উমাইরা সেদিন রেস্টুরেন্টের ঘটে যাওয়া সবকিছু খুলে বলেছে লারাকে। ওয়াসিফের সাথে করা আচরণ, অন্তিকার দাবি, সব। লারা চুপচাপ শুনেছে, তারপর বলেছে—
-"এবার সরাসরি ওর মুখোমুখি হতে হবে।"
উমাইরা বেশ কিছু দিন পর অন্তিকার সাথে যোগাযোগ করে দেখা করতে বলে। একটি রেস্টুরেন্টের ঠিকানা পাঠিয়েছে অন্তিকাকে। বিকেল পাঁচটার দিকে, লারা আর উমাইরা পাশাপাশি বসে অপেক্ষা করছে।
দু’জনের মুখে দৃঢ়তা। চুপচাপ কিন্তু ভেতরে চলেছে ঝড়। হঠাৎ রেস্টুরেন্টের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে অন্তীকা। সে যথারীতি সাজানো, আত্মবিশ্বাসে ভরা।
একবার চারপাশ দেখে, তারপর সোজা এসে চেয়ারে বসে। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।
-"কেমন আছো, উমাইরা?"
উমাইরা কাঁধে ভর দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে—
-"ভালো ছিলাম, যতদিন না আপনার মুখটা দেখেছি।"
অন্তীকা ভ্রু কুঁচকে বলে—
-"তোমার সমস্যা কী? আমি আবার কী করেছি?"
উমাইরা এবার আর ঘুরিয়ে না বলে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—
-"তুমি সেদিন বললে, ওয়াসিফ ভাইয়ার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক আছে, তার কী কোনো প্রমাণ আছে তোমার কাছে?"
অন্তীকার চোখ এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠল, কিন্তু স্বর ছিল দৃঢ়—
-"হ্যাঁ, আছে। আমি মিথ্যা বলি না।"
লারা এবার হালকা হেসে বলে—
-"তাহলে প্রমাণ দেখান। শুধু মুখে বললে কেউ বিশ্বাস করে না।"
উমাইরাও চোখে চোখ রেখে বলে—
-"এইবার সত্য আর মিথ্যা একবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে।"
অন্তীকা ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে একটা খাম বের করল।
হাতটা ধীরে বাড়িয়ে দিল উমাইরার দিকে, চোখে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। উমাইরা নীরবে খামটা নিল।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
ধীরে খুলে ছবি বের করল, ওয়াসিফ আর অন্তিকার একান্ত মুহূর্তের কিছু ছবি।
লারার মুখ থেকে শ্বাসটা যেন একদম আটকে গেল।
-"ও মাই গড!"
সে ফিসফিস করে বলে উঠল। কিন্তু উমাইরা?
তার মুখে একটুও চমক নেই। ছবিগুলো নিরুত্তাপে দেখে নিয়ে আবার গুছিয়ে খামের ভেতর ঢুকিয়ে রাখল। তারপর ব্যাগে ভরে রাখল। তবুও একবারও অন্তিকার দিকে চোখ সরালো না। তার ঠান্ডা কণ্ঠ যেন ধারাল ছুরির মতো কেটে যায় বাতাস—
-"কত দিনের সম্পর্ক তোমাদের?"
অন্তীকা এক মুহূর্ত ইতস্তত করে, তারপর গলা সোজা করে বলল—
-"ইতালিতে থাকার সময় থেকেই!"
উমাইরার কণ্ঠে তীব্র শ্লেষ নেই, তবে শীতলতা ছিল—
-"ওই সময় তো আমি কানাডায় ছিলাম। তাহলে বিয়ে করলে না কেন?"
প্রশ্নটা ছুরি হয়ে ঢুকে গেল অন্তিকার পরিকল্পনার ভেতর। সে একটু থমকে গেল, ঠোঁট চাটল, চোখ নামিয়ে আনল।
-"আসলে.... ওয়াসিফের মা...মানে, মনি বলেছিলেন,
তোমাকে ছাড়া নাকি ওয়াসিফকে বিয়ে দেবে না। তিনি বলেছিলেন তুমি এলেই আমাদের বিয়ে দিয়ে দেবে!"
এইবার কথাগুলো বলার সময় গলার জোর হারিয়ে ফেলল অন্তীকা। জবাবটা প্রস্তুত ছিল, কিন্তু আত্মবিশ্বাসটা আর নেই।
উমাইরা এবার সামান্য হেসে তাকাল,না ব্যঙ্গ, না রাগ, শুধু এমন এক হাসি, যা সামনে ঝড়ের পূর্বাভাস।উমাইরা হঠাৎ হেসে উঠল। না, সেটা সাধারণ হাসি ছিল না, একটা নিঃশব্দ, শীতল, তাচ্ছিল্য মাখানো অট্টহাসি।
হাসতে হাসতে চোখে পানি এসে গেল তার। সে হাত তুলে সেটা মুছল। তারপর একবারও না কাঁপা কণ্ঠে, ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল—
-"ভুল মানুষকে পেছন থেকে ছুরি মারার চেষ্টা করেছ, আপু। এবার সেই ছুরিটাই তোমার দিকেই ঘুরবে।"
এক চোখ টিপে দিযে বলল উমাইরা। দুইবার হাততালি। মুহূর্তেই রেস্টুরেন্টের দরজা খুলে চারজন কালো পোশাকের পুরুষ নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল।
তারা চুপচাপ এসে উমাইরার পেছনে দাঁড়িয়ে গেল।
অন্তীকা প্রথমে বোঝে না। তারপর বুঝে, তার চোখ বড় হয়ে যায়। সে উঠে দাঁড়ায়।
-"এই....এটা....কী হচ্ছে?"
উমাইরা পিছন ফিরে, পুরুষদের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে আদেশ দিল—
-"Take her to the studio. Quietly. Make sure no one sees her. I’ll come… when it’s time."
কোনো চিৎকার, কোনো হট্টগোল নয়। তার কণ্ঠে ছিল কেবল হিমশীতল সিদ্ধান্ত। উমাইরা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। লারা তার পাশে চুপচাপ হাঁটছে। দুজনের পেছনে পড়ে রইল স্তব্ধ রেস্টুরেন্ট আর স্তব্ধ এক অন্তীকা। চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে তাকে।
সে চিৎকার করে উঠল—
-"উমাইরা! প্লিজ! এটা ঠিক হচ্ছে না! তুমি যা করছো, তার ফল পাবে! ছেড়ে দাও! ছেড়ে দাও আমাকে!"
কিন্তু কণ্ঠ হারিয়ে গেল নিঃশব্দের ভেতর। দরজা ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। আলো-ছায়ার খেলা যেন এক নতুন গল্পের সূচনা লিখে দিল। উমাইরা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে সোজা ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। লারা এসে পাশের সাইট বসে উমাইরার উদ্দেশে বলল—
-"কিরে ভাই তুই এত শান্ত কিভাবে? এইসব ছবি দেখে কেউ কি শান্ত থাকতে পারে নাকি?"
-"ছবি গুলো ফটোশপ করা। ওয়াসিফ আমি ব্যথিত কোনো নারীর দিকে কখনও ওই দৃষ্টিতে তাকায় নি আর তো এইসব করা।"
-"তুই কিভাবে জানলি। হাজার হোক পুরুষ মানুষ বলে কথা। চাহিদা আছে অন্য নারীর প্রতি মোহ চলে আসতেই পারে।"
-"যেই পুরুষ কানাডা যাওয়ার আগে আমার বাবা মায়ের হাতে পায়ে ধরে আমকে ভিক্ষা চায়। যেই পুরুষ ছমাস অন্তর অন্তর আমাকে এক নজর দেখার জন্য কানাডা যায়। যেই পুরুষ আমার জন্য খুন পর্যন্ত করতে যায়। যেই পুরুষ আমার গায়ে আমার ভাই হাত তুলে ছিল বলে সেই ভাইকে এক মাসের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। যেই পুরুষ ২৪ ঘণ্টা আমাকে নজর দাঁড়িতে রাখে। যে নিজের নিশ্বাস আমার নামে করে দিয়েছে, সেই পুরুষকে অবিশ্বাস করবো?"
লারা বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে উমাইরার দিকে। কি বলছে এই মেয়ে? ওয়াসিফ ভাই এইসব কবে করলো? লারা নিজেকে দমাতে না পেরে প্রশ্ন করলো—
-"তুই এইসব জানলি কিভাবে?"
-"এহসান ভাই বলেছে আমকে।"
-"কবে?"
-"সেইদিন রাতে ওয়াসিফ ভাইয়ের সাথে বেয়াদবি করতে দেখে ফেলেছিল। তখন আমাকে বোঝানোর জন্য এইসব কিছু বলেছে।"
লারা বিষ্ময়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। কারও চেয়ে কেউ কম নয়। যেমন মিয়া তার তেমন বিবি।
-"আচ্ছা এখন বল প্ল্যান কি? কি করবি মেয়েটার সাথে?"
-"ল্যাবে আগুন লাগানোর ব্যাপারে ওর হাত আছে।"
-"তুই কিভাবে জানলি?"
-"ও ওয়াসিফ ভাইকে ভালোবাসে। কিন্তু ওয়াসিফ ভাই আমাকে ভালোবাসে। সে ওয়াসিফ ভাইকে পাবে না তাই তাকে ধ্বংস করতে চায়। বাকি আর একজন এটাকে খুঁজে পেলেই সব প্রকাশ পাবে।"
---------------------------
নিধী ও এহসান বসে আছে একটি রেস্টুরেন্টে। দুজনের মধ্যে নীরবতা। নিধী এহসানের দিকে তাকিয়ে খাবার নড়াচড়া করছে। অন্য দিকে এহসান ফোনে বেস্ত। নিধী চামচ টা শব্দ করে প্লেটে রাখলো। এহসান শব্দ শুনে চোখ তুলে তাকালো। তারপর ফোনটা পকেটে রেখে বলল—
-"খাচ্ছ না কেনো?"
-"আপনি কি এখানে ফোন টেপার জন্য এসেছেন?"
এহসান ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তা দেখে নিধী বলল—
-"অফিসে, বাসায় কি ফোন টিপতে পারেন না?"
-"হুম পারি কিন্তু কি হয়েছে হঠাৎ এইসব কেনো বলছ?"
-"আপনি এখানে কেনো এসেছেন?"
-"তোমাকে দেখতে?"
-"আর আপনি এতক্ষণ কি করছিলেন?"
এহসান বুঝল। হালকা হেসে বলল—
-"সরি আজকে অয়ন ভাইয়া ফিরে আসছে। আমাকে মেসেজ করে জানালো তাকে রিসিভ করতে যেতে তাই সময় জিজ্ঞাসা করছিলাম।"
নিধী চোখ বড় বড় করে তাকালো উচ্ছসিত কন্ঠে বলল—
-"সত্যি!"
এহসান মাথা নাড়িয়ে বোঝালো হুম সত্যি।
নিধী ফের বলল—
-"বাহ খুব ভালো তো আমি কালকেই ভাইয়াকে নিয়ে ওবাড়ি যাবো বেশ কিছু দিন থাকতে। অনেক দিন ভাবীকে দেখি না। বেশ গল্প করা হবে।"
এহসান কপাল কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো—
-"শুধু ভাবীকে দেখতে যাবে তার সাথে গল্প করার জন্য। আর কারো জন্য যাবে না?"
নিধী বুঝল তার কথার মানে। কিন্তু দুষ্টুমি বুদ্ধি মাথায় জেঁকে বসলো। খাবার খেতে খেতে বলল—
-"হুম। আর কেউ আছে নাকি? যার আমার জন্য মন পুড়ে সে দেখা করতে এসে ফোন টিপি না।"
এহসান ও নিধীর সময় টুকু বেশ দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়ায় কেটে গেলো।
-------------------
ওয়াসিফ বেশ কিছু দিন ল্যাবে আসেনি। আজ রাতের দিকে হঠাৎ এসে হাজির, সব কাজ কতদূর এগোলো, সেটা দেখতে। কিন্তু ল্যাবে পা রেখেই তার চোখ খুঁজতে থাকে অন্তিকাকে। না, কোথাও নেই।
সে সোজা শানের দিকে এগিয়ে গেল।
-"অন্তিকা কোথায়?"
শান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
-"জানি না। বিকেলের দিকে বেরিয়ে গেছে। আর আসেনি এখনো।"
-"ফোন করেছিলি?"
-"হ্যাঁ, কিন্তু ধরেনি।"
ওয়াসিফ কিছুক্ষণ চুপ। ঠোঁট চেপে ধরে বলে—
-"আচ্ছা। কালকেও না আসলে খোঁজ নিতে হবে। আর শোন, কাজটা দ্রুত শেষ করতে হবে। হাতে আর সময় নেই, মাত্র ১৫ দিন পর ইতালিতে যেতে হবে। সো ডোন’t মেক এনি মিসটেক।"
শান হালকা মাথা ঝাঁকালো—
-"তুই টেনশন নিস না, সব ঠিকঠাক মতোই হবে।"
ওয়াসিফ একবার শানের দিকে তাকাল। ছেলেটা মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি, আবার অদৃশ্য এক উদ্বেগ তার ভেতর বয়ে যায়। এক মুহূর্ত চুপ থেকে ওয়াসিফ ঘুরে দাঁড়াল। নীরব পায়ে ল্যাব থেকে বেরিয়ে গেল। পরিকল্পনা ঠিকঠাক মতোই এগোচ্ছে। এখন শুধু অপেক্ষা, সেই কাঙ্ক্ষিত দিনের।
--------------------------
রাত গভীর। রহমান ভিলায় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। সবাই ঘুমে অচেতন। চারপাশ অন্ধকারে আচ্ছন্ন, শুধু কোথাও কোথাও টিমটিমে আলো, যেন ছায়ার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে।
এই নিস্তব্ধ রাতেই কক্ষ থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো উমাইরা ও লারা। ধীর পায়ে তারা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। আলো এতই মৃদু যে মুখ স্পষ্ট নয়, শুধু অবয়ব দেখা যায় আবছা।
রান্নাঘরের পেছনে একটি পুরোনো দরজা, যা বাড়ির পেছনের দিকে যাওয়ার একমাত্র গোপন রাস্তা। সেই দরজা খুলে, নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল তারা। বাড়ির পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে উমাইরার স্টুডিও।
স্টুডিওর দরজাটা টিপে খুলল উমাইরা। ভিতরে ঢুকতেই এক অন্যরকম দুনিয়া, চারপাশে ক্যানভাস, রংতুলির গন্ধ, অর্ধসমাপ্ত পেইন্টিং, মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সরঞ্জাম। যেন এই ঘরেই বাস করে তার ভেতরের আসল রূপ।
লারা একবার চারপাশটা দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
-'এখানেই শুরু হবে না তো সবকিছু?"
উমাইরা চুপ। শুধু চোখে এক ঝলক দৃঢ়তা, যেন এই নিঃশব্দ রাতেই লেখা হতে চলেছে এক নতুন গল্পের শুরু। নিজের আঁকা সব সম্পূর্ণ পেইন্টিংগুলো সংরক্ষণ করার জন্য উমাইরা স্টুডিওর নিচে একটি বিশাল গোডাউনের মতো ঘর তৈরি করেছে। স্টুডিওর এক কোণায় মেঝের সঙ্গে মিশে থাকা একটি লোহার দরজা উমাইরা খুলে তোলে। দরজার নিচে নেমে যাওয়ার জন্য রয়েছে সরু সিঁড়ি আর একটি পুরনো ধাঁচের খোলা লিফট, যেটা সাধারণত বড় ক্যানভাস তোলা-নামানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।
উমাইরা লারাকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ি ধরে নিচে নামল। নিচের ঘরটিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে, দেয়ালজুড়ে সারি সারি ক্যানভাস। এই বছর এক্সিবিশনের জন্য সে যত ছবি এঁকেছে, সবই সেখানে সাজানো। প্রতিটি ছবির ওপরে আলাদা করে ফোকাস লাইট লাগানো, যেন প্রতিটির সৌন্দর্য নিজস্ব আলোর ছটায় উদ্ভাসিত হয়।
ঘরের চারপাশের দেয়ালে ঠেস দিয়ে পেইন্টিংগুলো সাজানো, মাঝখানের বিরাট অংশ ফাঁকা রাখা। আর ঠিক সেই ফাঁকা জায়গার কেন্দ্রে একটি চেয়ারে বসে আছে এক নারী, হাত দুটো শক্ত করে বাঁধা। তার মাথার ওপরে ঝুলছে একটি কাঁচের বাল্ব, যার কড়া আলোয় তার মুখখানি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ভীত, ক্লান্ত, আর অচেনা এক অভিব্যক্তিতে পূর্ণ।
উমাইরা ও লারা নীরবে এসে দাঁড়ালো তার সামনে। কনক্রিটের মেঝের ওপর একা, চেয়ারে বাঁধা পড়ে থাকা অন্তিকার মাথাটা হালকা কাত। নিঃসাড়, নিস্তেজ। হঠাৎ লারা এক গ্লাস ঠান্ডা পানি তার মুখে ছুঁড়ে মারল। চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালো অন্তিকা। কিছুক্ষণ চারপাশে এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, এটা কোথায়? তারপর চোখে পড়ল, সামনে দাঁড়িয়ে উমাইরা ও লারা।
ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেল। কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে বলল—
-"উমাইরা....কেন করছো এটা? কী ক্ষতি করেছি আমি তোমার?"
উমাইরার ঠোঁটে একরাশ শীতলতা। কণ্ঠটা ঠান্ডা কিন্তু কাঁপা রাগে ভরপুর—
-"ঠিক এই প্রশ্নটাই তো আমি তোমাকে করতে চাই। কেন করেছো এমন?"
-"কি? কী বলছো তুমি? আমি তো কিছুই বুঝছি না!"—অন্তিকার কণ্ঠে আতঙ্ক।
উমাইরার চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
-"ওয়াসিফ ভাইয়ের ক্ষতি করার চেষ্টা কেন করছো? যে ছেলেটা তোমাকে বিশ্বাস করে, বন্ধু ভাবে....তাকে ঠকাতে গেলে কেন?"
অন্তিকা গিলে ফেলল এক অদৃশ্য ঢোক। চোয়াল কেঁপে উঠল। গলা শুকিয়ে গেছে। চোখ নামিয়ে ফেলল সে।
-"আমি....আমি তো....তা করিনি....মানে....আমি!"
কথাগুলো আর জোড়া লাগছিল না তার মুখে। ভিতরের গিল্ট আর ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় দুইয়ে মিলে কণ্ঠস্বর যেন একেবারে মিইয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে অন্তিকা আবারও বলল—
-"তুমি কী বলছো এসব? আমি কেন ওয়াসিফের ক্ষতি করতে যাবো? আমি তো ওকে ভালোবাসি!" গলাটা কেঁপে উঠল অন্তিকার, চোখে জল জমে উঠছে।
উমাইরা একটু ঝুঁকে এলো, ঠান্ডা গলায় বলল—
-"I know that! But the question is, when you love someone, how can you be the one to destroy him?"
অন্তিকার চোখে বিস্ময়, তারপর হঠাৎ বিষাক্ত তীর ছোড়া কণ্ঠে বলল—
-"কি সব বাজে বকছো তুমি? পাগল হয়ে গেছো নাকি? তোমার কাছে কোনো প্রমাণ আছে? না ওয়াসিফ তোমাকে ভালোবাসে না বলে তুমি এখন আমার ওপর রাগ ঝাড়ছো, প্রতিশোধ নিচ্ছো?"
একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফেটে বেরোল উমাইরার ঠোঁট থেকে। তারপর ধীরে ধীরে সে হাঁটল অন্তিকার পেছনে। এক লাফে চুলের মুঠি ধরে মাথাটা টেনে পেছনে ঠেলে দিল। ব্যথায় মুখ দিয়ে ‘উঁহ’ শব্দ বেরিয়ে এলো অন্তিকার। উমাইরার চোখে এখন আগুন আর ঠোঁটে শীতল পৈশাচিক হাসি।
-"আমার সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলার চেষ্টা করো না অন্তিকা। সত্য আর মিথ্যে আমি চোখ দেখে ধরতে পারি। সেটা আমার অভ্যাস....অনেক বছরের অভিজ্ঞত বলতে পারো । তাই একদম চালাকি কোরো না। কারণ আমি যেটা খুঁজছি....সেটা আমি পেতেই আসছি।"
ব্যাথায় ছটফট করতে করতে অন্তিকা কেঁপে কেঁপে বলল—
-"ছ....ছাড়ো আমাকে....লাগছে আমার! আমি কিছু করিনি, কিচ্ছু না! তুমি প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ হয়েছো, তাই না? কিন্তু ওয়াসিফ যদি এসব জানে....উমাইরা, তোমার রক্ষা থাকবে না।"
উমাইরার চোখ জ্বলে উঠল। ঠোঁট আঁকাবাঁকা করে উঠে কাঁপা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল—
-"চুপ! একদম চুপ! ফাইজলামি করসি আমার সাথে? আমাকে বোকা ভেবেছিস নাকি? কয়েকটা ফটোশপ করা ছবি দেখিয়ে ভাবছিস আমি বিশ্বাস করব ওয়াসিফ তোর? ওয়াসিফ আমার! শুধুই আমার!"
তার চোখের ভাষায় ছিল দগদগে মালিকানা। হঠাৎই উমাইরা চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে সরে গেল অন্তিকার দিক থেকে। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এলো, হাতে গাছের ডাল কাটার জন্য ব্যবহৃত একটি ভারী কাটার। চোখে মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা, যেন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। আস্তে করে অন্তিকার এক হাত তুলে নিলো, তার একটা আঙুল কাটারের ফাঁকে গুঁজে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে
বলল—
-"এখন যা যা জিজ্ঞেস করব, সত্যি করে বলবি। একটুও চালাকি করবি না, মিথ্যে বলবি না। কারণ প্রতিবার মিথ্যে বললে....একটা করে আঙুল হারাবি।"
অন্তিকার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ঠোঁট কেঁপে উঠল। আর উমাইরার চোখে তখন শুধুই সিদ্ধান্ত...আর প্রতিশোধের ছায়া। অন্তিকা এক শুকনো ঢোক গিলে নিল। চোখে জমে থাকা ভয়ের ছায়া আরও ঘন হয়ে উঠল। তার মনে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, উমাইরা কী জিজ্ঞেস করতে চলেছে? এই কীসের মাঝখানে এসে পড়ল সে? কানাডায় উমাইরা আসলে কী করত? এত ক্ষমতা তার হলো কী করে? দুই দিন ধরে একজীবন্ত মানুষকে গায়েব করে রেখেছে সে, অথচ কেউ জানেই না, কেউ খোঁজও নিচ্ছে না। কীভাবে সম্ভব এমন নিখুঁত নিঃশব্দ অপারেশন?
উমাইরা যেন তার মনের কথাই শুনে ফেলল। ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল—
-"কি ভাবছিস? আমি কীভাবে এসব করলাম, এই ক্ষমতা এল কোথা থেকে? ভাবিস ভাব, তবু কিছুই জানতে পারবি না। আমি না বললে কিছুই না। তাই মনের দোলাচল থামা, এবার আমার প্রশ্নের উত্তর দে, সত্যি করে।"
অন্তিকা হালকা কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ল, সে বোঝাতে চাইছে, এখন আর চালাকি করবে না।
উমাইরার ঠোঁটে হালকা একটা বিকৃত হাসি ফুটে উঠল। তারপর প্রশ্ন করল—
-"ল্যাবে আগুন তুইই দিয়েছিলি, আমি জানি। এখন বল, কার সঙ্গে মিলে দিয়েছিস? কীভাবে করেছিস, সব ডিটেইলে চাই।"
অন্তিকা স্তব্ধ। এই প্রশ্নের জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।ল্যাব? আগুন? সে তো ভেবেছিল, ওয়াসিফকে ভালোবাসা নিয়ে কথা বলবে, মানসিক যুদ্ধে যাবে। কিন্তু এই মেয়েটা তো ভেতরের সবচেয়ে গোপন জিনিস জেনে বসে আছে! কীভাবে জানল উমাইরা? কে বলল তাকে?
কিছু না বুঝেই ঠোঁট শুকিয়ে এলো, গলা বন্ধ হয়ে আসছে।
উমাইরা তার ভাবনার মাঝে আর সময় দিল না। আবারও আঙুলটা কাটারের ফাঁকে চেপে ধরল। হালকা চাপ পড়তেই অন্তিকা এক চিৎকারে বলে উঠল—
-"দাঁড়াও! দাঁড়াও! কেটো না! বলছি সব বলছি!"
হড়বড় করে বলতে লাগল সে—
-"সেদিন আমাদের ফর্মুলার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেই ফর্মুলা আমরা বিক্রি করতে চেয়েছিলাম....একটা নির্দিষ্ট মানুষকে দিতে। কিন্তু সরাসরি চুরি করলে ধরা পড়ে যেতে পারতাম। তাই নাটক করেছিলাম, ল্যাবে আগুন! আগুনে সব কিছু ধ্বংস দেখিয়ে, ভেতরে ভেতরে আমরা সব ডেটা সরিয়ে নিয়েছিলাম। তারপর সেটা পৌঁছে দিই সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির হাতে।"
উমাইরার কণ্ঠ এবার আরও কঠিন হয়ে উঠল—
-"তোর সঙ্গে আর কে ছিল?"
এই প্রশ্নে অন্তিকার মুখ থমকে গেল। সে চুপ। নিঃশব্দে কাঁপছে। উমাইরার ধৈর্যের বাঁধ এবার টলতে শুরু করল। সে আবার হাত বাড়িয়ে কাটার চেপে ধরতেই—
-"বলছি! বলছি....প্লিজ....কেটো না....আমি বলছি!" আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল অন্তিকা।