আধফোটা প্রেমের ফুল

পর্ব - ১৬

🟢

-"এইগুলো কি এনেছো তোমরা?"

পুরুষটির গর্জনে পুরো ঘরটা যেন কেঁপে উঠলো। সাথে সাথে কেঁপে উঠলো সামনে দাঁড়ানো দুইজন।

কাঁপা গলায় দাঁড়ানো সেই ব্যক্তিটি বলল—

-"আমরা বুঝতে পারিনি, ওয়াসিফ আয়মান আমাদের সঙ্গে ট্রিকস করবে।"

পুরুষটির চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। গর্জে উঠল আবার—

-"কি জানিস তুই জানোয়ারের বাচ্চা! এই ডকুমেন্টস যে ভুল ফর্মুলার, তোরা যাচাই করিস নি? সারাদিন শুধু ফালতু কথা!"

তাদের মাথা নিচু, চোখে অনুশোচনা। ওরা সত্যিই বুঝতে পারেনি, ওয়াসিফ ভুয়া ফর্মুলা সামনে রেখে আসলটা গোপনে লুকিয়ে রেখেছে।

উন্মত্ত ক্রোধে সেই পুরুষ আবার চিৎকার করলো—

-"এতটা ধূর্ত কেউ কিভাবে হতে পারে? একটার পর একটা চাল, কোনোটাই সফল হতে দেয় না। কিছু করার আগেই যেন বুঝে ফেলে সবকিছু। আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ আগেই জানে! কিছুতেই তাকে টেক্কা দিতে পারছি না!"

সে নিজের চুল টেনে ধরল, চিৎকার করতে লাগল পাগলের মতো।

নিচু গলায় অনুনয় করে বলল সেই দুইজন—

-'আমাদের আরেকটা সুযোগ দিন....এইবার আমরা সফল হবোই।"

সে অগ্নি দৃষ্টিতে তাদের দিকে এগিয়ে এলো। পকেট থেকে পিস্তল বের করে ঠেকালো এক জনের কপালে।

ঠান্ডা কণ্ঠে বলল—

-"এইবার সফল হতেই হবে। না হলে....দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতে হবে তোদের।"

-----------------------

ওয়াসিফের দিনগুলো এখন দমবন্ধ করা ব্যস্ততায় ভরা। সব রিসার্চ আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে, শুরু থেকে, একদম গোড়া থেকে। সময় হাতে খুব কম, কারণ ফর্মুলা নিয়ে তাকে খুব শীঘ্রই ইতালি রওনা হতে হবে। অথচ একের পর এক আক্রমণ যেন থামছেই না। বাধ্য হয়েই এবার সব কিছু নিজের তত্ত্বাবধানে করছে সে। কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। সামান্য একটা ভুলেই পুরো মিশন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

এদিকে শান আর অন্তিকা এক অজানা আতঙ্ক আর দায়িত্বের ভারে বিধ্বস্ত। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে প্রকল্পের সবচেয়ে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এক চুল এদিক-ওদিক হলেও পুরো পরিকল্পনা ধসে পড়বে। তাই দম আটকে আসা সতর্কতা নিয়ে তারা কাজ করছে, প্রতিটি ধাপ যাচাই করে, নির্ভুলভাবে।

সময় যেন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে, আর সেই সাথে বেড়ে চলেছে চাপ, সংশয় আর অদৃশ্য হুমকি।

সবাই তখন নিজেদের কাজে মগ্ন। ঠিক সেই মুহূর্তেই ল্যাবে প্রবেশ করল উমাইরা ও লারা। একজন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ওয়াসিফকে জানাল তাদের আগমনের কথা। সব কাজ ফেলে ওয়াসিফ ছুটে এলো। যাওয়ার আগে শান ও অন্তিকাকে বলে গেল—

-"সব কিছু দেখে রেখো, যেন একচুলও এদিক-ওদিক না হয়।"

ওয়াসিফ উমাইরাকে নিয়ে আসে বাকিদের সাথে পরিচয় করাতে। সোফিয়া আর রুবাবের সামনে উমাইরাকে নিয়ে গিয়ে বলে—

-"উমাইরা, ওরা আমার টিমমেট, সোফিয়া ও রুবাব।"

রুবাব হেসে উঠে বলে—

-"উমাইরা তো আমাকে আগেই চেনে। আহা! ছোট থাকতে রাফসানকে যে দৌঁড়ানিটা দিলি, এখনো ভাবলে হাসি থামাতে পারি না!"

উমাইরা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।

ওদিকে লারা আর সোফিয়া কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তাদের মুখের অদ্ভুত দৃষ্টি দেখে রুবাব পুরো ঘটনাটা খুলে বলল। সবাই একসাথে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।

ওয়াসিফ, মাথা নিচু করে রাখা উমাইরার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের কোণে মুচকি হাসি নিয়ে

হঠাৎ লারা উমাইরাকে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে বলল—

-"বাবা, ছোটবেলা থেকেই আগলে রাখছিস নাকি, হুম?"

উমাইরা চোখ গরম করে তাকাতেই লারা একটু চুপসে গেল। তবে এক মুহূর্ত পরই আবার হেসে উঠল।

উমাইরা প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল—

-"ওয়াসিফ ভাই, শান ভাইয়া আর অন্তিকা আপু কোথায়? এত শব্দেও তো বের হচ্ছে না ওরা।"

সবাই মিলে তখন ওদের খোঁজ নিতে গেল।

ল্যাবের এক কোণে শান ব্যস্তভাবে কাজ করছিল। হঠাৎ পেছন থেকে ওয়াসিফ ডেকে উঠল—

-'তুই আমার সাইটে কি করছিস?"

শান ঘাবড়ে গিয়ে কাচুমাচু করে বলল—

-'আর দেখছিলাম কোনো কাজ বাকি আছে কি না, যেটা আমি করতে পারি, তাই আরকি!"

ওয়াসিফ হেসে বলল—

-"তা ঠিক আছে। এখন এসব বাদ দে, দেখি কে এসেছে।"

শান পেছনে তাকিয়ে উমাইরাকে দেখে অবাক। তারপর এগিয়ে এসে বলে—

-"কেমন আছো, ওয়াসিফের বডিগার্ড?"

উমাইরা লজ্জা পেয়ে বলল—

-"ভাইয়া, আপনারা সব সময় এমন লজ্জা দেন আমাকে। ছোটবেলার সব কথা এখনো মনে রাখতে হয় নাকি?"

সবাই আবার হেসে উঠল।

শান হেসে বলল—

-"পাগলি, আমরাতো মজা করি। আচ্ছা বাদ দাও, কখন এসেছিস?"

-"এই তো কিছুক্ষণ আগে। অন্তিকা আপু কোথায়, তাকে তো দেখছি না!"

-"ও একটু ওয়াশরুমে গেছে। ঐতো চলে এলো।"

অন্তিকা ফিরে আসতেই উমাইরা এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

-"কেমন আছো আপু?"

-"এই তো ভালো। তুমি কেমন আছো?"

-"আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।"

তবে অন্তিকার মুখে যেন একধরনের জড়তা ছিল।

উমাইরা সেটা বুঝতে পারল। তাই আর বেশি কিছু বলল না।

ওয়াসিফ তখন বলল—

-"আজ আর কাজ না। সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে যাচ্ছি। একটু রিল্যাক্স করি, ফ্রেশ মাইন্ডে কাজ ভালো হবে।"

--------------------

রেস্টুরেন্টে সবাই আড্ডায় মেতে উঠেছে। গল্প, হাসি, খাওয়া, মুহূর্তগুলো বেশ প্রাণবন্ত। লারা আর রুবাবের মধ্যে ভালোই ভাব জমেছে। উমাইরা হঠাৎ বলে—

-"আমি একটু ওয়াশরুমে যাচ্ছি।"

তার পেছন পেছন অন্তিকা-ও উঠে দাঁড়াল।

ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে উমাইরা দেখতে পেল, অন্তিকা ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল—

-"আপু, আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন নাকি?"

-"হ্যাঁ, কিছু কথা ছিল তোমার সাথে।" শান্ত সুরে জবাব দিল অন্তিকা।

-"কি কথা? বলেন।"

একটু দম নিয়ে অন্তিকা বলল—

-"ওয়াসিফ কি তোমাকে আমাদের ব্যাপারে কিছু বলেছে?"

উমাইরার মুখ থমকে গেল।

-"আমাদের ব্যাপারে? মানে?"

অন্তিকা সোজা বলল—

-"আমি আর ওয়াসিফ, আমরা একে অপরকে ভালোবাসি। তুমি যে ওকে ভালোবাসো, সেটা বুঝি আমরা সবাই। এজন্যই ও তোমাকে কিছু বলে না, যাতে তুমি কষ্ট না পাও। আমি শুধু চাচ্ছি তুমি যেন মিথ্যে আশায় না থাকো। তোমার কষ্ট আমার খারাপ লাগত, তাই বললাম।"

উমাইরার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। ঘূর্ণির মতো মাথা ঘুরে উঠলো, হোঁচট খেতে খেতে সে বেসিন ধরে দাঁড়ালো। "কি শুনছি আমি? তাহলে সবটাই....মিথ্যে?"

ওয়াসিফ ভাই....তার চোখ দিয়ে অঝোর নোনাজল ঝরতে লাগল। অন্তিকা চুপচাপ চলে গেল। উমাইরা সেটা টেরই পেল না।

হাত-মুখ ধুয়ে ধীরে ধীরে সে ফিরে এলো টেবিলে।

চোখ লাল, মুখে কোন হাসির ছায়া নেই। সোজা লারার দিকে তাকিয়ে বলল—

-"চলো, বাড়ি চল। অনেক রাত হয়েছে। বাসায় সবাই চিন্তা করবে।"

সবাই হতবাক। ওয়াসিফ চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল—

-"হঠাৎ? তুই তো একটু আগেও ঠিক ছিলি। শরীর খারাপ?"

উমাইরা কিছু বলল না। শুধু লারার হাত ধরে ব্যাগটা তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবার দৃষ্টি এবার ওদের দিকে।

শান তখন একবার চোখ তুলে অন্তিকার দিকে তাকাল।

অন্তিকা মাথা নিচু করে খাচ্ছে, মুখে কোন ভাবান্তর নেই। শান বুঝে গেল, কিছু একটা হয়েছে।

ওয়াসিফ আবার বলল—

-"চল, আমি তোদের পৌঁছে দেই।"

ঠিক তখনই অন্তিকা বলে উঠল—

-"না, ওটা সম্ভব না। আজ সারারাত ল্যাবে কাজ আছে। তুই যেতে পারবি না, ওয়াসিফ।"

উমাইরার পা থমকে গেল। এক মুহূর্ত সে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ঘুরে তাকিয়ে বলল—

-"প্রয়োজন নেই।"

তারপর লারার হাত ধরে হনহন করে বেরিয়ে গেল।

ওয়াসিফ স্থির। হতবাক। তার মাথায় যেন কুয়াশা। এতটুকু সময়ে কী এমন হলো? উমাইরা কেন এমন আচরণ করল?

চোখে চিন্তার ছায়া নিয়ে সে ফোনটা হাতে তুলে নিল।

গাড়ির চাবি নিয়ে উঠে দাঁড়াল।

অন্তিকা একাধিকবার ডাকল—"ওয়াসিফ! শুন..."

কিন্তু সে একবারও ফিরে তাকাল না। দ্রুত পায়ে সে উমাইরার পেছনে বেরিয়ে গেল।

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এসেই ওয়াসিফ দম নিয়ে হাঁপাতে থাকা উমাইরার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।

কণ্ঠে আগুনে শীতলতা—

-'গাড়িতে ওঠ।"

উমাইরা চুপ। মুখে একটাও শব্দ নেই, শুধু নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতে ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ওয়াসিফের চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লারা হতবাক। সে কিছুই বুঝতে পারছে না, এই কয়েক মিনিটে এমন কী ঘটল? ওয়াসিফ চোখের ইশারায় লারাকে নির্দেশ দিল—"গাড়িতে ওঠো।"লারা ধীরে ধীরে গিয়ে পিছনের সিটে উঠে বসল, চোখে সংশয়।

উমাইরা তখনও অনড়। এক পা-ও গাড়ির দিকে না এগিয়ে সে নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ওয়াসিফের ধৈর্য ফুরিয়ে যায়। একটুও সময় না নিয়ে সে সোজা কাঁধে তুলে নেয় উমাইরাকে।

-"ওয়াসিফ ভাই! কী করছেন!" উমাইরার কণ্ঠে বিস্ময়।

কোনো উত্তর নেই। উমাইরা হাত-পা ছুঁড়ে ছাড়িয়ে নিতে চাইলেও কিছুতেই সফল হলো না। ওয়াসিফ গাড়ির দরজা খুলে তাকে সিটে বসিয়ে দেয়। দরজা লাগিয়ে দেয় সজোড়ে।

নিজেও দ্রুত পাশের সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়।

গম্ভীর মুখ, দৃঢ় চোয়াল, তার চোখে যেন ঝড় ধেয়ে আসছে।

গাড়ির ভেতরে এক অস্বস্তিকর নীরবতা। সামনের সিটে ওয়াসিফ, পাশে চুপচাপ বসে উমাইরা। পেছনে বসে লারা, তার চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন—"কি এমন হলো হঠাৎ?"

রেস্টুরেন্টের সামনে তখন সবাই জড়ো হয়ে গেছে।

ওয়াসিফ কাঁধে করে উমাইরাকে গাড়িতে তুলে বসানোর দৃশ্যটা চোখের সামনে স্পষ্ট। সবার মুখে অবাক বিস্ময়, কেউ কিছু বলতে পারছে না।

অন্তিকার চোখ মুহূর্তেই আগুনে জ্বলে উঠল।

চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল, ঠোঁট দুটো সজোরে চেপে ধরা। হাতে থাকা পার্সটা এমনভাবে মুঠো করে ধরল যেন এখনই কিছু ভেঙে ফেলবে। তার চোখে শুধু একটাই কথা—"উমাইরা! সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে!"

শান তখন পিছন থেকে এক পা এগিয়ে এসে তার কাঁধে আলতো হাত রাখল। চোখে ছিল সতর্ক ইশারা—

"শান্ত হও অন্তিকা, এখন কিছু বলার সময় না।" অন্তিকা চোখ নামিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু তার ভেতরে এক ভয়ানক ঝড় বইছে। সবার সামনে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও, এই মুহূর্তেই সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

----------------------

রহমান ভিলার সামনে এসে গাড়ি থামলো। লারা চুপচাপ নেমে পড়ল। উমাইরা নামার আগেই ওয়াসিফ ওর কব্জি চেপে ধরল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লারার উদ্দেশ্যে ঠান্ডা গলায় বলল—

-"ভেতরে যাও।"

লারাও এক আদেশে সাড়া দিয়ে ঘরের দিকে হাঁটলো। উমাইরা রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল ওয়াসিফের দিকে, কিন্তু ওয়াসিফ পাত্তা দিল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে গাড়ি চালাতে লাগল, যেন কিছুই ঘটেনি।

গাড়ি থামল এক নির্জন জায়গায়। চারপাশে নিঃসাড় নিস্তব্ধতা। শুধু ঝিঝি পোকার টানাটানা ডাক আর রাতের পাখিদের অস্পষ্ট আওয়াজ। দিগন্ত জুড়ে অন্ধকার আর গা ছমছমে জঙ্গল। গাড়ির ভেতরে পিনপতন নীরবতা। ওয়াসিফ এক ঝলক তাকালো পাশের সিটে বসে থাকা উমাইরার দিকে, মাথা নিচু, ঠোঁট কামড়ে ধরা। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে ওয়াসিফ সরাসরি বলল—

-"কি হয়েছে?"

উমাইরা চুপচাপ বসে থাকে। কোনো উত্তর দেয় না।

ওয়াসিফ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আবার বলল—

-"এতক্ষণ তো সব ঠিক ছিলি। হঠাৎ এমন করছিস কেন? কী হয়েছে, উমাইরা?"

উমাইরা ধীরে মাথা তোলে। চোখ দুটো লাল, কোণায় জমে থাকা কষ্টের অশ্রু। ওয়াসিফের বুকটা হঠাৎ ধক করে ওঠে। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে উমাইরার সিটবেল্ট খুলে এক টানে তাকে কোলে তুলে নেয়।

অপ্রত্যাশিত স্পর্শে উমাইরা কেঁপে ওঠে। হাত দুটো ওয়াসিফের বুকের ওপর ঠেলে ধরে সে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করে।

ওয়াসিফ শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে—

-"আমার চোখের দিকে তাকা। এবার বল, কী হয়েছে?"

উমাইরার গলা কাঁপে, চোখ ছলছল করে উঠে। কান্নার গলা চেপে সে জিজ্ঞেস করে—

-"আপনি....আপনি অন্তিকা আপুকে ভালোবাসেন?"

এক মুহূর্ত স্তব্ধতা নেমে আসে। ওয়াসিফ যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, এই প্রশ্নটা ওর প্রিয় মানুষটা করছে।

মুখটায় বিরক্তির রেখা ফুটে ওঠে, কিন্তু রাগটা চাপা দিয়ে ধীরে বলে—

-"কে বলেছে তোকে এই কথা? তোর বুদ্ধি কি গাশ চড়াতে গেছে? তুই কি এতটাই বোকা যে বুঝিস না আমি কাকে ভালোবাসি?"

তার কণ্ঠে আগের মতো ধমক ছিল সাথে ছিল একরাশ অভিমান। ওয়াসিফের গলা খানিকটা উঁচু হলেও তাতে যে কম্পন ছিল, সেটা ঠিকই টের পেয়েছিল উমাইরা।

হয়তো রাগ নয়, ছিল একরাশ অভিমান, কিছুটা হতাশা।

ওয়াসিফ ধীরে হাত বাড়িয়ে উমাইরার থুতনিটা ধরে মুখটা একটু উঁচু করল। চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল—

-"তুই কি বুঝিস না, আমি তোকে পাগলের মতো ভালোবাসি?"

উমাইরা চমকে তাকালো। তাঁর চোখে বিস্ময় আর অভিমানের জল একসাথে। বাচ্চার মতো ভাঙা কণ্ঠে জবাব দিল—

-"কোনোদিন কি বলেছেন, যে বুঝবো?"

ওয়াসিফ মুহূর্তে নিজের উপরই চরম রাগ অনুভব করলো। দাঁতে দাঁত চেপে গলা নামিয়ে বলল—

-"তুইও তো আমাকে কোনোদিন বলিসনি, তুই আমায় ভালোবাসিস। আমি কীভাবে বুঝলাম?"

উমাইরা কোনো উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল, চুপচাপ। ওয়াসিফ একটু থেমে আবার বলল—

-"ভালোবাসা কথায় নয়, কাজে প্রকাশ পায়।

অনেকে মুখে বলে, ভালোবাসি, কিন্তু কাজে তার ছিটেফোঁটাও নেই। তুই কি আমার কাজেও এতদিনে কোনো প্রমাণ পাসনি?"

তার গলায় কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল একরাশ ব্যথা। একটা নিরব অন্ধকার গাড়ির ভিতর, বাইরে ঝিঝি পোকার ডাকের মতোই নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভালোবাসার না বলা সত্যিটা।

উমাইরা চুপ করে বসে আছে। মনের ভেতর তখন ঝড় বইছে। সত্যিই তো! ওয়াসিফ ভাই তো কখনো মুখে বলেনি, কিন্তু কাজেই বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে, সে আমাকে ভালোবাসে। তাহলে আমি কেন অন্তিকার কথায় এতটা বিশ্বাস করলাম? কেন তাকে কষ্ট দিলাম?

ভেতরে ভেতরে অনুশোচনায় পোড়া উমাইরা বাইরে থেকে স্থির, নিশ্চুপ। ওয়াসিফ এক নজর দেখে নিলো তাকে, তারপর আর কিছু বলল না। চোখ ঘুরিয়ে দিল জানালার দিকে। তার মুখে অভিমান জমে আছে, নীরব, অথচ তীব্র।

অবশেষে সেই নীরবতা ভাঙে। উমাইরা ভেতু ভাঙা গলায় বলল—

-"সরি।"

ওয়াসিফ ধীরে তাকালো তার দিকে। চোখে যেন একটা প্রশ্ন—"এত সহজে মাফ চাওয়া যায়?"

কিছু না বলেই আবার মুখ ফেরালো। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো।

উমাইরা একটু ধাক্কা খায় যেন। সে জানে, ওয়াসিফ রাগ করেছে। কিন্তু এই রাগের পেছনে ভালোবাসার দাবিও আছে। ধীরে নিজের দুই হাতে ওয়াসিফের মুখটা ঘুরিয়ে নেয় নিজের দিকে। চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট গলায় আবার বলল—

-"সরি। সত্যি খুব ভুল হয়ে গেছে। আমি....আমি বিশ্বাস করিনি, কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম। আপনাকে হারানোর ভয়। সরি, আর এমন করবো না। প্লিজ, এবারের মতো মাফ করে দিন।"

তবুও ওয়াসিফ নিশ্চুপ। কোনো উত্তর নেই। উমাইরার হাতটা ধীরে সরিয়ে নিলো নিজের মুখ থেকে। চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে রইল। চুপচাপ। যেন সমস্ত শব্দ হারিয়ে ফেলেছে।

উমাইরা কী বলবে, বুঝে উঠতে পারছে না। ভেতরে তার কান্না চেপে বসে আছে, কিন্তু মুখে কোনো শব্দ নেই। শেষমেশ সেও চুপ করে গেল। গাড়ির ভেতর আবার নেমে এলো নিঃশব্দ এক নীরবতা, যেখানে ভালোবাসা আছে, অভিমান আছে, কিন্তু কারও মুখে কোনো শব্দ নেই।

হঠাৎ অতি সূক্ষ্ম, নরম স্পর্শ ছোঁয়ে গেল ওয়াসিফের ওষ্ঠ জোড়ায়। এত দ্রুত, এত নরম যে, মুহূর্তের জন্যই যেন সময় থেমে গেল। ওয়াসিফ চোখ তড়াক তাকালো, জানার আগ্রহ আর বিস্ময়ে মিশ্রিত।

উমাইরা মাথা নিচু করে, লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না, তার হাত বারে বারে ওয়াসিফের শার্টের বোতাম খুঁটতে লাগলো।

ওয়াসিফ ধীরে ধীরে চোখের চশমা খুলে পাশে রাখল,

তারপরে উমাইরার কোমর ধরে এক টানে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো, যেন শুধু নিজের কাছে টেনে আনতে চায়। ওয়াসিফের তপ্ত নিশ্বাস উমাইরার মুখের ওপর পড়ছে। ওয়াসিফ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নেশালো গলায় বলল—

-"এটা কী করলি তুই?"

উমাইরা সেসময় চোখ মুড়ে ফেলে, মুখের অভিব্যক্তি মিশ্র লজ্জা আর অনিশ্চয়তার। কোনো শব্দ নেই, শুধু নিঃশ্বাসের গুঞ্জন ভেসে বেড়ায়।

ওয়াসিফ ধীরে শান্ত ভঙ্গিমায় বলল—

-"যেটা পারিস না, সেটা কেন করতে যাস?"

ওয়াসিফ আর কিছু বলল না। ওমাইরাকে কোনো সুযোগ দিল না কিছু বলার। তার ওষ্ঠ এক ঝাপটে ওমাইরার ওষ্ঠজোড়া ধরে ফেলল, নিজের ওষ্ঠ জোড়ার সাথে শক্ত করে মিলিয়ে নিল।

উমাইরা শার্টের কাপড় শক্ত করে ধরে, কাঁপছে অবিরত। ওয়াসিফের উগ্র স্পর্শে সে যেন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে, মন আর শরীর উভয়ই বেসামাল।

ওয়াসিফ উমাইরার ঠোঁট এমনভাবে আঁকড়ে ধরল, যেন পুরোটা নিজ মধ্যে শুষে নিতে চায়।

কিছুক্ষণ পর, উমাইরার ছটফট করতে শুরু করলে সে ছেড়ে দিল তাকে,তাঁর চোখে তখন অদ্ভুত এক আবেগ, একটা যুদ্ধের পর শান্তির প্রশান্তি।

উমাইরা হাপিয়ে উঠলো। আর কিছুক্ষণ ঐভাবে থাকলে যেন দম বন্ধ হয়ে যেত তার।

ওয়াসিফ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নিজের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে উমাইরার ভেজা ঠোঁট মুছতে মুছতে বলল—

-"আমার কাছে আসার আগে নিজেকে প্রস্তুত করে আসবি। হুট করে আমাকে কাছে ডাকবি না। তুই কাছে ডাকলে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না।"

আধফোটা প্রেমের ফুল পর্ব ১৬ গল্পের ছবি