আধফোটা প্রেমের ফুল

পর্ব - ১৮

🟢

অন্তিকার সঙ্গে শেষ কথা বলার পর, উমাইরা আর লারা চুপচাপ ফিরে আসে নিজেদের কক্ষে। অন্তিকাকে ফেলে আসে ঠিক যেমন নিঃশব্দে রাত ফেলে যায় ভোরের আগের অন্ধকার।

বারান্দায় বসে উমাইরা। নিস্তব্ধ চারপাশ। সামনে কুয়াশার মতো ঘন অন্ধকার, যেন ঠিক সেই অচেনা ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি, যা ওর চোখের ভেতর ছায়া ফেলেছে। ঠান্ডা বাতাস বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর, কিন্তু যেন অনুভব করার শক্তিটুকুও নেই আর তার ভেতর।

হঠাৎ পেছনে এসে লারা ওর কাঁধে হাত রাখে, উমাইরা পেছনে না ফিরে বলে উঠে, যেন বহুকাল ধরে জমে থাকা এক অপ্রকাশ্য কষ্টের চিরচেনা ভাষা খুঁজে পেয়েছে অবশেষে—

-"জানিস লারা, মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আসে শুধু ভাঙার জন্য, কোনো স্থায়িত্ব নেই, কোনো ভালোবাসাও না। প্রীতি, রাইসা, লামিয়া....ওদের মিথ্যে বন্ধুত্ব আমি ভুলিনি। ক্ষমা করেছি ঠিকই, কিন্তু অন্তর থেকে আর আপন করে নিতে পারিনি। তবুও ওরা কোনোদিন আমার ক্ষতি করতে চায়নি। কিন্তু অন্তিকা....সে তো ওয়াসিফ ভাইয়ের ছায়াসঙ্গী ছিল। কত বছরের বন্ধুত্ব, কত আস্থা, সবকিছু ভেঙে সে কিভাবে এমন ক্ষতির পথ বেছে নিতে পারল? হয়তো সফল হয়নি, কিন্তু সেই ইচ্ছেটাই আমাকে পোড়ায়।

জীবনে এমন কিছু মানুষ আসে, যারা শুধু ভাঙে, তাদের অস্তিত্বই যেন অভিশাপ হয়ে আসে।"

লারা চুপচাপ আকাশের পানে তাকিয়ে শুনছিল উমাইরার কথা। কণ্ঠে ছিল না কোনো অভিযোগ, তবুও সেই শব্দগুলো বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধে যাচ্ছিল।

সত্যিই তো, কেনো এমন বন্ধুর মুখোশ পরে কেউ কারো জীবনে আসে? উমাইরা আর ওয়াসিফ তো সবসময়ই বন্ধুত্বের মানে বুঝিয়েছে, ভরসা, নির্ভরতা, আত্মত্যাগ। তবু কেনো এমন বিশ্বাসভঙ্গ? কেনো এমন ছুরিকাঘাত? লারার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দিনগুলোর চিত্র। মাত্র পাঁচ বছর আগের কথা—

উমাইরা তখন সদ্য কানাডায় এসেছে। চারপাশ অচেনা, মুখগুলোও অজানা। নিজের মতো করে একা একাই সংগ্রাম করে যাচ্ছিল। একদিন, গভীর রাতে, লারা, একটা পথ দুর্ঘটনায় আহত, রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার ধারে পড়ে ছিল। কোনো দ্বিধা করেনি উমাইরা।

না চিনেও, না জেনেও, কোনো শঙ্কা না রেখে ছুটে এসেছিল তাকে বাঁচাতে। একটিবারও ভাবেনি, এটা কোনো ফাঁদ হতে পারে। অচেনা মেয়ের জন্য, অচেনা দেশে, উমাইরা যেন এক অদৃশ্য প্রহরী হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল।

সেদিন থেকেই লারা জানে, এই মেয়ে নিজের আপনদের জন্য হাসিমুখে জীবন দিতেও দ্বিধা করবে না। সেই দিনই সে পেয়েছিল জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বন্ধু। লারা উইলসন জানে, এক মুহূর্তও ভাববে না, যদি নিজের জীবন উমাইরার জন্য দিতে হয়।

ভাবনার গভীরতা থেকে বেরিয়ে এসে সে ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে উমাইরার সামনে। তার দুই হাতে উমাইরার মুখখানা জড়িয়ে ধরে গভীর চোখে চোখ রেখে বলে, লারার চোখে ভাসছে হাজারটা স্মৃতি, বুকের গভীরে জ্বলে উঠেছে এক অনামা প্রতিজ্ঞার আলো। সে উমাইরার মুখখানা নিজের দুই হাতে ধরে, চোখে চোখ রেখে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে—

-"তোকে নিয়ে কিছু বলার আগে, একটা কথা আজ চিরদিনের জন্য বলেই রাখি, তুই আমার কাছে কেবল বন্ধু না, তুই আমার প্রিয়তমা যুদ্ধসঙ্গী। যে লড়ে, বাঁচায়, ছায়ার মতো পাশে থাকে। সেদিন, যেদিন আমার জন্য তুই ছুটে এসেছিলি, সেইদিনই বুঝেছিলাম, দুনিয়ার সব সম্পর্ক ভেঙে গেলেও, তোর হাতটা আমায় ছেড়ে যাবে না। তোর মতো মানুষ হারালে আমি শুধু একটা বন্ধু হারাব না, আমি নিজের অস্তিত্বের একটা বড় অংশ হারাব। তুই যদি কখনো ভেঙে পড়িস, সব ছেড়ে দিতে মন চায়, তাহলে শুধু একবার আমার চোখে তাকাস, এই চোখের ভেতর যে ভরসা আছে, সেটা তোকে আবার দাঁড় করিয়ে দেবে।

আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি উমাইরা, এক মুহূর্তও না ভেবে নিজের জীবন তোর জন্য দিয়ে দিতে রাজি আছি।

কারণ তোর মতো মানুষ, জীবনে একবার আসে, আর সারা জীবন জায়গা করে নেয়। প্রতিটা মানুষের ভেতরেই একেকটা পশু বাস করে, জানিস তফাৎটা কোথায়?"

উমাইরা একটু কপাল কুঁচকে, প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকায় লারার দিকে। লারা হালকা হেসে বলে,

-"তফাৎটা শুধু একটাই, কে কখন সেই পশুটাকে জাগিয়ে তোলে। আমার মাঝেও একটা হিংস্র জন্তু ঘুমিয়ে থাকে। আমার আপনজন, আমার পরিবার, তোরা যদি কেউ একটুও ব্যথা পাস, যদি তোদের গায়ে কেউ একটা ফুলের টোকাও দেয়, আমি থেমে থাকব না। যেমন এখন তুই থেমে থাকছিস না, ওয়াসিফ ভাইয়ের জন্য যেভাবে নিজেকে আগুনে ফেলে দিচ্ছিস। তুই জানিস, ওয়াসিফ ভাইও তোকে ঠিক এভাবেই ভালোবাসে। সে-ও একদিন পশু হয়ে উঠেছিল প্রীতিকে প্রায় মেরেই ফেলেছিল।

তাই বলছি, আমাদের ভেতরে ভালো-মন্দ দুইটাই থাকে। কে কোনটা বেছে নেবে, সেটা তার সিদ্ধান্ত।

প্রীতি, রাইসা, লামিয়া, ওরা খারাপ ছিল না। তোর ক্ষেত্রে ওরা একবার খারাপের পথ নিয়েছিল, কিন্তু পরে নিজেদের ভুল বুঝে, ফিরে এসেছিল। তুই ওদের ক্ষমা করেছিলি, কারণ ওদের বিবেক ছিল। তাই তারা সুযোগ পেয়েছিল মানুষ হবার।

কিন্তু অন্তিকা....ভালোবাসলেও সে পায়নি। তবু সে ভালো চাইতে পারেনি। বরং তোর, আর ওয়াসিফ ভাইয়ের জীবন নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছে।

সে নিজের ভেতরের হিংস্র জন্তুটাকেই বেছে নিয়েছে।

নিজেকে পাল্টাবার সামান্য বিবেকটুকুও তার নেই।

তাই তাকে ক্ষমা করাটা হবে অন্যায়। কারণ সেই ক্ষমাই তাকে আরও হিংস্র করে তুলবে। এখন আমাদের উচিত তাকে প্রাপ্য শাস্তি দেওয়া না প্রতিহিংসা থেকে,

বরং সুবিচারের স্বার্থে। আর একটা কথা মনে রাখ, তুই ভাবছিস ওয়াসিফ ভাই চুপ করে আছে? সে কিন্তু কখনোই নিঃশব্দে হারে না। ওর চুপ থাকাটা আসলে ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। তুই দেখিস, সে কিছু একটা করছেই আমরা শুধু এখনো জানি না।"

লারার কথা শেষ হতেই বারান্দায় কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। শুধু বাতাসের ঝিরঝিরে শব্দ, দূরের গাড়ির হালকা গুঞ্জন আর গাছের পাতার হালকা দুলুনি যেন এই দুই বন্ধুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।

উমাইরা চোখ বন্ধ করে একটু সময় নেয়। তার বুকের ভেতর যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা কান্নাগুলো একটু একটু করে প্রশমিত হতে শুরু করেছে। তারপর ধীরে ধীরে সে চোখ মেলে লারার দিকে তাকায়। কণ্ঠে শান্ত অথচ দৃঢ় এক রেশ—

-"তুই জানিস লারা, আমি কাঁদিনি। আমি কখনোই কারো সামনে কাঁদি না। কিন্তু আজ তোর কথা শুনে, মনটা হালকা লাগছে। আমি সবকিছু একা সামলাতে গিয়ে ভুলে গেছি, আমারও অধিকার আছে ভেঙে পড়ার, আমারও অধিকার আছে কারো কাঁধে মাথা রাখার। তোকে পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ, আজ আমি বুঝলাম, একা লড়াই করার মানে শক্তি না, সঠিক সঙ্গী নিয়ে লড়াই করাটাই আসল শক্তি।"

(একটু বিরতি নিয়ে নিচু গলায় বলে)

-"তুই ঠিক বলেছিস, অন্তিকার মধ্যে সেই ‘বিবেক’টা নেই। ওকে ছেড়ে দিলে ও আবার ফিরে আসবে, আরও হিংস্র, আরও বিষাক্ত হয়ে। তাই এবার সময় এসেছে,

আমি শুধু প্রতিক্রিয়া দেখাবো না,আমি নিজেই চালক হবো এই খেলার। আর আমি ওয়াসিফ ভাইয়ের পাশে থাকব, যেমন ও আমার পাশে ছিল, নিঃশব্দে, নিঃস্বার্থে।"

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। চোখেমুখে কঠোর এক প্রশান্তি। সেই শান্ত ভঙ্গির আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রতিজ্ঞা।

-"চল, সময় হয়েছে সত্যি আর মিথ্যার মুখোমুখি হবার।

এবার অন্তিকার রূপটা সবাইকে দেখাতেই হবে।"

-----------------------

আজ অয়ন ও প্রীতিরা ফিরে এসেছে। এহসান, স্নিগ্ধা, মেহরাব ও নিধী এয়ারপোর্টে গিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে তাদের রিসিভ করে নিয়ে এসেছে।

রহমান ভিলায় যেন খুশির হাওয়া বইছে—

বাড়ির প্রতিটা ছেলেমেয়ে একত্র হয়ে বসে আছে অয়ন ও প্রীতিকে ঘিরে। উচ্ছ্বাস, হাসি আর গল্পে মুখর চারপাশ।

ঠিক সেই সময়ে সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করল ওয়াসিফ। এই দৃশ্য চোখে পড়তেই কর্কশ কণ্ঠে, উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠল—

-"তোদের কি বুদ্ধি-শুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে?

এতটা পথ জার্নি করে এসেছে ওরা, একটু বিশ্রাম নিতে না দিয়ে সবাই ঘিরে ধরেছিস? যা, সবার যার যার রুমে যা। কালকে অনেক সময় আছে, তখন আড্ডা দিস।"

ওয়াসিফের কঠিন কথায় মুহূর্তেই সবাই চুপচাপ হয়ে গেল। তারপর কেউ কিছু না বলে, ধীরে ধীরে যার যার রুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।

রাতের খাবারের সময় সবাই আবার একসাথে জড়ো হলো। হালকা গল্প, হেসে-খেলে কাটল পুরো ডিনার টাইম। আলাপে-খাবারে মিলিয়ে সেই মুহূর্তগুলো হয়ে উঠল আরও একটু ঘনিষ্ঠ, আরও একটু আনন্দময়।

সবাই যার যার ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে। শেষদিকে এল উমাইরা আর লারা, তাদের ঠিক পেছনেই ওয়াসিফ। ঘরে ঢোকার মুহূর্তে ওয়াসিফ হঠাৎ উমাইরাকে লক্ষ্য করে শীতল কণ্ঠে বলল—

-"ঘরে আয়, জরুরি কথা আছে। এখনই।"

উমাইরা একবার লারার দিকে তাকাল। চোখে ইশারা করে বলল, "তুই যা, আমি আসছি।" লারা পরিস্থিতি বুঝে নিজের ঘরে চলে গেল। উমাইরা ধীরপায়ে ওয়াসিফের কক্ষের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ওয়াসিফ খাটের ধারে বসে, দুই হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। তার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরা, মুখ নিচের দিকে।

উমাইরা গিয়ে তার ঠিক সামনে দাঁড়াতেই, ওয়াসিফ একই ভঙ্গিতে, মাটির দিকে তাকিয়েই বলল—

-"অন্তিকা কোথায়, উমাইরা?"

প্রশ্নটা যেন হাওয়ার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। উমাইরা চোখ বড় করে তাকাল ওর দিকে। স্পষ্ট বোঝা যায়, ওয়াসিফ সব জানে। আর তাই ভণিতা না করে, চোখে স্থিরতা এনে শান্ত গলায় বলল—

-"আমার কাছেই আছে। কেন জানতে চাইছেন?"

-"ওয়াসিফ নিঃশব্দ কিছুক্ষণ। তারপর—

-"ওকে ছেড়ে দে।"

-"ও ল্যাবে আগুন লাগিয়েছে। ওকে এখন ছেড়ে দিলে, আবার হামলা করবে, আরও হিংস্রভাবে।"

-"জানি আমি।"

-"জানেন? তবু কিছু বলেননি কেন?"

ওয়াসিফ এবার মুখ তোলে না, কিন্তু তার কণ্ঠে ভার—

-"আমার ফর্মুলা ইতালিতে পাঠাতে হবে। ওরা আমার নজরের ভেতরে আছে বলেই এখনো কিছু করতে পারেনি। আমি যদি এখন কিছু বলি, ওরা গা-ঢাকা দেবে। চোখের আড়ালে গেলে আমি আর কিছু করতে পারব না। তাই এখন নয়।"

-"তারপর?"

-"তারপর, যা করণীয়, সবই করব।"

-"অন্তিকা জানে আমি সব জেনে গেছি। ওকে ছাড়া এখন রিস্ক হবে।"

ওয়াসিফ চুপচাপ হেটে গিয়ে দাঁড়ায় জানালার পাশে। বাইরে রাতের অন্ধকার আকাশে । ঘরের ভেতর নিঃশব্দতা যেন কিছু একটা বলার অপেক্ষায়।

উমাইরা ধীরে এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ নিঃশব্দ থেকে হঠাৎ নরম গলায় বলল—

-"আপনি জানেন, আমি এসব কেন করছি?"

ওয়াসিফ তাকাল না। তবুও বুঝতে পারল, উমাইরার কণ্ঠে রাগ নেই, আছে একটা দীর্ঘশ্বাসের মত শান্ত অভিমান।

-"ঠিক সেই কারণেই, যেই কারণে আপনি একদিন প্রীতিকে মৃত্যুর খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।"

শব্দগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু গর্জে উঠল না। বরং নেমে এল এক ভারি নিঃস্তব্ধতা। ওয়াসিফ এবার ধীরে মুখ ফেরাল। চোখে এক ধরণের অবিশ্বাস, আর মনের ভিতরে একটা কেঁপে ওঠা।

-"তুই জানলি কিভাবে?"

শব্দটা বেরোল, কিন্তু কণ্ঠটা যেন নিজের কাছেই অপরিচিত ঠেকল তার।

উমাইরা হালকা হাসল, একটু ক্লান্ত ভঙ্গিতে।

-এহসান ভাই সব বলেছে আমাকে। কেমন করে আপনার ভেতরের মানুষটা একদিন হারিয়ে গিয়েছিল তা-ও।"

এক মুহূর্তে চোখাচোখি হলো। দুজনেই জানে, এই কথাগুলো অভিযোগ নয়, বরং সেই গভীর জায়গা থেকে উঠে আসা যন্ত্রণা, যা শুধু কাছের মানুষের কাছেই বলা যায়। একটা দমকা নীরবতা।

উমাইরা হঠাৎ বলে ওঠে—

-"আপনি জানতে চাইবেন না, আমি কিভাবে এত কিছু জানলাম, করলাম?"

ওয়াসিফ এবার ধীরে মুখ তোলে। উঠে দাঁড়িয়ে উমাইরার একদম সামনে এসে থামে। চোখে অভেদ্য স্থিরতা, ঠোঁটে হালকা ব্যঙ্গমিশ্রিত প্রশ্রয়—

-"কি জানতে চাচ্ছিস? কিভাবে চারজন হিটম্যান দিয়ে ওকে অপহরণ করলি? কিভাবে পাঁচ বছর লারার মাফিয়া বাবার অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছিস?"

উমাইরার মুখ কঠিন হয়ে যায়।

-"আপনি....এসব জানলেন কিভাবে?"

-"উমাইরা সম্পর্কিত প্রতিটি কাহিনি, প্রতিটি ছায়া, এই ওয়াসিফের নখদর্পণে।"

একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে উমাইরা। অনেকটা সময় কেউ কোনো কথা বলে না। নীরবতা যেন কথা বলে। শেষমেশ উমাইরা বলে—

-"ফর্মুলা কবে পাঠাবেন?"

-"আর চার দিন পর।"

-"ঠিক আছে....তাহলে আমি যাই।"

ওয়াসিফ মাথা নাড়ে সম্মতির ভঙ্গিতে।উমাইরা ধীর পায়ে কক্ষ ছাড়ে।

---------------------

চার দিন পর—

আজ সেই দিন, যেদিন ফর্মুলা ইতালিতে পাঠানোর কথা। প্রস্তুতি সম্পন্ন। রুবাব ও সোফিয়া তৈরি ইতালির উদ্দেশে রওনা হওয়ার জন্য। কিন্তু শান ও অন্তিকার কোনো খোঁজ নেই। উমাইরা আগেই অন্তিকার ফোন থেকে একটি মেসেজ পাঠিয়েছিল—"আমি অসুস্থ, আজ আসতে পারব না।" কিন্তু আজকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে অনুপস্থিতি? ওয়াসিফ যদিও চিন্তিত হয়নি। কারণ সে জানে, অন্তিকা কোথায়।

সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। সবাই তৈরি। গাড়ির সারিতে ব্যস্ততা, চেহারায় চাপা উত্তেজনা। ওয়াসিফ একাই একটি গাড়িতে। শান জানিয়ে দিয়েছে, সে সরাসরি এয়ারপোর্টে দেখা করবে। অন্যদিকে, রুবাব ও সোফিয়া শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে গাড়ি পরিবর্তন করেছে। তারা অন্য রুটে, আলাদা গাড়িতে রওনা হয়েছে।

নগরীর উপর নামে নিকষ কালো রাত। তবু রাত বলে কিছু বোঝা যায় না, আলোকিত বিল্ডিং, ঝলমলে ল্যাম্পপোস্ট, তীব্র হর্ন, আর গাড়ির হেডলাইটে ঝলসে যাওয়া রাস্তাগুলো যেন এক যান্ত্রিক জ্যোৎস্নার রাজ্য। রাতের শহর ঘুমায় না, শুধু গতি বাড়ায়।

ওয়াসিফের জিপ ছুটে চলছে হাইওয়ের বুক চিরে। হঠাৎই তার চোখে পড়ে, দুইটি কালো রঙের গাড়ি তাকে অনুসরণ করছে। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও, কয়েক মিনিট পর্যবেক্ষণ করতেই সন্দেহ নিশ্চিত হয়।

গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয় ওয়াসিফ। কিন্তু তাতেও তারা পিছিয়ে পড়ে না। বরং এক সময় দুই পাশ থেকে ঘিরে ফেলে তার জিপটিকে। হাইওয়েতে তখন তিনটি গাড়ি সমান্তরাল রুদ্ধশ্বাস দৌড়ে চলছে, যেন কোনো নিঃশব্দ লড়াই শুরু হয়েছে। ওয়াসিফ পরিস্থিতি বুঝে, হঠাৎই এক নির্জন রাস্তায় মোড় নিয়ে পাল্টে ফেলে রুট।

কিন্তু....সেই দুই গাড়িও থামে না। ছায়ার মতো তারা পেছনে ছুটে চলে, ঠিক ওয়াসিফের গতিপথ আঁকড়ে।

শহরের কোলাহল পেছনে পড়ে যায়। সামনে এখন শুধু অন্ধকারে নিমগ্ন রাস্তা, আর এক অজানা সংঘর্ষের অপেক্ষা।

তিনটি গাড়ি এসে থামে এক নির্জন, খোলা মাঠের মতো স্থানে।দুটি গাড়ি দুই পাশে, মাঝখানে ওয়াসিফের জিপটি। যেন এক নিঃশব্দ ফাঁদ। চারপাশে নীরবতা, কেবল ইঞ্জিনের গম্ভীর গর্জন।

হঠাৎ, দুই পাশ থেকে গাড়ি ছুটে আসে, যেন মুহূর্তেই পিষে ফেলবে মাঝখানের নিশানা। ওয়াসিফের মনোযোগ ভেদ করে এক অদ্ভুত বিষয় তার চোখে

পড়ে, দুই গাড়ির মধ্যে শুধুমাত্র একটি গাড়িই দ্রুতগতিতে তার দিকে ছুটে আসছে, অন্যটি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে।

এখন সামনে ছুটলে পড়বে খাদে। পেছনে নিলে ধাক্কা খাবে দ্বিতীয় গাড়ির। যেন প্রতিটি পথ বন্ধ।

দু'চোখে হিসাব কষে ওয়াসিফ ভাবছে,গাড়ি পেছন দিকে নিতে হবে। কিন্তু ঠিক তখনই, নিঃশব্দ সেই দ্বিতীয় গাড়িটিও ইঞ্জিন গর্জন করে এগিয়ে আসে।

দুটি গাড়ি, দুটি দিক থেকে, যেন একসাথে মৃত্যুর ফাঁদে ঠেলে দিতে চলেছে ওয়াসিফকে। একটির মুখ প্রায় ঠেকেছে ওয়াসিফের গাড়িতে, আরেকটি সবে গতি তুলছে, মুহূর্তটাই যথেষ্ট তাকে থমকে দিতে।

তখনই, একটি অজানা গাড়ি ঝড়ের গতিতে ছুটে আসে পাশ দিক থেকে! বিকট শব্দে ধাক্কা মারে সেই গাড়িটিকে, যেটি ওয়াসিফের দিকে ধেয়ে আসছিল।

ধাক্কা এতটাই তীব্র যে গাড়িটি ছিটকে গিয়ে বহু দূরে উল্টে পড়ে যায়। চারপাশে ধুলোর ঘূর্ণি।

এই আকস্মিক আঘাতে হতভম্ব হয়ে থেমে যায় অপর গাড়িটিও। নীরবতা ভেঙে শুধু শোনা যায়, কারো গলা শ্বাস নিচ্ছে, জীবিত, রুদ্ধ, প্রস্তুত।

আধফোটা প্রেমের ফুল পর্ব ১৮ গল্পের ছবি