উমাইরা নিজের কক্ষের দিকে পা বাড়িয়েও সেই পা গুটিয়ে আনলো। পাশেই ওয়াসিফের কক্ষ, একটু উঁকি দেওয়া যাক ভেবে সেই দিকে পা বাড়াল। ওয়াসিফের কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। উমাইরা বার কয়েক টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর ওয়াসিফ দরজা খুলেছি।
পরনে কোমর পর্যন্ত জড়ানো সাদা তোয়ালে, ঠিক নাভির নিচে। বাম হাতে আরেকটি তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছে সে, আর ডান হাতটা ঠেকানো দরজার হাতলে। সদ্যস্নাত দেহ জুড়ে ছড়ানো জলকণার ঝিলিক—পেশীবহুল বুকজুড়ে টলমল করছে একেকটি ফোঁটা। ভেজা চুল থেকে গড়িয়ে আসা এক বিন্দু পানি ঘাড় ছুঁয়ে নেমে এলো বুকের ওপর, থেমে রইল ঠিক হৃদয়ের কাছে, যেন এক নিঃশব্দ, শীতল শিহরণ ছড়িয়ে দিল তার নগ্ন ত্বকে।
উমাইরা হা করে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবটির উন্মুক্ত বুকের দিকে। চোখে বিস্ময়, মুখে নিঃশব্দতা। সদ্যস্নাত শরীরের জলকণা যেন বৈদ্যতিক বাতির আলোয় ঝিকমিক করে তার দৃষ্টি ছিনিয়ে নিয়েছে। সে এক মুহূর্তে খেই হারিয়ে ফেলেছে, চুপিসারে ডুবে গেছে ভাবনার গহিন জলে। হঠাৎ ভেসে এলো এক তুরির আওয়াজ, ছেদ ঘটলো তার বিভোরতা। বাস্তব যেন টেনে আনলো তাকে ভাবনার জগৎ থেকে। চক্ষু উঁচু করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল মানবের মুখশ্রীতে। ভেসে এলো এক গুরু গম্ভীর কন্ঠস্বর বিরক্তি মিশিয়ে বলল—
-"মুখ বন্ধ কর মশা ঢুকবে। হা করে কি দেখছিস সেই কখন থেকে? কখনও দেখিস নি আমাকে?"
টনক নড়ল উমাইরার। কি করছিল সে এতক্ষণ যাবৎ! বেহায়ার মতন তাকিয়ে ছিল। ইসস মানসন্মান সব গেলরে তোর উমাইরা। নিজেকে ধাতস্থ করে উমাইরা কন্ঠে জর এনে বলল—
-"দেখছি, দেখছি! সরে দাঁড়ান ভেতরে যাবো!"
ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো ওয়াসিফের। কুঁচকানো ভ্রু জোড়া আরো কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়লো—
-"এত রাতে আমার রুমে কি তোর?"
উমাইরা ওয়াসিফকে ঠেলে সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল—
-"বিয়ের কাজ কর্ম নিয়ে কিছু কথা ছিল আপনার সাথে, তাই আসলাম।"
-"বেশ! বল কি বলতে এসেছিস, বলেই বিদায় হো।"
-"এমন ভাবে বলছেন কেন? আমি তো প্রয়োজনেই এসেছি।" শেষের কথা টুকু বলে মুখে ভেংচি কাটলো উমাইর।
-"একদম ভেংচি কাটবি না। কি বলতে এসেছিস বল, বাড়তি কথা বলার প্রয়োজন নেই।"
-"বলছিলাম, আপনি যে তখন বললেন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সাথে অ্যাপয়েনমেন্ট করে আপনকে জানতে। তো আপনি কি যাবেন আমার সাথে মিটিং করতে?
-"হুম!" ছোট্ট জবাব ওয়াসিফের।
-"আচ্ছা ঠিক আছে। আমি মিটিং এর ডেট ঠিক করে আপনকে জনাব।"
-"ওকে! আর কিছু বলবি? বলার না থাকলে বের হ আমি ড্রেস পড়বো।"
উমাইরার এতক্ষণে খেয়াল হলো ওয়াসিফ শুধু টাওয়েল পড়ে আছে। জিভ কেটে চোখ নামিয়ে নিলো। লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করার জন্য পা বাড়ালো উমাইরা। তৎক্ষণাৎ বহু টেনে ধরলো ওয়াসিফ। মুখ তুলে চাইলো উমাইরা।
-"এখন লজ্জা পাচ্ছিস কেন? একটু আগে তো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলি। মনে হচ্ছিল এই বুঝি খেয়ে ফেলবি আমকে।"
উমাইর ওয়াসিফের হাত থেকে বহু ছড়িয়ে, মাথা নিচু করে বলল—
-"সরি! আসলে আমার খেয়াল ছিল না। আপনি চেঞ্জ করে নিন।" বলেই উমাইরা এক ছুটে নিজের কক্ষ এসে দরজা বন্ধ করে বুকে হাত দিয়ে দরজার সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। বুকটা এখনোও ধুকপুক করছে। ইসসসস এত লজ্জা সে জীবনে পায় নি।
অন্যদিকে উমাইরার কাণ্ড দেখে ওয়াসিফ উচ্চশব্দে হেসে উঠলো।
----------------------------
পরদিন সকাল বেলা—
উমাইরা কিছুক্ষণ লজ্জায় কাটালেও পরবর্তীতে বিয়ের কথা স্মরণে এলে উঠে কাজে লেগে পড়ে। সারা রাত জেগে অনেক গুলো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সাথে যোগাযোগ করছে। পরশুদিন মিটিংয়ের ডেট দিয়েছে উমাইরা। এখন শুধু ওয়াসিফ ভাইকে জানানো হলেই হলো। তাইতো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে এসে দাঁড়িয়েছে ওয়াসিফের কক্ষের সামনে। কালকে রাতের ঘটনা মনে হতে লজ্জায় আড়ষ্ঠ হচ্ছে উমাইরা। অনেকক্ষন গাইগুই করার পর ও ডাকতে পারলো না।
হঠাৎই দরজা খুলে যাওয়ার শব্দে দৃষ্টি ঘুরালো উমাইরা। ওয়াসিফ একদম ল্যাবে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েই বের হয়েছে। দরজা খুলেই সামনে উমাইরাকে দেখে কপাল কুঁচকে এলো ওয়াসিফের।
-"এত সকালে তুই আমার রুমের সামনে পায়চারি করছিস কেনো?"
-"না মানে.. ইয়ে.."
-"স্পষ্ট ভাবে কথা বলতে পারিস না? কি বলবি দ্রুত বল বের হবো আমি।"
-"আপনি মিষ্টি করে কথা বলতে পারেন না? ইতালিতে গিয়ে কি এইসব শিখেছেন? যখনই মুখ খুলে নিমপাতার মতন তিতা তিতা বাক্য বের করেন।" বলেই একটা ভেংচি কাটলো। পরক্ষণেই দাঁতে জিব কাটল, বুঝল কাকে কি বলে ফেলেছে। চোরা চোখে দৃষ্টিপাত করল সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মনবটির পানে।
ওয়াসিফ চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে এলো উমাইরার কাছে। উমাইরা দু'পা পিছনে তার উপায় নেই রেলিংয়ের সাথে ঠেকেচে তার পিঠ। ওয়াসিফ হাত উঠে শক্ত করে চেপে ধরলো উমাইরার দুই গাল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল—
-"তোকে কত বার বলেছি মুখ ভেংচি কাটবি না। একটা কথাও শুনিস না তুই। আবার বেয়াদবিও করছিস। আমি তিতা কথা বলি? তা, আমি মিষ্টি কথা বললে তুই নিতে পারবি তো?"
দুই গাল চেপে ধরায় উমাইরার ঠোঁট গোল হয়ে রয়েছে। সেইভাবেই অস্পষ্ট বলল—
-"আর হবে না। সরি!"
-"মনে থাকে যেন কথা টা।" বলেই ওয়াসিফ ছেড়ে দিলো উমাইরাকে তারপর দ্রুত পা ফেলে বেরিয়ে পড়ল ল্যাবের উদ্দেশে।
উমাইরা গাল ঘষছে আর রাগে ফুঁসছে। গাল ঘষতে ঘষতে বিড়বিড় করছে—
-"খবিস লোক কোথাকার! একবার বিয়ে করি তোকে তারপর তোর মজা বুঝাবো ওয়াসাইফের বাচ্চা।" উমাইরার হঠাৎই খেয়াল হলো যেটা বলতে এসেছিল সেটা বলা হয় নি। তড়িৎ বেগে উল্টো ঘুরে চেঁচিয়ে উঠলো উমাইরা—
-"আরে আসল কথাই তো বল হলো না, দাঁড়ান!" কিন্তু ওয়াসিফ ততক্ষণে সদর দরজা পেরিয়ে চলে গেছে।
-"ধুর ছাই! চলে গেলো কথাই শুনল না।" বেশ বিরক্তি সহিত বলল উমাইরা।
---------------------
স্নিগ্ধা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। হঠাৎই ঝড়ের বেগে কেউ এক দৌঁড়ে ওপরে উঠছিল, আর তখনই স্নিগ্ধার সঙ্গে তার ধাক্কা লাগে। ধাক্কার চোটে স্নিগ্ধা পড়ে যেতে যাচ্ছিল, চোখ শক্ত করে বন্ধ করে এক চিৎকার দিয়ে ফেলে। কিন্তু ঠিক তখনই দুটি পুরুষালি, শক্ত বাহু তাকে আগলে নেয়।
শরীরে কোনো ব্যথা অনুভব না হতে, স্নিগ্ধা মিটিমিটি করে চোখ খুলে তাকায়। আর তাকাতেই চমকে ওঠে, বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায় সে। তার সামনেই দাঁড়িয়ে এক মানব, যে এখনো স্নিগ্ধার কোমর জড়িয়ে ধরে রেখেছে।
মেহরাবের জরুরি একটি কাজ ছিল কক্ষে। সেই কারণে ঝড়ের বেগে ওপরে উঠতে গিয়েই ধাক্কা লাগে স্নিগ্ধার সঙ্গে। স্নিগ্ধার চিৎকার শুনে ঘুরে তাকাতেই থমকে যায় মেহরাব। এক মুহূর্ত দেরি না করে তড়িৎ গতিতে ছুটে এসে জাপটে ধরে স্নিগ্ধাকে, পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে ফেলে।
স্নিগ্ধার চোখ তখনও বন্ধ। আর মেহরাব অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। যেন কোনো বিরল ফুলের সাক্ষাৎ পেয়েছে সে, এক অনামা প্রশান্তি বুকের গভীরে ছড়িয়ে পড়ছে। কী হচ্ছে তার সঙ্গে? কেন এমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে? কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না মেহরাব।
শুধু এই মুহূর্তটি যেন থমকে থাকে,
সময় স্তব্ধ হয়ে যাক, এটাই চাইছে সে।
-"কি হচ্ছে এটা? মেহরাব ভাই! ছাড়ুন আমাকে!"
অপ্রস্তুত কণ্ঠে কথাগুলো বলে ওঠে স্নিগ্ধা। তার মৃদুস্বরে বলা সেই কথাগুলো কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই যেন ভাবনার ঘোর কাটে মেহরাবের।
আস্তে করে সে জড়িয়ে রাখা কোমর ছেড়ে দেয়। লজ্জায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, কানের পেছনে মাথা চুলকে ধীরে ধীরে বলে ওঠে—
-"আসলে….আমি খুবই দুঃখিত, স্নিগ্ধা। তোমাকে দেখতে পাইনি। জরুরি একটা কাজ ছিল, তাই তাড়াহুড়া করে উঠতে গিয়েই তোমার সঙ্গে ধাক্কা লেগে যায়। আইএম এক্সট্রিমলি সরি, কিছু মনে কোরো না,প্লিজ।"
-"ইটস ওকে, মেহরাব ভাই। আমি বুঝতে পেরেছি। চিন্তা করবেন না, আমি কিছু মনে করিনি।"
বলেই ঘুরে নিচে নেমে যায় স্নিগ্ধা।
তার চলে যাওয়ার পানে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে মেহরাব।
অসচেতনভাবে ডান হাত চলে যায় বুকের বাঁ পাশে।
বুকে কি চিনচিনে একটা ব্যথা করছে?
হ্যাঁ, করছেই তো! কিন্তু কেন?
মেহরাব কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।
শুধু এটুকুই বোঝে, এই ব্যথা থামাতে হলে স্নিগ্ধাকে এই বুকে আসতেই হবে। তবেই মিলবে শান্তি, তবেই বুকের এই ব্যথার অবসান হবে।
-----------------------
উমাইরা নিচে রান্না ঘরে চলে আসে। রুমানা বেগম, ফাহমিদা বেগম ও রাহেলা বেগম রান্না করছেন। ছোট ফুপু রুবায়েত বেগম সবার ছোট হওয়ায় তাকে কেউ কোনো কাজ করতে দিচ্ছেন না, তাই তো রান্না ঘরে তাদের সাথে গল্প গুজব করছেন। বাব, কাকুমনি অয়ন ভাইয়া আর এহসান ভাইয়া অফিসে গেছেন। দাদু-দাদী স্নিগ্ধা ও নিধী ড্রয়িং রুমে বসে গল্প করছে।
উমাইরা রান্না ঘরে এসে সোজা রাহেলা বেগম এর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করলো—
-"মনি তোমার রাজপুত্তুরের ফোন নাম্বারটা দাও তো। বেটা আমার পুরো কথা না শুনেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো।"
-"আহ উমাইরা! ওয়াসিফ তোমার বড় সম্মান দিয়ে কথা বলো।"
-"মা! ওই বেটা সব সময় আমার সাথে কেমন ব্যবহার করে দেখো না তুমি। আচ্ছা বলো তো আমি তোমার পেটের সন্তান নাকি ওয়াসিফ ভাইয়া? আমার চেয়ে বেশি তো তুমি ওয়াসিফ ভাইয়াকেই ভালোবাসো।" গাল ফুলিয়ে কথা গুলো বললো উমাইরা। রুমানা বেগম মেয়েকে কিছু বলবেন কিন্তু তার আগেই রাহেলা বেগম তাকে বাঁধা দিলেন।
-"আচ্ছা হয়েছে বাবা! থামো তোমরা মা-মেয়ে। তোর কাছে ওয়াসিফের নম্বর নেই উমাইরা?"
-"থাকবে কি করে! তোমার রাজপুত্তুর তো আমার সাথে কথাই বলে না। আসার পর থেকে শুধু ধমকিয়েই গেছে। একদিনও ভালো ভাবে কথা বলে নি আমার সাথে।" মুখ ফুলিয়ে নিলো উমাইরা। অনেক অভিমান জমেছে তার মনে।
-"আচ্ছা বেশ! ঐযে ওই খানে আমার ফোন পাসওয়ার্ড নেই, বের করে নে।"
আদুরে সুরে বললেন রাহেলা বেগম। রান্না ঘরে রাখা রেকের দিকে ইশারা করে বোঝালেন ফোন ওখানে। উমাইরা ফোনটা হাতে নিয়ে নম্বর খুঁজে বের করে নিজের ফোন উঠিয়ে নিল। তারপর হেলতে দুলতে ড্রয়িং রুমে এসে সোফায় ধপাস করে বসে পড়ল। উমাইরার কাণ্ড দেখে রান্না ঘরে উপস্থিত সকলেই হেসে উঠলো।
উমাইরা ওয়াসিফের নম্বরে দুটি মেসেজ পাঠিয়েছে—
-"এইযে! জনাব রাজপুত্তুর, তখন তো কথা না শুনেই আমাকে ধমকিয়ে চলে গেলেন। স্বভাব পরিবর্তন করুন বুঝছেন? আমি বলে সহ্য করি, অন্য কেউ কিন্তু নেবে না। ঘরে বউ থাকবে না এই ধমক দেওয়ার স্বভাব থাকলে। কপালে ঝাড়ু মেরে চলে যাবে হু!" সাথে একটি মুখ ভেঙানোর ইমোজি।
-"শুনুন, জরুরি কথা! আমি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সাথে অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়েছি। আগামীকালের পরের দিন অর্থাৎ পরশুদিন বেলা ১২ টার দিকে। আপনার ঐ পোকা পড়া মাথায় কথা টি ঢুকলে যথা সময়ে আমাকে নিয়ে যাবেন।
—ইতি আপনার একান্তই বাধ্য, শান্তশিষ্ট ভদ্র মামাতো বোন।"
মেসেজটি পাঠিয়ে ফোনটা পাশে রেখে দিলো। স্নিগ্ধা আর নিধীকে ফিসফিস করতে দেখে উমাইরাও আস্তে ধীরে এগিয়ে যায়। নিধীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে—
-"কিরে কি কথা বলছিস তোরা দুজন? আমাকেও বল আমিও একটু শুনি!"
হঠাৎ উমাইরার ফিসফিসিয়ে বলা কথা শুনে দুজনেই ভয় পেয়ে দেয় এক চিৎকার—
-" ও মা গো !" তারপর দুজনেই একসাথে বুকে থুথু দিয়ে উমাইরার পানে দৃষ্টিপাত করে বলে—
-"উফ! আপুই এইভাবে কেউ পেছন থেকে এসে ফিসফিস করে? ভয়ে আত্নটা বেড়িয়ে আসছিল।"
উমাইরা কপাল কুঁচকে কোমরে দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে। ওদের চিৎকার শুনে রান্না ঘর থেকে রুমানা বেগম আওয়াজ ছুঁড়লেন কি হয়েছে জানতে। উমাইরা প্রত্যুত্তর করে বলল—
-"কিছু হয়নি আম্মু! এমনি দুজনে দুষ্টুমি করছে।"
-"ছোট নাকি তোরা এখনো? ভদ্র ভাবে গিয়ে পড়তে বস যা। সব সময় শুধু বাঁদরামি।"
-"কি কথা বলছিলি তোরা হুম? আমাকে দেখে এত ভয় পাওয়ার তো কথা নয় তোদের।" সন্দিহান চোখে চেয়ে প্রশ্ন করল উমাইরা। স্নিগ্ধা ও নিধী কাচুমাচু করছে। আমতা আমতা করে স্নিগ্ধা বলতে লাগলো—
-"আসলে আপুই, নিধী এহসান ভাইয়াকে পছন্দ করেছে।"
-"আরেররর বাসসসস! কি বলিস সত্যি নাকি? আয় আয় এখানে বসে শুনি সবটা আয় জলদি।" সাথে সাথেই তিন বোন বসে পড়ল সোফায় তারপর নিধী বলতে শুরু করলো—
-"আসলে আপু, তুই যেইদিন আসলে ওইদিন এহসান ভাইয়ার রাগ দেখে আমি তার প্রেমে পড়ে গেছি।"
উমাইরা খানিকটা অবাক হলো। রাগ দেখো কেউ করো প্রেমে পরে নাকি? আজব তো।
-"রাগ দেখে কেউ করো প্রেমে পড়ে নাকি ছাগল। রাগী ছেলেদের দেখলে তো ভয় পাওয়ার কথা। আর তুই কিনা প্রেমে পড়ে গেলি?"
-"হ্যাঁ আপু! জানি না আমি, কিন্তু এহসান ভাই যেইভাবে প্রীতি ভাবী আর অয়ন ভাইয়ার ওপর রাগ দেখলো, বিশ্বাস করো কি হ্যান্ডসাম যে লাগছিল। উফফফ...আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। তবে একজন ভাই হিসাবে বোনের জন্য যেই ভালোবাসা, কনসার্ন দেখিয়েছে সেটাই আমার মন কেড়ে নিয়েছে।"
-"বাবাহ্! কবে এত পেকে গেলিরে? এত ভারী ভারী কথা বুঝিস তুই, বলছিস যে? আচ্ছা সেসব বাদ দে! ভাইয়াকে বলেছিস?"
-"না!" অমনি মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো নিধীর।
-"কেনো?"
-"আমি বলছি আপুই। এই গাঁধী ভাবছে ভাইয়ার পছন্দের কেউ আছে। আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কিন্তু ভাইয়া তো আমাকে এইসব কিছু বলে না তাই আমি জানি না।"
-"ওওওওও! এই ব্যাপার। আরে ভাইয়া কাউকে পছন্দ করে না। এহসান ভাইয়া খুব স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড ছেলে। যদি কাউকে পছন্দ করত তাহলে গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে ফেলত বা বিয়ের জন্য বাসায় জানিয়ে দিত। যেহেতু এইসব কিছুই নেই তাহলে পছন্দের কেউ ও নেই। তুই নির্দ্ধিধায় ভাইয়াকে জানাতে পারিস।"
-"কিন্তু যদি রিজেক্ট করে দেয়?"
-"হুম! সেটাও ঠিক। শোন এক কাজ করতে পারিস। অয়ন ভাইয়ার বিয়ের প্রোগ্রামে এহসান ভাইয়াকে পটানোর চেষ্টা করতে পারিস। তুই সুন্দরী বুদ্ধিমতি নিশ্চই ভাইয়া তোর প্রেমে পড়বে। জাস্ট ঐভাবে এগিয়ে যাস। বাকি কোনো সমস্যা হলে প্রীতি ভাবী তোকে শিখিয়ে দেবে। আমি তো ভাই প্রেমে আন্ডা প্রাপ্ত মানুষ এইসবে আমার বুদ্ধি চুরি করতে যায়।"
-"কেন আপুই এইভাবে বলছ কেন? প্রীতি ভাবী জানলে তুমি কেনো জানবে না?"
-"কি যে বলিস তুই নিধী! আপুই এইসব ব্যাপারে জানলে তো ওর নিজেরই অন্তত পক্ষে একটা বয়ফ্রেন্ড থাকতো, জীবনে চোখে দেখতাম। জীবনে প্রেমের স্কুলের দরজার কাছেও যায়নি আপুই।"
হাসতে হাসতে সোফা থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম স্নিগ্ধার। উমাইরা মাথায় একটা চাটি মেরে বলল—
-"খুব পেকেছিস তাই না? দাঁড়া আব্বুকে বলে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করছি। বাড়ি থেকে বিদায় করবো তোকে জাস্ট ওয়েট কর।"
-"আপুই মেহরাব ভাইয়ার সাথে ওকে বিয়ে দিয়ে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দাও। দুইজন দুইজনকে জ্বালিয়ে মারুক। আমি এহসান ভাইয়াকে বিয়ে করে এখানে চলে আসব। তারপর দুইবোন মিলে আনন্দে দিন কাটাব।"
কথা গুলো বলেই নিধী ও উমাইরা হাসতে হাসতে একেঅন্যের গায়ের ওপর ঢলে পড়ছে। স্নিগ্ধা ওইদিকে রাগে ফুঁসছে। তন্মধ্যে বাড়িতে প্রবেশ করলো ওয়াসিফ। বাড়ির তিন মেয়ে সোফায় বসে গল্প করছে। উমাইরাকে হাসতে দেখে পা দুটো স্থির হলো।
উমাইরা হাসতে হাসতে হঠাৎ চোখ গেলো সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াসিফের দিকে। যে অপলক দৃষ্টিতে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। মানুষের চোখের ভাষা তো বোঝা যায়। তাহলে উমাইরা কেনো ওয়াসিফের চোখের ভাষা বুঝতে পারছে না?
ভাবনাচুত্ব হলো উমাইরার, নিধী হাসতে হাসতে তার ওপর পড়ায়। চোখ ঘুরিয়ে নিল উমাইরা। তারপর দুই বোন কে এক ধমক দিয়ে বলতে লাগলো—
-"বিয়ে ৩০ তারিখ, আমরা যাবো ১০ দিন আগে। আর তোরা এক মাস আগে থেকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাঁদরামি করছিস? যা গিয়ে পড়তে বস।"
বোনের হঠাৎ ভাব পরিবর্তন বুঝতে পারল না নিধী স্নিগ্ধা। উমাইরা চোখের ইশারায় সদর দরজার দিকে তাকাতে বললো। ওয়াসিফকে দেখে দুজনেই এক সঙ্গে বলে উঠল—
"হ্যাঁ,হ্যাঁ আপু যাচ্ছি। অনেক পড়া বাকি চল চল।" বলেই দুজনে ছুটলো নিজেদের রুমে। উমাইরাও দিলো এক দৌড় রান্না ঘরের দিকে। যেই মেসেজ পাঠিয়েছে, সামনে পেলে এখন কাঁচা চিবিয়ে খাবে লবণ মরিচ ছাড়া।
----------------------
আজকে হসপিটালে আজকে বোর্ড মিটিং আছে। সেই জন্য সকাল সকাল ল্যাবে গিয়ে কিছু কাজ বাকিদের বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে। এখন ফ্রেশ হয়ে আবারও হসপিটালে যেতে হবে ওয়াসিফকে। উমাইরার যাওয়ার পানে তাকিয়েছিল। দৃষ্টি ঘুরিয়ে চলে গেলো উপরে নিজের রুমে ফ্রেশ হতে।
ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে রাহেলা বেগমকে হাক ছেড়ে ডাকছে ওয়াসিফ। রাহেলা বেগম ছেলের কন্ঠ পেয়ে ছুটে এসেছেন।
-"কি হয়েছে বাবা?"
-"কিছু খেতে দাও হসপিটালে যেতে হবে আবার।"
-" আচ্ছা তুই বস আমি খাবার দিচ্ছি তোকে।"
রাহেলা বেগম খাবার নিয়ে এসে ছেলেকে বসতে বললেন। ওয়াসিফও বসে খাওয়া শুরু করলো। আড়চোখে এদিক ওদিক কাউকে খুঁজে চলেছে। কিন্তু না, কাঙ্ক্ষিত মানুষটির দেখা পেলো না। অতঃপর মায়ের উদ্দেশে বলল—
-"উমাইরা কথায় মা?"
-"ওতো স্টুডিওতে আঁকিবুঁকি করছে। কি সব নাকি এক্সিবিশন আছে ওর। আঁকতে পারছিল না বলে আজাদ বাড়ির পিছনের ফাঁকা জায়গায় স্টুডিও বানিয়ে দিয়েছে।
উমাইরা পড়ে গিয়ে রং তুলি যা যা প্রয়োজন সব নিয়ে এসেছে। বেশ কিছুদিন যাবৎ চলছে আঁকাআঁকি।"
ওয়াসিফ আর কিছু জিজ্ঞাসা করলো না। খাওয়া শেষ হওয়ায় মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পরলো। কিছুএকটা ভেবে উল্টো ঘুড়ে বাড়ির পেছনের দিকের স্টুডিও তে গেলো, যেখানে এই মুহূর্তে উমাইরা আঁকাআঁকি করছে। বেশ খোলা মেলা একটা পরিবেশ।
উমাইরা মনোযোগসহকারে ব্রাশের নিখুঁত আঁচড়ে ক্যানভাসে এক স্বপ্নদৃশ্য ফুটিয়ে তুলছে। অনেকটা কাজ এগিয়েছে, আর কয়েকদিন কাজ করলেই ছবিটি হয়তো পূর্ণতা পাবে।
খোলা জানালা দিয়ে ঢোকা বাতাসে তার চুলগুলো বারবার উড়ে এসে কাপলের ওপর পড়ছে। বিরক্ত না হয়ে সে ধীরে হাতে চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছে। সেই মুহূর্তে কিছু রঙ কপালে লেগে যায়।
এপ্রনে, হাতে, মুখশ্রীতে, এমনকি কপালেও রঙের দাগ ছড়িয়ে আছে। রঙে রঙে মিশে থাকা উমাইরাকে দেখে মনে হয় যেন সেও একটি অপরূপ শিল্পকর্ম—নিজ হাতে আঁকা, কিন্তু নিজের অজান্তেই।
ওয়াসিফ অপলক তাকিয়ে আছে সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপটের দিকে। চোখ ফেরাতে পারছে না, যেন চোখের পলক পড়লেই ভেঙে যাবে এই জাদুর ঘোর, মিলিয়ে যাবে মুহূর্তটা।
বুকের ওপর দু’হাত আড়াআড়িভাবে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে সে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে ভাবছে, তার মোহনমল্লিকার একি রূপ সে দেখছে? এমন অনায়াস, অনবদ্য সৌন্দর্য!
উমাইরার মাঝে মিশে থাকা শিল্প ও সরলতার এই মূর্ছনা বেসামাল করে দিচ্ছে ওয়াসিফকে। বুকের ভেতর অনুভূতির এক তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। সে জানে, এভাবে আর এখানে থাকলে ভুল কিছু করে বসবে।"তুই কী করছিস, ওয়াসিফ? নিজেকে সামলাতে শিখ, নাহলে হারিয়ে ফেলবি ওকেও, নিজেকেও।"
চোখের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে একবার শেষবারের মতো তাকাল, তারপর ঘুরে বেরিয়ে গেলো, হসপিটালের উদ্দেশে।
---------------------------
আজ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট টিমের সাথে মিটিং। ওয়াসিফ সকাল থেকেই রেডি হয়ে নিচে বসে আছে—আজ আর ল্যাবে যাওয়া হয়নি। কিন্তু উমাইরার যেন কোনো হেলদোল নেই। সে দিব্যি পুরো বাসা ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন মিটিং বলে কিছু নেই!
"মিটিং ১২টায়, আর রাজপুত্তুর ভোরবেলায়ই সাজগোজ করে বসে আছে! থাকুক, দেখি কতক্ষণ বসে থাকতে পারে, হু!"
উমাইরা আপন মনে বিড়বিড় করছে, আর মাঝে মাঝে ওয়াসিফের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে।
ওয়াসিফের আর সহ্য করতে পারল না। হঠাৎ এক ধমক দিয়ে রুক্ষ কণ্ঠে বলে উঠল—
-"অ্যাই চিকনির বাচ্চা! যা গিয়ে তৈরি হ! চোখে দেখছিস না, হাতে সময় নেই?"
চিকনি শব্দটা শুনেই উমাইরার মুখটা থমকে গেল। অপমানবোধে চোখ রাঙ্গিয়ে বলল—
-"আমার সাথে কথা বলার সময় কি আপনি ভদ্রতা পানির সাথে গুলিয়ে খেয়ে ফেলেন? একটুখানি ভদ্রভাবে বলা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়?" রাগ দেখালেও কণ্ঠে ছিল একটু নাটুকেপনা।
ওয়াসিফ ভ্রু কুঁচকে হালকা কটাক্ষে বলল—
-"মাননীয় মাংস বিহীন হাড্ডি বিশিষ্ট প্রাণী, অনুরোধ করছি একটু তৈরি হয়ে নিন। আমাদের মিটিং আছে, রাস্তায় জ্যামও প্রচুর। আপনি একটু তাড়াতাড়ি করলে এই অধম কৃতজ্ঞ থাকবে।”
ওয়াসিফের ব্যঙ্গাত্মক কথা শুনে উমাইরা হতবাক, মুখটা লটকে গেল। মুখে ভেংচি কেটে ধুপধাপ পায়ে রুমে চলে গেল তৈরি হতে।
পেছনে ওয়াসিফ চুপচাপ নিঃশ্বাস ফেলে একাই মাথা ঝাঁকাল—
-"একটা দিন শান্তিতে যায় না!"
উমাইরা তৈরি হয়ে আসার পর ওয়াসিফরা বেরিয়ে পড়ে মিটিংয়ের উদ্দেশে।
মিটিং সম্পূর্ণ হতে হতে ৩টা বেজে গিয়েছে। মিটিংয়ের মাঝে বিরতি দিয়ে সবাই লাঞ্চ সেরে ফেলেছে। বিয়ের সম্পূর্ণ কাজ কিভাবে কেমন চায় এইসব বলতে বলতেই এত দেরি হয়ে গেলো।
ওয়াসিফ গাড়ি ড্রাইভ করছে, উমাইরা নিশ্চুপ বসে আছে। হঠাৎই খেয়াল হলো গাড়ি বাড়ির রাস্তায় না গিয়ে অন্য রাস্তায় যাচ্ছে। উমাইরা তড়াক করে দৃষ্টি ঘুরিয়ে এনে ওয়াসিফের পানে।
-"বাসায় যাবেন না?"
-"না!" নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর করলো ওয়াসিফ।
-"তাহলে কোথায় যাচ্ছি?"
-"তোকে নারী পাচার দলের কাছে বিক্রি করেছি। তাদের কাছেই তোকে পৌঁছে দিয়ে টাকা গুলো নিয়ে আসব।"