তুমি থাকো সিন্ধুপারে

পর্ব - ৩৫

🟢

সময় যেন কোথাও থমকে আছে, নয়তো এই ছয় মাসকে ছয় বছর মনে হচ্ছে কেন? নাকি মন কেমন করা প্রহরগুলোই এমন দীর্ঘ মনে হয়! ভেবে পায় না রায়ান। প্রায় নয় মাস পেরিয়ে গেছে কিন্তু ওর জীবনটা বলা ভালো হৃদয়টা এখনো যেন এক জায়গায় আটকে আছে। জীবন কিন্তু ঠিকই এগিয়ে গেছে নিজের নিয়মেই।

ওর সলো ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন সফলভাবে শেষ হবার পরেই ইউ.এস.এ. এর নামজাদা কিছু ফটোগ্রাফি ম্যাগাজিন থেকে অত্যন্ত ভালো কিছু অফার আসে। যদিও ও ফ্রিল্যান্সার হিসেবেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তবুও একটাতে যোগ দিয়েছে। এত ভালো অফার হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করেনি। হয়তো নিয়ম মাফিক কাজে ডুবে থাকলে সময়টা কেটে যাবে বলেই এই সিদ্ধান্ত! তবুও কী এক অদৃশ্য সুতোর ডগায় আঁটা সূঁচ ওর হৃদয়কে টেনে ধরে সুতীক্ষ্ণ খোঁচায় খোঁচায় রক্তাক্ত করে দিচ্ছে!

যখন দুজন কাছাকাছি ছিল তখনও ওদের মাঝে কয়েক সিন্ধু দূরত্ব ছিল, এখনও তাই আছে। রায়ান শুনেছিল সময় নাকি সব ভুলিয়ে দেয়, বিষাদ আর আনন্দের মধ্যে একটা সাম্যাবস্থা বজায় রাখে! কিন্তু ওর তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। যদি তাই হতো তবে অনেকটা সময় পেরিয়ে এসে, সহস্র ক্রোশ দূরত্ব অতিক্রম করেও হৃদয়টা এখনো সেই একই জায়গায় পড়ে আছে কেন? ওই সুদূর সিন্ধুর ওপারের এক পাথর হৃদয়ের মায়াবতীর হৃদয় কিনারায় ঘাপটি মেরে বসে আছে! আর বেচারা রায়ান নিঃস্ব হচ্ছে, শূন্যতায় ডুবে যাচ্ছে!

***

নবনীর মনে কিছুটা মেঘ জমেছে, মাস ছয়েক আগে রায়ানকে টেক্সট করেছিল, কিন্তু তার উত্তর পায়নি। মূলত এটাই ওকে তাতিয়ে দিয়েছে। অথচ ও ছাড়া আর সবার সাথেই দিব্যি কথা হয় তার। চামেলি তো ভাইজান বলতে গদগদ, বাবাও যখন রায়ানের সাথে কথা বলেন কী মিষ্টি করে হাসেন, চন্দ্র তো আরেক কাঠি এগিয়ে, কত-শত আবদারের ঝাঁপি খুলে বসে। আর ওকে যেন বেমালুম ভুলে বসে আছে!

"খুব তো বলেছিল অপেক্ষা করবে, একবারও যোগাযোগ করতে পারল না। এটাই তার অপেক্ষার নমুনা। সবটাই শুধু মুখে মুখে।"

পরক্ষণেই নিজের এমন ভাবনা নিজের কাছেই হাস্যকর লাগল, ও নিজেই তো সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। রায়ানের আকুতি ভরা নিবেদনের প্রতিদান কী নিষ্ঠুরভাবেই না দিয়েছে ও! রায়ানকেই তো দুমড়ে মুচড়ে গুড়িয়ে দিয়েছে ও। তবে এমন আশা কী করে ওর মনে থেকে গেল? চোখের জল মুছে বাবার ঘরে যাবার জন্য পা বাড়াল।

আফজাল সাহেব আধশোয়া হয়ে আজকের পত্রিকাটা ভাজ করে বুকের উপর রেখে পড়ছিলেন। মেয়ের ডাকে সেটা নামিয়ে রেখে উঠে বসলেন। নবনী বাবার পাশে বসে তাঁর হাত ধরে বলল,

"বাবা, ওষুধ খেয়েছ তুমি? এখন তো আমি দেবার আগেই তুমি খেয়ে নাও।"

"হ্যাঁ, নিজের খেয়াল রাখতে শিখছি। তোর উপরে বোঝা হয়ে আর কতদিন থাকব বল। তাই..."

"এসব কী বলছ বাবা? তুমি এমন করে বললে আমি কোথায় যাব বলো তো? আমাকে কেন ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছ?"

ভেজা চোখে ভাঙা স্বরে নবনীর আর্তি।

আফজাল সাহেবের বলতেও খুব খারাপ লাগছে, কিন্তু উনি মেয়েকে থিতু করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যদি দুটোরই চোখে পরস্পরের জন্য ভালোবাসা না দেখতেন তবে এসব করতেন না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের মেয়ের সুখের কাঁটা কিনা তিনি নিজেই, এটা একেবারেই মেনে নিতে পারছেন না।

"তোকে ছুঁড়ে ফেলার সাধ্য আমার নেই। আমি কেবল চাই তুই যোগ্য একটা জীবনসঙ্গী বেছে নে। প্রত্যেক মানুষেরই বিশেষ কাউকে জীবনে দরকার হয়। নয়তো দেখবি এমন এক সময় আসবে যখন একেবারে একা হয়ে যাবি। তীব্র একাকিত্ব যে কতটা তিক্ত এটা তখন ঠিকই উপলব্ধি করবি। তখন আঁতিপাঁতি করে একটা হাত খুঁজবি, কিন্তু পাবি না। সময় থাকতে সত্যিকার হাতটা ধর, যে হাত তোকে কখনোই একা হতে দেবে না!"

চশমা খোলে পাঞ্জাবীর হাতায় মুছে নিয়ে আবার নাকের উপরে বসিয়ে চোখ ঢেকে নিলেন তিনি।

নবনী কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না,

"তুমি একা কীভাবে থাকবে বাবা? আমি তোমাকে ফেলে কোত্থাও যাব না।"

"ঘুরেফিরে আমাকেই কেন তুই অপরাধী করছিস মা? রায়ান খুব কষ্ট পাচ্ছে, তুইও কষ্ট পাচ্ছিস। আর আমি পুড়ছি অপরাধবোধের জ্বালায়, নিজের মেয়ের সুখ গলা টিপে মারার জন্য এই অপরাধবোধ। এটা যে কী ভয়ংকর একটা বোঝা, কী যে গ্লানি মিশে আছে এতে, তুই সেটা জানিস না মা! আমাকে এভাবে শেষ করে দিস না।"

নরম গলায় এতগুলো কথা বলে থামলেন আফজাল সাহেব, বড় করে শ্বাস টানলেন।

"আমি রায়ানকে ভালোবাসি এটা ঠিক, কিন্তু এরজন্য তোমাকে কী করে একা ফেলে যাব বাবা। তোমার কাছে আমার নিজের জীবনও কিছু না। আর ওটা তো কিছু অনুভূতি!" শক্ত গলায় বলার চেষ্টা করলেও গলাটা নিজের কথা শুনছে না। কিছুতেই দৃঢ়তা খুঁজে পাচ্ছে না।

"মা রে! এই অনুভূতিগুলোই কিন্তু আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আমি দীর্ঘ একটা জীবন কাটিয়ে ফেলেছি, এখন জীবনের কাছে আমার খুব একটা কিছু চাইবার নেই। এই বুড়ো বাপের শেষ চাওয়া হিসেবেই নাহয় নিস এই ইচ্ছেটাকে।"

হামলে কেঁদে উঠল নবনী, দীর্ঘদিন পরে মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন তিনি, সেই হাতে যেন মিশে থাকল স্নেহ, ভালোবাসা আর ভরসা!

***

রায়ান আশরাফ সাহেব আর ন্যান্সি আন্টির সাথে বসে গল্প করছিল, এই সময়টা ওর খুবই ভালো কাটে। যাকে বলে পারফেক্ট ফ্যামিলি টাইম। ন্যান্সির আরও দুটো ছেলে আছে, ওরাও থাকে সেসময়। লালচে চুলের ভীষণ সুন্দর দেখতে দুজনেই। ওরাও রায়ানকে ভালোবাসে, দূরত্ব কাটিয়ে ওদেরকেও কাছে টেনে নিয়েছে।

আড্ডা শেষ করে রুমে গিয়ে ফোনটা হাতে নিতেই টেক্সটটা পেল,

"এই যে মশাই, তোমার কঠিন ব্যামোটা কি সেরে গেছে? নাকি নতুন প্রতিষেধক পেয়ে গেছ?"

রায়ানের মস্তিষ্ক যেন কিছু সময়ের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিল, এর মানে কী? এতদিন পরে এমন মেসেজের মানেই বা কী? তবুও কোনোমতে ফোনের বাটন চেপে উত্তর দিল,

"আমি তো এই অসুখটাকেই নিজের সর্বস্ব করে নিয়েছি। একে সারিয়ে নিলে যে আমি নিঃস্ব হয়ে যাব! এতটা শূন্য হলে বেঁচে থাকব কী করে?"

পাঠানোর পরে মনে হলো বুঝি আরেকবার ভুল করল, ওমন প্রত্যাখ্যানের পরও কী করে এসব বলল রায়ান! নিজের উপরে রাগ হলো, নিজেকে বেহায়া, নির্লজ্জ মনে হলো। কিন্তু নিরস্ত করতে পারল না। কী এক অদ্ভুত দোলাচাল!

উত্তর এলো ক্ষণেক পরেই, যেন অপরপ্রান্তে নবনী এর অপেক্ষাতেই ছিল, এবার আরেক দফা ধাক্কা খেল রায়ান, বিস্ময়ে যেন চোখ বেরিয়ে এলো কোটর ছেড়ে, এও কী সম্ভব! ঠিক দেখছে তো সে?

"তবে নাহয় আমি তোমার সেই অসুখের উপসর্গই হব।"

"সে তো কবেই হয়ে গেছ! নতুন করে আর কী হবার আছে? এখন আমার সময় কাটে শুধু একটা ইশারার অপেক্ষায়! যেই ইশারায় আকুণ্ঠ ডুবে যেতে প্রস্তুত আমি, জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হওয়া এই আমি তাতে কিছুটা হলেও শান্তি পাব।"

অনেকটা সময় নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতেই লিখল, সেন্ড বাটন চাপতেই আবারও অস্থিরতা ফিরে এলো, তবে কী ইশারা আসবে!

"মাথামোটা ছেলে, ইশারা তো পেয়েই গেছ, তবে বুঝে নিতে পারলে না কেন? সবকিছু কী বলে বলে বোঝানো যায়?"

এটা কী সত্যি, ঘুম ভাঙলেই সবটা হারিয়ে যাবে না তো! একটা সুতীব্র ঘোরে ডুবে উত্তর দিল,

"আমার কী দোষ বলো তো? তুমি এত দুর্বোধ্য কেন? আহবানটা আরেকটু তীব্র হলে কিইবা ক্ষতি হতো? আমার বোধহয় আজীবন কেটে যাবে তোমার মনের অলিগলি চিনতে!"

এবার কলই করেছে নবনী, আর কোনো রাখঢাক নেই, কিছুটা হলেও বলে দিয়েছে। কল দিতেই খট করে ধরে ফেলে রায়ান,

"এসব কি সত্যি নবনী? ঘুম ভাঙলেই সবটা গুড়িয়ে যাবে না তো?" কাতর গলা ওর।

"বুদ্ধু, এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার?"

"ভালোই যদি বাসো তবে ফিরিয়ে দিয়েছিলে কেন? আরও আগে ডাকলে না কেন?" দ্বিধা নিয়ে বলল রায়ান।

"যার অসুখ তারই তো প্রতিষেধকের খোঁজ করতে হয়। তোমার সাথে আমার অনেক কথা আছে রায়ান! কিছু চাওয়া আছে।"

নবনীর গলা আজ কী ভীষণ রিনরিনে মিষ্টি লাগছে, কাঠিন্যের ছিঁটেফোঁটাও নেই সেখানে।

"তোমার সব কথা তো শুনতেই চাই, খুব করে চাই। তুমি যখন ইচ্ছে বলতে পার!"

আরেকটা কথা মুখে এলেও বলল না, কেবল মনে মনে আওড়াল,

"এই মুহূর্তের জন্য কত সহস্র প্রতীক্ষা, এই ক্ষণ তবে সত্যিই এলো। একবার শুধু খোলাখুলি ভালোবাসি বলে দেখ মেয়ে, তোমার এই একটা কথা শুনতে শুনতে সারাজীবন কাটিয়ে দেব।"

প্রথম প্রেমে পড়লে যেমন সব সুন্দর মনে হয়, রায়ানের কাছেও সবটা স্বপ্নের মতোই সুন্দর মনে হচ্ছে। পৃথিবীটা সত্যিই সুন্দর, অদ্ভুত সুন্দর!

............

তুমি থাকো সিন্ধুপারে পর্ব ৩৫