সকালটা ছিল একেবারে শান্ত। ভার্সিটির মূল ফটকে দাঁড়িয়ে ছিল এহসান ও স্নিগ্ধা। স্নিগ্ধা হালকা হেসে বলল—
-"তুমি বলেছিলে ব্যস্ত, তাও এলে?"
এহসান কাঁধ উঁচিয়ে ছোট্ট করে বলল—
-"তুই বলেছিলি তো, আর আমি তোকে না বলতে পারি? আমার একমাত্র আদরের ছোট বোন তুই।"
তাদের কথোপকথনের মাঝে গাড়ির হর্ন। সামনে এসে থামা এক গাড়ি থেকে নামল মেহরাব ও নিধী। নিধীর চোখে হালকা উচ্ছ্বাস, আর মেহরাবের চোখ সবসময় ঘুরে পড়ে স্নিগ্ধার দিকে। স্নিগ্ধাও এক ঝলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলে, অভিনয় করতে চায় নির্লিপ্ত, কিন্তু মন বাঁধা পড়ে আছে মেহরাবের দিকে।
এহসানের চোখ পড়ে মেহরাবের ওপর, সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে যায়।
-"তুই এখানে? কি করছিস?"
মেহরাব হেসে জবাব দেয়—
-"নিধীকে নামাতে এসেছি, আর তুই?"
-"একটা কাজ ছিল, স্নিগ্ধা বলল ওকে নামিয়ে দিতে, তাই এলাম।"
মুহূর্তটা অদ্ভুত শান্ত, চারজনের মাঝে একধরনের নিঃশব্দ রসায়ন ভেসে বেড়াচ্ছে।
মেহরাব হঠাৎ প্রস্তাব দেয়—
-"চল সবাই মিলে কোথাও ঘুরে আসি?"
এহসান মাথা নাড়িয়ে গম্ভীরভাবে বলে—
-"না রে, আজ পারব না। অফিসে কাজের পাহাড়। অয়ন ভাই বাইরে, সব দায়িত্ব এখন আমার ঘাড়ে।তোরা যা, স্নিগ্ধাকে নামিয়ে দিয়ে দিস।"
নিধী কিছু বলতে চায়, কিন্তু গিলে ফেলে কথাটা।
এহসান চলে যেতে যেতে নিধীর চোখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে—
-"ফোন করো রাতে।"
নিধীর গাল লাল হয়ে যায়। সে চোখ নামিয়ে ফেলে, কিন্তু মনে মনে হাসি লুকিয়ে রাখে না। মেহরাব আড়চোখে একবার দেখলো দুজনকে। কিছু একটা বুঝে সন্তুষ্ট হলো।একটা নিঃশব্দ ভালোবাসা যেন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে ভালোবাসা,যার নাম নিধী-এহসান আর স্নিগ্ধা-মেহরাব।
-----------------------------
ল্যাবরেটরি, একটি নতুন সূচনার প্রস্তুতি।
ওয়াসিফ আজ অবশেষে ল্যাবে এসেছে। পুরোনো ক্ষত মুছে ফেলে নতুন করে শুরু করতে হবে এবার। সবাই, অন্তীকা, রুবাব, সোফিয়া, শান, একত্রিত হয়েছে মিটিং রুমে। টেবিলের চারপাশে চাপা উত্তেজনা।
ওয়াসিফ গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"আগের প্ল্যানটা আমরা সফল করতে পারিনি। তবে এবার আর ভুল হবে না। আমি প্ল্যানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছি। এই ফর্মুলা আগেরটার তুলনায় অনেক বেশি উন্নত।"
শান চোখ বড় করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
-"কি বলছিস ওয়াসিফ? তাহলে আগের রিসার্চটা…?"
অন্তীকাও সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল—
-"ওটা তো প্রায় শেষের দিকে ছিল, তাই না?"
ওয়াসিফ নিঃশ্বাস নিয়ে উত্তর দিল—
-"না, ওটা আসলে অসম্পূর্ণ ছিল। বিয়ের ঝামেলার পর আমি সেটা ঠিক করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তার আগেই যা ঘটার ঘটে গেছে। তবে যে আমাদের ক্ষতি করেছিল, সে আসলে আমাদের উপকারই করে গেছে, নাহলে এখন সবকিছু গোড়া থেকে নতুনভাবে শুরু করতে পারতাম না।"
সোফিয়া ও রুবাব একসাথে বলল—
-"এই বিষয়টা নিয়ে আমরা আগেই কথা বলেছিলাম। তোদের জানানো হতোই। যাক, এখন অন্তত ফ্রেশ মাইন্ডে কাজ শুরু করতে পারবো।"
ওয়াসিফ মাথা নেড়ে বলল—
-"হুম, ঠিক বলেছিস রুবাব।"
তবে শান আর অন্তীকা এত সহজে মানতে রাজি নয়।
শান বলল—
-"কিন্তু যে আগুন লাগিয়েছিল, তার খোঁজ কি করবি না? এখনো সে মুক্ত। আবার হামলা করতে পারে। আর তুই পুরনো ল্যাবে এসেছিস কেন? ঝুঁকি নেওয়ার দরকার ছিল না।"
অন্তীকা চিন্তিত গলায় যোগ করল—
-"তুই জানিসই তো, আমাদের ফর্মুলার ডেটা এতটাই সেনসিটিভ, আবার যদি কিছু হয়?"
ওয়াসিফ এবার কঠিন গলায় বলল—
-"চিন্তা করিস না। আমি সবরকম সিকিউরিটির ব্যবস্থা করেছি। কাজে মন দে। যেই আমাদের ক্ষতি করতে চেয়েছিল, আমি তাকে চিনি। এখন শুধু প্রমাণ দরকার। একবার সেটা পেলে তার জায়গা জেলে হবে। ভুলে যাস না, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কিন্তু তোদের দুজনের কাঁধে।"
শান ও অন্তীকা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাকাল, দায়িত্ব তারা নিচ্ছে।
রিসার্চ নিয়ে আরো কিছুক্ষণ গুছিয়ে পরিকল্পনা চললো। তারপর সবাই নিজ নিজ কাজে ডুবে গেল,
নতুন করে, নতুন আশায়, নতুন লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে।
---------------------------------
রাত প্রায় দশটা। শহরের কোলাহল স্তিমিত, আর বাড়িটাও যেন নিঃশব্দে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ওয়াসিফ বাড়িতে ফিরেই সোজা উঠে যায় নিজের রুমে। একমাত্র ট্রাউজার পরা, মাথায় তোয়ালে, বাথরুম থেকে বেরিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই হঠাৎ থেমে যায় তার গতি।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের পাশেই সে দেখতে পায় আরেকটি ছায়া, উমাইরা।
চোখ বড় হয়ে যায় তার, হৃদস্পন্দন এক মুহূর্ত থমকে যায়। পেছনে ফিরে দাঁড়িয়ে দেখে, উমাইরাই সত্যি!
এত রাতে? এই বাড়িতে? এক মুহূর্ত মনে হয়, সে কি ভুল দেখছে?
উমাইরা এগিয়ে এসে ওয়াসিফের হাতটা নরমভাবে ধরে ঝাঁকায়। তার কণ্ঠে অভিমান আর স্নেহের
মিশেল—
-"এত দেরি করে ফিরলেন কেন? সন্ধ্যা থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। আমার বন্ধু এসেছে, তার সাথে আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবো। জলদি তৈরি হোন, আমি খাবার গরম করছি। আমরা কেউ এখনো খাইনি, আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।"
এক নিশ্বাসে বলে উমাইরা দরজা খুলে বেরিয়ে যায়।
ওয়াসিফ তখনো স্থির। হতভম্ব চোখে ফাঁকা দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে… যেন বুঝে উঠতে পারছে না, এটা কি বাস্তব, নাকি কোনো মায়াবী স্বপ্ন?
গায়ে হালকা এক খয়েরি টিশার্ট পরে নিচে নামে ওয়াসিফ। ড্রয়িং রুমে চারপাশ বেশ প্রাণবন্ত, রাহেলা বেগম, ওসমান আয়মান, উমাইরা এবং এক অপরিচিত মেয়ে, বোধহয় উমাইরার সেই বন্ধু।
ওয়াসিফ ধীরে গিয়ে এক কোণে চেয়ার টেনে বসে। উমাইরা তখন খাবার পরিবেশন করছে, সাবলীল হাতে, পরিপাটি ভঙ্গিতে। তার এই অভ্যাস পুরোনো, এই বাড়িতে সে যেন অতিথি নয়, আপনজন। মনিকে একটুও কাজ করতে দেয় না, বরং নিজেই হাসিমুখে সব সামলায়।
ওয়াসিফ লক্ষ করছিল সবটাই। তার বাবা-মা লারার সঙ্গে আলাপ জমিয়েছেন।
হঠাৎ উমাইরা ওর সামনে খাবার রাখতে আসে। ওয়াসিফ চুপিচুপি চোখে ইশারা করে, একটু কাছে আসতে। উমাইরা একটু ঝুঁকে পড়ে, মুখে কৌতূহল—
-"কি?"
ওয়াসিফের চোখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি। সে আবেদনময় কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলে—
-"গিন্নির মতো ব্যবহার করছিস। কি বোঝাতে চাইছিস? পারমানেন্ট গিন্নি বানিয়ে ফেলি তোকে?"
উমাইরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—
-"ইশ সখ দেখ! বুড়ো বয়সে ভীমরতি! আপনার গিন্নি হইতে আমার বয়েই গেছে!"
মুখে ভাঁজ করে চোখ ঘুরিয়ে খাবারের বাটি গট করে রেখে পাশে বসে পড়ে সে।
ওয়াসিফের ভেতরটা ধক করে ওঠে, বুড়ো? সে বুড়ো?
৩০ বছর! এখনো তো ঠিকঠাক ছেলেই! এই মেয়ে যে ডাউনলোডে হতে ৮ বছর লেট, এটা কখনও সে মানবে না!
মনটা একটু খুঁতখুঁত করে বসল, কিন্তু মুখে কিছু না বলে একচোখে তাকিয়ে রইল উমাইরার দিকে।
রাতের খাবার শেষ সবারই। একটু বসে গল্পগুজব করলো সবাই। ১২ টা বেজে গেছে। উমাইরাদের ফিরতে হবে। ওসমান ওয়াসিফকে বলল ওদের বাড়িতে দিয়ে আসতে।
ওয়াসিফ গাড়ি বের করে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরেই লারা ও উমাইরা চলে আসে। রহমান ভিলায় এসে গাড়িটি থামে। লারা ও উমাইরা নেমে পড়ে। হঠাৎই ওয়াসিফ উমাইরাকে পেছন থেকে ডাক দেয়—
-"উমাইরা দাড়া!"
উমাইরা উল্টো ঘুরে একবার তাকালো ওয়াসিফের দিকে। তারপর লারাকে বলল—
-"ভেতরে যা আমি আসছি।"
লারা ভেতরে চলে গেলে উমাইরা ওয়াসিফের কাছে আসে দাঁড়ায় তারপর বলে—
-"বলুন!"
ওয়াসিফ কোনো কথা না বলে উমাইরার কোমরে দুই হাত রেখে টান দিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। উমাইরা ছটফটে উঠে। হতভম্ব সে। রাস্তার এইদিকে ওদিকে তাকিয়ে ওয়াসিফকে বলে—
-"কি করছেন ছাড়ুন। রাস্তায় মানুষজন দেখলে খারাপ ভাববে।"
ওয়াসিফ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ওয়াসিফ নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে আসে উমাইরার মুখের কাছে তারপর নীরবতা ভেঙে ওয়াসিফ হুস্কি সুরে বলে—
-"আমি বুড়ো হয়ে গেছি? আমার গিন্নি হবি না তুই?"
উমাইরা চুপ হয়ে গেলো। ছটফট করে আরও বেড়ে গেলো। এক পলক ওয়াসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
-"আপনি বুড়ো হলেও আমার যুবক হলেও আমার। আপনাকে বুড়ো বলার একমাত্র অধিকারও আমার।"
ওয়াসিফ স্মিত হাসলো। তারপর আকস্মিক উমাইরাকে ঘুরিয়ে নিয়ে তার পিঠের ওপর পড়ে থাকা চুল গল্প এক সাইড দিয়ে শামেন রেখে ঘাড়ে আলতো কামড় বসালো। উমাইরা ব্যথায় চোখটা খিঁচে নিলো। ওয়াসিফ উমাইরার কাঁধের ওপর নিজের থুতনি রেখে ফিসফিসিয়ে হাস্কি সুরে বলে—
-"তুই আমার মোহনমল্লিকা, সকালবেলার ঘ্রাণে ভেজা এক কোমলতা, যার সুবাসে আমার সমস্ত দিন শুরু হয় মুগ্ধতায়।
তুই আমার চড়ুই, ছোট ছোট ডানায় উড়ে বেড়ানো এক চঞ্চল ভালোবাসা,যার সরলতা আর মায়াবী দৃষ্টি আমার সমস্ত ক্লান্তিকে গলিয়ে ফেলে।
তুই আমার বুকের ভেতর গোপনে লালন করা অনুভূতি,
যার প্রতিটি নিঃশ্বাসে আমি ভালোবাসার পূর্ণতা পাই।
তুই প্রশান্তির মতো, ঝড়ের রাত পেরিয়ে যে মেঘভাঙা রোদ হয়ে আমার জীবনে নামে।
তোর মাঝে আমি হারিয়ে যেতে চাই, বারবার, বারংবার, যেন নিজেকেই খুঁজে পাই নতুন কোনো আলোয়।
উমাইরা তখন অনুভূতির জোয়ারে ভাসছে।
ওয়াসিফের গরম নিশ্বাস তার ঘাড়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে, যেন প্রতিটা ছোঁয়ায় জ্বলে উঠছে স্নায়ুর একেকটি শিরা।
উদরের পাশে রাখা তার হাত, যেন এক অপার্থিব ছোঁয়া, নেশার মতো মাতাল করে দিচ্ছে। আর কথা বলার ফাঁকে ঘাড়ে ঠোঁটের সেই নরম, কিন্তু বিদ্যুৎস্পর্শের মতো স্পর্শ, উমাইরার শরীর যেন কেঁপে ওঠে ভিতর থেকে।
ওয়াসিফ উমাইরাকে ঘুরিয়ে নিজের মুখো মুখো করে ধরে। গভীর কণ্ঠে বলে উঠে—
-"চোখ খোল।"
উমাইরা শোনে, কিন্তু চোখ বন্ধই রাখে। ওয়াসিফ আবার বলে—
- "চোখ খোল, না খুললে এবার ঠোঁটে চুমু খাবো!"
এইবার উমাইরার চোখ হঠাৎ বড় বড় হয়ে যায়, যেন ধরা খাওয়া শিশুর মতো তাকিয়ে থাকে। ওয়াসিফ হেসে ওঠে, এক বাঁকা ছলনাময় হাসি। তারপর সে নিজের উষ্ণ ওষ্ঠ দিয়ে আঁকড়ে ধরে উমাইরার নরম ওষ্ঠজোড়া, যেন মুহূর্তের মধ্যে পুরো পৃথিবী থেমে যায়।
উমাইরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। লোকটা কী ধড়িবাজ! চোখ খুললে চুমু দেবে না, এই তো বলেছিল। মিথ্যে বাদী!
প্রায় পাঁচ মিনিট পর অবশেষে ওয়াসিফ ওকে ছাড়ে।
উমাইরা ততক্ষণে রাগে-লজ্জায় গলে গেছে। সে এক ধাক্কা দিয়ে ওয়াসিফকে সরিয়ে বাড়ির ভেতরে দৌড়ে যায়। যেতে যেতে বলে—
-"মিথ্যে বাদী লোক! আর কখনও আসবো না আপনার কাছে!"
ওয়াসিফ হাসে। ঠোঁট মুছে গাড়িতে উঠে বসে। তারপর ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যায়, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে রয়ে যায় সেই বাঁকা বিজয়ী হাসি।
----------------------------------
লারা ওপরে বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে সবটাই দেখেছে।
ওর চোখে অবিশ্বাস, কৌতূহল লুকিয়ে আছে। উমাইরা দৌড়ে ঘরে ঢুকতেই লারা দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়।
উমাইরা ওকে দেখে চমকে যায়। লারার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। লারা ঝট করে ওকে চেপে ধরে, বলেই ফেলে—
-"কিরে! কবে থেকে এসব চলছে, হ্যাঁ? আমাকে তো একবার বলিসওনি!"
উমাইরা কিছুটা অপ্রস্তুত, চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে—
-"ঘরে আয়, সব বলব তোকে।"
দুজনে তখন চুপচাপ চলে আসে উমাইরার ঘরে।
লারার মুখে চাপা একটা রাগ, কিন্তু ভেতরে বন্ধুর সেই চিরচেনা উদ্বেগ। উমাইরার চোখে-মুখে তখনো লালচে আভা, লজ্জা আর কিছুটা পরিণতির শিহরণ।
ঘরের দরজা বন্ধ হতেই লারা ঠাস করে বালিশ ছুঁড়ে মারে উমাইরাকে—
-"তুই প্রেমে পড়েছিস, মানছি, কিন্তু আমাকেও তো কিছু বলতে পারতিস!"
উমাইরা হেসে ওঠে, একটু লজ্জায় গলা নামিয়ে বলে—
-"আমি নিজেই তো জানতাম না, এটা প্রেম না পাগলামি!"
রুমে আলো হালকা, বাতাসে একধরনের নিস্তব্ধ উষ্ণতা। বালিশে মাথা রেখে লারা চুপচাপ শুনছে, উমাইরা ধীরে ধীরে সিলেটে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা খুলে বলছে। ওয়াসিফের সাথে যা ঘটেছে, তার প্রতিটি মুহূর্ত যেন আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
উমাইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-"প্রীতিদের ক্ষমা করেছি ঠিকই, কিন্তু এখনো ঠিক আপন করে নিতে পারি না। হালকা পাতলা কথা হয়, সৌজন্যবোধে কিছু আদান-প্রদান। কিন্তু আগের মতন প্রাণ খুলে মিশতে পারি না, মন চায় না আর।"
লারা একটু চুপ করে থাকে, তারপর শান্ত গলায় বলে,
-"দেখ, এসব কোনো ব্যাপার না। মন যদি না চায়, তাহলে জোর করে কিছু হবার না। চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ক্ষমা করা যায়, কিন্তু মন থেকে জায়গা দেওয়া যায় না। এটা স্বাভাবিক। তুই ভাবিস না এত কিছু, তোর মাথা ব্যথা বাড়বে শুধু।"
-"কিন্তু প্রীতি তো এখন আমার ভাইয়ের বউ।"
উমাইরা চোখ নামিয়ে বলে।
লারা হালকা হেসে উত্তর দেয়,
-"তাই তো, ভাইয়ের বউ হিসেবেই তাকে ট্রিট কর। যতটা প্রয়োজন ততটাই দাও। আর কিছু নয়। তোর শান্তিটাই আসল। বাকিটা সময় ঠিক করে দেবে।"
উমাইরা কিছু না বলে চুপ করে থাকে। কেবল জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, যেখানে শীতের রাতের আলো-আঁধারিতে যেন তার মনের কথাগুলো মিশে যায়। তারপর বলে—
-"হুম, তুই একদম ঠিক বলেছিস, লারা!" উমাইরা এক গভীর নিশ্বাস ফেলে বলল। "আচ্ছা বাদ দে এসব, তোকে যে কারণে আমি তাড়াতাড়ি আসতে বলেছিলাম সেটা বলি—"
-"হুম, বল, শুনছি আমি। এমন কী হয়েছে যে আমাকে এত দ্রুত চলে আসতে বললি?"
-"ওয়াসিফ ভাইয়ের ল্যাবে আগুন লেগেছে। কিন্তু বিষয়টা অদ্ভুতভাবে জটিল। পুরো ল্যাব পুড়ে ছাই, অথচ ভিতরে থাকা দু’জন মানুষ, একটা আঁচও লাগেনি তাদের গায়ে।"
-"কি বলছিস তুই! তারা কি ভিতরে ছিল তখন?"
-"হ্যাঁ, চারজন ছিল মোট। সবাই একসাথে ইতালিতে পড়ত, তিনজন বাংলাদেশি আর একজন ইতালিয়ান। ঘটনার সময় দুইজন বাইরে গিয়েছিল একটু হাওয়া খেতে, বাকি দুইজন ভিতরেই ছিল। এখন প্রশ্ন হলো, যখন সবকিছু ভস্ম হয়ে গেল, তখন ওই দুজন কিভাবে অক্ষত অবস্থায় বের হলো?"
-"তাদের কি কেউ উদ্ধার করতে পেরেছিল?"
-"না, এটা একদমই অসম্ভব। ল্যাবটা খুব নির্জন জায়গায়, লোকচক্ষুর আড়ালে। এর আগেও বহুবার কেউ কেউ ভাইয়ার গবেষণাগারের গোপন ফর্মুলা হাতাতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু ভাইয়া খুবই ধূর্ত আর সতর্ক, তাই কেউ সফল হতে পারেনি। এজন্যই ল্যাবের ঠিকানা বদলে খুব গোপনে তৈরি করা হয়।
ঘটনার দিন দু’জন বাইরে যায় কিছুক্ষণের জন্য, আর ফিরে এসে দেখে, সব ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু অবাক ব্যাপার, বাকি দু’জন তখনও জীবিত, এক কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল। তারা নাকি তখন কিছু একটা করছিল, যেন কিছুতে মগ্ন।"
-"তখন তো মাথায় কিছুই ঢুকছিল না নিশ্চয়?"
-"না, তখন মূল লক্ষ্য ছিল, গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টসগুলো যেভাবে হোক সেভ করে ফেলা। ওরা সেগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ওই দুজন কী করছিল বা কিভাবে বেঁচে গেল, তা নিয়ে তখন ভাবার অবকাশই ছিল না।"
-"তুই এখন কী করতে চাইছিস, উমাইরা? ব্যাপারটা সত্যিই অনেক জটিল, মানতে হবে!" লারা কিছুটা চিন্তিত কণ্ঠে বলল।
উমাইরার চোখে তখন অন্যরকম এক জ্বলজ্বলে দৃঢ়তা। গলা নামিয়ে শান্ত স্বরে সে বলে—
-"আমি এই ঘটনার গোড়া পর্যন্ত যেতে চাই। আমার মন বলছে, ওই বাকি দু’জন ওয়াসিফ ভাইয়ের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। ওদের পেছনে আরও কেউ থাকতে পারে, আমি নিশ্চিত না। কিন্তু একটা কথা আমি নিশ্চিত জানি, যে কেউ হোক না কেন, যদি ওয়াসিফ আয়মানের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, আমি কখনো চুপচাপ বসে থাকবো না।"
তার চোখের দৃষ্টিতে আগুন জ্বলছিল।
-"সবাই ভাবে আমি শান্ত, ভদ্র, সহানুভূতিশীল, সবাইকে ভালোবাসি, সবার কথা ভাবি। কিন্তু যারা আমার আপনজনের দিকে চোখ তুলে তাকায়, তাদের জন্য উমাইরার ভেতরের হিংস্র রূপ জেগে ওঠে। আমি বেঁচে থাকতে কেউ ওয়াসিফ আয়মানকে স্পর্শ করার সাহসও করবে না, ভাবতেও পারবে না। আর এখন, ঠিক সেই কাজটাই আমাকে করতে হবে।"
লারার ঠোঁটে এক গা-ছমছমে আত্মবিশ্বাসী হাসি।
-"তাহলে তো ভালোই হল। আমি তো আছি তোর পাশে, সবসময়। শুধু বল, কী কী করতে হবে, বাকি সব আমি দেখে নেব।"
তারপর একটু থেমে গম্ভীর গলায় বলে,
-"এইবার সময় এসেছে, কানাডায় আমার বাবা তোকে যা শিখিয়েছেন, সেই শিক্ষা এবার কাজে লাগানোর।"