আধফোটা প্রেমের ফুল

পর্ব - ২১

🟢

সবাই প্রস্তুত হয়ে বাড়ি থেকে রওনা হয়েছে। ওয়াসিফের গাড়িটি অন্য দুইটি গাড়ির পেছনে অনুসরণ করছে। দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার সফর শেষে তারা পৌঁছাল এক অভিজাত আর্ট এক্সিবিশন ভেন্যুতে। বাড়ির সবাই খানিকটা অবাক, আশ্চর্য জড়ানো চোখে একে একে গাড়ি থেকে নামছে।

উমাইরা দাদা-দাদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে, খুব আপন করে হাত ধরে ধীরে ধীরে তাদের নিয়ে চলেছে ভিতরের দিকে। তার চোখেমুখে এক অপূর্ব আনন্দের উচ্ছ্বাস, এক অভ্যন্তরীণ গর্ব, যা সকলেই বিস্ময়ের দৃষ্টিতে লক্ষ্য করছে। মেইন গেটের সামনে এসে সবাই থমকে যায়। সেখানে একের পর এক ঝুলে থাকা ব্যানার। শেষ ব্যানারটি যেন চোখে পড়তেই সময় থেমে যায়, ব্যানার জুড়ে বড় করে লেখা আছে এক শিল্পীর নাম ও ছবি। সবাই নিঃশব্দে, অভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকে সেই ব্যানারের দিকে। কারও ঠোঁটে অস্ফুট স্বরে উচ্চারিত হয়—

"আমিরা রহমান উমাইরা…"

ছবির নিচে উমাইরার একটি অসাধারণ কালো পোশাকে তোলা প্রতিকৃতি। মুহূর্তেই যেন বাতাস ভারী হয়ে আসে আবেগে। ওয়াসিফ সবার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। পরিবারের বিস্মিত প্রতিক্রিয়া দেখে মৃদু হেসে বলে ওঠে—

-"উমাইরার পাঁচ বছরের অর্জন!"

তার কথা শুনে সবাই আরও গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকায় তার দিকে। চোখের ইশারায় ওয়াসিফ ভিতরে যেতে ইঙ্গিত করে। আর ভিতরে? সেখানে অপেক্ষা করছিল আরও এক মোহময় চমক। প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে, সাদা আলোর ভেতরে স্বর্গীয় এক প্রদর্শনী। এক্সিবিশন হলের প্রতিটি কোণায় ঝকঝকে ফোকাস লাইটে উদ্ভাসিত একের পর এক অপার সৌন্দর্যময় চিত্রকর্ম। প্রতিটি পেইন্টিং-এর পাশে লেখা আছে তার প্রেক্ষাপট, প্রতীকী ব্যাখ্যা, আর শিল্পীর নিজস্ব উপলব্ধির ছোঁয়া। সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে, শুধু দেখে যায়। যেন শব্দ হারিয়ে ফেলেছে তারা। এত মানুষের ভিড়, অথচ পুরো পরিবেশে যেন এক পবিত্র নিস্তব্ধতা। এইতো মাত্র এক্সিবিশনের উদ্বোধন, অথচ ইতোমধ্যেই এত মানুষের উপস্থিতি!

উমাইরার পরিবার বাকরুদ্ধ। তারা শুধু তাকিয়েই থাকে চারপাশে। কোনো কথা খুঁজে পায় না। আজ, এই মুহূর্তে, তাদের মেয়ের জন্য এতখানি গর্ব, এতখানি আবেগ, তারা হয়তো জীবনেও আর কখনও অনুভব করেনি। অজান্তেই চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রু। এ অশ্রু লজ্জার নয়, কষ্টের নয়, এ তো নিখাদ গর্বের, ভালবাসার, এক পরিপূর্ণতার অশ্রু।

রুমানা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন—

-"আমি জানতাম ও আঁকে, কিন্তু এমন কিছু করছে, স্বপ্নেও ভাবিনি। এই মেয়েটা আমাদের কত বড় চমক দিল!"

আজাদ রহমান নরম কণ্ঠে, চোখে জলের দীপ্তি নিয়ে বললেন—

-"আমি অনেকবার ওকে জিজ্ঞেস করেছি, 'তুই কী করিস কানাডায়?' শুধু বলতো, 'শিখছি বাবা।'আজ বুঝলাম, কী শিখেছে আমার মেয়ে।"

আযান রহমান হাসতে হাসতে বললেন—

-"আমি তো ভাবতাম, এই মেয়ে চঞ্চল স্বভাবের, নরম মনের, আসলে ভিতরে আগুন ছিল!"

আফসানা বেগম আশ্চর্য হয়ে বললেন—

-"তুমি জানো, আমাদের ছেলেমেয়েরা এত ফেসবুকে ছবি দেয়, একবারও তো এমন কিছু আমরা দেখিনি ওর প্রোফাইলে! পুরোটাই চমক!"

রাহেলা গলা ভারী করে বলেন—

-"বলেছিলাম, উমাইরা ভদ্র, চঞ্চল মেয়ে। আজ জানলাম, সে এক অসম্ভব মেধাবী শিল্পীও!"

রুবাইদা বেগম চোখে বিস্ময়—

-"এই ছবিগুলোর ব্যাখ্যাগুলো পড়েছো? মনের গভীরতা না থাকলে এভাবে কেউ লিখতে পারে না, কী গভীর চিন্তা ওর!"

মেহরাব হতবাক কন্ঠে বলল—

-"ওয়াসিফ ভাই তো কিছুই বলেনি! ভাইরে, এত বড় জিনিস লুকিয়ে রাখলে কেমনে?"

ওয়াসিফ হেসে, শান্ত গলায় বলল—

-"ও চেয়েছিল কাজ দিয়ে কথা বলুক, প্রচারে নয়, আমি শুধু পাশে ছিলাম।"

এহসান বলল—

-"এইতো, আজ প্রমাণ হয়ে গেল। কিছু মানুষ চুপচাপ কাজ করে যায়, কিন্তু একটা দিন আসে যখন চারপাশ জ্বলজ্বল করে শুধু তাদের আলোতেই।"

স্নিগ্ধা আবেগে গলা কাঁপছে—

-"ভাবতেই পারছি না আমার বোন এত বড় আর্টিস্ট! এমন অর্জনের অংশ হতে পেরে নিজেকেও গর্বিত লাগছে।"

অয়ন অশ্রু মুছতে মুছতে বলল—

-"আমার ছোট্ট উমাইরা, যে পেন্সিল আর রং তুলির সাথে বড় হয়েছে, আজ এত বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে, কতোটা পথ পেরিয়ে এসেছে সে!"

নিধী হাসি মুখে বলল—

-"এই প্রতিটি ছবি যেন ওর আত্মার গল্প… প্রতিটি রঙে, প্রতিটি রেখায় যেন একটা কান্না, একটা আশা, একটা জয়।"

প্রীতি চোখে জল, মুখে হাসি

-"আমি জানতাম ও আলাদা, কিন্তু এতটা আলাদা, এতটা অসাধারণ, এটা আমি কল্পনাও করিনি। আমার বন্ধু, আমার অহংকার, উমাইরা।"

উমাইরা তার দাদা-দাদীকে নিয়ে এগিয়ে এলো এক কোণে, যেখানে তিনটি পেইন্টিং সাদা কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তিনটি চিত্রের সামনে এসে থামতেই দাদা-দাদী বিস্ময়ভরা চোখে তাকালেন।

দাদু মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—

-"এইসব কি দাদুভাই?"

উমাইরা হালকা হেসে বলল—

-"আমার আঁকা, আমার পেইন্টিং এগুলো, দাদু।"

দাদু-দাদীর চোখে বিস্ময় আর আবেগ মিশে ধরা পড়ে গেল। চোখের কোনায় নীরব অশ্রুর রেখা। উমাইরা সযত্নে নিজের হাত বাড়িয়ে সেই অশ্রু মুছে দিল।

-"খুশি হওনি?" জিজ্ঞেস করল সে।

দাদু কাঁপা গলায় বললেন—

-"কি বলছিস তুই? এটা তো আনন্দের অশ্রু, সেই ছোট্ট উমাইরা, যে রঙ-তুলি নিয়ে বাড়ির দেয়ালে আঁকা বুকি করত, আজ সেই উমাইরা একজন স্বীকৃত শিল্পী! তুই জানিস, তখন আমি ভেবে নিয়েছিলাম তোকে একদিন আর্টিস্ট বানাবো। কিন্তু তোর দাদী বলেছিল, 'তুই যা হতে চাস, তোকে সেটাই হতে দিতে হবে। তোর ওপর যেন কখনো কারো স্বপ্ন চাপিয়ে না দিই।' আজ দেখ, নিজের অজান্তেই তুই আমার সেই স্বপ্নটা পূরণ করে ফেলেছিস দাদুভাই। আজ আমি খুব খুশি, খুব!"

উমাইরা আলতো করে দাদু-দাদীকে বুকে জড়িয়ে ধরে। চোখের জল মুছে দেয়, যেন ভালোবাসার আঁচলে গর্ব লুকিয়ে রাখে। এরপর সে চোখের ইশারায় লারাকে কিছু বোঝাল। লারা একটি মাইক্রোফোন এনে তার হাতে দিল।

উমাইরা মাইকে ঘোষণা করল—

-"সবাই একটু এদিকে আসবেন, আমি আপনাদের কিছু দেখাতে চাই।"

এক এক করে সবাই এগিয়ে এলো, কৌতুহলী চোখে। পরিবারের সদস্যরা শেষে এসে দাঁড়াল, তাদের পেছনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল ওয়াসিফ।

উমাইরা লারার হাত ধরে তাকে পাশে এনে দাঁড় করাল, যেন এক বন্ধুতার দৃঢ় মঞ্চে সে একাই নয়। এরপর সে প্রথম পেইন্টিংটির ওপর থেকে ধীরে ধীরে পর্দা সরিয়ে নিল। এক মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল চারদিকে।

সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সেই চিত্রপটের দিকে। লারা অবাক হয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে পেইন্টিংটির দিকে

ছবিটা লারার। তাদের কলেজ জীবনের একটি মুহূর্ত। তখন তারা ঘুরতে গিয়েছিল এক সুন্দর প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপটে। হাসি-মজায় ভরা এক বিকেল, দুষ্টুমিতে ভরা মুহূর্তগুলো ধরা পড়েছিল ক্যামেরায়। সেই মুহূর্তকে উমাইরা রঙে রঙে বন্দি করেছে এই ক্যানভাসে।লারার মুখে আনন্দ আর বিস্ময়ের হাসি—

-"এই আমি?!" চোখে জল চিকচিক করে।

পেইন্টিং-এর পাশে লেখা একটি বর্ণনা—

" ঘনিষ্ঠ বন্ধু লারা ও তার বৈশিষ্ট্য। এক বন্ধুত্বের শিকড়, এক নির্ভরতার প্রতিচ্ছবি।" এত হৃদয় ছোঁয়া ভাষায় বন্ধুত্বের ব্যাখ্যা, উপস্থিত সকলেই স্তব্ধ হয়ে পড়ে। মনে হয়, এমন নিখাদ বন্ধুত্ব আদৌ কি এই পৃথিবীতে বাস্তব?

উমাইরা এগিয়ে এসে সবার উদ্দেশে বলতে শুরু

করে—

-"বন্ধুত্ব, এ এক অনন্ত আশ্রয়। যেখানে সম্পর্কের নামের চেয়ে হৃদয়ের টান বড় হয়ে ওঠে। বন্ধুত্ব মানে শুধুই একসাথে হেসে ওঠা নয়, বরং নিঃশব্দ কান্নার মুহূর্তেও পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব সাহস। বন্ধু সেই, যে কোনো স্বার্থ ছাড়াই তোমার ভিতরের আলো-অন্ধকার দুটোই ভালোবাসে। সত্যিকারের বন্ধুত্ব মানে, বুঝে ফেলা সেই অশ্রু, যা চোখ ছোঁয়ার আগেই হৃদয়ে গড়িয়ে পড়ে। একটি স্পর্শ, একটি বাক্য, একটি নিরব চাহনি, যা হাজার ব্যাখ্যার চেয়েও গভীর। বন্ধুত্ব এমন এক সম্পর্ক, যেখানে বিচার নয়, গ্রহণযোগ্যতাই বড়ো। যেখানে ভুলে ঠেলে দেওয়া নয়, হাত ধরে ফেরানো হয়। যে বন্ধুত্ব হৃদয়ে গেঁথে যায়, তা কোনো দূরত্বে ফিকে হয় না, কোনো সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায় না। বরং জীবন যখন ক্লান্ত, হাল ছেড়ে দিতে চায়, ঠিক তখনই বন্ধুত্ব এক নির্মল বাতাসের মতো পাশে এসে দাঁড়ায়। বন্ধু হল সেই আয়না, যার সামনে দাঁড়ালে নিজের ভেতরের সবটুকু দেখা যায় ভয়, বিশ্বাস, শক্তি, দুর্বলতা, সব। সেই বন্ধুত্বই আশ্রয় হয়, যেখানে জীবন যখন নিজের ভাষা হারায়, তখন কেউ নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়ে বলে, "আমি আছি, ঠিক আছি।" আর আমর জীবনের সেই বন্ধুটির নাম লারা!"

লারা বিস্ময়ে ভরা দৃষ্টিতে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে উমাইরার দিকে। মুহূর্তেই যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, ছুটে এসে জাপটে ধরল উমাইরাকে। কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—

-"এত ভালোবাসা...এতটা সম্মান...এসবের যোগ্য আমি?"

উমাইরা মৃদু হেসে, চোখে মমতার দীপ্তি নিয়ে বলল—

-"তুই তার চেয়েও বেশি যোগ্য, লারা। আমি হয়তো তোকে তোর প্রাপ্য সম্মানের সবটুকু দিতে পারিনি।"

লারা সাথে সাথেই মুখ গম্ভীর করে, গলা তুলে বলল—

-"চুপ কর, বেয়াদব! তুই যে ভালোবাসা দিয়েছিস, হাজার সম্মান ও দিয়েছিস!"

তাদের কথোপকথন ভিজে ছিল চোখের জলে, কিন্তু মুহূর্তেই তা ভেসে গেল হাসির ঝরনায়। দু’জন একসাথে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সেই হাসির রেশ গিয়ে ছুঁয়ে ফেলল চারপাশের সবাইকে। আনন্দে ভরে উঠল এক্সিবিশনের হল, হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল সব দর্শকের মুখে। উমাইরা লারার হাত আলতো করে ছেড়ে এবার এগিয়ে এলো তৃতীয় পেইন্টিংয়ের সামনে। নিঃশব্দে পর্দাটি সরিয়ে দিল।

সবার চোখে একসাথে বিস্ময়, আবেগ আর গর্বের জোয়ার। পেইন্টিংটিতে তার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতিচ্ছবি, কেউ হাসছে, কেউ ভাবনায় ডুবে, কেউবা উমাইরার পাশে দাঁড়িয়ে। যেন একটি জীবন্ত গল্প, এক জীবনের সবটুকু ভালোবাসা বন্দি করে রাখা ক্যানভাসে। পেইন্টিংটির পাশেই লেখা ছিল উমাইরার হাতের লেখা এক বিবরণ, প্রতিটি সদস্যের সম্পর্কে গভীর অনুভূতির ছোঁয়া, কে কীভাবে তার জীবনের অংশ, কাকে দেখে সে সাহস পেয়েছে, কাকে হারিয়ে কেঁদেছে, কার কোলে মাথা রেখে সব কষ্ট ভুলে গেছে।

এরপর উমাইরা ধীরে ধীরে মাইক্রোফোন হাতে নিল। চারপাশে এক নিঃশব্দ অপেক্ষা। সবার চোখ তার দিকে। উমাইরা চোখ ঘুরিয়ে পরিবারের দিকে তাকিয়ে, গলা একটু কাঁপিয়ে বলতে শুরু করল—

-"এই ছবিটা শুধু একটি চিত্রকর্ম না, এইটা আমার জীবন… আমার ঘর। (একটু থেমে চোখের জল চেপে ধরে) আপনারা যারা আজ এখানে এসেছেন, অনেকেই জানতেন না আমি ছবি আঁকি। জানতেন না আমি আমার সবটুকু ঢেলে এক নিঃশব্দ যুদ্ধ চালিয়ে গেছি। কিন্তু যাদের আমি আঁকিনি শুধু রঙে, তাদের আমি আঁকেছি হৃদয়ে। এই যে আমার বাবা, যিনি নিজের মুখে কখনও বলেননি, কিন্তু চোখে চোখে সব বুঝে নিয়েছেন। যিনি বলতেন, 'পড়াশোনা কর, নিজের মতো কিছু হো', আমি জানি, ওনার সেই কথায় লুকিয়ে ছিল একটা আকাশজোড়া আস্থা। আমার মা...যার আঁচলে মুখ লুকিয়ে আমি বহুবার কেঁদেছি। যার হাতে রান্না করা খিচুড়ি আমাকে পৃথিবীর সব দুঃখ ভুলিয়ে দিত। তিনি জানতেন না আমি রং নিয়ে কী করি, কিন্তু তিনি আমাকে আগলে রেখেছেন, যেন আমি ভেঙে না যাই, যেন আমি রঙের মধ্যে নিজের পৃথিবী খুঁজে পাই। আমার কাকা, কাকি, দুই মনি, দুই বাবাই, সবাই নিজের মতো করে ভালোবেসেছেন, কারো কাছে আমি হাসির উমাইরা,কারো কাছে এক চঞ্চল মেয়ে, কিন্তু আজকের এই আমি, আপনাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় গড়ে উঠেছে। আমার ভাই-বোনেরা, আমার ঝগড়ার সাথী, আমার নিরবতার আশ্রয়। তারা জানত না, আমি রাত জেগে আঁকি। তারা শুধু জানত,'উমাইরা নিজের মতো থাকতে শুরু করেছে।' তবু কখনও জোর করেনি, কখনও প্রশ্ন করেনি, তারা শুধু পাশে থেকেছে। শুধু ছিল। এটাই সবচেয়ে বড় সমর্থন। আজ তোমরা জেনে গেছ, আমি কি করেছি এই পাঁচ বছরে।

কিন্তু আমি জানতাম, আমার কাজের চেয়ে বড় যে জিনিসটা আমি পেয়েছি, তা হলো তোমাদের নির্ভেজাল ভালোবাসা। তোমরা কিছু না জেনেও আমাকে আগলে রেখেছ, আমার আত্মা যেন ভেঙে না যায়, সেইখানে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছ।

এই জীবনে আমি যদি কিছু পেয়ে থাকি, তাহলে সেটা একটাই, আমার পরিবার। (হালকা হাসে, চোখ মুছে)

এই চিত্রকর্মটি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা, তাদের প্রতি, যারা জানতেন না আমি কী করছি, তবু কোনোদিনই আমাকে একা হতে দেননি। আমার এই সফলতার পেছনে রঙ আর তুলি নয়, পেছনে আছে তোমাদের ভালোবাসা, আস্থা, আর দুআ। আজকের এই মুহূর্ত শুধু আমার নয়, এটা আমাদের। পুরো পরিবারের।"

চারপাশে নিস্তব্ধতা, অনেকের চোখে জল, উমাইরা মাইক্রোফোন নামিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে পরিবারের দিকে। বাবা-মা, ভাই-বোন, সবাই দাঁড়িয়ে আছে, জড়িয়ে ধরে ওদের সবাইকে, তাদের ভালোবাসার আঁচলে যেন নিজেকে সম্পূর্ণরূপে জড়িয়ে দেয়। সবশেষে, এক নিঃশব্দ আবেশে ভরা মুহূর্তে, উমাইরা ধীরে ধীরে সবার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওয়াসিফের সামনে এসে দাঁড়ায়। চারপাশে যেন এক অলিখিত নীরবতা নেমে আসে। ওয়াসিফ কপালের ভাঁজ চেপে তাকিয়ে আছে উমাইরার দিকে, চোখে বিস্ময় আর গাম্ভীর্যের এক অদ্ভুত মিশেল।

হঠাৎ সকলকে চমকে দিয়ে উমাইরা এক পা গেড়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে ওয়াসিফের সামনে। চারপাশের উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে হা করে তাকিয়ে থাকে। কেউ কেউ বিস্ময়ে মুখে হাত চেপে ধরে, ফিসফাস পড়ে যায়, এই তো ইতিহাসের মতো কিছু ঘটে চলেছে তাদের চোখের সামনে।

উমাইরা মাথা তুলে তাকায় ওয়াসিফের চোখে, গভীরভাবে। ওয়াসিফ তখনো অবিশ্বাস আর বিস্ময়ে তাকিয়ে, মাথাটা একটু কাত করে রেখেছে, তার দৃষ্টিতে এক রকম অস্থিরতা, যেন হৃদয় তোলপাড় করছে কিছু। উমাইরা এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু

করল—

-"আমি যখন ভালোবাসা শব্দটার মানে বুঝতাম না, তখন থেকেই আপনাকে ভালোবাসি। যখন বুঝলাম অনুভব কি জিনিস, তখন নিজেকে বোঝালাম, এটা হয়তো একটা মোহ। কাটবে....সময় হলে কেটে যাবে।

কিন্তু না, কাটেনি। তারপর ভাবলাম, এটা হয়তো প্রেম। প্রেম তো একদিন ভেঙে যায়...কিন্তু প্রেমটাও ভাঙলো না। শেষমেশ বুঝলাম, এটা হয়তো নিঃশর্ত ভালোবাসা,

যা ফুরোয় না, যা এক জীবনের মতো থেকে যায়।

তবু ভয় পেলাম, ভালোবাসাও তো একদিন ফুরিয়ে যায়। সংসার ভাঙে, সম্পর্ক মরে যায়। ভাবলাম আমারটাও ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু না...আমি আবারও ভুল প্রমাণিত হলাম।

(চোখ ভিজে যায়, গলা ধরে আসে)

আপনি আমার মোহ নন, প্রেম নন...আপনি আমার আসক্তি, আপনি আমার একান্ত ব্যক্তিগত নেশা।

আর আসক্তি...সেটা কখনও শেষ হয় না। আপনার প্রতি আমার আকর্ষণ শুদ্ধ, স্থায়ী, চিরন্তন।"

(একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলে ওঠে—)

"ওয়াসিফ আয়মান,

আপনি কি আমার একান্ত ব্যক্তিগত হালাল পুরুষ হবেন?"

এই বলে উমাইরা এক হাত বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। চোখে অপার আবেগ, অশ্রুসিক্ত স্বপ্নময় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে সে ওয়াসিফের চোখে। ওয়াসিফ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে, নিঃশব্দ। তার হৃদয়ে যেন ঝড় বইছে, আত্মার গভীর থেকে উথলে আসছে আবেগ।

চোখে জল, ঠোঁটে স্পন্দন, মনে বিস্ময়, এই মেয়েটা!

এই একটি মেয়ের হৃদয়ে এতটা প্রেম, এতটা ধৈর্য, এতটা গভীরতা শুধুই তার জন্য? তার চোখ নরম হয়, ঠোঁটের কোণে জেগে ওঠে এক অদ্ভুত ভালোবাসার হাসি। চোখের জল লুকিয়ে সে নিজেও ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে উমাইরার সামনে। তার হাত বাড়িয়ে দেয় উমাইরার বাড়ানো হাতের দিকে।

উমাইরা নিজ হাতে প্লাটিনামের একটি আংটি পরিয়ে দেয় ওয়াসিফের আঙুলে, আংটির মাঝে যেন তাদের পাঁচ বছরের নীরব অনুভব, সমস্ত না বলা কথা, সমস্ত স্বপ্নের অঙ্গীকার গেঁথে আছে।

ওয়াসিফ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর আচমকা এক টানে উমাইরাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে, এভাবে যেন কোনোদিন কাউকে ধরে রাখেনি সে।

এই আলিঙ্গনে ছিল আত্মসমর্পণ, বিশ্বাস আর অনন্ত ভালোবাসার নিঃশর্ত স্বীকৃতি।

চারপাশে করতালির ঝড় ওঠে। বাকি সবাই হাসছে, বাড়ির বয়স্করা মুচকি হেসে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু চোখের কোণে আনন্দ লুকানো যাচ্ছে না। কেউ কেউ মোবাইল তুলে ভিডিও করছে, কেউ তুলছে ছবি, কারণ এমন একটি দৃশ্য তারা জীবনে হয়তো আর কখনো দেখবে না।

একটি মেয়ে, এইভাবে, এই গভীরতা নিয়ে, এই সম্মান নিয়ে, এই সাহস নিয়ে কাউকে ভালোবাসা প্রকাশ করছে, এ দৃশ্য ছিল হৃদয়ের মঞ্চে লেখা এক চিরস্মরণীয় কবিতা।

ঠিক সেই মুহূর্তে, নিঃশব্দ আবেগঘন পরিবেশ ভেদ করে আচমকা মাঝখানের পেইন্টিংটির পর্দা সরে যায়।

সাথে সাথেই একটা নরম শব্দে ওপর থেকে ঝরে পড়ে অসংখ্য ফুলের পাপড়ি, যেন ভালোবাসার ঋতু নেমে এসেছে ক্যানভাস জুড়ে। সবার দৃষ্টি ঘুরে যায় পিছনের দিকটায়। তারা দেখতে পায়, এক অপার সৌন্দর্যের অধিকারী একজন পুরুষের প্রতিকৃতি, যার পেছনে রঙিন রশ্মিতে লেখা—

“আমার একান্ত ব্যক্তিগত নেশা”।

তাদের কৌতুহল আর আবেগ একসাথে ঢেউ তোলে,

সবার পা আপনাতেই এগিয়ে যায় সেই চিত্রপটের দিকে। ভিড়টা ঘন হয়ে আসে পেইন্টিং ঘিরে। ভালো করে তাকালে বোঝা যায়, এই একটি পেইন্টিংয়ে আঁকা হয়েছে এক পুরুষের জন্ম থেকে বর্তমান অবধি পুরো জীবনকথা। ছোট ছোট প্রতিটি মুহূর্ত, স্মৃতি, ছায়া, সব মিলিয়ে এক অপূর্ব মুখশ্রী গঠিত হয়েছে। যার চোখে লুকিয়ে আছে নিঃশব্দ আবেগ, ঠোঁটে এক নরম মুগ্ধতার হাসি, আর চারপাশে ছড়িয়ে আছে শিল্পীর গভীর ভালোবাসার স্পর্শ। কে ভাবতে পারে, একটি পেইন্টিং এতো জীবন্ত হতে পারে! কে বুঝতে পারে, কতটা গভীর অনুভব থাকলে, একজন মানুষকে এমনভাবে রঙে গেঁথে রাখা যায়?

এই পেইন্টিং কোনো সাধারণ আর্ট নয়, এ যেন ভালোবাসার আত্মপ্রকাশ, এক নিবিড় ধ্যান।

উপস্থিত সকলে এক বিস্ময়ভরা নিস্তব্ধতায় তাকিয়ে আছে। একজন একজন করে ফিসফিস করে বলে উঠছে—

"এটা ওয়াসিফ....এটা তো ওয়াসিফ আয়মান!"

বাড়ির সকল সদস্য তাকিয়ে আছে উমাইরার দিকে, মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ, বিস্ময়ে পরিপূর্ণ। কারও কল্পনাতেও আসেনি, উমাইরার ভালোবাসা এত গভীর, এত শিল্পময়, এত স্থায়ী।

"কত মাস লেগেছে?"

কারো মুখে উচ্চারিত হয় প্রশ্ন।

"কত রাত না ঘুমিয়ে আঁকতে হয়েছে ওকে?"

অন্য একজনের ফিসফাস।

আর ওয়াসিফ?

সে স্থির দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে সেই প্রতিকৃতির দিকে।

চোখে বিস্ময়, মুখে স্তব্ধতা। তার হৃদয়জুড়ে এক ঝড় বইছে। সেই পেইন্টিংয়ে সে শুধু নিজের মুখই দেখতে পাচ্ছে না, দেখছে, একটা মেয়ের নিঃস্বার্থ ধৈর্য, সমস্ত নিঃশব্দ প্রতীক্ষা, সমস্ত না বলা ভালোবাসা। তার মনে হয়, সে হেরে গেছে। এই ভালোবাসার প্রতিযোগিতায় সে এক বিন্দুতে গিয়ে ঠেকেছে। আর উমাইরা, সে তো এক সাগর।

উমাইরা প্রমাণ করে দিয়েছে—

তার মতো করে কেউ ভালোবাসতে পারে না।

আর পারবেও না।

আধফোটা প্রেমের ফুল পর্ব ২১ গল্পের ছবি