ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে আসছে। সবাই বেস্ত পড়াশোনা নিয়ে। যেভাবেই হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেতেই হবে। সবাই কোচিং এ ভর্তি হয়েছে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এর মধ্যে লামিয়া, রাইসা, প্রীতি ও উমাইরার সাক্ষাৎ হয়েছে খুবই কম। গ্রুপে বেশ একটা কথা হতো না। ওই মাঝে মধ্যে কেমন আছে, কি খবর, পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন, এইসব নিয়েই অল্প বিস্তর কথা হয়েছে।
প্রীতির কথা মেনে লামিয়া, রাইসা ও উমাইরার থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। অনেক কথাই উমাইরার থেকে গোপন করেছে। এই যেমন, ওরা তিন জন একই কোচিংএ ভর্তি হয়েছে, কিন্তু উমাইরাকে মিথ্যে বলেছে।
উমাইরা সব জানে, সবই বোঝে, তবে ওদের কাউকে কিছু বুঝতে দেয়না। মেয়েটা ভিতরে ভিতরে গুমরে মরছে অথচ কেউ টের পাচ্ছে না। সবার মাঝে থেকেও উমাইরা যেনো একা। কেউ নেই ওর, করো সাথে দুটো মনের কথা বলা যায় না। সবাই ব্যস্ত, সবাই উমাইরাকে ইগনোর করছে ব্যস্ততা দেখিয়ে।
উমাইরা বুঝে পায় না, ওর কি দোষ, কেনো সবাই ওর সাথে এমন করছে। উমাইরা গান গাইতে পছন্দ করে। যখন ওর মন খারাপ থাকে, বা কেউ কষ্ট দেয়, আঘাত করে, তখন উমাইরা গিটার নিয়ে গান গাওয়া শুরু করে।
উমাইরা খুব ভালো আঁকতে পারে। আঁকাটা ওর প্যাশন। সেই জন্যই তো কাউকে কিছু না জানিয়েই কানাডার George Brown College Toronto Art & Design Foundation-এ আবেদন করেছে। দেখা যাক, আল্লাহ চাইলে ইনশা আল্লাহ্ হয়ে যাবে।
---------------------------
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। যেহেতু একই দিন ও একই বিশ্ববিদ্যালয়, তাই প্রীতিরা চাইলেও উমাইরাকে মিথ্যা বলতে পারে নি। অবশেষে সবাইকে এক সাথেই কেন্দ্রে আসতে হয়েছে।
ভর্তি পরীক্ষা শেষ, মোটামুটি সবাই অনেক ভালো পরীক্ষা দিয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষা রেজাল্টের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা সবাই পরীক্ষা দিয়েছে।
এর মাঝে একদিন উমাইরা স্নিগ্ধাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে গিয়েছিল। স্নিগ্ধাকে নিয়ে বাসায় ফেরার সময় স্নিগ্ধা বায়না ধরল, সে একটু ঘুরতে যাবে। বোনের আবদার ফেলতে পারলো না উমাইরা। ওর স্বভাবই এমন কেউ ওর কাছে কিছু চাইলে, আর সেটা ওর সাধ্যের মধ্যে হয়, উমাইরা বিনা দ্বিধায় দিয়ে দেয়।
দুই বোন গল্প করতে করতে একটি পার্কে আসলো। আইসক্রিমের গাড়ি দেখে দুই বোন এগিয়ে গেলো দুটো আইসক্রিম নেওয়ার জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হলো, প্রীতি, লামিয়া, রাইসা। ওদের একসাথে দেখে উমাইরা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো। ওদের সামনে গিয়ে প্রশ্ন করলো—
-"তোরা এখানে? কই? আমকে তো কিছু বলিস নি।"
প্রীতি, রাইসা ও লামিয়া অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো। রাইসা ও লামিয়া প্রীতিকে কুনুই দিয়ে খোঁচাচ্ছে কিছু বলার জন্য। প্রীতি চোরা চোখে একবার রাইসা, লামিয়া তো একবার উমাইরার দিকে তাকিয়ে আছে, যে ওদের উত্তরের অপেক্ষায় ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। অবশেষে প্রীতি নিজেকে ধাতস্থ করে বলল—
-"আরে তোকে বলতাম আমরা হঠাৎই প্ল্যান হয়ে গেলো, আর আমরাও বেড়িয়ে পড়েছিলাম। ভাবলাম রাস্তায় তোকে কল করে নিবো। কিন্তু তার আগেই তোর সাথে দেখা হয়ে গেলো। কিন্তু তুই এখানে কি করছিস?আমাদের কাউকেই তো কিছু বল্লি না! কি ব্যাপার, হুম? কোনো স্পেশাল মানুষকে নিয়ে এসেছিস নাকি হ্যা? আমাদের দেখাতে চাস না বলে বলিস নি তাই না?"
-"আরে না! কি যে বলিস তুই। আমি স্নিগ্ধাকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলাম। ও বায়না ধরলো ঘুরবে, তাই ওকে নিয়ে আসলাম। আচ্ছা, তোর থাক, আমি ওকে নিয়ে বাসায় যাই। অনেক দেরি হয়ে গেছে, পরে আম্মু রাগারাগী করবে।"
-"আচ্ছা, ঠিক আছে! রাতে গ্রুপে কথা হবে। সাবধানে যাস।"
বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়ে উমাইরা স্নিগ্ধার হাত ধরে হাটা ধরলো। কিছু দূর যেতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো পিছনে ফেলে আসা বান্ধবীদের কথা—
-"কি একটা অবস্থা বল! ওকে যে আমরা ইগনোর করছি, ও কি বোঝে না নাকি?"
রাইসা বলল—
-"বুঝবে কি করে, মাথায় ঘিলু থাকলে তো। যত্তসব ঢং। ওর ঢং দেখলে গা-পিত্তি জ্বলে যায় বাবা।"
-"যা বলেছিস। যেখানেই যাব, ওকে সঙ্গে নিতে হবে। কেন? কোন দেশের মন্ত্রী রে ভাই তুই, যে তোকে নিয়ে যেতে হবে সব জায়গায়? ওর মতন বিরক্তকর ছেঁচরা মেয়ে দুটো দেখি নি।"
-"বাদ দে তো ওর কথা। হ্যাঁ, মানছি বিপদে ওকেই আগে পাওয়া যায়। তাই বলে কি মাথা কিন নিয়েছে নাকি। এমন ভাবে চলে ফেরা করে যে, আমরা ওর চামচা, ওর পা চেটে থাকি।"
-"থাক, আর মুড খারাপ করে লাভ নেই! চল যাওয়া যাক।"
তারপর ওরা এগিয়ে গেলো নিজেদের গন্তব্যে। উমাইরা ওদের কথপোকথন শুনে কিছু মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
ওর বান্ধবীরা এইসব ভাবে ওর ব্যাপারে? ও না হয় একটু বেশি কথা বলে, সবাইকে অনেক আপন করে ফেলে, তাই তাদের ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবে, তাদের সব কথায় জড়িয়ে যায়। সব সময়ে সাহায্যর হাত বাড়িয়ে রাখে। আর ওরাই কিনা ওকে বিরক্তকর ছেঁচরা ভাবে।
নিজের অজান্তেই চক্ষুদ্বয় দিয়ে অস্রু গড়িয়ে পড়লো। স্নিগ্ধা হাত ধরে টানছে বাড়ি যাওয়ার জন্য। অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্নিগ্ধা চিৎকার করে যখন ডাকলো, তখন নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলো উমাইরা। তারপর বনের হাত শক্ত করে ধরে চলে গেলো বাড়ির উদ্দেশে।
-------------------------------
George Brown College Toronto Art & Design Foundation থেকে মেইল এসেছে। উমাইরা চান্স পেয়েছে। ২০ দিন পর উমাইরার ফ্লাইট। ভাগ্যিস সখের বশে পাসপোর্ট করে রেখেছিল, নাহলে তো কাউকে সারপ্রাইজই দিতে পারত না।
উমাইরা অনেক উৎফুল্ল হয়ে সারা ঘর জুড়ে লাফা লাফি করছে। নেচে বেড়াচ্ছে পুরো ঘর জুড়ে, আর গোলা ছেড়ে গান গাইছে মনের আনন্দে। একবার ভাবলো, এই খুশির খবর সবার আগে ওয়াসিফ ভাইজানকে জানাবে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়লো, লাস্ট যেদিন ওয়াসিফের সাথে কথা হয়েছিল সেই ঘটনা। সেইসব ভেবে ফোনটা রেখে দিলো। তারপর গিটারটা নিয়ে বারান্দায় চলে আসলো।
রাতে খাবার টেবিলে বাবা-মাকে উদ্দেশ্য করে উমাইরা বলল—
-"আব্বু-আম্মু, তোমাদের সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল। খাবার শেষ করে রুমে এসো।"
বলেই উমাইরা চলে গেলো নিজের রুমে। কিছুক্ষণ পর আযাদ রহমান ও রুমানা বেগম উমাইরার রুমে এসে জিজ্ঞাসা করলেন—
-"কি হয়েছে মা? এত জরুরি ভাবে আসতে বললে। কি কথা আছে বলো।"
উমাইরা বাবা-মায়ের হাত ধরে খাটের ওপর এনে বসিয়ে, দুইজনের দুই হাত নিজের হাতে গুজে নিয়েছে। ভনিতা ছাড়াই বলতে লাগলো—
-"আব্বু, আমি কানাডার একটি কলেজে পেইন্টিং কোর্সের জন্য আবেদন করেছিলাম।"
-"কি বলো? আমাদের তো আগে কিছু জানাও নি?"
-"তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। তাই তোমাদের কিছু বলি নি।"
-"আচ্ছা! তো এখন কি হয়েছে?"
-"আমি চান্স পেয়েছি, আব্বু। ২০ দিন পর আমার ফ্লাইট। এক বছরের কোর্স। আমি যেতে চাই, আব্বু। এমন সুযোগ বারবার আসবে না। আর তুমি তো জানো, পেইন্টিং করতে আমি কতটা ভালোবাসি। প্লিজ আব্বু-আম্মু, তোমরা না করো না।"
আযাদ রহমান মেয়ের আকুতি ভোরা কথা শুনে কিছু ভাবলেন। তারপর স্ত্রীর দিকে তাকালেন। রুমানা বেগম চোখের ইশারায় সম্মতি দিলেন। তারপর মেয়ের দিকে তাকালেন। উমাইরা আকুতি ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাবা-মার দিকে। নিস্তব্ধতা ভেঙে আযাদ রহমান বললেন —
-"বেশ, ঠিক আছে! যাও তুমি। তোমাকে বাধা দিবো না আমরা। কিন্তু তোমার পড়াশোনার কি হবে? কি ভেবেছো সেটা নিয়ে?"
-"আর কিছু দিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল প্রকাশ পাবে। আমি যেহেতু এক বছরের কোর্স করতে যাবো,তো অনার্স এক বছর গ্যাপ দিব। দেশে ফিরে আবার না হয় ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হবো।"
-"বাহ! সব কিছুই ভেবে রেখেছো দেখছি। অনেক বড় হয়ে গেছ।"
-"আব্বু আর একটা অনুরোধ আছে তোমাদের কাছে আমার।"
-"কি? বলো শুনছি।"
-"এই ব্যাপারে তোমরা দু'জন ছাড়া আর কেউ জানবে না।"
-"মানে? কিন্তু কেনো?"
-"আমি সবাইকে সারপ্রাইজ দিতে চাই আব্বু যেদিন যাবো ওইদিন। আর ওয়াসিফ ভাইকে দেশে এসে সারপ্রাইজ দিব। প্লিজ আব্বু তোমরা কাও কে কিছু বলো না। শুধু নিজেদের মধ্যে রাখবে সব কিছু। কথা দাও আমকে!"
-"ঠিক আছে, ঠিক আছে! এইভাবে বলতে হবে না সোনা। তুমি যা চাচ্ছো তাই হবে। তুমি আমাদের লক্ষী মেয়ে। অনেক বোঝদার তুমি, তুমি যে কোনো ভুল করবে না আমরা জানি সেটা। তোমার ওপর আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস আছে। তুমি আজ পর্যন্ত আমদের বিশ্বাসের সুযোগ নাও নি। তাই এটা তার পুরস্কার ভেবে নাও।"
-----------------------------
আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন। ভাগ্য ক্রমে উমাইরারা চার বান্ধবী সবাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে। তবে প্রীতি ও উমাইরা একই সাবজেক্ট পেয়েছে বাকি দুজনের আলাদা সাবজেক্ট এসেছে।
সব বান্ধবী একই ভার্সিটিতে সুযোগ পাওয়ায়, বেজায় খুশি তারা। তবে, উমাইরার চান্স পাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না কেউই। তারা ভেবে ছিলো অন্য কোথাও চান্স পাবে উমাইরা। ও খুব ভালো স্টুডেন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলেও কেউ অবাক হতো না।
তিন বান্ধবী এক সাথে বের হয়েছে, একই ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার খুশি উৎযাপন করতে।
------------------------------
উমাইরার ফ্লাইট আর তিন দিন পরে। কানাডার আবহাওয়া সারাবছরই ঠান্ডা থাকে। সেই জন্য ওখানে গিয়ে পড়ার জন্য গরম কিছু কাপড়-চোপড় দরকার। উমাইরা একাই বের হয়েছে শপিং করতে। যেহেতু কাউকে কিছু জানায় নি, তাই কাউকে সঙ্গে করে আনলে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো।
বেশ অনেক জামা কাপড় কিনে ফেলেছে উমাইরা। কখন যে বিকেল হয়েছে খেয়ালই করে নি মেয়েটা। একটু নাস্তা করা প্রয়োজন, ক্ষুধাও লেগেছে। তাই শপিং আপাদত স্থগিত রেখে চলে এসেছে একটি রেস্টুরেন্টে।
রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখা মিলল, রাইসা, প্রীতি আর লামিয়ার। তারা একটি টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে আর কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুব হাসা হাসি করছে। উমাইর ওদের দেখে এগিয়ে গেলো কথা বলার জন্য। উমাইরা এসে দাঁড়িয়েছে লামিয়াদের টেবিলের ঠিক একটু দূরে। দাঁড়িয়েছে বললে ভুল হবে, রাইসার বলা কথায় ওর পা থেমে গেছে।
-"আচ্ছা প্রীতি তুই যে অয়ন ভাইয়ার সাথে রিলেশনে আছিস সেটা এখনো ওই ডাইনিটাকে কেনো বলিস নি?"
চোখ-মুখ কুঁচকে বলল কথাটা রাইসা। যেনো উমাইরার ব্যাপারে কথা বলতেও ঘেন্না লাগছে।
রাইসার প্রশ্নে প্রীতি বিরক্তি ভরা কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো—
-"না বলি নি! কি বলবো ওকে বল। সেই তো ঘ্যানঘ্যান করবে। চিনিস তো ওকে! ঢাক ঢোল পিটাবে। এইসব আমার পছন্দ না। তারওপর চবিশ ঘণ্টা জিজ্ঞাসা করবে, আমরা কি কথা বলছি কোথায় ঘুরতে যাই, মাথার পোকা বের করে ফেলে একদম।"
লামিয়া কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলো—
-"আচ্ছা অয়ন ভাইয়াও তো বলতে পারে ওকে। অয়ন ভাইয়াও কি বলে নি কিছু?"
-"না! ওকে আমি বলেছি উমাইরাকে কিছু না জানাতে, আমি সারপ্রাইজ দিব। তাই ও কিছু বলে নি এখনো, আর বলবেও না, যতদিন না আমি বলছি।"
-"যাই বলিস না কেনো ভাই, ওই ছেমরিরে সহ্যই হয় না এতটা অসহ্যকর। কিভাবে যে ওর সাথে এত গুলো বছর বন্ধুত্ব রেখেছি আল্লাহ্ মালুম। ভেবেছিলাম ভার্সিটিতে উঠে ওর পিছু ছুটবে। কিন্তু অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে যায়! আমাদের হয়েছে ওই দশা।"
বিরক্তি, ঘেন্না ও আফসোসের সহিত কথাটি বলল রাইসা।
-"হ্যা রে দোস্ত! এই আপদ কবে নামবে আমাদের ঘর থেকে বল তো। স্কুল, কলেজ সব জায়গায় নিজের রাজত্ব চালিয়েছে। প্রতিটা স্যার- ম্যাডাম, সিনিয়র-জুনিয়র সকলের চোখে মনি ছিল উমাইরা। আর আমরা ছিলাম ওর চেলা। ওর কথায় নাচাতো আমদের। ওর বাবার বেতন ভুক্ত কর্মচারী আমরা। এমন ভাবে ট্রিট করত আমাদের।" প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে কথা টি বলল প্রীতি।
উমাইরা আর বেশি কিছু শুনতে পারলো না। নিজের কানকে যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না উমাইরা। উল্টো ঘুড়ে হাটা ধরলো উমাইরা, যেনো পালাতে চাইছে এখান থেকে।
বাড়িতে এসে নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে, হাউমাউ করে কাদঁছে। অনেকক্ষন যাবত কান্না করার ফলে চোখ মুখ ফুলে লাল হয়ে গেছে। বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেলো উমাইরা। ফিরে এসে গিটারটা নিয়ে বসলো। রুমানা বেগম খাবারের জন্য ডেকে গেছেন, উমাইরা বাহিরে খেয়েছে জানিয়েছে।
--------------------------------
আজ উমাইরার ফ্লাইট। যাবার আগে বান্ধবীদের সাথে শেষ দেখা করতে চায় উমাইরা। তাই সবাইকে একটি রেস্টুরেন্টের লোকেশন পাঠিয়েছে, যাতে সবাই একত্রে হতে পারে।
একটি সফেদ রংয়ের থ্রি পিস্ পড়েছে উমাইরা। চুল গুলো পরিপাটি করে বেঁধেছে। চোখে হালকা কাজল, আর ঠোঁটে একটু লিপবাম লাগিয়েছে। উমাইরা দেখতে সুন্দর, টানা টানা চোখ, গোলাপী ঠোঁট, গায়ের রংটা শ্যামলা, তবে দেখতে মায়াবতী। পার্সটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল উমাইরা।
নিচে ড্রয়িং রুমে বসে পড়াশোনা করছিল স্নিগ্ধা। ১৩ বছর বয়স স্নিগ্ধার দশম শ্রেণীতে পড়ে। সামনে বছর এসএসসি দিবে। উমাইরাকে নামতে দেখে দৌড়ে গেলো তার কাছে। আবদার করার সুরে বলল—
-"কথায় যাচ্ছো আপুই? আমাকে সাথে নিয়ে চলো প্লিজ।"
-"আমি একটু কাজে যাচ্ছি। তোমাকে অন্যদিন নিয়ে যাব। এখন যাও গিয়ে পড়তে বস।"
কিন্তু স্নিগ্ধা তো মানার পাত্রী নয়। সে জেদ ধরে বসেছে, তাকে নিয়ে যেতে হবে মনে নিয়ে যেতেই হবে। এই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বুঝালো উমাইরা। কিন্তু স্নিগ্ধা বুঝতে চাইছে না। হঠাৎ স্নিগ্ধা রেগে উমাইরাকে বলে—
-"তুমি খুব জঘন্য আপুই! I hate you! তোমার মতন বোন যেনো কারো ভাগ্যে না জুটে। আমি যখনই বলি আমকে কোথাও নিয়ে যাও, তুমি সব সময় বাহানা করো। তোমার থেকে তো প্রীতি ভাবীই অনেক ভালো। অয়ন ভাইয়ার সাথে আমকেও ঘুরতে নিয়ে যায়। আর তুমি, তুমি খুব খারাপ আপু তুমি খুব পঁচা।"
স্নিগ্ধার ব্যবহার স্থির বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উমাইরা। বাকরুদ্ধ সে! কি বললো স্নিগ্ধা? আমি জঘন্য? আমি খুব খারাপ? তার কোনো আবাদার আমি পূরণ করি না? আর কি বললো প্রীতি ভাবী? তাহলে কি স্নিগ্ধা সব জানে? নিজেকে সামলে নিয়ে স্নিগ্ধাকে রূঢ় হয়ে জিজ্ঞাসা করলো—
-"প্রীতি ভাবী? প্রীতি তোর ভাবী কবে থেকে হলো?"
-"কেন? অয়ন ভাই তো প্রীতি আপুকে ভালোবাসে। ভাইয়ার মাস্টার্স শেষ হলে বিয়ে করবে। তুমি জানো না?"
অবাকের চরম পর্যায় পৌঁছে গেছে উমাইরা। এত কিছু হয়ে গেছে আর আমি কিছুই জানি না। এতটা ঘৃনা করে আমাকে প্রীতি? অথচো আমকে ও ওর বেস্ট ফ্রেন্ড বলতো! নিজেকে ধাতস্থ করে স্নিগ্ধার দিকে দৃষ্টি ঘুরালো উমাইরা —
-"তুই আমাকে ঘৃনা করিস? আমি খুব বাজে? খুব জঘন্য?"
-"হ্যা! তুমি খুব বাজে, জঘন্য তুমি। আমি ঘৃনা করি তোমাকে। আই উইশ প্রীতি ভাবী আমার বোন হতো।"
-"বেশ আজকের পর থেকে আমাকে আর বোন বলে পরিচয় দিতে হবে না তোকে। এতই যখন ঘৃণা আমার প্রতি তোর, আজকে থেকে আর আমকে পাবি না।"
ছোট বোনের কোথায় অনেক আঘাত পেয়েছে উমাইরা। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করছে উমাইরা। বন্ধুদের মনে নিজের সম্পর্কে এমন অনুভূতি অজানা ছিল উমাইরার। ওয়াসিফের অবহেলা, অপমান, তিক্ত কথা, সব মিলিয়ে মন-মস্তিষ্ক অসহ্যকর বেদনা সৃষ্টি করেছিল। আজ আবার নিজের মায়ের পেটের ছোট বোনের ও একই অনুভূতি শুনে দুঃসহ যন্ত্রণা অনুভব করছে হৃদয়ে। কোনো দিকে না তাকিয়েই হন হন করে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।
-------------------------------
রেস্টুরেন্টে লামিয়া, রাইসা, প্রীতি বসে আছে। উমাইরার জন্য অপেক্ষা করছে ওরা। হঠাৎ সকালে উমাইরা কল করে বলল, বিকালে এখানে আসতে জরুরি কথা আছে। তাই তিন জন চলে এসেছে। কিন্তু উমাইরার আসার খবর নেই। তিনজনেই বেশ বিরক্ত ও রাগ লাগছে। দশ মিনিট যাবত অপেক্ষা করছে। কোন দেশের মহারানী এখনো আসার খবর নেই।
মিনিট পাঁচেক পর উমাইরা আসলো। তিনজনের মুখপানে দৃষ্টি বুলিয়ে বসে পড়ল লামিয়ার পাশে ফাঁকা চেয়ারটাতে। প্রীতি উমাইরার দিকে তাকিয়ে বলল—
-"এত সময় লাগে আসতে? সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি আমরা।"
-"সরি রে একটু দেরি হয়ে গেলো। আসলে স্নিগ্ধা বায়না ধরছিল তো তাই। যাই হোক, ওসব কথা থাক! তোদের যে জন্য ডেকেছি সেটা বলি।"
রাইসা অস্থির হয়ে বলল—
-"হ্যা হ্যা! তারাতারি বল আমাদের হাতে সময় নেই। কিছু দিন পরই তো ভার্সিটি শুরু হবে অনেক পেরায় আছি।"
নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল উমাইরা, রাইসার কথা শুনে মৃদু হেসে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তার দিকে। কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে গেলো রাইসা। উমাইরার দৃষ্টিতে কিছু ছিল। উমাইর বলতে লাগলো—
-"আমি কি জেনে বুঝে কোনো দিন তোদের ক্ষতি করেছি? আঘাত করেছি? অপমান করেছি?"
তিনজনই চোখ-চোখি করলো। বুঝতে পারছে না উমাইরার কথার মানে। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো সবাই উমাইরার দিকে। সবাই একত্রে বলতে লাগলো—
-"না তো! হঠাৎ এইসব কথা আসছে কথা থেকে। আমরা তো কখনও তোকে কিছু বলি নি।"
সূক্ষ্ম হাসলো উমাইরা। চোখ তুলে তাকালো প্রীতির দিকে। আহত কণ্ঠস্বরে বলতে লাগলো—
-"তোরা আমাকে আর আগের মতন পছন্দ করিস না! আগেও করতি কিনা সেটাও এখন একটা প্রশ্ন। আমাকে বাদ দিয়ে তোরা নিজেদের মতন প্ল্যান করে ঘুরে বেড়াস, আড্ডা দিস। আমাকে বাদ দিয়েই তোরা নতুন গ্রুপ খুলেছিস। সেখানেই নিয়মিত কথা বলিস। আর আমকে অজুহাত দিতি পড়াশোনার। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারেও কিছু বলিস নি। আলাদা কোচিংএ পড়েছিস তিনজন এক সাথে। আমি সবই দেখেছি নিজের চোখে।"
কথা গুলো বলতে বলতে কন্ঠনালী ভারী হয়ে আসছিল উমাইরার। বহু কষ্ট চোখের অশ্রু গুলোকে আটকে রেখেছে। অশ্রু গুলো যেন চক্ষুদয় দিয়ে পড়ে যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিছু সময় নিশ্চুপ রইলো উমাইরা।
এইদিকে প্রীতি, রাইসা, লামিয়া হতভম্ব হয়ে একে অন্যের দিকে দৃষ্টি বুলাচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে না উমাইরা এইসব কিভাবে জানলো। লঘু আতঙ্কে কেঁপে উঠলো তিনজনের সত্তা। চোরা চোখে শুধু দেখে যাচ্ছে উমাইরাকে।
নিজেকে ধাতস্থ করে ফের বলতে লাগলো উমাইরা—
-"আমি কখনোই তোদের নিজের বাপের বেতন ভুক্ত কর্মচারী হিসেবে ট্রিট করি নি। আমি সব সময় তোদের নিজের বোনের মতন ভেবেছি। আর ঠিক সেই জন্যে আমি নিজের আগে তোদের রেখেছি সব সময়, সেটা আমার চেয়ে ভালো তোরাই জানিস। আমি জঘন্য, বিরক্তকর, অসহ্যকর, ডাইনী, না জানি আর কত কিছু তোরা আমকে বলেছিস।"
কান্না পাচ্ছে উমাইরার। পলক ঝাপটালেই অশ্রু কোন গড়িয়ে পড়বে। ঢোক গিলে আবার ও বলতে শুরু করলো উমাইরা—
-"তোরা আমার সাথে কেনো এমন করলি? এইসব কেনো ভাবলি তোরা আমার ব্যাপারে? আমি কি করেছি একটু বলবি প্লিজ ?"
যা হওয়ার হয়েছে! উমাইর যখন সবটা জেনেই গেছে তখন আর লুকানোর কোনো প্রয়োজন নেই। প্রীতি রাগান্বিত হয়ে বলতে লাগলো—
-"কি করিস নি তুই সেটা বল, কেনো সব সময় সবাই শুধু তোকেই পছন্দ করবে? কেনো সব সময় তুই সবার প্রথম চয়েস হবি? এত ভালো হওয়ার নাটক কেনো করিস তুই?"