ভাঙাচোরা, একতলা সেই নিঃশব্দ বাড়িটা যেন কবরঘর। বাতাসে ভেসে বেড়ায় একটাই শব্দ, প্রাণভিক্ষার কান্না। ঘর জুড়ে গভীর অন্ধকার। কোথাও কোনো আলো নেই, শুধু একপাশে থমকে থাকা ছায়ামূর্তি, কালো সোফায় বসে থাকা এক পুরুষ অবয়ব। তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক পুরুষ, মাথা নিচু, শরীর কাঁপছে। পেছন থেকে কালো পোশাকধারী দুইজন তার কাঁধ চেপে ধরে রেখেছে, যেন একটুও নড়তে না পারে। সে কাঁদছে। বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে।
সোফার পুরুষটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ভারি পা ফেলে এগিয়ে এল সামনে। তারপর পিস্তলটি তুলে স্লাইড করল পুরুষটির গালে, ধাতব ঠান্ডা সেই স্পর্শে পুরো শরীরটা কেঁপে উঠল। এক পলক চুপ। তারপর পিস্তলটা থুতনিতে ঠেকিয়ে তার মুখটা উপরের দিকে তুলল সেই ছায়ামূর্তি। ঠান্ডা গলায় বলল—
-"একটা কাজও করতে পারিস না, তাই না? অন্তিকা গায়েব, জানালি না আমাকে। আবারও পুরনো ভুল ডাটা নিয়ে আমার সামনে এসে পড়েছিস। ভাগ্য ভালো, আমি আগেই ওয়াসিফকে মারার লোক পাঠিয়েছিলাম, নইলে সেই ডাটা চিরতরে চলে যেত। তোদের ভুলে আমার কী ক্ষতি হতে পারত, জানিস? আমি আগেই বলেছিলাম, আর একবার ভুল করবি, তোকে আর বাঁচতে দেব না। সোজা ‘ইন্না লিল্লাহি’ করে দেব।"
-"দয়া কর....প্লিজ....আমরা জানতাম না অন্তিকাকে ওয়াসিফ আটকে রেখেছে। বিশ্বাস করো, আমরা বুঝতেই পারিনি ও সব জানে। যে কাজ করিয়েছিল ও আমাদের দিয়ে, ওটা আসলে ভুল ফর্মুলা ছিল। গোপনে ও রুবাব আর সোফিয়াকে নিয়ে আসল ফর্মুলা বানিয়েছে....আমরা জানতাম না।"
ছায়ামূর্তি পিস্তলটা নিচে নামাল না, বরং আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
-"জানি তোরা কিছুই জানিস না। তবু কীভাবে এত বড় ভুল করলি? ওয়াসিফ তোদের চোখের সামনেই খেলছে, আর তোরা দেখছিস না! তোরা কী ঘাসে মুখ দিয়ে চলিস?"
-"বিশ্বাস করো....আমরা একটুও বুঝতে পারিনি। যদি বুঝতাম, এইসব কিছুই হতো না। তুমি তো জানো, এত বছরের বন্ধুত্ব আমাদের মধ্যে। তোমাকে আমি ধোঁকা দেবো? কখনও না... কখনও না!
সেই ছায়ামূর্তি এবার হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
হাসতে হাসতে এক হাঁটু ভর দিয়ে নিচু হয়ে মানবটির চোখে চোখ রাখল। তারপর ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল—
-"তুই যখন ওয়াসিফকে ধোঁকা দিতে পারিস, তখন আমাকে তো খেলারচ্ছলে হারিয়ে দিতেই পারিস।
আর তুই এখন বলছিস, তোকে বিশ্বাস করতে?
হাসালি, শান। সত্যি হাসালি!"
ঠিক তখনই একটা কাঁপা কাঁপা, তীক্ষ্ণ অথচ আত্মবিশ্বাসী মেয়েলি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
-"হ্যাঁ। সত্যিই বলছেন আপনি। আমরাও খুব হেসেছি আপনাদের কথোপকথন শুনে।
ঘরে হঠাৎ একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। সবাই চমকে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে উমাইরা, সোজা পিস্তল তাক করে। তার পাশেই লারা।
আর পিছনে কালো পোশাকধারী প্রায় ২০০ জন দক্ষ ফাইটার, যাদের চোখে মুখে ছিল কেবল একটাই নির্দেশ, আক্রমণ হলে নিশ্চিহ্ন করে দাও। চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়েছে। ভেতরে-বাইরে জাল বিছানো।
উমাইরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ছায়ামূর্তিকে এক লাথি দিল হাঁটুতে। লাথি খেয়ে তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ল। উমাইরা পিস্তল ঠেকিয়ে দিলো কপালে। ঠাণ্ডা, স্নিগ্ধ কিন্তু জ্বালাময়ী কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল—
-"কেন করলেন এমন বেঈমানি? ওয়াসিফ ভাইয়ের সাথে আপনার আসলে কী শত্রুতা ছিল? উনি তো কখনো আপনার ক্ষতি করেননি।"
ছায়ামূর্তি হেসে উঠল। ধ্বস্ত, ধুলিমাখা মুখে বিদ্রুপের ছায়া।
-"আমি এসব করেছি, এতটা পথ পেরিয়ে এসেছি,
শুধু এভাবে ধরা দিতে, সব শেষ করতে? না, উমাইরা। খেলাটা সবে শুরু হয়েছে।"
উমাইরা এবার পিস্তল নামিয়ে নিলো। পাশে রাখা টেবিল থেকে একটা জ্বলন্ত সিগারেট তুলে নিলো। তারপর ধীরে ধীরে ছায়ামূর্তির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
-"জানের মায়া আপনার নেই সেটা বুঝে গেছি।
কিন্তু শরীরের প্রতি আপনার কিছু মমতা থাকতে পারে।
তাই ভাবছি....কী করা যায় এখন আপনার সঙ্গে, বলুন তো....সাজ্জাদুল ভাই?"
সাজ্জাদুল এবার হকচকিয়ে তাকিয়ে রইল উমাইরার দিকে। তার ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। চোখের পাতাগুলো থরথর করে কাঁপছে। উমাইরা হালকা হেসে জ্বলন্ত সিগারেটটি তার চোখের খুব কাছাকাছি নিয়ে গেল।
সাজ্জাদুল ছটফট করে উঠে পড়ল, কাঁপতে কাঁপতে আর্তনাদ করে উঠল—
-"No....no....উমাইরা! Don’t do this! আমি সব বলছি....আমি সব বলছি তোমাকে....!"
উমাইরা ধীরে সিগারেটটা সরিয়ে নিল। ঠোঁটে শীতল হাসি। সাজ্জাদুল এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর নিচু গলায় বলতে শুরু করল—
-"ওয়াসিফ, সর্বজনপ্রিয় এক নাম। সবকিছুর শীর্ষে তার উপস্থিতি। পড়াশোনা, খেলাধুলা, বুদ্ধিমত্তা, চেহারা কিংবা পারিবারিক সম্মান, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ও ছিল সবার আগে। আমি? আমিও মন্দ ছিলাম না, অন্তত পড়াশোনায় তো নয়। কিন্তু তারপরও কখনোই পেলাম না সেই মর্যাদা, যা সহজেই ওয়াসিফ ছিনিয়ে নিত।
বাড়ির সবাই সব সময় ওর সঙ্গেই আমার তুলনা করত। যেন আমি কোনো অপূর্ণ সৃষ্টি, এক ব্যর্থ প্রতিচ্ছবি। মা-বাবার মুখেও শুনেছি—"তুই যদি ওয়াসিফ হতি, আমরা অনেক গর্ব করতে পারতাম।" এভাবেই এক অদৃশ্য ঘৃণার বীজ বপন হতে থাকে আমার ভেতরে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। সেই তুলনার যন্ত্রণা আমায় গ্রাস করত প্রতিনিয়ত।
ভার্সিটি পর্যন্তও চলতে থাকে সেই একই চিত্র। তারপর আমরা ইতালিতে গেলাম একসাথে। ভেবেছিলাম নতুন দেশে হয়তো পাল্টাবে কিছু, কিন্তু না, সেখানে গিয়েও সবাই যেন এক অদৃশ্য টানে ওর দিকেই ঝুঁকে পড়ল।
মেয়েরা পর্যন্ত তাকেই চাইতো। শান আর আমি, আমরা দু'জনেই এই অবহেলা আর উপেক্ষার যন্ত্রণা নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। তবে শান কখনোই সাহস করে ওঠেনি ওয়াসিফের বিরুদ্ধে যাওয়ার। আমি পারিনি চুপ থাকতে। ইতালিতে থাকাকালীন আমি এক মেয়েকে পছন্দ করতাম। কিন্তু সে? সে পাগলের মতো ভালোবাসতো ওয়াসিফকে। ওর একমাত্র লক্ষ্য ছিল, ওয়াসিফের মন জয় করা, তার পাশে থাকা। প্রেম নিবেদন করেছিল একাধিকবার। ওয়াসিফ প্রতিবারই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, সে বিবাহিত, এসবের মধ্যে নেই। কিন্তু মেয়েটি ছিল নাছোড়বান্দা।
অবশেষে এক সময় সে আমার দিকেই ফিরে তাকালো, আমি বুঝেছিলাম না, ওর দৃষ্টি আমার দিকে নয়, বরং ওর স্বার্থের দিকে ছিল। আমাকে ব্যবহার করেছিল সে, ওয়াসিফকে কাছে টানার ব্যর্থ এক চেষ্টার অংশ হিসেবে। ওয়াসিফ যখন দেশে ফিরে যায়, তখন সে বুঝে ফেলে তার স্বপ্নের মানুষ অধরা।
আর সেই ক্ষোভে, অপমানে, আমাকে সবার সামনে অপমান করে, সম্পর্ক ভেঙে দেয়, নৃশংসভাবে। আমি ভেঙে পড়ি। নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম....কিন্তু ভাগ্য আমার জন্য অন্য এক পথ লিখে রেখেছিল।
একদল মাফিয়া আমাকে আত্মহত্যা থেকে উদ্ধার করে। তারা আমার অতীত জানে, আমার ক্ষতগুলো চেনে। তারা আমায় বলে—"তোর প্রতিশোধ নেয়া উচিত।" আর আমি সে পথেই পা বাড়াই। প্রথমে ভেবেছিলাম,ওয়াসিফের গড়ে তোলা সম্মানকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেব, ফর্মুলার ডাটা ফাঁস করে।
তারপর শেষ করব তাকে, চিরতরে। কিন্তু ও যে ওয়াসিফ! ধূর্ত, সুশৃঙ্খল, অদ্ভুতভাবে পূর্বানুমানক্ষম।
প্রতিবার আমার পথ আটকেছে। প্রতিবার আমার চাল উল্টে দিয়েছে।
আর এই গাধার দল, এই মাফিয়া নামের ছায়া মানুষগুলো! তারা শুধু দাবার গুটি হয়েই রইল। ক্ষমতা ছিল মুখে, কাজে কিছুই না। হারামজাদা গুলো একটাও কাজের না!"
উমাইরা হেসে ফেলল। প্রতিহিংসার চূড়ান্ত রূপ সে যেন দ্বিতীয় বার চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পেল।
সাজ্জাদুল হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। উমাইরার সেই অদ্ভুত, বিষণ্ন অথচ তৃপ্তির হাসি যেন তাকে কুঁচকে ধরছে। সে বুঝতে পারছে না, এই হাসির অর্থ কী। নীরবতা ভেঙে, ধীর অথচ ধারালো কণ্ঠে উমাইরা বলল—
-"আপনি ছিলেন ওয়াসিফ ভাইয়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সবচেয়ে প্রিয়জন। তার জন্য আপনি কত কিছুই না করেছেন, সে তো সবাই জানে। কিন্তু জানেন, সেই বন্ধুত্বের আড়ালে আপনি কী করেছেন? হিংসার আগুনে নিজেকেই জ্বালিয়েছেন, আর সেই ছাই ছিটিয়ে দিতে চেয়েছেন ওর উপর। আপনার জন্য কোনো অজুহাত চলে না, মিস্টার সাজ্জাদুল।
আপনি যা করেছেন, জেনে বুঝেই করেছেন।
আপনি এমন এক সীমা অতিক্রম করেছেন, যেখানে মানুষ খুন করতেও আপনার হাতে কাঁপনি ধরেনি।"
একটু থেমে, চোখ সরাসরি তার চোখে স্থির করে বলল
-"তবে একটা কথা মনে রাখবেন। ওয়াসিফের গায়ে ফুলের টোকাও দেওয়ার আগে, সবার আগে এই উমাইরাকে টপকাতে হবে। আর আমি? আমি টোপা দেওয়ার জন্য না, গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকি।
বিষয় যখন ওয়াসিফ আয়মান, তখন আমি আর শান্ত উমাইরা থাকি না, আমি হিংস্র হয়ে উঠি। ওর দিকে চোখ তুলে তাকানো মানেই মৃত্যুকে আমন্ত্রণ। ওর ক্ষতির কথা কেউ ভাবলে, আমি হিংস্র জানোয়ার হয়ে উঠি, আর তখন আমি ক্ষমা করতে শিখিনি।আমি আগুন হয়ে যাই। যে হাত ওর ক্ষতি করতে উঠবে, আমি তা ছিঁড়ে ফেলতে দ্বিধা করব না। ও আমার শ্বাস, আমার শান্তি। ওকে আঘাত মানে আমায় জ্বালানো, আর আমি যখন জ্বলি, তখন কেউ বাঁচে না। ও আমার সবচেয়ে আপন, আর আপন মানুষের জন্য আমি পুরো দুনিয়াকে ছারখার করে দিতে পারি।"
উমাইরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখে আগুনের ঝিলিক। লারার দিকে ফিরে বলল—
-"বেঁধে রাখ ওকে। ওয়াসিফ ভাইকে মারার জন্য লোক পাঠিয়েছে....আমি সেখানে যাচ্ছি। আমি আর ওয়াসিফ ভাই মিলে এদের প্রমাণ সহ পুলিশে দেবো।"
কঠিন দৃঢ়তায় ঘুরে দাঁড়াল উমাইরা। ঠিক তখনই, এক বিষাক্ত মুহূর্তে বাতাস থমকে গেল। সাজ্জাদুল বিদ্যুৎ গতিতে লুকানো পিস্তলটি বের করে প্রথম গুলি ছুঁড়ে দিল শানের কপালে। এরপর কোনো চিন্তার ফাঁক না রেখেই দ্বিতীয় গুলি ছুড়ে মারল উমাইরার দিকে।
চিৎকার করে বলল—
-"আমার কোনো কাজের প্রমাণ নেই, উমাইরা! তুমি কিছুই করতে পারবে না! শান গেছে, এবার তোর পালা! ওয়াসিফের সাথে ওপারে ভালো থেকো!"
গুলির গতি যাকে ছুঁতে যাচ্ছিল, সে পড়ে যায় এক তীব্র ধাক্কায়।উমাইরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বুঝতে পারে, ওটা তার জন্য ছিল না। লারা....লারা তাকে ধাক্কা দিয়ে নিজের গায়ে গুলি নিয়েছে!
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেছে যে উমাইরার মাথা কাজ করার আগেই, সময় গলে গেছে। চোখের সামনে লারার কাঁপতে থাকা শরীরটা দেখে এক হাহাকারে উঠে চিৎকার করে উঠল—
-"লারা!!"
উমাইরা কাঁপা হাতে লারাকে জড়িয়ে ধরে। তারপর কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তলটা বের করে মুহূর্তে গুলি চালিয়ে দেয় সাজ্জাদুলের দিকে। একটা, দুইটা, তিনটা....পুরো ছয়টা গুলি, প্রতিটা বুলেট যেন প্রতিহিংসার বিষ ছিল।
সাজ্জাদুলের বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়। রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে, নির্মম প্রতিশোধের ছাপ রেখে।
উমাইরা এখনো এক হাতে লারাকে ধরে আছে। লারা এখনো অজ্ঞান হয়নি, কিন্তু যে কোনো মুহূর্তে হারিয়ে যেতে পারে। উমাইরা গার্ডদের দিকে চিৎকার করে—
-"গাড়ি বের করো! এক্ষুণি!"
গার্ডরা ছুটে এসে লারাকে ধরে দ্রুত গাড়িতে তোলে।
উমাইরা নিজের গাড়িতে উঠে ফোনে এহসানকে কল করে, কিন্তু ফোন বন্ধ। অগত্যা অয়নকে ফোন করল—
-"হাসপাতালে এখনই চলে আসো। কেনো? সেটা গিয়ে বলব।"
ফোন কেটে ফেলল সে। আর এরপর উমাইরা, যুদ্ধের ময়দানে ফিরল....ওয়াসিফকে রক্ষা করতে।
ওয়াসিফের ফোন ট্র্যাক করে উমাইরা সেই লোকেশনে যাচ্ছে। একটি খোলা মাঠের মতো জায়গা সামনে খাদ। ওয়াসিফের গাড়িটি মাঝখানে দুটি গাড়ি, দুটি দিক থেকে, যেন একসাথে মৃত্যুর ফাঁদে ঠেলে দিতে চলেছে ওয়াসিফকে। একটির মুখ প্রায় ঠেকেছে ওয়াসিফের গাড়িতে, আরেকটি সবে গতি তুলছে, মুহূর্তটাই যথেষ্ট তাকে থমকে দিতে।
তখনই, উমাইরার গাড়ি ঝড়ের গতিতে ছুটে আসে পাশ দিক থেকে! বিকট শব্দে ধাক্কা মারে সেই গাড়িটিকে, যেটি ওয়াসিফের দিকে ধেয়ে আসছিল। ধাক্কা এতটাই তীব্র যে গাড়িটি ছিটকে গিয়ে বহু দূরে উল্টে পড়ে যায়। চারপাশে ধুলোর ঘূর্ণি। এই আকস্মিক আঘাতে হতভম্ব হয়ে থেমে যায় অপর গাড়িটিও। নীরবতা ভেঙে শুধু শোনা যায়, কারো গলা শ্বাস নিচ্ছে, জীবিত, রুদ্ধ, প্রস্তুত।
ওয়াসিফ থমকে দাঁড়িয়ে গেল। চোখের সামনে যেন সময় থেমে গেছে। উমাইরার গাড়ির জানালা নামানো, আর সেই জানালা দিয়ে ঠিক তার চোখে চোখ রেখে উমাইরা একরাশ বিজয়ী হাসি ছুড়ে দিল। যেন সে বলে দিল—“আমি এসেছি, তোমায় বাঁচাতে। সব পেছনে ফেলে।”ওয়াসিফ বুঝে গেল, এই মেয়েটা তাকে রক্ষা করতে গিয়ে এমন এক জগতের দরজা ঠেলে এসেছে, যেখান থেকে ফেরার রাস্তা নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে সামনে এসে পড়ল একটি কালো গাড়ি, গর্জে উঠল ইঞ্জিন। আঘাত হানার আগেই উমাইরার হাত ঘুরল স্টিয়ারিংয়ে। শুরু হল পাগল করা গতি, ধোঁয়া আর থরথর কাঁপা উত্তেজনার এক অদ্ভুত লড়াই। তিনটি গাড়ি যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হল। উমাইরা ও ওয়াসিফ নিজেদের গাড়ি দিয়ে আঘাত করে মাঝের গাড়িটিকে আটকে রাখার চেষ্টা করল, যেন সেটি পালিয়ে যেতে না পারে। রাস্তায় তখন মৃত্যু নাচছিল।
হঠাৎ করেই বাতাস কাঁপিয়ে বাজতে শুরু করল পুলিশের সাইরেন। মুহূর্তেই থেমে গেল সব। পেশাদার প্রশান্তিতে চারদিক নিস্তব্ধ। কেবল সাইরেনের ধ্বনি আর জ্বলজ্বলে লাল-নীল আলো। পুলিশ এসে চারজন কালো পোশাক পরা লোককে গাড়ি থেকে বের করে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেল। ওয়াসিফ পুলিশকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পাশে এক নির্বাক নিঃসঙ্গতা, আর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, উমাইরা।
সে আস্তে আস্তে ওয়াসিফের পাশে এগিয়ে এল। চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। তারপর—
-"তুই এতটা রিস্ক নিলি কেন, উমাইরা?"
ওয়াসিফের কণ্ঠে স্পষ্ট গলা কাঁপা।
-"আপনি কি ভাবেন? আমি বসে দেখতাম, ওরা আপনাকে শেষ করে দিচ্ছে?"
"তারা তো শুধু ডাটা নিতে এসেছিল। আমি ম্যানেজ করে নিতাম।"
উমাইরা ঠান্ডা গলায় বলল—
-"তারা আপনাকে খুন করতে এসেছিল, ওয়াসিফ ভাই।"
ওয়াসিফ স্তব্ধ, "তুই জানলি কিভাবে?"
উমাইরার চোখে অদ্ভুত এক অন্ধকার খেলা করল।
-"এই সবকিছুর পেছনে ছিল সাজ্জাদুল ভাই। আমি চেয়েছিলাম তাদের আটকে রাখতে। কিন্তু...শান ভাই...সে…"
উমাইরার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। নিঃশ্বাস নিয়ে সে বলল—
-"সাজ্জাদুল ভাই শান ভাইকে গুলি করেছে । আমাকেও গুলি করেছিল....কিন্তু সেই গুলি লারা আমার হয়ে নিয়েছে।"
ওয়াসিফের মুখ ফ্যাকাশে।
-"আমি পাল্টা গুলি ছুঁড়েছিলাম। সাজ্জাদুল ভাইকে আমি মেরেছি।"
-"কি বলছিস! তুই খুন করেছিস!"ওয়াসিফ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।
উমাইরা চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। গলা স্থির।
-"লারাকে ওভাবে দেখে, আমি আর সহ্য করতে পারিনি। আর চিন্তার কিছু নেই, আমি একা ছিলাম না। লারার বাবার লোকজন ছিল, প্রায় দুই শতাধিক।"
ওয়াসিফ থমকে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এই মেয়েটা....এমন ঠান্ডা মাথায়, খুন করে এসেছে, অথচ মুখে এক ফোঁটা ভয় নেই।
ওয়াসিফের মনোভাব বুঝে উমাইরা শান্ত ভঙ্গিতে বলল—
-"সেল্ফ ডিফেন্স ছিল।"
ওয়াসিফ কিছুটা স্বস্তি পেল। অন্তত এই মেয়েটা জানে কোথায় থামতে হয়, কখন নিজের দায়িত্ব নিতে হয়।
-"আপনি তাহলে ফর্মুলা পাঠাতে পারেননি?"—উমাইরা আবার জিজ্ঞেস করল।
ওয়াসিফ মাথা নাড়ল।
-"না, পাঠিয়েছি। ঠিক সময়ে পৌঁছে যাবে।"
-"কে নিয়ে গেছে?"
-"এহসান, রুবাব আর সোফিয়া। আমি একা এসেছিলাম ওদের বিভ্রান্ত করার জন্য। ওদের পাঠিয়ে দিয়েছি গোপনে। কেউ টেরও পায়নি।"
---------------------
হাসপাতালের সাদা আলোয় ভরে আছে চারপাশ। শীতল, নির্বিকার পরিবেশে যেন কিছুটা হালকা উষ্ণতা নিয়ে প্রবেশ করল ওয়াসিফ ও উমাইরা। দুজনেই ছুটে এল লারার কেবিনে। শুয়ে আছে লারা, শান্ত মুখে। কপালে বাহুতে ব্যান্ডেজ, গুলিটি ছুঁয়ে গিয়েছে, তেমন কোনো বড় ক্ষতি হয়নি। কিন্তু ব্যথার থেকেও বেশি ভারী কিছু যেন জমে আছে সবার মনে।
বাড়ির সবাই তখন হাসপাতালের করিডোরে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কিন্তু সবার মুখে একটাই অভিব্যক্তি, অস্থিরতা।
উমাইরা ধীরে ধীরে সবটা খুলে বলল। সাজ্জাদুল, শান, অন্তিকার ষড়যন্ত্র, নিজের লড়াই, লারার আত্মত্যাগ....একে একে সমস্ত সত্য উঠে এলো আলোয়। কিছু কথা ছিল ঝড়ের মতো, কিছু ছিল নিঃশ্বাসের মতো ভারী। সব শুনে নেমে এলো এক নিস্তব্ধতা। যেন শব্দ ফুরিয়ে গেছে, কেবল উপলব্ধিই কথা বলে।
সবাই বুঝে গেল, এই সম্পর্ক, এই বন্ধুত্ব একরৈখিক নয়। এর রঙ একটির চেয়ে অনেক বেশি। একদিকে প্রীতি, লামিয়া, রাইসা, বন্ধুত্বের মুখোশ পরে প্রতিহিংসায় অন্ধ হয়ে উঠেছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত বিবেকের কাছে হার মেনে নিজের ভুল স্বীকার করে নতুন পথ বেছে নিয়েছে তারা।
অন্যদিকে লারা, এক মুহূর্তের জন্যও ভাবেনি নিজের জীবন নিয়ে। বন্ধুর জন্য বুকে গুলি নিতে একটুও দ্বিধা করেনি। তার নির্ভীক ভালোবাসা যেন সবাইকে থামিয়ে দিয়েছে একপলক। আর অন্যদিকে শান, সাজ্জাদুল, অন্তিকা, যারা বন্ধুত্বের আড়ালে লুকিয়ে রেখে এসেছিল প্রতারণা, হিংসা আর ধ্বংসের নীলনকশা।
তবে তলে তলে, নীরব ভঙ্গিতে, সাহস আর নির্ভরতার প্রতীক হয়ে পাশে ছিল রুবাব, সোফিয়া আর রাফসান। তারা যেন ছিল ছায়ার মতো, ওয়াসিফের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি যুদ্ধে চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
এই হাসপাতালের দেয়ালের মাঝে আজ কেবল এক গুলির গল্প নয়, একজন বন্ধুর সাহস, একজন প্রেমিকার দৃঢ়তা, কিছু বিশ্বাসঘাতকের মুখোশ উন্মোচন, আর কিছু নীরব যোদ্ধার নাম লেখা হয়ে গেল অদৃশ্য কালি দিয়ে।