আধফোটা প্রেমের ফুল

পর্ব - ১৩

🟢

গাড়ি চলছিল ধীরে ধীরে, একঘেয়ে রাস্তা পেরিয়ে। জানালার পাশে বসে থাকা ওয়াসিফের মুখে হালকা এক তৃপ্তির হাসি খেলছিল বারবার। পাশে বসে থাকা রাফসান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে, চুপচাপ। আচমকা সে জিজ্ঞেস করল—

-"বল তো দেখি, কবে থেকে এত পাগল হলি?"

ওয়াসিফ একটু চমকে তাকাল তার দিকে, যেন বুঝতেই পারল না প্রশ্নটা কিসের দিকে ইঙ্গিত করছে।পেছনে বসে মেহরাব ও এহসান ও একটু এগিয়ে এসে শুনতে শুরু করলো তাদের কথা।

-"মানে?" জিজ্ঞেস করল সে।

রাফসান হালকা হেসে কাঁধ ঝাঁকালো,

-"মানে হচ্ছে, উমাইরার জন্য তোর এই পাগলামিটা কবে থেকে শুরু?"

ওয়াসিফ এবার আর লুকোল না। ঠোঁটের কোণে এক চুপচাপ হাসি খেলে গেল। বলল—

-"অনেক বছরের!"

রাফসান অবাক হয়ে তাকাল,

-"মানে?"

-"মানে, ঠিক যেমন বললাম।"

-" তুই কবে প্রেমে পড়লি উমাইরার?"

গাড়িটা এসে থামল এক নিরিবিলি, জনমানবহীন জায়গায়। চারপাশে শুধু নীরবতা। ওয়াসিফ ধীরে নামল, পকেট থেকে সিগারেট বের করে একটা রাফসানের দিকে বাড়িয়ে দিল, আর নিজেরটা জ্বালিয়ে এক টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে বলল—

-"আমি তখন ইতালিতে ছিলাম, তিন বছর কেটে গেছে প্রবাসে। দেশে আসার একটাই কারণ, আমার ঘরের ভেতরে একটি সিক্রেট রুম তৈরি করব। সেই ঘরটা বানানোর পেছনে কারণ ছিল, আমি গোপনে একটি রিসার্চ শুরু করেছিলাম, যেটা সম্পর্কে কেউ কিছু জানত না। রিসার্চের সমস্ত ফাইল, ডকুমেন্ট, খুঁটিনাটি সবকিছুই রাখার জন্যই সেই গোপন ঘরটি বানানো।

তখন উমাইরার বয়স মাত্র পনেরো। ছোটবেলা থেকেই ও আমার ভীষণ ভক্ত। আমার দাদা-দাদি চাচা ফুপু কেউই নেই। উমাইরা মায়ের বংশের প্রথম মেয়ে। বাবা তো বিশ্বাস করতেন, তার মা নাকি উমাইরার রূপে আবার ফিরে এসেছেন। তাই বাবার কাছে উমাইরা ছিল হৃদয়ের খুব কাছের মানুষ, প্রাণের চেয়েও প্রিয়। এই কারণেই আমি কখনো তাকে রাগ করে ধমকও দিতে পারি নি।

একদিন হঠাৎ করেই উমাইরা আমার রুমে আসে। আমকে ওর সাথে খেলতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমার হাতের ওপর হাত রাখতেই বুঝতে পারে, আমার গায়ে হালকা জ্বর। ব্যস! সেই ছোট মেয়েটা পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছিল সেদিন। চিৎকার, কান্না, হৈচৈ, সব মিলিয়ে একদম তুফান তুলে দিয়েছিল। বাবাকে পর্যন্ত ফোন করে ডেকে এনেছিল।

বাবা এসে দেখে বললেন —

-"তেমন কিছু না, হালকা জ্বর। ওষুধ খেয়েছে, ঠিক হয়ে যাবে।"

কিন্তু উমাইরা কি আর এমন কথায় চুপ থাকে? একেবারে জেদ ধরল।

মাকে বলেই যাচ্ছিল—

-"দুধ গরম করে দাও, স্যুপ বানাও, ফল কেটে দাও।"

আর মা-ও ঠিক সেভাবেই সব দিয়ে দিতেন।

উমাইরা একটু পর পর এসে আমার মুখে তুলে খাবার দিচ্ছে, জ্বরের রোগীর মতো যত্ন নিচ্ছে। অথচ আমি ঠিকই ছিলাম, কিছুই হয়নি আমার! তবু আমাকে একবারও বিছানা থেকে উঠতে দেয়নি।

সারাদিন জ্বালিয়ে মেরেছে সবাইকে। রাতেও বাড়ি যায়নি, চেয়ার নিয়ে আমার ঘরেই বসে ছিল, এই বলে যে সে আমার সেবা করবে। আর আমি? ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কখন টেরও পাই নি।

নিশুতি রাত! প্রহর প্রায় একটার কোঠায়, হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় ওয়াসিফের। পাশ ফিরে তাকাতেই চোখে পড়ে এক অপূর্ব দৃশ্য, ছোট্ট উমাইরা, খাটের পাশে একটি চেয়ারে বসে দুই হাত বিছানার ধারে রেখে মাথা এলিয়ে দিয়েছে তার ওপর। ঘুমে ঢলে পড়া উমাইরার মুখশ্রীতে যেন ছায়া পড়েছে স্বর্গীয় প্রশান্তির। ওয়াসিফ এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে, বক্ষ জুড়ে নেমে আসে এক গভীর নীরব শান্তি।

হঠাৎই! কিছু এক অজানা ভয়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসে ওয়াসিফ। নিঃসঙ্গ পদক্ষেপে উঠে যায় ছাদে।

আকাশ ঘিরে নিস্তব্ধতা, চারপাশে গভীর রাতের নীরবতা আর তার মাঝে, একের পর এক সিগারেট জ্বালিয়ে চলেছে সে। প্রতিটি ধোঁয়ার কুন্ডলীর সঙ্গে ভেসে আসে একটি মুখ, ঘুমন্ত উমাইরার সেই মায়াবী, নিষ্পাপ মুখশ্রী। চোখের পাতা বুঁজেও যেন সেই মুখটিকে তাড়াতে পারে না ওয়াসিফ। অক্ষীকোটরে বারবার ভেসে ওঠে সেই শান্ত, নরম ছায়াচিত্র। ভিতরে জমে ওঠে ব্যাখ্যাতীত এক অনুভব, ভালোবাসা, না কি কিছু আরও গভীর?

নৈঃশব্দ্যের ছায়ায় মন ও মস্তিষ্কের মধ্যে এক অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এমন সময়ে রবি ঠাকুরের একটি বাণী মনে পড়ে যায় তার। ঠোঁট নাড়ে নিঃশব্দে, যেন নিজেকেই শুনিয়ে বলছে—

"প্রহরশেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস,

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।"

হয়তো সত্যিই, উমাইরা, তুই কি তবে নিজের অজান্তেই সর্বনাশের খেলায়ই আমাকে মাতালি?

ঠিক সেইদিন, সেই রাত থেকেই, আমার মনের মালিকানা নিয়েছে উমাইরা। নিঃশব্দে, অবলীলায়। আর এখনো, আজও সে ঠিক সেভাবেই রাজত্ব করে চলেছে, অদৃশ্য এক অধিকার নিয়ে, আমি নিজেই তাকে সিংহাসনে বসিয়ে দিয়েছি।"

ওয়াসিফ থামলো। পাশে ফিরে রাফসানকে দেখে এক চমৎকার, মৃদু হাসি উপহার দিলো। রাফসান ফের প্রশ্ন করল—

-"বাড়ির কেউ যদি তোকে উমাইরাকে না দেয়?"

-"আমি যখন আরও তিন বছরের জন্য ফিরে যাচ্ছিলাম, তার আগে আব্বু-আম্মুকে নিয়ে মামুর কাছে যাই। আমি মামুর পায়ে পড়ে আমার চড়ুইটাকে নিজের জন্য ভিক্ষা চেয়েছি।"

-"মানে?"

এহসান মধ্যিখানে ফোড়ন কাটল—

-"মানেটা আমি বলছি, শোন!"

সেইদিন ভাইয়ার ফ্লাইট ছিল। উমাইরা বাসায় ছিল না, পরীক্ষা ছিল ওর। হঠাৎ দেখি, ওয়াসিফ ভাই আর মণি, বাবাই চলে এসেছেন। তারা এসেই কারও সাথে কোনো কথা না বলেই সোজা বড় আব্বুর পাশে গিয়ে বসে পড়লেন। ওয়াসিফ ভাই কিছুক্ষণ চুপচাপ, মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। হঠাৎ করেই উঠে পড়ে বড় আব্বুর পায়ের কাছে বসে পড়লেন।

-"আরে ওয়াসিফ, কী করছিস তুই? ওঠ বলছি, ওঠ!"

আজাদ রহমান বোনের ছেলের এমন কাণ্ডে হকচকিয়ে গেলেন। টেনে তুলতে গিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে কথাগুলো বলতে থাকলেন। বাড়ির বাকি সদস্যরা শব্দ পেয়ে এসে দাঁড়ালেন ড্রয়িংরুমে। সবাই বিস্ময়ে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। আর ঠিক তখনই ওয়াসিফ ভাই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তার এমন অবস্থায় সবাই গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়ল। দাদা-দাদি, বড় মা, আব্বু, সবাই তার পাশে দাঁড়িয়ে, তাকে উঠাতে চেষ্টা করলেন আর প্রশ্ন করতে লাগলেন, "কি হয়েছে?"

কিন্তু ওয়াসিফ ভাই কিছু বললেন না, উঠলেনও না।

ঠিক তখন মণি ও বাবাই বললেন—

-"ভাই আজাদ, তোর কাছে আজ আমরা একটা আবদার নিয়ে এসেছি।"

-"আবদার? তুই শুধু হুকুম কর, বুবু! তার আগে ওয়াসিফকে বল উঠতে এইসব কি করছে ও?"

-"আমার ছেলে উমাইরাকে চায়। তুই দিবি উমাইরাকে?"

চারপাশটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই অবাক, নিস্পন্দ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না কথাগুলো। ওয়াসিফ উমাইরাকে পছন্দ করে? কেউ কিছু বলতে পারল না।

ঠিক তখনই ওয়াসিফ বলতে শুরু করল—

-"আমি জানি না কখন, কীভাবে এই অনুভূতি তৈরি হলো। আমি নিজেকে অনেক বোঝাতে চেয়েছি, নিজের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করেছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি বারবার। আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি উমাইরাকে ভুলে যাওয়া।"

এটুকু বলে থামলো ওয়াসিফ। মাথা তুলে তাকালো আজাদ রহমানের দিকে। চোখ লাল রঙ ধারণ করেছে। চোখের কোণ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে আবার বলতে লাগলো—

-"আমি কথা দিচ্ছি মামু, আমি কোনোদিন ওকে কষ্ট পেতে দেব না। আমি ওকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। সবসময় ওকে আগলে রাখবো, যত্ন করবো। তুমি আমাকে ওকে ভিক্ষে দাও মামু....প্লিজ।"

ওয়াসিফ ভেঙে পড়ে, অনেক আকুতি মিনতি করে। তারপর বাড়ির সবাই ধীরে ধীরে রাজি হয় উমাইরার সাথে তার বিয়েতে। ঠিক ছিল, দেশে ফিরলেই ওদের বিয়েটা হয়ে যাবে। কিন্তু তার আগেই ঘটে যায় সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। উমাইরা কানাডা চলে যায়। তখনো সে বেশ ছোট ছিল। তাই ওয়াসিফ ভেবেছিল দেশে ফিরে সব নিজেই জানাবে তাকে।

সব শুনে রাফসান ঘুরে তাকায় ওয়াসিফের দিকে। যিনি এই মুহূর্তে সিগারেটের ধোঁয়া আকাশে উড়িয়ে চলেছেন। রাফসান তার ঘাড়ে হাত রেখে বলল—

-"তোর মতো দাম্ভিক, আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ একজন মানুষও নিজের ভালোবাসার জন্য ভিক্ষা চেয়েছে! ভাবাই যায় না। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, তুই উমাইরাকে এতটা ভালোবাসিস, তবুও ওর সাথে যা ঘটেছে, সেসব তুই জানতিস না?"

-"জানতাম। সব জানতাম আমি। তবে ঐ দিনের ঘটনা, ও চলে যাওয়ার পর জেনেছি।"

-"কীভাবে জানলি তুই এত কিছু?"

-"আমি ইতালি যাওয়ার আগে ওর জন্য একজন বডিগার্ড রেখে গিয়েছিলাম, যে ওর অজান্তেই ওকে পাহারা দিত। সে আমাকে সব জানাত। তবে আমি ভেবেছিলাম, হয়তো বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো ঝামেলা হয়েছে, কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেইদিন রেস্টুরেন্টে যা ঘটল, অয়নের ওর গায়ে হাত তোলা, এইসব আমি জানতে পারি ও বিদেশ চলে যাওয়ার পর। তারপর আমি লোক লাগিয়ে ওর কানাডার সব তথ্য খুঁজে বের করি, আর গোপনে দেখতে যাই ওকে। কিন্তু দূরত্ব বজায় রেখেই, ও জানতও না আমি গিয়েছিলাম। কানাডাতেও ওর জন্য বডিগার্ড ঠিক করে দিই। এরপর প্রতি ছয় মাস অন্তর আমি ওখানে যেতাম, ওকে দেখতে, এটা কেউ আজও জানে না।"

-"তাহলে তুই কিছু করিস নি? প্রীতিদের শাস্তি দিস নি কেন?"

-"কে বলেছে আমি শাস্তি দেই নি?"

-"মানে?"

-"প্রীতিকে আমিই ডিপ্রেশনে যেতে বাধ্য করি।"

ওয়াসিফ চোখে শূন্যতা নিয়ে ধীরে ধীরে বলতে থাকে—

-"এতসব কিছুর পর ওর মানসিক অবস্থা এমনিতেও খুব একটা স্থিতিশীল ছিল না। আমি ওর ফোনে একটি লিংক পাঠিয়েছিলাম। ও ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গে আমি ওর পুরো ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিই। তারপর থেকেই শুরু হয় আমার প্রতিশোধ, নিঃশব্দ অথচ নির্মম এক মানসিক অত্যাচার। যতভাবে সম্ভব, দূর থেকে আমি ওর উপর মানসিক যন্ত্রণা চাপিয়ে দিয়েছি। বারবার ওকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছি, আবার নিজেই টেনে এনেছি জীবনের দিকে।"

ওয়াসিফ একটু থেমে শ্বাস নিল। কণ্ঠে এক বিষণ্ণ নির্লিপ্তি।

-"যখনই ও মরতে যেত, আমি ইচ্ছে করেই ওর পরিবারের কাউকে এমনভাবে ইঙ্গিত দিতাম, যাতে তারা ঠিক তখনই ওর ঘরে চলে যায়। আমি প্রীতিকে জীবিত রেখেই মৃত্যুর স্বাদ খাইয়েছি…. বারবার।"

রাফসান নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিল, ওর চোখে যেন একধরনের বিস্ময়, আর প্রশংসার মিশ্র ছাপ। মেহরাব এবার সামনের দিকে এগিয়ে এসে বলল—

-"আর অয়ন?"

-"অয়নের কাহিনি আমি বলছি।"

এহসান এগিয়ে এসে বলল—

-"অয়ন ভাইকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছিল। পুরো এক মাস হসপিটালে ভর্তি ছিল সে। এমন অবস্থা হয়েছিল যে, ডাক্তাররাও নিশ্চিত ছিলেন না সে বাঁচবে কিনা। শরীরটা ছিল একেবারে থেঁতলে যাওয়া অবস্থায়।"

একটু থেমে আবার বলল—

-"এরপর তাকে সরাসরি বলা হয় প্রীতিকে যেন বিয়ে না করে। অয়নের এতে আপত্তি ছিল না, বরং সে নিজেও বুঝতে পেরেছিল সে যা করেছে, তার পরিণতি কী হওয়া উচিত। তাই তাকে বেশি বাধ্য করতে হয়নি।"

কিন্তু এহসান আবার থেমে যায়, যেন আরেকটা বড় সত্যি বলার আগে নিজেকে প্রস্তুত করছে।

-"তবে দুর্ভাগ্যবশত, শেষবার প্রীতি যে আত্মহত্যার চেষ্টা করে, সেটা কিন্তু ওয়াসিফ ভাই করায়নি। সেই ঘটনার পরই পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়।"

-"ওয়াসিফ ভাই যা করেছেন, তা শুধু বড় আব্বু আর বাবাই জানতেন। তারাই বোঝান তাকে, শান্ত থাকতে। এরপর ভাই নিজেকে সামলে নেয়। না হলে আজ প্রীতি হয়তো কোনো পাগলাগারদের ঘরেই থাকতো।"

-"এত কিছু কবে করলিন তুই?"

ওয়াসিফ নিশ্চুপ। কোনো উত্তর দিলো না। প্রয়োজনও নেই।

যা করার, সে করে ফেলেছে। এখন এসব কথা কাউকে বলার কিছু নেই। তার জীবনের ওপর দিয়ে যত আঘাত আসুক, সে হাসিমুখে বরণ করে নেবে, তবু তার চড়ুইয়ের গায়ে যেন চুল পরিমাণ আঁচড়ও না লাগে। নেই মেয়ে নিজে শত আঘাত সইতে পারে। নিজের জন্য কখনও কিছু করে না, সেই মেয়ের জন্য ওয়াসিফ আয়মান।

ওই আঘাত….অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। সামান্য মনে করে যেটা ওয়াসিফ এক সময় উড়িয়ে দিয়েছিল। আর সেই অবহেলার ফলেই আজ তার চড়ুই এতটা কষ্ট পেয়েছে। এই অপরাধের শাস্তি সে নিজেই নিজেকে দিয়েছে, উমাইরার কাছ থেকে দূরে থেকে।

হ্যাঁ, এটিই তার জন্য সবচেয়ে বড় শাস্তি।

চাইলেই সে জোর করে উমাইরাকে দেশে এনে বিয়ে করতে পারত। ক্ষমতা, প্রভাব, উপায়, সবই তো ছিল তার হাতে। কিন্তু সে কিছুই করেনি। শুধু চুপচাপ অপেক্ষা করেছে, উমাইরা নিজে থেকে ফিরে আসবে, নিজের ইচ্ছায়, ভালোবাসায় ভর করে।

আর….তা-ই হয়েছে।

হঠাৎ করেই ওয়াসিফের ফোনটা বেজে ওঠে। পকেট থেকে বের করে দেখে, শান ফোন দিয়েছে। ফোনটা রিসিভ করে কানে দেওয়া মাত্রই রাগে ফেটে পড়ে চিৎকার করে উঠে—

-"কি বলছিস তুই? আমি এখনই বের হচ্ছি! সকলেই পৌঁছে যাবে, তোরা আপাতত সামলে নে।"

বলেই তাড়াহুড়া করে ফোনটা পকেটে গুঁজে গাড়ির দিকে দৌড়ে যায়। রাফসান, এহসান ও মেহরাব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যায় তার পিছু।

ওয়াসিফ গাড়ি স্টার্ট দিতেই সবাই তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে আর উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করে—

-"কি হয়েছে? কে ফোন করেছিল? কি বলেছে, বল তো আমাদের!"

গাড়ি দ্রুত চালাতে চালাতেই ওয়াসিফ জানায়—

-"ল্যাবে আগুন লেগেছে। আমাকে এখনই ঢাকা ফিরে যেতে হবে। তোদের রিসোর্টে নামিয়ে দিয়ে আমি রওনা দেবো। তোরা কাল ট্রেনে না গিয়ে গাড়িতেই ফিরিস, সবাইকে দেখে-শুনে নিয়ে আসবি।"

রিসোর্টে পৌঁছে ওয়াসিফ ওদের নামিয়ে দিয়ে এক মুহূর্ত দেরি না করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে যায়।

-----------------

সকালে ঘুম ভাঙতেই সবাই ওয়াসিফের ল্যাবে আগুন লাগার খবর শুনে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। মুহূর্তেই আনন্দঘন পরিবেশ নিস্তব্ধ আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় ভরে ওঠে। কেউ কিছু বলতে পারে না, তাড়াহুড়া করে সবাই জিনিসপত্র গুছিয়ে রিসোর্ট থেকে চেকআউট করে ঢাকার পথে রওনা দেয়।

রাতের মধ্যেই বিধ্বস্ত, ক্লান্ত চেহারায় সবাই বাড়িতে পৌঁছে যায়। এখনো পর্যন্ত কারো সঙ্গে ওয়াসিফের যোগাযোগ হয়নি। সে শুধু একটি মেসেজ পাঠিয়েছে,

"চিন্তা কোরো না, আমি ঠিক আছি। সবাই বিশ্রাম নাও।"

এই আশ্বাসের পর সবাই নিজের নিজের জিনিসপত্র রেখে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে কেউ রান্নার কথা চিন্তাও করতে পারেনি, তাই বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে সেরেছে রাতের খাওয়া।

---------------------

মাঝরাতে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে ওয়াসিফ ফিরে এল রহমান ভিলায়। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, তবে কেউ এখনো নিজ নিজ বাসায় ফিরে যায়নি, সবাই এই বাড়িতেই রয়ে গেছে।

ওয়াসিফ কোনোকিছু না বলেই ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। সোজা নিজের ঘরে ঢুকে বিছানায় ধপ করে শরীরটা ফেলল। পরনের জামা কাপড়ও বদলায়নি, জুতোও খুলেনি, এমনকি ফ্রেশও হয়নি। ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল কিছুক্ষণ।

ওদিকে, উমাইরা তখনও জেগে ছিল। হঠাৎ করেই ওয়াসিফের রুমের দরজা খোলার হালকা শব্দ তার কানে এলো। কৌতূহল নিয়ে সে দরজার সামনে গিয়ে টোকা দিল। কোনো সাড়া নেই, কিন্তু দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধও না।

ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে উমাইরা স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখের সামনে বিধ্বস্ত এক ওয়াসিফ। সেই শক্তপোক্ত, আত্মবিশ্বাসী মানুষটা যেন আজ ভেঙে পড়েছে ক্লান্তির ভারে। শরীরে দিনের ময়লা, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু নিঃশব্দ শুয়ে থাকা। উমাইরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।

উমাইরা নিঃশব্দে দরজার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকল। ধীরে ধীরে পায়ে হেঁটে এসে বসল ওয়াসিফের পায়ের কাছে। মাথা নিচু করে সাবধানে তার পা থেকে জুতোগুলো খুলতে লাগল। হঠাৎ করেই নিজের পায়ে কারো স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলে তাকাল ওয়াসিফ।

চোখে ঘুম আর ক্লান্তির ছায়া নিয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর যেন বাস্তবে ফিরে এলো।

-"তুই এখনও ঘুমাস নি?"

ক্লান্ত ভেজা কণ্ঠে প্রশ্ন করল সে।

উমাইরা মাথা নিচু রেখেই জুতোর ফিতা আলগা করছিল। ওয়াসিফের দিকে একবার তাকিয়ে মলিন একটা হাসি দিলো। জুতোটা খুলে আলতো করে পাশে রাখল, তারপর উঠে ওর পাশে এসে বসল।

একটু থেমে, নরম কণ্ঠে প্রশ্ন করল—

-"কি হয়েছে? এত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন আপনাকে?"

ওয়াসিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ওর মুখে কোনো উত্তর নেই, কিন্তু চোখের গভীরে যেন হাজারটা কথা জমা হয়ে আছে।

হঠাৎ করেই ওয়াসিফ উমাইরাকে নিজের সামনে টেনে দাঁড় করাল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে উমাইরার কোমর জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। নিঃশব্দে মাথা রেখে দিল ওর উদরে, যেন পৃথিবীর সব ক্লান্তি সেখানেই লুকিয়ে রাখতে চাইছে।

উমাইরার নিঃশ্বাস মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। পুরো ঘটনাটা এত আচমকা ঘটল যে, কী বলবে, সে নিজেই জানে না। শব্দ খুঁজে পাচ্ছিল না মুখে, কিছু বলার মতো ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছিল। শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ঢেউ উঠছে, অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই।

ঘরের জানালা ভেজা, বাইরে আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ। সেই মেঘের ফাঁক গলে হিমেল হাওয়া ঢুকছে ঘরের ভেতর, জানালার পর্দাগুলো দুলে উঠছে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটায়। চারদিকে নিস্তব্ধতা, না কোনো কথা, না কোনো শব্দ। শুধু দুটো মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ আর জমে থাকা আবেগের ভারে বোঝা হয়ে থাকা নিরবতা। ওরা দুজন যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে, কেউ কারও কিছু বলছে না, তবুও যেন সব বলা হয়ে যাচ্ছে।

উমাইরা ওয়াসিফের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নীরবতা ভেঙে ওয়াসিফ বলল—

-"সব শেষ….ল্যাবে আমার এত বছরের পরিশ্রম, সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দুজন মানুষের অসতর্কতার কারণে আমার স্বপ্নটা ভস্ম হয়ে গেল!"

উমাইরা আস্তে করে জিজ্ঞাসা করলো—

-"কে কে ছিল তখন ল্যাবে, যখন আগুন ধরে?"

-"শান আর অন্তিকা। সোফিয়া, রুবাব, ওরা বাইরে গিয়েছিল একটু ফ্রেশ এয়ারের জন্য। ফিরে এসে দেখে সর্বনাশ হয়ে গেছে।"

উমাইরা নরম কণ্ঠে বলল—

-"চিন্তা করবেন না। সব পুড়ে গেলেও আপনার মেধা তো এখনো অক্ষত। যা নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন, সেটা তো আজও আপনার মনে গাঁথা আছে। নতুন করে শুরু করবেন না হয়, আগেও পেরেছিলেন, এবারও পারবেন।"

ওয়াসিফ ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল উমাইরাকে। নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল, তারপর ধীরে পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগোতে এগোতে বলল—

-"যাস না, আসছি আমি।"

উমাইরা চুপচাপ বসে রইল। সময় যেন থমকে গেল কিছুক্ষণের জন্য। প্রায় দশ মিনিট পর, ওয়াসিফ এক জোড়া ট্রাউজার আর হালকা রঙের টি-শার্ট পরে, চুল মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চোখ গেল খাটে বসে থাকা উমাইরার দিকে। ওকে দেখে যেন ক্লান্ত হৃদয়ে একটু প্রশান্তির ছোঁয়া এলো।

উমাইরা তখনই বলল—

-"আপনি বসুন, আমি খাবার গরম করে নিয়ে আসছি।"

ওয়াসিফ শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কিছুক্ষণ পর উমাইরা খাবার নিয়ে ঘরে ফিরে আসে। খাবারের প্লেটটা ওয়াসিফের সামনে রেখে দিলে, সে হালকা কণ্ঠে বলে ওঠে—

-"খাইয়ে দে, খুব ক্লান্ত আমি আজ।"

কোনো কথা না বলে উমাইরা পাশে বসে নিঃশব্দে খাওয়াতে শুরু করল। ওয়াসিফ খাচ্ছে আর চুপচাপ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর মুখপানে, যেন কী যেন খুঁজছে, কী যেন বোঝার চেষ্টা করছে।

খাওয়া শেষ হলে, উমাইরা চুপচাপ উঠে পড়ে চলে যেতে চাইলে, হঠাৎ ওয়াসিফ হাত ধরে টেনে ওকে খাটে বসিয়ে দেয়। তারপর ধপ করে মাথাটা রেখে দেয় ওর কোলের উপর। চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে—

-"অনেক ক্লান্ত আমি, আমার এখন একটু শান্তির দরকার। এক চুলও নড়বি না।"

উমাইরার বুকের ভিতর কেমন যেন কেঁপে ওঠে, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। কোলের উপর মাথা রাখা মানুষটার নিঃশ্বাসে যেন ক্লান্তি আর নির্ভরতার সুর বেজে চলে।

----------------------

-"কাজ হয়েছে?"

-"হ্যাঁ, সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। একটা কিছু অবশিষ্ট নেই।"

-"সব কিছু ধ্বংস করার আগে রিসার্চের কাগজপত্র, সংরক্ষণ করেছিলে তো? আমাদের কাছে যেন সব থাকে।"

-"হ্যাঁ, প্রয়োজনীয় সব তথ্য আমরা আগেই নিয়ে নিয়েছি। তারপরই আগুন লাগানো হয়েছে।"

-"কেউ সন্দেহ করেছে?"

-"না। কে-ই বা সন্দেহ করবে?"

-"ভুলে যেও না, সে ওয়াসিফ আয়মান। অতি ধুরন্ধর, শীতল মস্তিষ্কের খেলোয়াড়। যার চোখ ফাঁকি দেওয়া child's play নয়।"

-"চিন্তা করবেন না। ওয়াসিফ কিছুই টের পায়নি। এখনও পর্যন্ত সব নিখুঁতভাবে চলছে।"

-"ভালো। সাবধানে থেকো। স্বাভাবিক আচরণ করো যেন কারও মনে সন্দেহের উদ্রেক না হয়।"

এই বলে অপরিচিত ব্যক্তি ফোন কেটে দিলেন।

অন্ধকার ঘরে এক কোণায় একটি রকিং চেয়ারে বসে আছেন তিনি। চারপাশে ঘন ছায়া, নিস্তব্ধতা। এক হাতে ঘোরাতে লাগলেন ফোনটি, আরেক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে উঠছে তার মুখের পাশ থেকে। পাশের টেবিলে রাখা মদের বোতল আর গ্লাস। ফোনটা নামিয়ে রেখে এক গ্লাস তুলে নিয়ে নিলেন গভীর এক চুমুক।

তারপর ঠোঁটে সিগারেট রেখে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন—

-"ওয়াসিফ আয়মান….ইউ আর ফিনিশড নাও।"

এ কথা বলেই অন্ধকার কক্ষ কাঁপিয়ে উচ্চস্বরে এক শীতল অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন।

আধফোটা প্রেমের ফুল পর্ব ১৩ গল্পের ছবি