সময় যত গড়াতে থাকে, এক্সিবিশন হলে মানুষের আগমন ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। চারদিকে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রেস মিটিং চলছে, আর সেখানেই আছে উমাইরা, উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে। এদিকে লারার বাবা এসে পৌঁছেছেন, আর ওয়াসিফ তাঁর পরিবারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন সৌজন্য ও শ্রদ্ধার সাথে।
অন্যদিকে, অয়ন ও প্রীতি একসঙ্গে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি চিত্রকর্ম অবলোকন করছে। শিল্পের নিখুঁত কারিগরি ও গভীর আবেগে তারা বারবার বিমুগ্ধ হয়ে পড়ছে। হঠাৎ, পেইন্টিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে অয়ন প্রীতির দিকে তাকিয়ে বলল—
-"দেখেছো, আমাদের প্রতি অভিমান, ক্ষোভ, সবটুকুই ক্যানভাসে রং-তুলির ছোঁয়ায় কী অপূর্বভাবে ফুটিয়ে তুলেছে! আমার বোনটা খাঁটি সোনা। অন্য কেউ হলে হয়তো প্রতিশোধ নিতো, কিন্তু সে তা করেনি। বরং নিজেকে নিঃশব্দে গুটিয়ে নিয়ে নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছে। এমন একটা বোন পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের বিষয়।"
প্রীতির চোখে জল চিকচিক করছিল। মৃদু কণ্ঠে বলল—
-"তুমি ঠিকই বলেছো। যেখানে আমাদের সময় ছিল স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলার, সেখানে আমরা ঈর্ষার বিষে নিজেদের কলুষিত করেছিলাম। কেনো সবাই উমাইরাকে চায়, এই প্রশ্নে ওকে কত অবজ্ঞা করেছি! অথচ ওর কাজই ছিল এমন, যা সম্মানের দাবিদার। এই যে দেখো, আমাদের মতো করে ও জীবন থেকে ছিটকে যায়নি, বরং নিজের পরিচয়কে সুদৃঢ় করেছে। আজ আমি তোমার স্ত্রী, কিন্তু নিজের কোনো স্বতন্ত্র পরিচয় নেই। অথচ উমাইরা আজও প্রমাণ করে চলেছে কেন সে ব্যতিক্রম। এ গর্ব যে আমরা তার আত্মীয়, এই রক্তের বাঁধনই বড় পাওয়া।"
অয়নের কণ্ঠে অনুরাগ মিশে যায়—
-"তোমার পথ এখনও শেষ হয়ে যায়নি প্রীতি। চাও তো, আজও তুমি নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারো।"
-"না অয়ন, এখন আর সে ইচ্ছে নেই। এখন শুধু সংসার আর তোমাকে নিয়ে বাঁচতে চাই।"
-"যেটা তুমি চাও, সেটাই হবে। আমি তোমার পাশে আছি, সবসময় থাকবো।"
প্রীতি একচিলতে হাসি দিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। অয়ন এক হাত বাড়িয়ে তাকে আপন করে টেনে নেয় বুকে। প্রীতি মাথা রেখে দেয় অয়নের কাঁধে। তাদের চোখ সামনের পেইন্টিং গুলোর দিকে। প্রতিটা ছবি যেন কথা বলছে, ভালোবাসার, পুনর্মিলনের, প্রাপ্তির।
নিজেদের পারিবারিক চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে স্নিগ্ধা চোখ মেলে তাকিয়ে বলে উঠল—
-"দেখুন না মেহরাব ভাই, আপুই কী সুন্দর করে এঁকেছে আমাদের পরিবারটাকে!"
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মেহরাব চুপচাপ পেইন্টিং দেখছিল। স্নিগ্ধার কথায় তাঁর দৃষ্টি ঘুরে আসে, কিন্তু "ভাই" শব্দটা শুনতেই কপালের মাঝখানে ভ্রু কুঁচকে যায়। স্নিগ্ধা কোনো সাড়া না পেয়ে মৃদু বিস্ময়ে তাকায় তাঁর দিকে।
-"কী হয়েছে? কপাল কুঁচকে রেখেছেন কেনো?"
মেহরাব ধীরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—
-"আমি তোমার ভাই?"
স্নিগ্ধা নির্দ্বিধায় হেসে বলল—
-"হ্যাঁ, ফুপাতো ভাই তো!"
-"তাহলে তোমার হবু স্বামীকে কী বলে ডাকবে?" কণ্ঠে চাপা ক্ষোভ, দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলে ওঠে মেহরাব।
স্নিগ্ধা বুঝতে পারে কী ভুলটাই না করে ফেলেছে! জিভ কামড়ে মাথা নিচু করে নেয়। মেহরাব ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে তার দিকে। স্নিগ্ধা ভয়ে কাতর পায়ে পিছু হটে দেয়ালের গায়ে এসে ঠেকে। মেহরাব দেয়ালে এক হাত রেখে, অন্য হাতে কাপতে থাকা স্নিগ্ধার মুখ তুলতে গিয়ে বলে—
-"ভাই বলার শাস্তি বিয়ের পর দেব। এখন বলো তো, এই মুহূর্তে তোমার সঙ্গে কী করা যায়?"
স্নিগ্ধার শ্বাস কেঁপে ওঠে। চারপাশে মানুষের ভিড়, পরিবারও আছে আশেপাশেই, লজ্জায়, সংকোচে গুটিয়ে যায় সে। শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে ফিসফিস করে বলে—
-"সবাই আছে এখানে। বাড়ির লোক দেখলে ভুল বুঝবে।"
মেহরাব শান্ত কণ্ঠে বলে—
-"এটা বিদেশ। কেউ তাকাচ্ছে না। আর আমাদের পরিবার? তারা তো সবই জানে, এখন আর ভাবার কিছু নেই।"
স্নিগ্ধা অনুনয়ভরে বলে—
-"তবুও, দয়া করে সরুন!"
-"একটা কথা বলো, আবার কখনও ‘ভাই’ বলে ডাকবে?"
স্নিগ্ধা মাথা নেড়ে না সূচক ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু মেহরাব তখনও তার মুখ ছেড়ে সরে যায়নি। বরং তার উড়ে আসা এক গোছা চুল ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দেয়। মেহরাবের নিশ্বাস পড়তেই কেঁপে ওঠে স্নিগ্ধা। দ্রুত ঠেলে সরিয়ে মেহরাবের কাছ থেকে দৌঁড়ে সরে যায়।
পেছনে দাঁড়িয়ে মেহরাব নিজের মনে বিড়বিড় করে—
-"আর কতদিন পালাবে এভাবে? শেষমেশ তো তোমাকেই বন্দিনী করবো, আমার সুভদ্রা!"
নিধী আর এহসান একটি অপরূপ পেইন্টিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে। পেইন্টিংটিতে আঁকা আছে দুটি ছোট্ট শিশু, একটি ছেলে আর একটি মেয়ে, একসাথে বসে আছে একটা পাতাঝরা গাছের নিচে। চারপাশে উষ্ণ আলো, শরতের কোমল রং, যেন স্মৃতিমাখা কোনো বিকেল।
নিধী হঠাৎ হেসে বলে—
-"ওই ছবির ছেলেটা ঠিক আপনার মতো দেখতে। একইরকম গম্ভীর মুখ করে বসে আছে!"
মেহরাব ভ্রু কুঁচকে বলে—
-"আমি গম্ভীর? তুমি তো সেই মেয়েটার মতো, চোখে যেন সবসময় দুষ্টু কিছু করার প্ল্যান!"
নিধী হালকা ধাক্কা দেয় মেহরাবের কাঁধে—
-"তাহলে আমরা কি সেই পেইন্টিংয়ের মতো ছোটবেলার প্রেমিক-প্রেমিকা?"
মেহরাব একটু হেসে, নিধীর দিকে তাকায়—
-"হয়তো....কিন্তু এখনকার আমরা তো একটু বেশি ঝগড়াটে, তাই না?"
নিধী চোখ গোল করে—
-"ঝগড়াটা সবসময় আপনি শুরু করেন!"
-"আর তুমি শেষ করো!"
দুজনেই হেসে ফেলে। চারপাশে মানুষের ভিড়, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, আলো-ছায়ার খেলা, তাদের যেন কিছুই স্পর্শ করছে না। পেইন্টিংটা হয়ে উঠেছে একটা আয়না, যেখানে তারা নিজেরা নিজেদের ছোটবেলার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাচ্ছে। তাদের খুনসুঁটি চলতেই থাকে, ক্যানভাসের নিঃশব্দ গদ্যে গাঁথা হয়ে যায় আরেকটা গল্প, এহসান আর নিধীর গল্প।
উমাইরা প্রেস মিটিং শেষ করে তাড়াতাড়ি বাবা-মায়ের কাছে আসে। দেখেন, লারার বাবা এসে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁকে দেখে উমাইরা একটু চমকে গিয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে বলে—
-"হাউ আর ইউ আঙ্কেল?”
-"আই’ম ফাইন, সুইটহার্ট। হাউ আর ইউ? আর ইউ এনজয়িং ইয়োর সাকসেস?"
-"ইয়েস আঙ্কেল। বাট মোস্ট ইমপোর্টেন্টলি, মাই হোল ফ্যামিলি ইজ হিয়ার টুডে।"
-"ইয়েস, ইট ওয়াজ নাইস মিটিং ইয়োর ফ্যামিলি।"
-"হু ইন্ট্রোডিউসড ইউ গাইজ?"
-"ওয়াসিফ।"
-"হাউ ডু ইউ নো হিম, আঙ্কেল?"
-"হোয়াট আর ইউ সেইং, মাই চাইল্ড? ইট ওয়াজ দিস গাই হু অ্যাকচুয়ালি অ্যাস্কড মি টু লুক আফটার ইউ। হোয়েন ইউ ক্যাম টু কানাডা, হি কন্ট্যাকটেড মি অ্যাবাউট ইউ। হি ইজ এ ভেরি গুড সায়েন্টিস্ট অ্যান্ড এ ফ্রেন্ড অব দা সিসিলিয়ান মাফিয়া। আই হ্যাড এ কনফ্লিক্ট উইথ দেম, অ্যান্ড ওয়াসিফ ম্যানেজড ইট সো ওয়েল। দ্যাট’স হাউ আই নো হিম।"
উপস্থিত সকলেই লারার বাবার কথা শুনে একেবারে বিস্ময়ে থমকে যায়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওয়াসিফের দিকে। আর লারার বাবা ধীরে ধীরে পেইন্টিংগুলোর দিকে এগিয়ে যান। আজাদ রহমান চুপচাপ এসে দাঁড়ান ওয়াসিফের পাশে। কিছুক্ষণ নিরব থেকে বললেন—
-"তুই এত কিছু কিভাবে গোপন রাখিস, বাপ? আমাদের এতটুকুও টের পেতে দিলি না! গোপনে গোপনে কত কিছু সামলে বেড়াচ্ছিস!"
ওয়াসিফ হালকা হাসল। তাঁর দৃষ্টিতে ছিল প্রশান্তির এক কোমল ছায়া। তিনি তাকিয়ে রইলেন উমাইরার দিকে। উমাইরা একদৃষ্টে তাঁর চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছিল, সেই চোখে যেন অজস্র না বলা কথা জমে ছিল। ঠিক সেই সময়, কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে ওয়াসিফের কণ্ঠস্বর। অথচ সে তো সবার সামনেই দাঁড়িয়ে। কেউই বুঝে উঠতে পারছে না, এ কণ্ঠ কোথা থেকে আসছে! সবার দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় ওয়াসিফের দিকে। ওয়াসিফ কেবল একবার হাত তুলে কানের কাছে নিয়ে ইশারা করে, "শুনো, কথা বলো না।" সবার মাঝে নেমে আসে নিঃশব্দতা।
তারপর ভেসে আসে সেই রেকর্ড করা কণ্ঠস্বর, ওয়াসিফ নিজেই নিজের অনুভবগুলো আগেই বলে গেছে, যেন এই মুহূর্তের অপেক্ষায়।
স্পিকারে ধীরে ধীরে ভেসে আসে সেই গলা, যেন নিঃশ্বাসের মত নরম, আবার হৃদয়ের গহীন থেকে উঠে আসা—
-"আমার মোহনমল্লিকা....আমার ছোট্ট চড়ুই। কবে, কখন, কীভাবে তোকে ভালোবেসে ফেলেছি, জানি না।
যেদিন নিজের পাশে এক ছোট্ট চড়ুইকে মাথার নিচে দুই হাত ভাঁজ করে ঘুমাতে দেখেছিলাম....ঘুমন্ত সেই মুখশ্রী দেখে আমার দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল আমার....হৃদপিণ্ড যেন হঠাৎ করেই নিজস্ব ছন্দ ভুলে গিয়েছিল। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠত সেই মুখ, নিঃশ্বাসের ফাঁকে শুধু সেই ঘুমন্ত মুখশ্রী।
কত রাত আমি ঘুমোইনি, শুধু এই ভয়ে, ঘুমিয়ে পড়লে যদি আবার ওর মুখটা ভেসে ওঠে।যদি আবার মনে পড়ে যায়, আমি তো তাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
জানিস, তোর প্রতি এই অনুভূতি আসার আগ পর্যন্ত আমি জানতাম না, ভালোবাসা কী। মনে হতো, ওসব কেবল বইয়ের পাতা বা সিনেমার দৃশ্যেই মানায়। কিন্তু তোকে ঘিরে এই অনুভূতি আসার পর, আমি বুঝলাম, ভালোবাসা কেবল অনুভব নয়, সেটা তো একটা পূর্ণ জীবন...আমি তোকে ভালোবেসেছি নিঃশব্দে, নির্জনে, নিরলসভাবে। তুই যখন হেসে বলতি, "তুমি খুব রাগী ওয়াইফাই ভাই" আমি চুপচাপ হাসতাম। তুই বুঝতে পারতিস না, আমি আসলে তোকে না দেখলে রাগ হতো নিজের ওপরেই....কেন তোকে আরো একটু বেশি আপন করে নিতে পারি না বলে। আমার এই মনের প্রতিটা কোণে শুধু তুই, তোর মুখ, তোর চোখের ভাষা, তোর অলস পায়ে হেঁটে যাওয়া, তোর হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো, আর সবার সামনে ছোট ছোট অভিমান।
জানিস, সেগুলোই আমার কাছে ছিল ভালোবাসার নিদর্শন। আমি তোকে হারাতে চাই না। আমি তোকে চাই....চিরতরে....শুধু আমার করে।"
উমাইরার চোখে জল। অবচেতনেই কান্নার কণা গড়িয়ে পড়ছে গালের উপর দিয়ে। ওয়াসিফের কণ্ঠে রেকর্ড করা প্রতিটি শব্দ যেন বুকের ভেতর ছুরি চালিয়ে যাচ্ছে ভালোবাসার। ঠিক সেই মুহূর্তে, মেহরাব, স্নিগ্ধা, অয়ন, প্রীতি, এহসান, নিধী, সবাই একে একে এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। রেকর্ড শুনতে শুনতে কারও চোখে বিস্ময়, কারও মনে উষ্ণতা। কিন্তু, ওয়াসিফ? উমাইরা চোখ মুছে চারপাশে তাকায়। না, কোথাও নেই সে। তার বুকের ধুকপুকানি আরও জোরে বাজতে থাকে। কোথায় গেল ওয়াসিফ? সবার মাঝেও যেন এক মুহূর্তে শোরগোল পড়ে যায়। একটি তীব্র, উৎসুক উত্তেজনা সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, "ওয়াসিফ কোথায়?"
হঠাৎ....উমাইরার কাঁধে আলতো ছোঁয়া।
সে চমকে পেছনে তাকায়।
ওয়াসিফ হাঁটু গেড়ে বসে আছে ঠিক তার সামনে।
উমাইরার মুখে হাত চলে যায়, বিস্ময়ে ও আবেগে।
এক পা পিছিয়ে যায় সে, যেন বাস্তবতার ভারটা এক মুহূর্তে সামলাতে পারছে না।
বাড়ির বাকিরা অবশ্য একটুও অবাক হয় না।
তারা জানত। জানত, আজ, এই সন্ধ্যায়, এই মুহূর্তে, ওয়াসিফ তার হৃদয়ের সবচেয়ে গোপন ইচ্ছেটা জানাবে।
ওয়াসিফ তাকিয়ে থাকে গভীর এক দৃষ্টিতে।
উমাইরার চোখে জমে থাকা জলের ভেতর সে পড়ে ফেলে সব উত্তর। এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে, নিঃশব্দে বলে ওঠে—
-"আমার বেলায় তো তোর ধৈর্য বরাবরই কম, তাই না?
তাইতো আর অপেক্ষা করতে পারলি না...নিজেই জনসমক্ষে আমায় চেয়ে বসলি। আমার করা সব পরিকল্পনা, সব সারপ্রাইজ, তুই নিজেই ভেস্তে দিলি।
তবে রেকর্ডের বাকি অংশটা না হয় এবার আমার মুখেই শুন...
আমিরা রহমান উমাইরা,
এই ওয়াসিফ আয়মান তোকে অসম্ভব ভালোবাসে।
এত বছরের দূরত্ব, আমাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে অঙ্গার করে ফেলেছে। এই বুক প্রতিনিয়ত জ্বলেছে তোকে ছোঁয়ার, তোকে একবার দেখতে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। তোকে দেখলেই যেন তৃষ্ণার্ত মরুভূমিতে বৃষ্টি নামে, আমার দুই চোখ শুধু তোকে দেখতে চায়, আর কিছু নয়। আমার হৃদয় তোকে পেতে চায়, ভিখারির মতো, কাঙালের মতো। তুই আমার শান্তির নীড়, আমার স্বস্তির শেষ আশ্রয়। তোকে পেলেই এই উত্তাল হৃদয় সমুদ্রে প্রশান্তি নেমে আসবে। বয়ে চলা ঝড় থেমে যাবে, থেমে যাবে সমস্ত অস্থিরতা। আমি জানি, তোর চোখ, তোর অশ্রু, তোর নিঃশ্বাস, সবই আজ উত্তর দিয়ে ফেলেছে। তবুও, তোর মুখ থেকে আমি সেই শব্দগুলো শুনতে চাই।
উমাইরা,
তুই কি নিজেকে লিখে দিবি আমার নামে? এই ওয়াসিফ আয়মানের নামেই? তুই কি আমার বউ হবি?
আমার হৃদয়ের একচ্ছত্র রানী হবি? আমার ভালোবাসার নাম লিখে দিবি তোর সত্তায়?"
বলেই ওয়াসিফ একটি রিং উমাইরার সামনে ধরে রিংটির কেন্দ্রবিন্দুতে একটি বড় পিয়ার শেইপড (পানাকৃতি) নীল পাথর বসানো আছে। পাথরটির রঙ গাঢ় নীল, যা দেখে মনে হচ্ছে নীল স্যাফায়ার। মূল পাথরটির চারপাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিরে বসানো আছে, যা তাকে হ্যালো সেটিং ডিজাইন দিয়েছে। এটি মূল পাথরের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে এবং আলো প্রতিফলনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ঝলমলে করে তোলে। যা পুরো রিংটিকে রাজকীয় ও আভিজাত্যপূর্ণ চেহারা দিয়েছে। ওয়াসিফ রিংটা উমাইরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে উমাইরার চোখে চোখ রেখে বলে—
-"এই রিংটা কেবল অলংকার নয়...এটা আমার হৃদয়ের ভাষা। এই নীল স্যাফায়ারটা আমার ভালোবাসার গভীরতা। এর প্রতিটা ছায়া আমার বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। ঠিক যেমন তুই, নিভৃত, গভীর, অথচ অপার নির্ভরতার মতো।"
ওয়াসিফ এক পলক থামে। উমাইরার চোখে জল চিকচিক করে ওঠে। সেই অশ্রু দেখে ওয়াসিফ আবারও বলতে শুরু করে—
-"আর এই হিরেগুলো? এগুলো আমার প্রতিটি প্রতিজ্ঞা, চিরন্তন, অটুট, নির্মল। ভালোবাসা যা কেবল দিনে নয়, রাতেও জ্বলে। যা কেবল উজ্জ্বল মুহূর্তে নয়, কষ্টের মধ্যেও আলো হয়ে থাকে।"
একটু নিশ্বাস নিয়ে ওয়াসিফ আবারও বলে, তার কণ্ঠ আরও মৃদু হয়—
-"তুই যদি এই রিংটা গ্রহণ করিস...তাহলে শুধু রত্ন নয়, আমার আত্মাটাও তুই গ্রহণ করবি। চাই তোর হাতটা আমার হাতে চিরতরে থাকুক। তুই আমার হবি, আমি তোর, একটা জীবন নয়, জন্মজন্মান্তর।"
উমাইরার ঠোঁট কাঁপে, সে কোনো কথা বলতে পারে না। কেবল এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, আর ওয়াসিফ অপলক তাকিয়ে সেই অশ্রু ও কাপতে থাকা উমাইরাকে দেখছে। ওয়াসিফ নিজে হাত বাড়িয়ে সেই কাঁপা হাতে রিংটি পরিয়ে দেয় উমাইরার আঙুলে। সে মুহূর্তে তারা কেউ কিছু বলে না, কারণ ভাষা সেখানে থেমে যায়, আর হৃদয় কথা বলে।
ওয়াসিফ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। চারদিক যেন করতালির উৎসবে মুখরিত,ভাইবোনেরা সিটি বাজিয়ে উল্লাস করছে, কেউ ক্যামেরা হাতে মুহূর্তগুলো বন্দি করছে, কেউবা ভিডিওতে ধরে রাখছে এই অবিস্মরণীয় স্মৃতি। বাড়ির বড়রা চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুগুলো মুছে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় ব্যস্ত। তাদের মুখে প্রশান্তির এক অপার্থিব হাসি, বহু বিপর্যয় পেরিয়ে অবশেষে যেন জীবনে ফিরেছে বহুল আকাঙ্ক্ষিত আনন্দের আলো।
উমাইরা একবার আংটিটার দিকে তাকায়। চোখ বেয়ে আনন্দের অশ্রু টুপটাপ করে ঝরে পড়ে। হঠাৎ করেই সে ঝড়ের গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওয়াসিফের বুকে। এত দ্রুত ঘটে যায় ঘটনাটি যে ওয়াসিফ কিছুক্ষণ দিশাহারা হয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। তারপর নিজের ভিতরে অনুভব করে এক চিরচেনা উষ্ণতা, আপন প্রাণের ছোঁয়া। সে নির্ভার হয়ে জড়িয়ে ধরে তার মোহনমোহিনীকে, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ আরাধ্যাকে।
উমাইরার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে কান্না ও ভালোবাসার ভারে। বুক চেপে ধরে সে বলে ওঠে—
-"আমি হবো আপনার হৃদয়সিংহাসনের একমাত্র অধিষ্ঠাত্রী। আমার আত্মায় গেঁথে দেবো আপনার নাম। আমার অস্তিত্বে ভালোবাসার অক্ষরে লিখে রাখবো শুধু আপনাকেই।"
তারপর সে মুখ তুলে, চোখ মেলে চায় ওয়াসিফের চোখে। সেই চাহনিতে ছিল কেবল একটাই কথা, যেটা ওর ঠোঁট থেকে বেরোয় ধীর কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে—
-"ভালোবাসি, ওয়াসিফ আয়মান।"
ওয়াসিফও তার চোখে চোখ রেখে মৃদু হাসি ছুঁড়ে বলে—
-"ভালোবাসি, আমিরা রহমান উমাইরা।"
প্রদর্শনীর নিঃশব্দ প্রাঙ্গণে, একটি নীল রত্ন দুজন প্রেমিকের চিরন্তন ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে রয়ে যায়।"