সবাই শপে ঢুকছে। মেয়েরা একসাথে ভেতরে প্রবেশ করেছে, আর তাদের পেছনে ছেলেরা। শুরুতেই প্রীতির জন্য লেহেঙ্গা দেখা হচ্ছে। অয়ন একটি অসাধারণ লেহেঙ্গা পছন্দ করেছে প্রীতির জন্য। লেহেঙ্গাটা প্রীতির গায়ে ধরে দেখছে আর বলছে—
-"জান, দেখো! এটায় তোমাকে দারুণ লাগছে।"
প্রীতি লজ্জায় একটু লাল হয়ে গেল। বয়সে বড় বড় দেবর-ভাসুর পাশে দাঁড়ানো, তার ওপর বান্ধবীরা আছে মজা করার জন্য। সে একটু লজ্জামিশ্রিত স্বরে বলল—
-"কি করছো এসব? সবাই তো তাকিয়ে আছে।"
অয়ন হেসে বলল—
-"আরে তাকিয়ে থাক, আমার কি? ওদের বউ নেই তো সেটা কি আমার দোষ? আমার বউ আছে, আমি যা খুশি তাই করব!"
প্রীতি লজ্জা-রাগে অয়নের বাহুতে কিল মেরে অন্য দিকে চলে গেল। ওদের এই মিষ্টি খুনসুটির মাঝেই প্রীতির জন্য লেহেঙ্গা আর অয়নের জন্য শেরওয়ানি নেওয়া হয়ে গেল। এখন সবাই ব্যস্ত নিজেদের পোশাক বেছে নিতে।
--------------------
এহসান নিজের জন্য পাঞ্জাবি দেখছিল। পছন্দমতো একটি পাঞ্জাবি পেয়েও গেছে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল মেয়েদের সেকশনে। নিধী খুব মনোযোগ দিয়ে লেহেঙ্গা খুঁজছে, কিন্তু কিছুতেই মন মতো পাচ্ছে না।
এহসানের চোখ আটকে গেল একটি লেহেঙ্গায়। কোনো দ্বিধা না করেই সে সেটি নিয়ে নিধীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লেহেঙ্গাটা সামনে ধরে বলল—
-"এটা নাও। তোমাকে দারুণ মানাবে।"
নিধী একটু অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে। এহসান তার জন্য পোশাক পছন্দ করছে, এই ভাবনায় এক মুহূর্তের শিহরণ বয়ে গেল নিধীর ভেতর। সে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
এহসান আবার বলল—
-"নেবে না?"
তাতে হুশ ফিরল নিধীর। সে একটু হাসি মিশিয়ে লেহেঙ্গাটা হাতে নিয়ে বলল—
-"ধন্যবাদ। সত্যি, এটা অসাধারণ সুন্দর!"
এহসান হালকা হেসে বলল—
-"My pleasure!"
বলেই আবার ফিরে গেল।
------------------------
রাফসান আর ওয়াসিফ নিজেদের মতো করে দোকানে ঘুরে ঘুরে এটা-সেটা দেখছিল। হঠাৎ উমাইরার আগমন। রাফসান এক লাফে ওয়াসিফের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। ওর এমন আচরণ দেখে সবাই থমকে গেল।
আসলে গাড়িতে আসার সময় উমাইরা বান্ধবীদের সঙ্গে পিছনের সিটে বসেছিল, তাই রাফসানের খেয়ালই ছিল না। ওর এমন অপ্রস্তুত প্রতিক্রিয়ায় ওয়াসিফ বিরক্ত হলো, আর রাইসা, লামিয়া ও উমাইরা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইল।
উমাইরা ঠান্ডা অথচ কটাক্ষভরা স্বরে বলল—
-"ভাইয়া, আমি এখন আর ছোট নেই, যথেষ্ট বড় হয়েছি। আপনার এই ভীতু ভীতু প্রতিক্রিয়া আজও গেল না? এত ভয় পেলে আপনি অপারেশন করেন কীভাবে? মুরগির কলিজা নিয়ে ডাক্তারি করেন শুনে বিশ্বাস হয় না!"
রাফসান ওয়াসিফের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে বলল—
-"তোমার সামনে আমার মুরগির কলিজা হয়! তাছাড়া আমি কিন্তু দায়িত্ববান একজন ডাক্তার।"
উমাইরা বিরক্ত স্বরে বলল—
-"হয়েছে হয়েছে, থামেন এবার। ভাইজান, আপনি কোনো পাঞ্জাবি পছন্দ করেছেন?"
এইবার সে ওয়াসিফের দিকে তাকিয়ে বলল—
-"না! কেন? তুই কিনে দিবি নাকি আমাকে?"
-"হ্যাঁ, দিব। আসুন।"
বলেই সে ওয়াসিফকে টেনে নিয়ে গেল পাঞ্জাবির সেকশনে।
ওয়াসিফ নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে। হতভম্ব সে, এই মেয়ে নাকি তাকে পাঞ্জাবি কিনে দিবি ভাবা যায়? তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে রাইসা, লামিয়া আর রাফসান। উমাইরা একের পর এক পাঞ্জাবি দেখছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু পছন্দ হচ্ছে না।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল সাদা রঙের একটা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবিটার গায়ে সূক্ষ্ম সোনালী সুতার কাজ। না কোনো সিকুয়েন্স, না জৌলুস—তবুও এক দেখাতেই মন কেড়ে নেয়।
উমাইরা পাঞ্জাবিটা তুলে দিয়ে বলল—
-"এইটা পড়ে দেখুন তো একবার।"
ওয়াসিফ ট্রায়াল রুমে গিয়ে পাঞ্জাবিটা পরে বের হয়ে এলো। তারপর, যেনো এক মুহূর্তে পুরো দোকান স্তব্ধ।
সবাই তাকিয়ে আছে ওয়াসিফের দিকে।
সাদা পাঞ্জাবি, সোনালী সূতো, আর তার গায়ে যেন এটা তার জন্যই বানানো হয়েছে। ফরসা গায়ের রঙে সেটা যেন আলাদা একটা দীপ্তি ছড়াচ্ছে। উমাইরা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে, এ যেন কোনো রূপকথার গল্প থেকে নেমে আসা রাজপুত্র।
পিছন থেকে নিধী, স্নিগ্ধা, এহসান, মেহরাব, প্রীতি, অয়ন রাফসানের চিৎকার শুনে ছুটে এসে দৃশ্য দেখে হতবাক।
রাফসান চিৎকার করে বলে উঠল—
-"বন্ধু, তোকে তো হেব্বি লাগছে রে! বলতে হবে, উমাইরার চয়েস এক নম্বর! একদম পারফেক্ট পাঞ্জাবিটা বের করেছে তোর জন্য!"
ওয়াসিফ তখনও কিছু বলছে না। শুধু তাকিয়ে আছে উমাইরার দিকে। তার চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন, “তোর চোখে কেমন লাগছে আমাকে?” ওয়াসিফ বুঝল উমাইরার অভিব্যক্তি। নেশালো চোখে তাকিয়ে আছে উমাইরা, তার মোহনমল্লিকা মোহিত হয়েছে তাকে এই পাঞ্জাবিতে দেখে। মুচকি হাসলো ওয়াসিফ।
উমাইরার চোখে এক অদ্ভুত নেশা। যেন কেউ টেনে নিয়ে যাচ্ছে গভীরে, ঠিক যেমন চোরাবালি টানে নিজের গভীরে। ওয়াসিফের প্রেমের অতল গভীরে দিনকে দিন তলিয়ে যাচ্ছে উমাইরা, নির্বিকার, নিঃশব্দে।
ওয়াসিফ বুঝে ফেলে সেই চোখের ভাষা। বুঝে ফেলে, তার মোহনমল্লিকার চোখে কেমন নির্জন ভালবাসা জমেছে। শুধু উমাইরাই বুঝতে পারে না।
সে আজও জানে না,তার জন্য কেউ একজন চোখের পাতায় স্বপ্ন আঁকে, নিঃশব্দে ভালোবাসে,আর প্রতিটি মুহূর্তে শুধু তাকেই অনুভব করে।
----------------------
বাকি সবাই তখন কেনাকাটায় ব্যস্ত। কারও পছন্দ হয়ে গেছে, কেউবা প্রায় শেষ করে ফেলেছে। স্নিগ্ধা এখনো কিছুই কিনতে পারেনি। আর উমাইরা, শাড়ি কিনেছে, তবে একদম সাধারণ ধরনের। জাঁকজমক, ঝলমলে সাজগোজ এসব উমাইরার স্বভাবে একেবারেই নেই। সে সব সময় একটু সাদামাটা, একটু অলিখিত পরিপাটি।
স্নিগ্ধা এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে নিজের জন্য পোশাক দেখছে, কিন্তু কিছুতেই সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না।
আর আশেপাশে কেউ নেই তাকে একটু সাহায্য করবে।
সবাই এতক্ষণে ক্লান্ত, কেউ বিশ্রামে বসেছে, কেউ ফোনে ব্যস্ত।
ঠিক তখনই, আচমকা মেহরাব এসে দাঁড়াল পেছনে।
স্নিগ্ধা চমকে গিয়ে একটু পিছিয়ে গেল।
-"ভয় পেলে? সরি সরি! তোমাকে ভয় দেখাতে চাইনি।" দ্রুত বলল মেহরাব, একটু চিন্তিত মুখে।
-"ইটস ওকে ভাইয়া। হঠাৎ আসার জন্যই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম,"
বলল স্নিগ্ধা, এখনও একটু অবাক চোখে তাকিয়ে।
-"পছন্দ হচ্ছে না কিছু?"
-"দুটো পছন্দ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কোনটা নেব বুঝতে পারছি না।" সে দুইটা শারারা সেট মেহরাবের সামনে ধরে দেখাল। একটা Meadow Green (মিডো গ্রিন)
আর একটা Lavender(ল্যাভেন্ডার)। মেহরাব কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল দুটোর দিকে। তারপর ল্যাভেন্ডার সেটটার দিকে আঙুল তাক করে বলল—
-"এটা নিতে পারো। তোমাকে সব রঙেই মানাবে,
তবে যদি দ্বিধা থাকে, দুটোই নিয়ে নাও। আর একটা নিতে চাইলে, তাহলে আমার পছন্দ, এইটা।"
স্নিগ্ধার মুখে হাসি ফুটে উঠল। এটাই ওর মনেও বেশি টানছিল, শুধু একটা নিশ্চয়তা দরকার ছিল, আর সেটা মেহরাব দিয়েছে। সে খুশি গলায় বলল—
-"ধন্যবাদ ভাইয়া, অসংখ্য ধন্যবাদ! আমারও এটা একটু বেশি ভালো লেগেছিল। আপনি কনফার্ম করে দিলেন, আর কি চাই!"
হাসিমুখে স্নিগ্ধা ড্রেসটা হাতে নিয়ে চলে গেল। আর মেহরাব পেছনে দাঁড়িয়ে রইল নিঃশব্দে। বুকে হাত দিয়ে যেন সেই হাসিটাকে ধারণ করে রাখছে, একটু আবেশে, একটু অনুধাবনে।
সবার কেনাকাটা শেষ। বাড়ির বড়রা আগামীকাল বের হবে নিজেদের কেনাকাটার জন্য। আগে নতুন বউয়ের শপিংটাই সবচেয়ে জরুরি ছিল, তাই সেটাই সবার আগে সারা হয়েছে।
এখন সবাই রিসেপশনের কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে, বিল পরিশোধের অপেক্ষায়।
ওয়াসিফ এগিয়ে গিয়ে বিল পেমেন্ট করছে। হঠাৎই উমাইরা নিজের কার্ডটা বাড়িয়ে দিল রিসেপশনিস্টের দিকে,আর এক হাত দিয়ে ওয়াসিফকে দেখিয়ে
বলল—
-"উনি যে পাঞ্জাবিটা ট্রায়াল দিয়েছিল, সেটার পেমেন্ট আমার কার্ড থেকে কেটে নিন।"
এক মুহূর্তে সবাই থেমে গেল। বিস্ময়, মুগ্ধতা আর নিরব চমক, সব মিশে আছে সবার দৃষ্টিতে। কিন্তু উমাইরা? সে একদম স্বাভাবিক, নিশ্চিন্ত। যা বলেছে, সেটাই করেছে। যেন কোনও ব্যাখ্যার দরকার নেই।
ওয়াসিফ বাধা দিল না। সে জানে,বাধা দিলেও শুনবে না উমাইরা কিছুতে থামানো যাবে না। বরং মনটা ভরে গেল একরাশ অনুভূতিতে। চোখে এক চিলতে মুচকি হাসি খেলল।
-------------------------
আজ সবাই রওনা দিয়েছে সিলেটের উদ্দেশে।উমাইরার প্রিয় একটি জায়গা। প্রীতির ইচ্ছা ছিল বিদেশে অনুষ্ঠান করার, তবুও সে করেনি। প্রিয় বান্ধবীর পছন্দকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
বন্ধুত্বে যেন কোনো হিসাব থাকে না,থাকে শুধু মনে রাখা আর ক্ষমা করে দেওয়া। প্রীতি ঠিক করেছে, উমাইরার মনে বাকি যত অভিমান, যত না বলা কষ্ট,
সব কিছু সেই সিলেটেই ফেলে আসবে, উমাইরার হাসির মাঝে মিশিয়ে দেবে ভালোবাসা, সেই আগের বন্ধুত্ব।
উমাইরা একদিন বলেছিল, বাইরে কোথাও করতে।
প্রীতি তখন শুনেছিল ঠিকই, কিন্তু সে চেয়েছে, উমাইরার পছন্দের জায়গাতেই বিয়ে করবে। তাই কেউ আর আপত্তি করে নি।
উমাইরার ট্রেনে ভ্রমণ করতে বরাবরই ভালো লাগে। দূরে কোথাও যাওয়ার হলে সে অন্য কোনো বাহনের কথা ভাবেই না, শুধু ট্রেন। সেই কারণেই প্রীতি ও অয়ন ঠিক করেছে এবার তারা ট্রেনেই যাবে। বড়রা যাবে বাড়ির গাড়িতে। কারণ এত জিনিসপত্র ট্রেনে নেওয়া সম্ভব নয়, হারিয়ে যাওয়ারও ভয় আছে।
ছেলেরা সবাই মিলে গাড়িতে জিনিসপত্র তুলছে। প্রীতির বাড়ির লোকজনও যাচ্ছে গাড়িতে। বাড়ির বড়দের যাওয়ার পর ছোটরা একে একে বেরিয়ে পড়েছে স্টেশনের দিকে।
ট্রেন চলছে আপন গতিতে। সেই চিরচেনা “শাই শাই” শব্দে যেনো ফেলে আসা সব স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ওয়াসিফ দুটি কেবিন বুক করেছিল। একটাতে যাবে ওয়াসিফ, উমাইরা, স্নিগ্ধা, এহসান, নিধী, মেহরাব, অয়ন ও প্রীতি। বাকিরা অন্য কেবিনে আছে।জানালার পাশে বসে উমাইরা বাহিরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বাতাসে চুল উড়ছে। তার মুখোমুখি বসে আছে ওয়াসিফ। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উমাইরার দিকে। যেনো এই মুহূর্তটা কোনোভাবেই হারাতে চায় না সে। বাকি সবাই ও বাহিরের প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত।
তাদের এই নীরবতা যেন হজম হচ্ছে না এহসান মেহরাবের। একটু কাশির ভান করে বলে উঠল—
-"এই, তোমরা কি ট্রেনের সাথে দৃষ্টির লড়াই করছো নাকি? একটা শব্দও বেরোচ্ছে না কারও মুখ থেকে!"
উমাইরা চোখ মেলে তাকায় মেহরাবের দিকে। মুচকি হেসে বলে—
-"তুমি কথা বলো না প্লীজ, তোমাকে চুপ দেখলেই শান্তি লাগে।"
ওয়াসিফ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি টেনে বলে—
-"আসলে প্রকৃতি কিছু শব্দহীন কথা বলে, বুঝলি মেহরাব। তুই কেবল কানে শোনার চেষ্টাই করিস, মন দিয়ে শুনলে বুঝতি।"
মেহরাব চোখ বড় বড় করে বলে—
-"আরে বাহ! কবি হয়ে গেছে নাকি রে? জানি না কোথাকার বাতাসে কারা উড়ে আসছে!"
সবাই হেসে ওঠে। উমাইরার চোখে এবার একটু প্রশান্তি, একটু হাসি। ট্রেন এগিয়ে চলে, ঠিক যেমন করে সময় এগিয়ে চলে নতুন কোন গন্তব্যের দিকে।
হাসি থামিয়ে এহসান বলল—
-"উমু, একটা গান ধর। এই বোরিং জার্নি আর ভালো লাগছে না।"
উমাইরা জানালার বাইরে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—
-"কি বলো ভাইয়া! এইভাবেই তো ঠিক আছি। প্রকৃতি দেখো না, কত সুন্দর!"
-"আরে না না, তুই একটা গান ধর। প্লিজ!" জোর দিয়ে বলল এহসান।
তখনই বাকি সবাই একসাথে বলে উঠল—
-"হ্যাঁ উমাইরা, গান ধর! ধর গান!"
অগত্যা, সবার চাপে পড়ে গিটারটা হাতে তুলে গেয়ে উঠলো উমাইরা—
Hey hey, chalo na
Dhoondhe shehar naya
Jahaan muskurahatien hain bikhri, jahaan se gum ka mausam gaya
Jahaan meethi baatein, har ik ajnabi se ho
Bhule hum bhi jo saari fikrein
Lamha lamha khushiyan bikhrein
Idhar udhar aur yahan wahan
Jayein wahin dil kahe jahaan
Baby baby baby
Kab tak giney, hum dhadkane
Dil jaise dhadke dhadakne do
Kyun hai koi aag dabi
Shola jo bhadke bhadakne do
Hey hey, chalo na
Gaaye naye naye geet
তার গলায় সুর তুলতেই বাকিরাও গলা মেলালো।
একসাথে গাইতে গাইতে মুহূর্তটা যেন উৎসবে পরিণত হলো। এইভাবে একের পর এক গান গাওয়া চলতেই থাকলো। কখন যে গন্তব্যে পৌঁছে গেছে, কেউ বুঝতেই পারেনি!
অনেকটা রাত পেরিয়ে তারা অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছাল। ক্লান্ত শরীরে সবাই নিজ নিজ জিনিসপত্র নিয়ে বরাদ্দকৃত কক্ষে চলে গেল।
অয়ন ও ওয়াসিফের জন্য রাখা হয়েছে আলাদা একটি রুম। ওয়াসিফের রুমে থাকবে রাফসান, যে ওদের সাথেই এসেছে। অন্যদিকে, অয়নের বন্ধুরা থাকবে পাশের একটি রুমে, যদিও তারা কেউ আজ এসে পৌঁছায়নি। বাড়ির বড়দের জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা।
মেয়েদের মধ্যে—
উমাইরা, স্নিগ্ধা, নিধী এবং উমাইরার মামাতো বোন থাকবে একসাথে। প্রীতি, রাইসা আর লামিয়া, এ তিনজন থাকবে এক রুমে। এহসান, মেহরাব আর প্রীতির ভাই প্রত্যয়ও একই ঘরে থাকবে।
বাকি আত্মীয়-স্বজন এখনো এসে পৌঁছায়নি।
কাল থেকে একে একে আসতে শুরু করবে, উমাইরার নানা বাড়ির সদস্যরা, প্রীতির নানা বাড়ির লোকজন, ফুফুরা, আর ছোট কাকামনির শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা।
এভাবেই ধীরে ধীরে জমে উঠবে পুরো বাড়ি, উৎসবের আমেজে।
---------------------
মধ্যরাত। অথচ উমাইরার চোখে একটুও ঘুম নেই।
শরীর ক্লান্ত, দিনের ভ্রমণে জারিত— তবুও চোখে ঘুম নামে না।
চুপচাপ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল সে।
খোলা আকাশের নিচে একটু প্রশান্তির খোঁজে হাঁটছে ধীরে ধীরে।
আকাশ অন্ধকারে ঢাকা, তবুও চাঁদের আলোয় চারপাশটা ভাসছে মৃদু নরম আলোর পরশে। দুই-একটা তারা দেখা যাচ্ছে, যেন নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে, উমাইরার গায়ে থাকা চাদরটা উড়ে উড়ে উঠছে হাওয়ায়। খোলা চুলগুলোও বাতাসে দুলছে, আর সে দাঁড়িয়ে আছে নীরব আকাশের নিচে, যেন নিজেকে খুঁজে ফিরছে।
-"এখানে একা দাঁড়িয়ে কী করছিস?"
হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর, পুরুষালি কণ্ঠ।
উমাইরা ঘুরে দাঁড়ায়। বুকের ওপর হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াসিফ। উমাইরা আবার সামনে তাকিয়ে বলে—
-"কিছু না। ঘুম আসছিল না, তাই একটু বাইরে এসেছি হাঁটতে।"
ওয়াসিফ কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। চারপাশে নিস্তব্ধতা। হাওয়ার মৃদু শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া কিছুই নেই। এক সময় সেই নীরবতা ভেঙে উমাইরা নিজেই বলল—
-"আমি ওদের ক্ষমা করেছি ভাইজান। কিন্তু আপন করে নিতে পারছি না। সেই বন্ধুত্ব....আর খুঁজে পাচ্ছি না। ওদের সাথে কথা বললেও, আগের মত মিশতে পারছি না। এরকম কেন হচ্ছে ভাইজান?"
ওয়াসিফ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। মুখে একটুও ভাবান্তর নেই। তারপর ধীর কণ্ঠে বলে—
-"মন আর মস্তিষ্কের লড়াইয়ে তুই মনকে জিতিয়েছিস, তাই ক্ষমা করেছিস ওদের। এটা ভাবিস না, ওরা শাস্তি পায়নি। তুই দিসনি বলে যে অন্য কেউ দেয়নি,
তুই প্রতিশোধপরায়ণ না বলে, অন্য কেউ তোর হয়ে প্রতিশোধ নে নি। সৃষ্টিও নিশ্চয়ই থেমে থাকেনি।
তুই এখন ওদের সাথে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারছিস না, এটা স্বাভাবিক। মনের কোণে কিছু না কিছু থেকেই যায়, উমাইরা। ওদের আবার তোর মনে জায়গা করে নিতে হবে। ততদিন.....অপেক্ষা কর। দেখ, ওরা কিভাবে নিজেদের বদলায়,তোর মন জয় করতে পারে কিনা। এইসব ভাবিস না এখন। তোর ভাইয়ের বিয়ে, সেটা উপভোগ কর মন দিয়ে। তোর আপন রক্তের ভাই, বান্ধবীর সাথে বিয়ে হলেও নিজের ভাইয়ের বিয়েতে উপভোগ কর, এই সময় আর ফিরে আসব না, তাই বিফলে যেতে দিস। চল অনেক কাজ আছে কাল থেকে ঘুমিয়ে পর গিয়ে।"
উমাইরা ও ওয়াসিফ ফিরে গেলো রুমে। এত ভেবে তো সত্যি কিছু হবে না। এই সময় আর ফিরে পাবো না। সব ভাবনা রেখে আনন্দ করা উচিত।
---------------------
বিয়ের বাড়িতে চলছে চূড়ান্ত ব্যস্ততা।
ছেলে-মেয়ে সবাই এদিক-সেদিক ছুটছে, আত্মীয়স্বজন এসে গেছে আগেই। কেউ গল্প করছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ আবার মজায় ব্যস্ত। চারদিকে যেন উৎসবের রঙ লেগেছে।
অয়ন আর প্রীতিকে কোনো কাজেই হাত দিতে দেওয়া হয়নি, ওরা যেন শুধু আনন্দ করুক, হাসুক, খুশি থাকুক, এই চাওয়াই সবার।
এদিকে মেহরাব, এহসান, নিধী, স্নিগ্ধা, উমাইরা আর ওয়াসিফ ছোটাছুটি করে সামাল দিচ্ছে পুরো অনুষ্ঠান। কোথায় কী বাকি, কোথায় কী লাগবে, খাবারের আয়োজন ঠিক আছে কি না, সবকিছুর খুঁটিনাটি নজরে রাখছে ওরা সবাই মিলে।
তাদের টিমওয়ার্ক আর হাসিমুখে কাজ করার এই চিত্রটাই যেন সবচেয়ে বেশি মন ভরিয়ে দিচ্ছে সবাইকে।
স্নিগ্ধা তাড়াহুড়ো করে কোথাও যাচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎই এক পুরুষের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে। দুজনেই একসাথে চিৎপটাং হয়ে মাটিতে পড়ে যায়।
মাথা তুলে স্নিগ্ধা চোখ মেলে দেখে, মেহরাব!
চোখ-মুখ লজ্জায় লাল করে, তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
-"সরি ভাইয়া! আমি দেখতে পাইনি। এত দৌড়াদৌড়ির মধ্যে তাড়াহুড়া করে যাচ্ছিলাম...আপনার সাথে ধাক্কা লেগে গেল। I'm extremely sorry!"
মাথা নিচু করে গম্ভীর স্বরে কথা বলল সে। অপরদিকে মেহরাব মৃদু হেসে বলল—
-"আরে না না, এত হাইপার হওয়ার কিছু নেই। আমি ঠিক আছি। আসলে আমিও তো তোমাকে খেয়াল করিনি। আর যদি এমন স্পর্শ পেতেই হয়, তোমার ছোঁয়া পেলে দোষ কী!"
মেহরাব মজা করেই বলল কথাটা। স্নিগ্ধা আরও লজ্জায় পড়ে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
এদিকে উমাইরা তখন থেকে ওয়াসিফকে খুঁজে চলেছে। বেটা গোম্বত কোথায় আছে কে জানে! সেই সকাল থেকে মাত্র একবার দেখেছি। মনটা আকুপাকু করছে একটু দেখার জন্য। উমাইরা বিড়বিড় করছে—
-"একবার তোকে আমার প্রেমে ফালাই শ্বশুরের পোলা, তারপর তোকে মজা বুঝাবো,উমাইরা কি জিনিস!"
-"কি বিড়বিড় করছিস?"
কানের কাছে ফিসফিসিয়ে কথাটি বলল ওয়াসিফ।
-"ও মাগো, কোন বাল রে!"
ভয়ে এক চিৎকার দিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখলো, ওয়াসিফ। উমাইরা সাথে সাথে মুখ নিচু করে বিড়বিড় করে গালি ছুঁড়লো।
-"কোন বাল রে কী ধরনের কথা?"
রাগান্বিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো ওয়াসিফ।
উমাইরা দাঁত বের করে এক হাসি দিয়ে বলল—
-"যেই ধরনের শুনেছেন, ওই ধরনেরই!"
কথা শেষ করেই যেন বাজ পড়ার আগেই দৌড়! চুলে বাতাসের ছোঁয়া, পায়ে পায়ে হাওয়া। মুহূর্তেই দৃষ্টির আড়ালে।
ওর যাওয়ার পানে কিছুক্ষণ স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে থাকল ওয়াসিফ। নীরবে পেছন ফিরল, আর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল অন্যপথে।
----------------------
আজ মেহেদির অনুষ্ঠান। রিসর্টের ভেতরে একটি খোলা জায়গায়, এক বিশাল গাছের নিচে সাজানো হয়েছে মেহেদির বিশেষ আয়োজন। গাছের ডালে ঝুলছে গাঁদা ফুলের মালা, লম্বা লম্বা করে ঝুলে থাকা উজ্জ্বল হলুদ ও কমলা ফুলের ছটায় জায়গাটা যেন এক রঙিন স্বপ্নপুরী। মালার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট বাতি ঝুলছে, যেগুলো সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে নরম ঝলমলে আলো।
মাঝখানে রাখা হয়েছে একটি কমলা রঙের সোফা, পাশে দুটি চেয়ার। সোফার ওপর রঙিন কুশন সাজানো, চারপাশটা আরামদায়ক ও নরম পরিবেশে ভরিয়ে তুলেছে। সামনে ছোট্ট একটি টেবিল, যেখানে ছোট ফুলদানিতে গোলাপ ফুল রাখা, আর এক পাশে একটি গোল প্লেট, যেটি গাঁদা ফুলের মালা দিয়ে ঘিরে সাজানো হয়েছে। তার ঠিক মাঝখানে গোলাপের পাপড়ির বিছানায় অনেকগুলো মেহেদির কোন রাখা হয়েছে, দারুণ নান্দনিকভাবে।
পেছনে গাছ আর ঝোপঝাড়ে সবুজের ছোঁয়া, পুরো দৃশ্যটিকে করেছে আরও প্রশান্ত ও মনোমুগ্ধকর।
বড়রা সবাই নিজেদের মতো বসে গল্প করছে। এর মধ্যে মেয়েরা এসে উপস্থিত হলো প্রীতিকে ঘিরে। প্রীতিকে বসানো হল, আর তার চারপাশে বাকি মেয়েরা গোল হয়ে বসল। প্রীতির পরনে এমেরাল্ড গ্রিন রঙের শাড়ি, কাঁচা ফুলের কানের দুল ও টিকলি, মাথায় কমলা রঙের দোপাট্টা। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন বসন্তের রঙে রাঙা কোনো অপ্সরা।
বাকি মেয়েরা সবাই পরেছে কমলা রঙের পোশাক, কারও পরনে শাড়ি, কারও থ্রি-পিস, কারও আবার সারারা।
ছেলেরা সবাই সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরেছে। কারণ ওয়াসিফ আগে থেকেই বলে রেখেছিল, সে অন্য কোনো রঙ পরবে না। তারা নিজেদের মতো গল্প করছে, ছোটখাটো কাজ সামলাচ্ছে।
ঠিক তখনই উমাইরা হাতে গিটার নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করে। ওয়াসিফ এক ঝলক তাকাতেই থমকে যায়। বেনি করা চুলে ফুল পেঁচানো, কানে কাঁচা ফুলের দুল। কোনো জাঁকজমক সাজ নেই, কপালে ছোট্ট একটি টিপ, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চোখে সামান্য কাজল। কিন্তু সেই সরলতাই যেন ওয়াসিফকে বিদ্ধ করল। ওর হৃদস্পন্দন থেমে যায়।
"এই রূপের অর্থ কী? এটা কি আমাকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্যই?" নিজের মনেই ফিসফিস করে বলে ওঠে ওয়াসিফ।