এক গ্লাস পানি দিতে পারবেন?"

নবনী এখনো আঁচ করতে পারছে না, আসল ঘটনাটা আসলে কী!

উঠতে গেল তখন পাশ থেকে চামেলি বলল ও নিয়ে আসছে। চামেলি কখন এসেছে ও খেয়ালই করেনি।

পানি খেয়ে কিছুটা দম নিয়ে বলতে শুরু করল,

"মেয়েটাকে পার্কেই বাদাম আর চা খাইয়ে ছিলাম। এর বিল কী করে দেই সেটা ভেবেই লজ্জায় মাথা কাটা যায় আমার! ওই বাচ্চা মেয়েটাই শেষে উদ্ধার করল। বিলটা ও দিল বলেই রক্ষা!"

এবার সত্যিকারের হাসি ফুটে উঠল রায়ানের অবয়বে, তবে তা মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই!

"এটা তো চমৎকার একটা ব্যাপার। এরজন্য আপনি মন খারাপ করে আছেন? মেয়েটা বাচ্চা হতে পারে, বাট শি হ্যাজ অ্যা ট্রু হার্ট! আপনি ভীষণ সৌভাগ্যবান, এমন একজনের দেখা পেয়েছেন বলে!" উচ্ছ্বসিত গলায় বলল নবনী। একটু আগের মন খারাপ এক নিমিষেই বাতাসে মিলিয়ে গেল যেন! এই প্রথম মেয়েটাকে এমন উচ্ছ্বসিত হতে দেখল রায়ান! ক্ষীণ গলায় বলল,

"অবশ্যই আমার সৌভাগ্য এটা। কিন্তু ভাবুন তো, এটাই হয়তো মেয়েটার প্রায় সারাদিনের রোজগার ছিল! সেটা বিনা দ্বিধায় অন্যকে তুলে দিল!"

"আপনি ওই পার্কে আবার গেলেই ওই মেয়ের দেখা পাবেন। কিছু দিতে চাইলে, কাল দিয়ে দেবেন।"

আস্বস্ত করার চেষ্টা করল নবনী।

কিছুটা যেন আশার আলো দেখল রায়ান,

"আচ্ছা, আমি যদি ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেই, ও কি রাজি হবে?" রায়ানের অনিশ্চিত স্বর।

"সেটা তো আমি বলতে পারব না! তবে আপনি ওকে প্রস্তাবটা দিয়ে দেখুন। এত চমৎকার একটা প্রস্তাবে রাজি তো হতেই পারে!"

এরকম আরও অসংখ্য শিশু রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়, জীবিকার তাগিদে। কারও বেশি খারাপ লাগলে সাহায্য হিসেবে কিছু টাকা দেয়, কেউ বা এড়িয়ে যায়। এরপর বাসায় ফিরে ভুলে যায় সব। ওদের জন্য কিছু করার সদিচ্ছা খুব কম মানুষেরই থাকে। অনুভূতিপ্রবণ কিছু মানুষই কেবল ওদের পাশে দাঁড়ায়। রায়ান যে একেবারে মন থেকেই এটা চেয়েছে, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। ওর সাথে যতই ত্যাঁদড়ামো করুক, সত্যিকার অর্থেই ছেলেটার একটা সংবেদনশীল মন আছে! এরজন্য কিঞ্চিৎ ছাড় সে পেতেই পারে!

মুহূর্তকাল থেমে সহসা প্রশ্ন করল নবনী, "আচ্ছা, আপনার মন খারাপের কারণ তো জানলাম, কিন্তু ওইরকম বিধ্বস্ত অবস্থা কী করে হলো?"

"আমি এখানকার রাস্তাঘাট কিছুই চিনি না। গুগল ম্যাপের হেল্প নিয়েই তো কাজ চালাচ্ছিলাম। ফোন হারিয়ে গেছে ভেবে একে ওকে জিজ্ঞেস করতে করতেই অনেকটা পথ হেঁটেছি, ওদিক থেকে কোন গাড়ি টাড়ি পাচ্ছিলাম না এদিকে আসার। ফোন নেই বলে কোথাও কমিউনিকেট করতে পারিনি। অনেকটা হেঁটে তবেই সি.এন.জি. টা পেলাম। আর সব ট্রাবল কাটিয়ে ফাইনালি বাসায় আসতে পারলাম। মাঝে অবশ্য ওখানকার থানায় কমপ্লেইন করেছি। থানায় যে কী বিশাল ঝক্কি! যখন প্রায় বাসার কাছাকাছি এসেছি, তখন একটা কল আসায় বুঝতে পারি ফোনটা খোয়াইনি!"

"এমন বোকামি কেউ করে?"

"ফোনটা পাবার পর আমারও ঠিক তাই মনে হয়েছে! ওটা বহাল তবিয়তেই আছে, আমার পিঠে চড়ে বসে ছিল, আর আমি কিনা বুঝতেই পারলাম না! পকেটে থাকলে অবশ্য ওটাও হাওয়া হয়ে যেত।"

সশব্দে হেসে ফেলল রায়ান, আর ওর হাসি দেখে না চাইতেই নবনীর ঠোঁটের কোণায় খেলে গেল এক চিলতে মিষ্টি হাসি!

এতক্ষণ চামেলি ওদের পাশেই বসে ছিল, এত লম্বা সময় ধরে এর আগে কখনোই চুপ থাকেনি ও, এটা ওর জন্য একটা রেকর্ড ব্রেকিং পারফরম্যান্স! এত ভাবগম্ভীর পরিবেশে হয়তো ও হাঁপিয়ে ওঠেছিল, গুমট পরিবেশ কেটে যেতেই কথার তুবড়ি ছুটিয়ে দিল চামেলি,

"ভাইজান ওই পিচ্চিডার ফটো তুলছেন, আমার একটা তুইল্যা দিয়েন তো, এক্কেবারে ফাস্ট ক্যালাস কইরা। আমি কিন্তু এসপেরেশন দিবার পারি, আর মাশআল্লাহ সুন্দরও আছি!" অত্যন্ত লাজুক ভঙ্গিতে শেষের কথাগুলো বলল চামেলি।

রায়ান একবার অসহায়ের মতো নবনীর দিকে তাকিয়ে দেখল মেয়েটা ওর স্বভাবসুলভ রাগী ফর্মে ফিরছে, চোখ সরিয়ে চামেলির দিকে তাকিয়ে বলল,

"তোমার ছবি আমি অবশ্যই তুলে দেব। ফার্স্ট ক্লাস ছবিই তুলব। কিন্তু এসপেরেশন ব্যাপারটা কী বুঝলাম না?"

"এক্সপ্রেশন বলতে চেয়েছে।" নবনী উত্তর দিল, এরপর চামেলির দিকে তাকিয়ে বলল,

"তোকে হাজারবার বলেছি, এমন উদ্ভট কথাবার্তা বলবি না। আর উনাকে বিরক্ত করছিস কেন?"

"আমি আবার কহন বিরক্ত করলাম, আফা। ভাইজান আফনেই কন, বিরক্ত হইছেন কিনা?" প্রতিবাদী গলায় বলল চামেলি।

রায়ান পড়ে গেছে ভীষণ অস্বস্তিতে, কী উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না!

নবনী এবার ওর ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলো যেন,

"তুই তখন কই ছিলি?"

"কখন, আফা?"

"যখন রায়ান এলেন?"

"আমি তো কাফড় ধুইতাছিলাম। বুজবার পারি নাই গো, আফা!"

"খাবারগুলো গরম করে আমাকে ডাকিস, এখন যা।"

"যাইতাছি। ভাইজান, ফটো কিন্তু তুইল্যা দিয়েন?"

যেতে যেতে গলা চড়িয়ে কথাগুলো বলল নাখোশ চামেলি।

"আপনি ওর কথায় কিছু মনে করবেন না। ও এরকমই। আপনার নিশ্চয়ই খাওয়া হয়নি? আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন, আমি খাবার রেডি করছি ততক্ষণে।"

"আমি কিছু মনে করিনি। আপনি উত্তেজিত হবেন না। আঙ্কেল বাসায় ফিরবেন কখন?"

"বাবা খেয়ে আসবেন, আপনি খেয়ে নিন বরং। আরেকটা কথা, আমি কিন্তু সবসময় উত্তেজিত হই না।"

নবনী উঠে রান্নাঘরে চলে গেল খাবারের তদারকি করতে, আর রায়ান চলে গেল ফ্রেশ হতে! নবনীর শেষ কথাটা যে ইঙ্গিতপূর্ণ ছিল এটা বেশ বুঝতে পেরেছে ও। যাই হোক, আজ অন্তত অনেকটা সদয় ছিল মেয়েটা! এই বা কম কী!

আজ প্রথমবার দু'জনের ঠোকাঠুকি লাগল না। তবে সামনে বিস্তর সময় পড়ে আছে। আর নবনীর মনে তো ক্ষণেই দুপুরের মিষ্টি রোদ উঁকি দেয়, তো পরক্ষণেই নিকষ কালো মেঘের ঘনঘটা! কখন রোদ কখন বৃষ্টি মেয়েটা নিজেই বুঝতে পারে না, আর রায়ান তো দু'দিনের পরিচিত! সে কীভাবে বুঝতে পারবে?

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ৪