আজ ঝুমুর বিয়ে। একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে আড়ম্বরহীন বিয়ে। ঝুমুর চাওয়াতেই এমন আয়োজন করা হয়েছে। কোনো একসময় যারা নানারকম কটূ কথা শুনিয়েছে, তাদেরকে ডেকে নিয়ে এসে ওর সুখের সঙ্গী করার কোনো প্রয়োজনীয়তা ওর কাছে নেই। শুধু মা, নিজের দুই ভাই-ভাবী, রুমু আর তাদের সন্তানরা উপস্থিত থাকল। সবাই ভীষণ খুশি। মৃদুলের পক্ষ থেকে কেবল ওর দুঃসম্পর্কের এক মামা আর চাচা, আর তিন বন্ধু সস্ত্রীক এসেছে। এই অল্প কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী কেবল সাক্ষী হলো এই আনন্দ ক্ষণের!
অথচ বহু আগে ওর ভেতরে বিয়ে নিয়ে হরেক রকম ফ্যান্টাসির বুনন এঁকেছিল। সানাইয়ের সুর, ঝলমলে আলোকসজ্জা আর সহস্র মানুষের কোলাহলে গোটা দুনিয়াকে জানান দিয়ে ভালোবাসার মানুষের সাথে নিজেকে বাঁধার সাধ ছিল। সেই সাধ কালের গহ্বরে হারিয়েছে সেই কবে! ওর জীবনে আবার কখনো ভালোবাসা আসবে এটাই কোনোদিন ভাবেনি ও, এমনকি স্বপ্নেও ভাবার দুঃসাহস হয়নি!
জীবনে সহস্র ভুলের মধ্যে কখনো কোনো পূণ্য হয়তো করেছিল সে, নয়তো এমন দুকূল ছাপিয়ে উঠা ভালোবাসার জল ওর ভাঙা আঙিনায় কী করে এলো!
মৃদুলের দৃষ্টি লোক লজ্জা উপেক্ষা করে ঝুমুতেই নিবন্ধ। হাজার চেয়েও চোখ সরাতে পারছে না। লাল টুকটুকে শাড়িটায় রূপ যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে, এমনিতেই অনিন্দ্য সুন্দরী ঝুমু, আজ যেন পুরো অপ্সরা! লজ্জার লালচে আভা ছড়িয়ে আছে পুরো অবয়বে, এটাই যেন পূর্ণতা এনে দিয়েছে ওর সৌন্দর্যে!
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা মাত্রই শেষ হয়েছে। কিন্তু এই ছেলের ঘোরই কাটছে না। যতবার তাকাচ্ছে ততবার আপ্তবাক্যের মতো রবি ঠাকুরের 'হৈমন্তী' গল্পে অপুর বলা 'সে আমার সম্পত্তি নয়, সম্পদ' লাইনটা মনে মনে আওড়ে গেল। যখন সাফিয়া বেগম ওদের দুজনের হাত এক করে দিলেন তখনও বেচারা মৃদুল অপুর শরণাপন্ন হলো, এবার ওর মননে, মস্তিষ্কে কেবল বেজে চলল, 'আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম'!
ঝুমুর রুমটা প্রায় ছেয়ে ফেলা হয়েছে ফুল দিয়ে, কোনো আয়োজন না হলেও এটুকু রুমু করেছে। ঝুমুর কোনো কথায় পাত্তা দেয়নি। হাজার হলেও স্মরণীয়, কাঙ্ক্ষিত একটা রাত, বিশেষ কিছু তো করতেই হয়। নইলে যে বড্ড ম্যাড়মেড়ে হয়ে যাবে রাতটা! অবশ্য ভালোবাসা যেখানে থাকে সেখানে এসব না হলেও ঠিকই সব মুহূর্তই ভালোবাসার মুহূর্ত হয়ে উঠে। আর ভালোবাসা না থাকলে দুনিয়ার সুন্দরতম জায়গাও ভালো লাগে না! রুমুর বিয়ের দিন শাফায়াতের পরিবার ঝুমুকে নিয়ে কথা শুনিয়ে বিয়ে ভেঙে দিতে চেয়েছিল তখন কেন দৃঢ়তা দেখিয়ে রুমুই তা ভাঙতে পারেনি! শাফায়াতের সেদিনের ভালোমানুষি এখন বুঝতে পারে, সেদিনই আসলে রুমুর মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছিল, এই কয়েক বছরে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি! শাফায়াতের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। প্রিয় বোনের এমন একটা সব পাওয়ার দিনে নিজের হারানোর গান কেন ভাবছে এটা ভাবতেই রাগ হলো রুমুর! তামিম আর নাঈমের দিকে আজ খুব একটা নজরই দিতে পারেনি ব্যস্ততায়! ওদের খুঁজতে বের হলো রুমু।
***
সেই ফুলের মধ্যে এখন বসে আছে ঝুমু, নিজের এত চেনা রুমটা চিনতে ভীষণ কষ্ট হলো। মৃদুল সামনে বসে আছে, সারাজীবন শুনে এসেছে মেয়েরা লজ্জা পায়, এই ছেলেকে দেখে ঝুমুর সেই চেনা ধারণায় কিছুটা ধাক্কা লাগল! লজ্জায় কাঁচুমাচু মুখে বসে আছে ছেলেটা, সাদামাটা দেখতে হলেও ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা মৃদুলের। কিন্তু আজ কেমন বোকা বোকা লাগছে ছেলেটাকে। বিয়ের দিন কি সব ছেলেদেরই এমন বোকাটে লাগে দেখতে? জানে না ঝুমু, বিয়ে, ভীড় কোলাহল এড়িয়েই চলেছে ও বহুবছর! তবে এই সারল্য ঝুমুর খুবই ভালো লাগল।
মৃদুল উসখুস করছে কথা বলার জন্য, কিন্তু বেচারা শুরুই করতে পারছে না। শেষে ঝুমুই শুরু করল,
"কী ব্যাপার! তুমি কি বোবা হয়ে গেলে নাকি? তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে আজ আমরা সারারাত গল্প করব। নো ঘুম, ঘুমের নাম মুখেই আনা যাবে না!"
ঝুমু সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল। মৃদুল এবার চোখ তুলে তাকাল,
"আমি সারাজীবন যা কিছু হাত বাড়িয়ে ধরতে গেছি, সব কেমন অধরা হয়ে থেকে গেছে। তোমাকে আমি কী করে পেলাম ঝুমু?"
মৃদুলের গলা কোথাও কেঁপে উঠল যেন!
"আমার কী মনে হয় জানো মৃদুল, তুমি এলেই যদি, তবে আরও আগে কেন এলে না? আমার কষ্টের প্রহর এত দীর্ঘ করলে কেন? দেরী করে এলে বলেই নিজের উপরে বিশ্বাস ফিরে পেতেও বড্ড দেরী হয়ে গেল!"
ঝুমুর চোখ ভর্তি জল, প্রাপ্তির জল!
"দেরী হলো বলেই তো নিজেদের পুড়িয়ে খাঁটি করে আমরা নিজেদের পেলাম। এই পাওয়ার মাহত্ব মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারলাম। অল্পে পাওয়া কাঙ্ক্ষিত জিনিসও আমাদের কাছে অনেক সময় হালকা হয়ে যায়! আমাদের সেই ভয়টা আর থাকল না ঝুমু।"
চোখ ভরা অশ্রু নিয়ে দুটো মানুষ আজ সহস্র প্রতিশ্রুতি, সহস্র চাওয়া, সহস্র স্বপ্ন একসাথে জুড়ে নিল, আবদ্ধ হলো এক অমোঘ বন্ধনে! যেখানে আছে শুধু বিশ্বাস, ভালোবাসা, মায়া, ভরসা আর মুঠো ভর্তি স্বপ্ন!
***
আফজাল সাহেব বিছানায় ছটফট করছেন, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারছেন না। গোঙানির মতো শব্দ করার ফাঁকে ফাঁকে অস্ফুট স্বরে বলা,
"পানি"
শব্দটা বোঝা যাচ্ছে। আশেপাশে কেউ নেই, উনার গোঙানি কারও কানে যাচ্ছে না। কেবল সহস্র ক্রোশ দূরে নবনী শুনতে পাচ্ছে, পাশে রায়ান যেন নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আফজাল সাহেবের শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত পড়ছে, আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছেন। নবনী প্রাণপণে চিৎকার করে উঠে
"বাবা.."
এই শীতেও পুরো শরীর ঘামে ভিজে একাকার, এই স্বপ্নটা ও দেখতে শুরু করেছে রায়ান যেদিন ওকে ওর মনের কথা জানায় সেদিন থেকেই। আর তাতেই ভয়ে পিছিয়ে আসে মেয়েটা। এই বয়সে বাবাকে একা রেখে কিছুতেই নিজের সুখ খুঁজতে পারবে না ও। যদি সত্যিই এমন কোনো সিচুয়েশন আসে! না না! আর ভাবতে চায় না ও! ভাবলেই বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে!
প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে রায়ান ফিরে গেছে। এই তিন মাসে চন্দ্র বাদে বাসার কেউ ওর সাথে ঠিকঠাক করে কথা বলেনি, না বাবা আর না চামেলি। ওর শূন্য সময়টা ক্রমশ আরও শূন্যতায় ঘিরেছে। অথচ নিজের ভেতরটা কাউকে বোঝাতে পারেনি। কী পরিমাণ ব্যাথার পাহাড় বুকে চেপে ঘুরছে এটা তো কেউই উপলব্ধি করতে পারবে না! বাবা যে বোঝেন এটা নবনী জানে, তবুও রেগে আছেন। এই প্রথমবার বাবা ওর উপরে রেগে গেছেন। কিন্তু ও তো অপারগ!
রায়ানের ব্যথাতুর অসহায় চেহারা চোখে ভাসলেই নিজেকে স্থির রাখতে পারে না, বড্ড অস্থিরতা অনুভব করে। কেন রায়ান ওর জীবনে এসে ওর পৃথিবীটা এভাবে উল্টে পাল্টে দিল? ও তো ভালোই ছিল নিজের দুনিয়ায়, নিজের গড়া জগতে। তবে কেন সেখানে সেই ছেলেটার প্রবেশাধিকার দিল? দিল তো দিলই কিন্তু ধরে রাখতে পারল না। কিছু মুহূর্তের ধরে রাখতে না পারা ভালোবাসা কেন এতো পোড়ায় ভেতরটা? জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে দেয় হৃদয়টা! চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে, নবনীর ভেতরে জমা আবেগ সমুদ্রের উথলে উঠা ব্যর্থতার জল!
কিছুদিন হলো ওর ডিপার্টমেন্টেই লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছে, আগে থেকেই সব ঠিকঠাক ছিল, মাঝে কয়েকমাস নিয়োগ বন্ধ থাকায় যোগ দিতে সময় লেগে গেল। বাবা, ওর বইয়ের জগৎ আর সাথে পড়াশোনা এই তিনেই নবনী। আর কোনোদিন ওর মন অন্য কোথাও সরেনি বলে রেজাল্টও চোখ ধাঁধানো, ডিপার্টমেন্টের বাকিদের টপকে একেবারে শীর্ষে ছিল সবসময়। আর এতেই এই সুযোগ। নিজের ভগ্ন হৃদয় জুড়তে এখানেই মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছে ও।
আফজাল সাহেব নবনীর দোটানাটা খুব ভালো করেই বোঝেন। কিন্তু এবার তাঁকে কিছুটা কঠিন হতেই হবে। সেদিন রায়ানের চোখে ফুটে উঠা কষ্টটা দেখেছেন তিনি। আর তাতেই এই সিদ্ধান্ত। ওদের ভালোবাসা যেন ঠিকানা খুঁজে পায়, তারজন্য সব করবেন তিনি। নিজেকে ভীষণ অপাংক্তেয় মনে হচ্ছে আফজাল সাহেবের।
***
রায়ানের এই তিন মাস ভীষণ ব্যস্ততায় কেটেছে। গতকালই ওর এক্সিবিশন খুব সফলভাবে শেষ হয়েছে। নিজের দেশকে দারুণভাবে তুলে ধরতে পেরে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি পেয়েছে মনে। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসতে চাইছে।
বাবার সাথে এখন সম্পর্কটা একেবারে সহজ স্বাভাবিক, বন্ধুত্ব হয়ে গেছে পুরোপুরি। ন্যান্সি আন্টির সাথেও দূরত্ব চুকিয়ে বুকিয়ে নিয়েছে। আন্টি বাস্তবিকই ওকে ভীষণ স্নেহ করেন। নিজের বোকামি এখনো নিজের কাছে ছোট করে দেয় মাঝে মাঝে।
আর কোনো আফসোসে পুড়তে চায় না বলেই নিজের হৃদয় খুলে নবনীর সামনে রেখেছিল। কিন্ত মেয়েটা সেই হৃদয় পানে ফিরেও তাকায়নি। এখন বলার জন্যই উল্টো আফসোস হয়। যদি না বলত কিছুই, তবে হয়তো এখনো ওর সাথে কথা হতো! যেমন আফজাল আঙ্কেল, চামেলি আর চন্দ্রের সাথে হয়।
নবনীর কাছ থেকে চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলেই কিনা জানে না, মুখ ফুটে ওদের কাছে নবনীর নাম পর্যন্ত তুলে না। আফজাল সাহেবও এড়িয়ে যান এই প্রসঙ্গ, মাঝেমধ্যে চামেলি কেবল হড়বড়িয়ে বলে ফেলে। ওটুকুই কেবল দুনিয়ার সামনে নবনীর সাথে ওর একমাত্র যোগসূত্র।
কিন্তু দুনিয়ার কেউ জানে না, ওর পুরো হৃদয়টাতেই ওই পাথর হৃদয় মেয়েটা কী প্রবল দর্পে বিচরণ করে চলছে! হৃদয়ে বসে কখনো হৃদয় খামচে ধরে দুমড়ে মুচড়ে গুড়িয়ে দিচ্ছে, তো কখনো ভীষণ নির্বিকার বসে হৃদয় শূন্য দিচ্ছে, আবার কখনো হৃদয়ে আলতো করে মায়ার পরশ ছুঁয়ে নবনী নামের মায়ার পাহাড় গড়ছে।
যার হৃদয়ের একটা কোণেও রায়ানের প্রবেশাধিকার নেই, ভুলে প্রবেশ করতে চাইলেও ছুঁড়ে ফেলে দিতে একফোঁটা সময় লাগে না, অথচ রায়ানের হৃদয়ের পুরোটা জুড়েই কেবল সে! নবনী ছাড়া ওর হৃদয়ে আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। কী অদ্ভুত আশ্চর্য এই সমীকরণ!
ক্লান্তিতে চোখ বুজে এসবই ভাবছিল রায়ান, এরইমধ্যে ওর মুঠোফোনে একটা টেক্সট মেসেজের টুংটাং শব্দ হলো। কী মনে করে জানে না, ফোনটা হাতে নিল। আর প্রায় বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। হোক শুকনো একটা অভিনন্দন বার্তা, তবুও ভেতরে ভেতরে কী এক শিহরণ বয়ে গেল।
"অভিনন্দন রায়ান, সবসময়ই এমন সফল হও।"
"আমি তো সবকিছুতেই সফল হতে চাই নবনী, তুমিই তো আমাকে ব্যর্থ করে দিলে, ভীষণভাবে ব্যর্থ করে দিলে!"
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে কথাটা বলল রায়ান।
...........