আজ তারা বাংলাদেশে ফিরে আসছে। দীর্ঘ ২২ ঘণ্টার ক্লান্তিকর আকাশযাত্রা শেষে তারা সবাই বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। এয়ারপোর্টে নামতেই সবাই ব্যাগ-সুটকেস গুছিয়ে গাড়িতে তোলে। এরপর গাড়ির ইঞ্জিনে গতি লাগে, আর একে একে সকলে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে যায়। দীর্ঘপথের এ সফর শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত করে তুলেছে সকলকে। বাড়িতে ফিরে প্রতিটি মানুষ যেন তার আপন নীড়ে ফিরে আসে। ফ্রেশ হয়ে, নিঃশব্দে, ক্লান্ত দেহ ও তৃপ্ত মন নিয়ে, তারা সবাই ডুবে যায় এক দীর্ঘ, গভীর নিদ্রায়।
চারদিন পর রাহেলা বেগম ও রুবাইদা বেগম তাঁদের স্বামী ও ছেলে-মেয়েদের নিয়ে হাজির হলেন ভাই আজাদের বাসায়। উদ্দেশ্য, বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত করা। সবাই ড্রয়িং রুমে বসে আছে, আলোচনার অপেক্ষায়। তখনই আজাদ রহমান গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—
-"বিয়ের তারিখ আর মাত্র পনেরো দিন বাকি। স্নিগ্ধা আর নিধীর তো বেশিরভাগ কেনাকাটা শেষ, এবার পালা উমাইরা আর ওয়াসিফের। ওদের নিজেদের মতো করে কেনাকাটা করতে দিই, আর আমরা সবাইকে একে একে দাওয়াত পাঠিয়ে দিই, কি বলো তোমরা?"
ভাইয়ের কথায় দুই বোন ও তাঁদের স্বামীরা সম্মতির হালকা হাসি দিয়ে মাথা নাড়লেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াসিফের ফোনটা বেজে উঠল। সে উঠে বাইরে গিয়ে কলটা রিসিভ করে ফিরে এসে বলল—
-"তোমরা আগে এহসান, নিধী, মেহরাব আর স্নিগ্ধার বিয়েটা শেষ করো। আমি আজ রাতেই ইতালি যাচ্ছি। জরুরি ভিত্তিতে রুবাবের ফোন এসেছিল, একান্ত দরকারি কাজে যেতে হচ্ছে।"
ওর মুখের কথা শুনে রাহেলা বেগম যেন বজ্রাহত হলেন। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন—
-"কি বলছো তুমি! এই বিয়ের জন্য তো এতদিন অপেক্ষা করছিল সবাই, আর তুমি এখন আবার সেই একই ভুল করতে যাচ্ছো? তোমার বাবার হাসপাতাল আছে, আর কোনো রিসার্চ করতে হবে না তোমাকে! এবার আর না, কোথাও যাচ্ছো না তুমি।"
ওয়াসিফের কথা শুনে মুহূর্তেই ঘরের আবহাওয়া পাল্টে গেল। সবার মুখে ছায়া পড়ে গেলো। নিরবতা ভেঙে উঠে দাঁড়ালেন উমাইরার দাদু। ধীরে ধীরে ওয়াসিফের পাশে এসে দাঁড়িয়ে স্নিগ্ধ অথচ ভারী কণ্ঠে বললেন—
-"তোমার জন্য আমার নাতনি কতটা অপেক্ষা করেছে, জানো? এখন তুমি যদি চলে যাও, তার মনের অবস্থা তুমি বুঝবে না রে ভাই। বিয়েটা না হয় শেষ করে যাও, তারপর যা করার করো।"
ওয়াসিফ মাথা নিচু করে বলল—
-"সম্ভব নয়, নানাভাই। আমাকে আজ যেতেই হবে।"
সে একবার চোখ তুলে তাকাল, কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা উমাইরার দিকে। তার চোখে যেন কথার চেয়েও গভীর এক অস্বস্তি। সেই চিরচেনা শান্ত চোখে আজ অশ্রুর চিকচিকানি। মুহূর্তমাত্র চেয়ে থেকেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল ওয়াসিফ। তাকিয়ে থাকা আর তার পক্ষে সম্ভব হলো না। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। অনুচ্চারিত অনেক প্রশ্ন, অসহায়তা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে, এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণের মতো। নীরবতা ভেঙে উমাইরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রাহেলা বেগমের পাশে বসে। সেই নারীর কাঁপতে থাকা হাতদুটি নিজের হাতে তুলে নেয়। তারপর মায়াভরা চোখে চেয়ে তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দু মুছে দিয়ে কোমল কণ্ঠে বলে—
-"কেঁদো না, মনি। উনি যাক। ফিরে তো আসবেই। আর কোথায় যাবেন উনি বলো তো? উনার শেষ ঠিকানা, একমাত্র আশ্রয় তো উমাইরাই। আমি অপেক্ষা করেছি, এতদিন, এত বছর ধরে। সেও তো অপেক্ষা করেছে আমার জন্য। এবার আমি আর একটু অপেক্ষা করলেই বা ক্ষতি কী? যখন ফিরবে, তখন না হয় আমাদের বিয়ে হবে। অপেক্ষা তো আমার চিরচেনা সঙ্গী। আর ক’টা দিন, যদি এত বছর পার করে আসতে পারি, আরও ক’টা দিনও পারবো।"
ঘরে হঠাৎ যেন নিঃশব্দ এক আলো নেমে আসে। সবাই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে উমাইরার দিকে, তাঁর অবিচল, সহনশীল অথচ অটল চোখে। ওয়াসিফ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। মনে হয়, এমন ভাগ্যবান কেউই হয় না, যার জীবনে এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আসে, এমন মাটির মতো ধৈর্যশীল সঙ্গিনী জোটে। রাহেলা বেগম এবার চোখের জল গোপন না করেই আলতো করে উমাইরার মাথায় হাত রাখেন। বুকভরে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাঁর কপালে এক চুমু এঁকে দেন, ভরসা আর ভালোবাসার। আজাদ রহমান সেই গভীর নীরবতা ভেঙে বলেন—
-"উমাইরার যখন কোনো আপত্তি নেই, তখন আমাদের আর বলার কিছু থাকে না। ও তো কাজের জন্যই যাচ্ছে, ফিরে আসবেই, তোমরা আর কিছু বলো না।"
তার কথার রেশ ধরে উমাইরাও একরাশ হাসি নিয়ে বলে—
-"হ্যাঁ বাবা, একদম ঠিক বলছেন। সবাই মিলে আগে এহসান ভাই, মেহরাব ভাই, স্নিগ্ধা আর নিধীর বিয়েটা এনজয় করি। নিজে যদি এখন বিয়ে করি, তাহলে তাদের বিয়েটা উপভোগ করার সুযোগ হয়তো আর পাবো না। না বাবা, তা হতে দেওয়া যায় না। ওয়াসিফ ভাই, আপনি নির্ভয়ে যান, তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। আমি পুরো বিয়েটা আগাগোড়া এনজয় করব, তারপর আপনি এসে আমায় নিয়ে যাবেন।"
উমাইরার কণ্ঠে এমন এক নির্ভরতা, এমন এক প্রশান্তি যে, মুহূর্তেই ঘরভরতি চোখের জল হেসে ওঠে। আনন্দ আর আবেগে মিশে যায় নিঃশব্দ অশ্রুপাত। কারও মুখে আর কিছু বলার থাকে না, শুধু মনে হয়, এই মুহূর্তটা যেন চিরকাল থেকে যায়।
-----------------
ওয়াসিফকে পৌঁছে দিয়ে মেহরাব, এহসান ও অয়ন ফিরে আসে বাসায়। এহসান ও অয়ন একটুখানি থেমে কিছু একটা ভেবে সোজা উমাইরার ঘরের দিকে পা বাড়ায়। ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল, অথচ ভেতরটা অন্ধকার। নিঃশব্দে ঢুকে দেখে, বারান্দায় চুপচাপ বসে আছে উমাইরা, শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
অয়ন ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আলতো করে বোনের মাথায় হাত রাখে। উমাইরা চমকে তাকায় তার দিকে। এহসান এসে ওর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে।
অয়নের কণ্ঠে মমতা—
-"কষ্ট হচ্ছে, বোন?"
উমাইরা মলিন হেসে নিঃশব্দে মাথা নাড়ে, না বোঝায়।
অয়ন তাকে নিজের পাশে বসিয়ে মাথাটা নিজের কাঁধে ঠাঁই দেয়—
-"ভাইয়ের চোখ ফাঁকি দিতে চাস? বৃথা চেষ্টা উমাইরা।"
এক মুহূর্ত থেমে উমাইরা কাপা কন্ঠে বলে ওঠে—
-"কেনো ভাইয়া? কেনো সবকিছু এত কঠিন হয়ে আসে আমার জন্য? কেনো কিছুই সহজে পাই না?"
অয়নের কণ্ঠে সান্ত্বনা মিশে—
-"আল্লাহ তাদেরই বেশি পরীক্ষা নেন যাদের তিনি বেশি ভালোবাসেন।"
উমাইরার চোখ বেয়ে নেমে আসে নিঃশব্দ অশ্রু। কাঁপা কণ্ঠে বলে—
-"কত বছর ধরে অপেক্ষা করছি ভাইয়া! কিন্তু এই অপেক্ষার কি কোনো শেষ নেই?"
এহসান ওর হাত ধরে বলে—
-"অপেক্ষার ফল সবসময় মিষ্টি হয়।"
উমাইরা চমকে তাকায় এহসানের দিকে। এহসান আবার বলে—
-"আমরাও তো অপেক্ষা করতে পারি। ওয়াসিফ ভাই ফিরলে না হয় সবাই একসাথে বিয়ে করব, একসাথে আনন্দ ভাগ করে নেবো।"
এই কথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে যায় উমাইরার হৃদয়ে। সে হঠাৎই অয়নের কাঁধ থেকে মাথা তুলে নিয়ে এহসানের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলে—
-"না না ভাইয়া! এ কথা আর কখনো মুখে আনো না! বিনা দোষে পাঁচটা বছর শাস্তি পেয়েছি, অপবাদ সয়েছি। আমি আর কারো দোষের ভাগীদার হতে চাই না। স্নিগ্ধা, মেহরাব ভাই, নিধী, ওরা আমাকে দোষ না দিলেও আমার নিজেরই খারাপ লাগবে। আর কোনো অপরাধের বোঝা আমি বইতে পারব না। পারব না!"
ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে আসে স্নিগ্ধার ভেজা কণ্ঠ—
-"মাফ করে দে আপু। ছোটবেলার ভুলের জন্য এখনও তোর মন জয় করতে পারিনি, জানি। কিন্তু এবার দয়া করে মাফ করে দে। আমি তোর উপর কোনো দোষ চাপাবো না, কথা দিচ্ছি। শুধু তোর কষ্টটা আর দেখতে পারছি না। চাইলে আমরা সবাই মিলে ওয়াসিফ ভাই আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারি!"
স্নিগ্ধার পেছনে দাঁড়িয়ে মেহরাব ও নিধী। নিধী এগিয়ে এসে মাটিতে বসে পড়ে, চোখে ভেজা ভালোবাসা—
-"আমাদের বোন কষ্টে থাকবে আর আমরা নাচতে নাচতে বিয়ে করব, এমনটা কি হয়? এতটা স্বার্থপর নই আমরা। তুই শুধু একটা কথা বল, চাস কি না আমরা বিয়ে পিছিয়ে দিই।"
সবাই একসাথে কাঁপা চোখে তাকিয়ে থাকে উমাইরার দিকে। উমাইরা চোখ মুছে সবার দিকে তাকিয়ে বলে—
-"তোমরা এমন করো না মেহরাব ভাই। তোমরা আমাকে দোষ না দিলেও আমার ভেতরটা খারাপ লাগায় ভরে যাবে। আমি চাই, তোমাদের আনন্দে আমি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে নিতে পারি। আমাকেও একটু উপভোগ করতে দাও না তোমাদের খুশি। দেবে না আমাকেও একটু এনজয় করতে?"
এক মুহূর্ত স্তব্ধতা, তারপর যেন এক আবেগের বিস্ফোরণ। সবাই একসাথে উমাইরাকে জড়িয়ে ধরে উচ্চ স্বরে কেঁদে ওঠে—
-"দেবো। তোর খুশির জন্য আমরা সবকিছু করতে পারি। যদি এখন বিয়ে করলে তুই খুশি হোস, তবে তাই হবে।"
-------------------
আজ মেহরাব-স্নিগ্ধা এবং এহসান-নিধীর বিয়ের দিন। আনন্দ, উত্তেজনা আর আবেগে ভরা এক অনন্য দিন। বেশ ধুমধাম করেই আয়োজন করা হয়েছে এই শুভ পরিণয়ের। গায়ে হলুদ থেকে মেহেদি, প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল প্রাণবন্ত আর নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত। বাড়ির প্রতিটি কোণ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, আর হাসি-আনন্দে পরিপূর্ণ।
উমাইরা, প্রীতি, স্নিগ্ধা আর নিধি একসাথে পার্লারে এসেছে সাজতে। তাদের চোখে-মুখে বিয়ের উত্তেজনা আর এক অদ্ভুত প্রশান্তি। বাড়ির সবাই ইতোমধ্যেই কমিউনিটি সেন্টারে চলে গেছে। সেখানে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি আর ব্যস্ততা। আর এই সব কিছুর মধ্যেও কোথাও এক ফাঁকে, ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে আছেন ওয়াসিফ, যে কর্মব্যস্ততার কারণে আসতে না পারলেও প্রতিটি মুহূর্তে নিজের উপস্থিতি অনুভব করিয়ে যাচ্ছেন। পর্দার ওপারে থেকেও ও যেন ছুঁয়ে আছে সবাইকে।
কমিউনিটি সেন্টারের সাজসজ্জা যেন স্বপ্নের মতো এক চিত্রপট। মূল স্টেজটি রাখা হয়েছে সামনের দিকে উঁচু কাঠের মঞ্চে, যার পেছনে ব্যবহৃত হয়েছে সাদা ও মেহগনি রঙের ক্যানভাস। ব্যাকড্রপজুড়ে ঝুলানো হয়েছে সোনালি জালের ওপরে শত শত সাদা গোলাপ, অর্কিড, বেবি রোজ ও জারবেরা ফুল, সবকিছু যেন এক স্নিগ্ধ শুভ্রতায় ঢেকে রেখেছে মঞ্চকে। উপরে থেকে ঝুলে পড়া সোনালি ফেয়ারিলাইটগুলো রাতের আলোয় ঝিকিমিকি করে ঠিক যেন নেমে আসা তারা,মাটির কাছাকাছি। স্টেজের চার কোণায় রাখা হয়েছে চারটি বিশাল সাদা লিলির ফুলদানি, যেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে মৃদু অথচ গভীর সুবাস। পুরো হলঘর যেন সাদা ফুলের ঘ্রাণে ভরে গেছে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে ভালোবাসা আর শান্তির অনুভব। নবদম্পতির বসার সোফাটি ছিল রাজকীয় নকশার, সোনালি কাঠের কাজ আর হালকা ক্রিম রঙের মখমলের কুশনে মোড়ানো। তার পেছনে অর্ধবৃত্ত ফুলের গেট, যার গঠন তাজমহলের মতো গম্বুজাকৃতি, এক চিরন্তন প্রেমের প্রতিশ্রুতি যেন। মঞ্চ থেকে নিচের র্যাম্প বরাবর বিছানো ছিল শুভ্র কার্পেট, আর দুই পাশে ছড়ানো সাদা গোলাপ, জুঁই ও রজনীগন্ধার পাপড়ি। ছোট ছোট মোমবাতির কাঁচের দেউলি আর স্ফটিক ঝাড়বাতির আলোয় চারপাশ জ্বলজ্বল করছিল, যেন এক পরীর রাজ্য। সারা হলঘরের ছাদজুড়ে ঝুলছিল ফুলের সাদা লতা, হালকা ফিতা ও রঙহীন কাঁচের প্যারাসল, যা হাওয়ায় দুলে এক মুগ্ধ আবেশ ছড়াচ্ছিল। ভেতরের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সাদা ফুলের মতোই কোমল চন্দন আর ল্যাভেন্ডারের ঘ্রাণ, যা অতিথিদের মন জয় করে নিয়েছিল নিঃশব্দে।
দুই নববধূকে নিয়ে কমিউনিটি সেন্টারে এসে পৌঁছেছে উমাইরা ও প্রীতি। হলঘর যেন মুহূর্তেই আলোয় ভরে উঠল তাদের উপস্থিতিতে। চারপাশে সবার চোখে বিস্ময় আর প্রশংসার ঝলক। স্নিগ্ধা, আজ যেন এক অপার্থিব রমণী। সাদা ও সোনালি রঙের মিশ্রণে বোনা শাড়িতে সে যেন এক স্বর্গীয় অপ্সরা। কাঁধে ঝরে পড়া তার লাল দোপাট্টা মুখে তৈরি করেছে এক অভিজাত আভা। গায়ে স্বর্ণালংকারের মোহ, আর হাতে সাদা চুড়ির রিণরিণ শব্দে যেন বাজছে এক অনুচ্চারিত সঙ্গীত। তার মুখে হালকা মেকআপ, কিন্তু চোখে ছিল গভীর প্রশান্তি আর এক অনাবিল আস্থা। অন্যদিকে নিধী আজ নিজেই যেন এক রাজকন্যা। পরনে মেরুন রঙের জরি-কাজ করা লেহেঙ্গা, হাতে সোনালি চুড়ির ঝংকার। তার মাথায় লাল দোপাট্টা, যা মেরুন লেহেঙ্গার ঘন দোপাট্টার ওপর সযত্নে খোঁপা করে সাজানো। চোখে কাজল আর ঠোঁটে নুড রংয়ের ছোঁয়া, পুরো সাজটা নিখুঁত, সৌন্দর্যের অপার ব্যঞ্জনা। দুই নববধূর সৌন্দর্যে এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে দাঁড়িয়েছিল।
উমাইরা নিজেও আজ এক গৌরবময় বোন। নীল রঙের রাজকীয় শাড়িতে সে নিজেকে সাজিয়েছে বড়া বরের মতোই পরিপাটি করে। যেন ওর চোখেমুখে লেখা আছে গর্ব আর প্রশান্তির ইতিহাস। প্রীতি, মিষ্টি গোলাপি রঙের শাড়িতে এক কোমল সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি, নরম অথচ উজ্জ্বল। ওর চোখে খুশির ঝিলিক।
মেহরাব আজ বরাবরের মতোই চঞ্চল অথচ গর্বিত। পরনে শুভ্র সাদা শেরওয়ানি, ঠোঁটে হালকা হাসি, আর চোখে সেই চিরচেনা নির্ভরতা। এহসান, স্বর্ণালী রঙের শেরওয়ানিতে যেন এক উজ্জ্বল দিন, যাকে দেখে বোঝা যায়, আজ তার জীবনের এক নতুন সূর্যোদয়।
বিয়ের নিয়ম অনুযায়ী, দুই নববধূকে আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে। বিয়ের কাগজপত্র সই হয়ে যাওয়ার পর, মোল্লা সাহেবের কণ্ঠে দোয়া মিশ্রিত ঘোষণা, “বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে”, শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সবার চোখ ছলছল করে ওঠে। এরপর নববধূদের বিশেষ আয়নায় মুখো দর্শন করানো হয়। বড় কনের আয়নায় বরের প্রতিচ্ছবি দেখার ঐতিহ্যপূর্ণ মুহূর্তে, চারপাশের বাতাসে যেন ছড়িয়ে পড়ে এক নিঃশব্দ আবেগ। তারপর একে একে দুই নববধূকে স্টেজে নিয়ে আসা হয়। ফুল, আলো আর সঙ্গীতের মাঝে তারা বসে পরেন সজ্জিত মঞ্চে, যেখানে অপেক্ষা করছে তাদের জীবনের নতুন গল্প, নতুন শুরু।
----------------------
আজ এক মাস পার হয়ে গেছে, ওয়াসিফ চলে গেছে কর্মস্থলে। বিয়েতে আসার কথা থাকলেও শেষমেশ কাজের চাপে আর হয়ে ওঠেনি। সে দিনগুলিতে, উমাইরা নিজেই এত ব্যস্ত ছিল বিয়ের নানা আয়োজন, দায়িত্ব আর অতিথি সেবায় যে ওয়াসিফের অনুপস্থিতি নিয়ে মনখারাপ করার সময়টুকুও ছিল না। কিন্তু এখন....বিয়ের রঙিন কোলাহল শেষ। আলোর মালা খুলে ফেলা হয়েছে, অতিথিরা ফিরেছে যার যার গন্তব্যে। ঘর ফিরে পেয়েছে আগের নিস্তব্ধতা, আর সেই নীরবতার ভেতরই উঁকি দেয় এক বিষণ্ন শূন্যতা।
স্নিগ্ধা ও মেহরাব তাদের হানিমুন কাটিয়ে ফিরেছে মালদ্বীপ থেকে। সমুদ্রের নীলতায় ছিল তাদের প্রেমের নতুন গল্প। এহসান ও নিধী সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি ঠান্ডায় খুঁজে নিয়েছে নিজেদের নিভৃতির মুহূর্ত। সবার জীবন এখন নিজের ছন্দে ফিরেছে, নতুন গন্তব্য, নতুন ব্যস্ততা, নতুন সম্পর্কের গভীরতায়।
আর উমাইরা? সে দাঁড়িয়ে আছে এক গভীর নিঃসঙ্গতার চৌকাঠে। সবাই নিজ নিজ জীবনে ফিরে গেলেও, ও যেন আটকে আছে কোথাও....এক অদৃশ্য অপেক্ষার ঘরবন্দি। স্নিগ্ধার কথা খুব মনে পড়ে।
শুধু বোন নয়, যেন নিজের ছোট এক সত্ত্বা ছিল স্নিগ্ধা। তার সঙ্গে বিয়ের পর পুরোপুরি সময় কাটাতে না পারার এক চাপা আক্ষেপ মনকে তাড়িয়ে ফেরে। মাঝে মাঝে স্নিগ্ধার শ্বশুরবাড়ি যায়, মনির বাসায় বসে তার হাতে রান্না করে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, তবু সেই শূন্যতা যেন কাটে না, মনে জমে থাকা বাকি কথাগুলো আর বের হয় না। আর ওয়াসিফ? সে এখন কেবল পর্দার ওপারে এক মুখ, এক কণ্ঠস্বর, আর অনেক অনুপস্থিতি। এক মাস হয়ে গেল, তবু ও জানায় না কবে ফিরবে। একটাও স্পষ্ট কথা নেই, শুধু হাসিমুখে ‘শিগগিরই’ বলেই ফোন কেটে দেয়। উমাইরার দিন কেটে যায় নিঃশব্দ প্রশ্নে— "কবে ফিরবে ও? কবে আবার সেই চেনা চোখ দুটো সামনে বসে বলবে, 'আমি এসে গেছি উমাইরা'?" সব ফিরে আসলেও, উমাইরার হৃদয়ে এখনো শূন্যতার দীর্ঘ অবকাশ। আর সেই শূন্যতা জুড়ে শুধুই এক নাম, ওয়াসিফ।
----------------
সকাল থেকে কেমন এক ঘোরের মধ্যে আছে উমাইরা। শরীরটা ভার মনে হচ্ছে, বারবার চোখ জড়িয়ে আসছে। পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে সে, বারবার জেগে উঠে আবার যেন নিঃশ্বাসে ঘুম নামে। বাড়ির কোথাও যেন শোরগোল হচ্ছে, কিসের এত ব্যস্ততা, কারা আসছে-যাচ্ছে, এসবের কিছুই সে বুঝে উঠতে পারছে না। আজ যেন পুরো বাড়িটাই ব্যতিক্রমভাবে সরব। মনিরাও এসে গেছে, সবাই বাড়িতে উপস্থিত। অথচ উমাইরার কিছুই জানা নেই।
অবশেষে দুপুরের দিকে ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে। ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসে। আর নেমেই চোখ বড় হয়ে যায় বিস্ময়ে। পুরো বাড়ি সাদা ফুলে সাজানো! বিশেষ করে সাদা লিলি আর অন্যান্য রকমারি সাদা ফুলে যেন তৈরি হয়েছে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য। সেই সুবাসে গোটা বাড়ি যেন এক মোহময় পরিবেশে আচ্ছন্ন। হতবিহ্বল চোখে চারপাশে তাকিয়ে দেখে, রান্নাঘরে মা, চাচী, মনিরা সবাই ব্যস্ত রান্নাবান্নায়। বাবা, চাচা, মামারা ঘরের নানা কাজে হাত লাগিয়েছেন। উমাইরা রান্না ঘরে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল—
-"আজ বাড়িতে কি কোনো উৎসব আম্মু?"
রুমানা বেগম শুধু মুচকি হেসে বললেন—
-"হ্যাঁ রে মা। তুই যা, তোর ঘরে যা। নাস্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি। প্রীতি তোকে খাইয়ে দেবে।"
উমাইরা একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। তখনই স্নিগ্ধা এসে তাকে টেনে নিয়ে গেল উপরে। স্নিগ্ধা ওকে বসিয়ে হাতজোড়া মেহেন্দি পড়াতে লাগল। উমাইরার বিরক্তি চরমে পৌঁছাল—
-"কি করছিস এটা? মেহেন্দি পড়তে বসিস কেনো! আমি এখনো খাইওনি!"
ঠিক সেই মুহূর্তে প্রীতি রুমে ঢুকল হাতে খাবার নিয়ে।
-"এত কথা বলিস কেনো! চুপচাপ বস। আমি খাইয়ে দিচ্ছি। আর আমরা সকলে সকালেই মেহেন্দি পড়েছি, তুই তখন ঘুমাচ্ছিলি তাই তোকে এখন পড়ানো হচ্ছে। বেশি কথা না বলে হাতটা বাড়া।"
উমাইরা তাকিয়ে দেখে, সত্যিই সবাই মেহেন্দি পড়েছে। একটা দলগত উচ্ছ্বাসের ছোঁয়া যেন সবার হাতে রঙে উঠেছে। সে আর কিছু না ভেবে চুপচাপ মেহেন্দি পড়ে নিল। খাবার খাওয়া শেষে মেহেন্দির রঙ শুকাতে দিতে দিতে দুপুর কেটে গেল। মেহেন্দি তুলে গোসল করে এসে চুল শুকাতে শুকাতে সে ফোনটা হাতে নেয়। ওয়াসিফ আজ কোনো ফোন করেনি, মেসেজও না। উমাইরা চিন্তিত হয়ে কল দিল, কিন্তু সেদিক থেকেও কোনো সাড়া নেই।
এদিকে বাড়িতে আগত অতিথিদের সংখ্যা বাড়ছে। মামা-মামি, নানু-নানী, প্রীতির পরিবারের সবাই, এমনকি রাইসা আর লামিয়াও এসে গেছে। অথচ আজ তো কোনো জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী কিছুই না, তাহলে এমন ভিড় কেন?
বিকেলে সবাই সাজতে শুরু করল। প্রীতি, নিধী, স্নিগ্ধা, রাইসা, লামিয়া সবাই উমাইরার ঘরে এসে হাজির। তারা দল বেঁধে তাকে সাজাতে শুরু করল।
উমাইরা বিরক্ত হয়ে বলল—
-"কি শুরু করেছিস তোরা? আমি কি সাজতে পারি না? আমাকে সাজিয়ে দিতে হবে নাকি? আর এই লাল টুকটুকে বেনারসী কেন এনেছিস? বিয়ে বুঝি আজ আমার? ওয়াসিফ ভাই তো দেশে নেই!"
প্রীতি হাসিমুখে বলল—
-"আরে দেখ না, আমরাও একই রকম শাড়ি পড়ছি। শুধু রঙ আর কাজ আলাদা। আজ সবাই মিলে পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে চাচ্ছি, তাই সাজ-পোশাকের এই আয়োজন। বেশি চিন্তা করিস না।"
উমাইরা সন্দেহের চোখে তাকাল। কিন্তু সবাই এমনভাবে হাসিমুখে আশ্বস্ত করল যে আর প্রশ্ন তোলার জায়গাই থাকল না। তারপর, সবাই মিলে সাজিয়ে দিল উমাইরাকে। লাল টুকটুকে বেনারসী,
হাতভর্তি লাল চুড়ি, চোখে হালকা কাজল,
কপালে লাল টিপ, আর ঠোঁটে টুকটুকে লাল লিপস্টিক। সাজ শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ও নিজেকেই চিনতে পারল না। অপ্সরার মতো লাগছিল তাকে। যেন রক্তিম আলোয় ভেজা এক শেমাবতী রমণী, যৌবনের ছায়া গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে এক অজানা প্রহরের অপেক্ষায়।
সন্ধ্যাবেলা। আলোর ঝিকিমিকি আর ফুলের সুবাসে ভরে আছে পুরো বাড়ি। উমাইরা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না, কিসের এত আয়োজন, কিসের এত সাজসজ্জা? ঠিক তখনই প্রীতি হাতে তুলে নেয় এক লাল টুকটুকে দোপাট্টা। ধীরে ধীরে সেটা এনে উমাইরার মাথায় পরিয়ে দেয়। উমাইরা আঁতকে উঠে বলে—
-"না না, এটা কি করছিস? দোপাট্টা পরাচ্ছিস কেনো? আমি কিছুই জানি না, এই সাজ কেনো?"
প্রীতি কিছু না বলে শুধু মিষ্টি করে হাসে। কোনো কথায় কর্ণপাত না করে সে শক্ত হাতে দোপাট্টাটা ঠিক করে গুজে দেয় ওর মাথায়। তারপর একে একে স্নিগ্ধা, নিধী, রাইসা, লামিয়া সবাই এসে ঘিরে ধরে উমাইরাকে। একরকম জোর করেই নিচে নামিয়ে আনে সিঁড়ির ধাপে ধাপে। উমাইরার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। সে নীচের প্রতিটি ধাপে নামতে নামতে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। ড্রয়িংরুমে পৌঁছে সে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়ায়। ঘরের মাঝখানে সাদা ফুলে তৈরি করা একটি বৃত্তাকার বেরা, তার এক পাশে পুরুষেরা আর অন্যপাশে মহিলারা বসে আছেন। বেরার ওপাশে বাবা, চাচা, মামা, বাবাইরা সবাই বসে আছেন।
আর তাঁদের পাশেই বসে আছে একজন অপরিচিত পুরুষ সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, চেহারাটা ফুলের কারণে স্পষ্ট নয়, তবে গাম্ভীর্যপূর্ণ উপস্থিতি!
সামনের সোফায় বসে আছেন দাদা-দাদী, নানা-নানী, প্রীতির মা-বাবা, মনিরা, সবার চোখে এক অভিভাবকসুলভ উজ্জ্বলতা। এই দৃশ্য দেখে উমাইরার বুক ধক করে ওঠে। সে কাঁপা গলায় পাশে দাঁড়ানো প্রীতিকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে—
-"কি হচ্ছে এসব? আমাকে বউ সাজিয়ে নিচে নামাচ্ছিস কেনো? আর এই বিয়ের মত পরিবেশ? ওয়াসিফ ভাই তো দেশে নেই! তাহলে, কী হচ্ছে এখানে? উত্তর দে প্রীতি!"
প্রীতির মুখে এক রহস্যময় হাসি। সে শান্তভাবে বলে—
-"নিচে গেলেই সব বুঝতে পারবি। একদম চুপ। এখন আর কোনো প্রশ্ন না, শুধু বসে থাক।"
এরপর কিছু বোঝার আগেই স্নিগ্ধা, নিধী ও প্রীতি মিলে উমাইরাকে এনে ফুলের বৃত্তের ওপর পাশে বসিয়ে দেয়। তার চারপাশে বসে পড়ে ওরা সবাই, কেউ ওর হাত ধরে, কেউ চুপচাপ ওর পাশে বসে।
সন্ধ্যার আকাশে ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে তারা। বাড়িটা যেন স্বপ্নের মত এক আলোয় মোড়ানো। সাদা লিলি আর গোলাপের গন্ধে আচ্ছন্ন চারপাশ, বাতাসেও যেন এক মধুরতা। উমাইরার হৃদপিণ্ড থেমে থেমে ধুকপুক করছে, সে এখনো কিছুই জানে না ঠিকভাবে। মাথায় লাল টুকটুকে দোপাট্টা, চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে টুকটুকে লিপস্টিক, সে আজ যেন নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছে এক কনের মতো।
তার সামনে ফুলে মোড়ানো বৃত্তাকার জায়গা, একপাশে পুরুষরা, অন্যপাশে মহিলারা বসে আছেন। ঘরের মধ্যভাগে বসে আছে সাদা পাঞ্জাবি পরা এক যুবক, চেহারাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, তবে উপস্থিতিটা যেন ছায়ার মত চেনা....যেন হৃদয়ের খুব চেনা অলিতে লুকিয়ে থাকা কেউ।
ঠিক তখনই মাইক্রোফোনের সামনে এসে বসলেন একজন সম্মানিত হুজুর। সাদা সুন্নতী পাঞ্জাবি, চোখেমুখে নুর, গম্ভীর অথচ কোমল কণ্ঠের প্রবীণ মানুষ। ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বাতাস যেন থমকে দাঁড়ায়। হুজুর চোখ বুজে শুরু করলেন পবিত্র নিকাহ খুতবা—
-"ইন্নাল হামদা লিল্লাহ, নাহমাদুহু ওয়া নাস্তাঈনুহু ওয়া নাস্তাগফিরুহু।"
-"আম্মা বা’দু। ফাক্বালাল্লাহু তাআলা ফিল কুরআনিল মাজীদ।"
খুতবার পর চোখ তুলে তাকালেন উপস্থিতদের দিকে। কণ্ঠে দৃঢ়তা ও স্নিগ্ধতা একসাথে।
-"আমরা আজ এখানে এক পবিত্র বন্ধনের সাক্ষী হতে একত্র হয়েছি। এখন প্রথমে কনে সাহেবা আমিরা রহমান উমাইরার সম্মতি নেওয়া হবে।"
হুজুর পর্দার দিকে তাকালেন। এক নারী প্রতিনিধি (উমাইরার কাকীমনি) এগিয়ে এসে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললেন—
-"কনে আমিরা রহমান উমাইরা সাহেবা, আপনি কি ওসমান আয়মানের পুত্র ওয়াসিফ আয়মান সাহেবকে, এক কোটি এক টাকা দেনমোহরের বিনিময়ে, আল্লাহর নামে বিয়ে করতে সম্মত আছেন?”
এই নামটা শুনেই উমাইরার ভেতরটা যেন কেঁপে উঠল।
ওয়াসিফ আয়মান?এক মুহূর্তে নিঃশব্দ হয়ে গেল চারপাশ। যেন শব্দগুলো বাতাসের ভেতর ঘুরে ফিরে বারবার তার কানে এসে ধাক্কা মারছে। ওয়াসিফ! ওর নামই বলল? কিন্তু....কিভাবে? কবে এল সে? কেউ তো কিছু জানায়নি.... সে যেন হঠাৎ কোনো অচেনা দৃশ্যের মাঝখানে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। গলার কাছে কিছু আটকে গেছে। ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে। হৃদস্পন্দন এতটা জোরে শুনতে পাচ্ছে, যেন বাইরেও কেউ শুনে ফেলবে। এটা কি স্বপ্ন? না কি কেউ ঠাট্টা করছে আমার সঙ্গে? এটা কেমন বিয়ে? আমাকেই তো কিছু বলা হয়নি! পাশ থেকে হঠাৎ প্রীতি ধাক্কা দিলো, কনুই দিয়ে।
-"বিয়ে করবি না নাকি? কথা বলছিস না কেনো? সবাই অপেক্ষা করছে!"
উমাইরা তাকিয়ে দেখে, সত্যি....সবাই চুপ করে তাকিয়ে আছে পর্দার এই পাশটায়। মাথা কাজ করছে না। ভেতরটা কাঁপছে, কিন্তু বাইরে থেকে সে বোবা।
সে মিনমিন করে বলল—
-"কি হচ্ছে এসব? বিয়ে আজ? আর ও...ওয়াসিফ ভাই...এভাবে?"
প্রীতি হাসিমুখে ফিসফিস করল—
-"আজই এসেছে। সব পরে বলবো। এখন শুধু কবুল বল। কষ্ট হলেও, মন দিয়ে বল।"
উমাইরা থতমত খেয়ে ওয়াসিফের দিকে তাকাল, সাদা পাঞ্জাবিতে মাথা নিচু করা এক পরিচিত মানুষ। এতদিন শুধু দিন গুনেছে, কোন আজকের দিনটা আসবে। এখন সেই মানুষ, তার সামনে, তার জীবনের নাম হয়ে উঠতে যাচ্ছে। সে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত, তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে বলল—
-"আমি....আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি।"
আবার বলুন—
-"আমি আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি।"
তৃতীয়বার বলুন—
-"আমি আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি।"
পর্দার পেছনে নীরব সাক্ষীরা মাথা নাড়ে। কেউ কেউ ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে ওঠে। এরপর হুজুর মাইক্রোফোনে এসে বলেন, এবার পাত্র সাহেবের কবুল নেওয়া হবে।
তিনি ওয়াসিফের দিকে তাকিয়ে বললেন—
-"ওয়াসিফ আয়মান সাহেব, আপনি কি আজাদ রহমান সাহেবের কন্যা, আমিরা রহমান উমাইরাকে, এক কোটি এক টাকা দেনমোহরের বিনিময়ে, আল্লাহর নামে বিয়ে করতে সম্মত আছেন?"
ওয়াসিফ মাথা নিচু করে, মৃদু গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
-"জি, আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি।"
আবার বলুন—
-"আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি।"
তৃতীয়বার—
-"আলহামদুলিল্লাহ কবুল করছি।"
হুজুর চারপাশে তাকিয়ে বললেন—
-"সাক্ষী ভাইয়েরা, আপনারা কি তিনবার কবুল শুনেছেন?"
-"জি, শুনেছি।
হুজুর দু'হাত তুলে বললেন—
-"বারাকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারাকা ‘আলাইকা, ওয়া জামা‘আ বাইনাকুমা ফি খাইর..." ("আল্লাহ তোমাদের জন্য বরকত দান করুন, একত্রে কল্যাণপূর্ণ জীবন দান করুন।") সবাই "আমীন" বলে ওঠে। হুজুর তিনবার কবুল শোনার পর সামনে রাখা কাবিননামা হাতে তুলে নেন। প্রথমে বর ওয়াসিফ আয়মান কলম হাতে নিয়ে নিজের নামের নিচে স্বাক্ষর করে।পাশে বসা দুই সাক্ষীও যথাক্রমে স্বাক্ষর দিয়ে দেন। এরপর হুজুর কাবিননামা ভাঁজ করে পর্দার ওপারে বাড়িয়ে দেন।উমাইরা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে কাগজটার দিকে।তারপর ধীরে মাথা নিচু করে স্বাক্ষর করে ফেলে। পাশেই বসা কনের পক্ষের দুই নারী সাক্ষীও একে একে নাম লিখে দেন।কাজী চোখ তুলে তাকিয়ে মৃদু হাসেন সবকিছু সম্পন্ন।
-"আলহামদুলিল্লাহ! পবিত্র নিকাহ সম্পন্ন হয়েছে। এখন কনের পক্ষ থেকে মুখ দেখা করানো হবে, ইনশাআল্লাহ।"
নিকাহ শেষ। আকাশের তারা একে একে জ্বলে উঠছে, কিন্তু বাড়ির ভেতরের আলো যেন আকাশের চেয়েও উজ্জ্বল। ঘরজুড়ে গুনগুন কথাবার্তা, চোখে চোখে কৌতূহল আর মুখে মুখে হাসির ঝিলিক। কিন্তু এই কোলাহলের মাঝেও উমাইরা বসে আছে স্তব্ধ, নিশ্চুপ, অবাক। সবাই যখন খুশিতে ব্যস্ত, তখনই প্রীতি এসে উমাইরার কানে ফিসফিস করে বলল—
-"চল, এখন তোর মুখ দেখা হবে।"
উমাইরা চমকে তাকায়।
-"মানে?"
প্রীতি হাসে, চোখে জল।
-"মানে তুই এখন ওয়াসিফ ভাইয়ের বউ, উমাইরা। নতুন দম্পতিদের মুখোদর্ষণ হবে চল।"
সবাই মিলে ধীরে ধীরে উমাইরাকে নিয়ে আসা হয় নিকাহের বেদীর কাছে। ফুলের মালায় সাজানো একটি ছোট আয়না রাখা হয়েছে মাঝখানে। একপাশে ওয়াসিফ বসে আছে, চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। আয়নার দু’পাশে বসানো হলো উমাইরা ও ওয়াসিফকে। তাদের মাঝখানে রাখা হল সেই আয়নাখানা, যে আয়নায় একসাথে প্রথমবার নিজের প্রতিচ্ছবিতে তারা দেখবে একে অপরকে। ঘরের সবাই চুপ। যেন নিঃশ্বাস বন্ধ। নানু ফিসফিস করে দোয়া পড়ছেন। কেউ ‘মাশাআল্লাহ’ বলে ফিসফিস করে উঠছে। প্রীতি ধীরে ধীরে উমাইরার চোখের ওপরের পাতলা ওড়নাটা সরিয়ে দেয়। ওয়াসিফ তার দিকে তাকায় না, সে শুধু চেয়ে থাকে আয়নায়। আর ঠিক সেই আয়নায়...দুই জোড়া চোখ একসাথে পড়ে।
সময় থেমে যায়। উমাইরার ঠোঁটে লাজুক হাসি। চোখে জল। বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। ওয়াসিফ হঠাৎ খুব নিচু স্বরে বলে—
-"আজ তোর চোখে আমারই প্রতিফলন, তুই আমার হয়ে গেছিস চিরতরে।"
উমাইরা তার চোখে চোখ রাখে। জবাব দেয় না। শুধু চোখ নামিয়ে আঙুলের মাথা দিয়ে চুড়ির টুংটাং শব্দ করে। ওয়াসিফ তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।
এক মুঠো হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে কেবল ফিসফিস করে বলে—
-"আজ থেকে আমি তোর, আর তুই আমার, একান্ত, ব্যক্তিগত, নিঃশর্ত ভালোবাসার অধিকারী। আজ আমি তোর মোহনমল্লিকার হৃদয়ের একচ্ছত্র রাজা, আর তুই আমার মনের হিংহাসনের একমাত্র রানি। আমাদের গল্পটা আজ থেকে শুধু আমাদের। শব্দের ঊর্ধ্বে, চোখের ইশারায় বাঁধা এক বন্ধন, যেখানে তুই আমি বলে কিছু নেই, শুধু 'আমরা' আছি।"
চারপাশে সবাই হেসে ওঠে। স্নিগ্ধা চুপচাপ একরাশ টিস্যু উমাইরার হাতে গুঁজে দেয়। উমাইরা চোখ মুছে, কিন্তু হাসি লুকোতে পারে না।
---------------
বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত গভীর হয়ে এলো। একে একে সবাই রাতের খাবার খেয়ে নিচ্ছে। কোথাও রসবর্ণা হাসি, কোথাও কান্না মাখা বিদায়। রহমান ভিলায় সবাই রয়ে গেল, শুধুমাত্র ওয়াসিফ ও উমাইরা বিদায় নিল। আশ্চর্যের বিষয়, তাদের সঙ্গে আর কেউ গেল না। নিজের কালো জিপে ওয়াসিফ উমাইরাকে নিয়ে বসে পড়লো। উমাইরার চোখে পড়লো, কেউ বিদায় দিতে এল না, কেউ পেছন পেছন আসছে না। একটু বিস্মিত গলায় বলল সে নিজের মনে,
‘হয়তো অন্য গাড়িতে করে বাকিরা আসছে।’
গাড়ি ছুটছে, ঢাকার কোলাহল ছুঁয়ে, হর্নের সুরে ভেসে। ট্রাফিক লাইট, বিলবোর্ড, গাড়ির ফ্ল্যাশ, শহরের আলোছায়া এক মায়াবী আবরণে ঢেকে রাখছে রাতটাকে। উমাইরার নজর পড়লো, এই রাস্তা তো ওয়াসিফের বাড়ির দিকে নয়। সে ধীরে চেয়ে জিজ্ঞাসা করল—
-"কোথায় যাচ্ছো আমরা? এটা তো বাসার রাস্তা না?"
ওয়াসিফের চোখ রাস্তার উপর, ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি। সে শান্ত গলায় বলল—
-"বাড়িতে যাচ্ছি না আমরা।"
উমাইরার কপালে ভাঁজ।
-"তাহলে কোথায়?"
ওয়াসিফ শুধু বলল—
-"গেলেই দেখবি। এখন চুপচাপ বসে থাক।"
উমাইরা চুপ করে থাকে না। আবার প্রশ্ন করে—
-"আপনি আজ আসবেন, সেটা তো একবার বলতেও পারতেন! এভাবে কেউ বিয়ে করে? আমি কিছুই জানতাম না। আপনি এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, অথচ আমায় কিছুই বললেন না!"
ওয়াসিফ একচোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—
-"আমি করি।"
উমাইরার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়—
-"আশ্চর্য! আমাকে একবার জানাবেন না আপনি আজ আসছেন? আজ আমার বিয়ে অথচ কবুল বলার মুহূর্ত পর্যন্তও আমি জানলাম না!"
ওয়াসিফ এবার গম্ভীর স্বরে বলল—
-"আমি তো এটাই চেয়েছিলাম।"
উমাইরার গলার স্বর নরম হয়, একটু নিচু।
-"কিন্তু কেনো?"
গাড়ির গতি হঠাৎ থেমে যায়, ট্রাফিকে আটকে পড়ে।
ওয়াসিফ এবার রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে ঘুরে তাকায় উমাইরার দিকে। চোখে জ্বলজ্বল করে এক নিষ্পাপ সত্য। গভীর দৃষ্টিতে বলে—
-"আমি তোকে পেতে চেয়েছিলাম নিঃশব্দে, নিঃশর্তে, একটুখানি লাজুক লাল শাড়িতে মোড়ানো তোর সেই চুপচাপ রূপটাকে নিজের করে নিতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম আমাদের বিয়েটা হোক শুধু তোর আর আমার জানার মতো, কিছু কাছের মানুষের চোখে দেখা এক অনাড়ম্বর শুভক্ষণ, না থাকুক কোনো উচ্চস্বরে বাজনা, না থাকুক চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা। থাকুক শুধু কিছু নিঃশ্বাসের শব্দ, চোখে চোখ রেখে বোঝা কিছু না-বলা কথা। তোকে আগে কিছু বলিনি, কারণ আমি চেয়েছিলাম তোর চোখে সেই চমকটা দেখতে, সেই বিশ্বাস না-হওয়ার বিস্ময়, সেই মৃদু কাপা-কাপা আবেগ, যেটা শুধু একবারই আসে, যখন কেউ সত্যি ভালোবাসা দিয়ে চমকে দেয়। এটা ছিল আমার ভালোবাসার সারপ্রাইজ, যেটাতে ছিল না কোনো আড়ম্বর, শুধু ছিল তুই আর আমি, আমাদের নিঃশব্দ প্রেম।"
উমাইরা কিছু বলে না। মুখ ফেরায় জানালার দিকে।
আলোর রেখা চোখে এসে পড়ে, লাল ওড়নার ভাঁজে খেলে যায় চাঁদের আলো। সে চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে, মনে মনে যেন কিছু অনুভব করছে।
ট্র্যাফিক ছেড়ে দিলে গাড়ি আবার চলতে শুরু করে।
আকাশে জ্বলজ্বল করছে একফালি চাঁদ, আর গাড়ির ভিতরে, চুপচাপ এগিয়ে যাচ্ছে দু’টি হৃদয়, একটি অনিশ্চিত অথচ প্রতীক্ষিত গন্তব্যের দিকে।
শহরের কোলাহল অনেক পেছনে ফেলে এসেছে ওয়াসিফের জিপ। এখন পাহাড়ি রাস্তায় চাঁদের আলো ফেলে রেখেছে এক রহস্যময় ছায়া। রাস্তার বাঁকে বাঁকে আলো-আঁধারির খেলা। উমাইরা জানালার পাশে বসে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠল—
-"সিলেট যাচ্ছি আমরা?"
ওয়াসিফ মৃদু হেসে মাথা নাড়াল।
-"বাসায় না গিয়ে সিলেট কেনো যাচ্ছি আমরা?" উমাইরার কণ্ঠে কৌতূহল জড়ানো উল্লাস।
ওয়াসিফ এক পলক তাকিয়ে বলল—
-"তোর স্বপ্নের মধুচন্দ্রিমা পূরণ করতে!"
উমাইরা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। মুখে যেন লাল রঙ ছড়িয়ে পড়ল সন্ধ্যার আভায়। ওয়াসিফ তার দিকে তাকিয়ে নরম হাসে, সেই হাসিতে ছিল গর্ব, প্রেম আর চিরন্তন অধিকার। রাস্তায় এক দোকান দেখে ওয়াসিফ গাড়ি থামিয়ে নামল। কিছু শুকনো খাবার, পানি, জুস নিয়ে ফিরে এল। উমাইরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
-"খেয়ে নে, যেতে যেতে সকাল হয়ে যাবে।"
-"এখন খিদে নেই, পড়ে খাবো।" উমাইরা মৃদু হেসে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল।
ওয়াসিফ পেছনের সিটে খাবার রেখে আবার সামনে এসে বসল। এবার হঠাৎ সিটবেল্ট খুলে উমাইরার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাকে টেনে নিজের কোলে বসাল।
উমাইরা চমকে উঠল। লজ্জায় গুটিয়ে গেল যেন। ওয়াসিফ তার থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে মুখটা তুলে ধরল নিজের দিকে। একদৃষ্টে চেয়ে রইল। যেন কোনো অপূর্ব শিল্পকর্মের দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপর চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—
-"আজ তোমার জ্যোৎস্নাও ফিকে লাগছে, চাঁদ।
লজ্জা হওয়া উচিত তোমার, আমার নববধূর পাশে আজ তুমি কিছুই না। তাঁর চোখে যেমন দীপ্তি, তোমার আলোয় তা নেই, তাঁর মুখে যে প্রশান্তি, তা তুমি দিতে পারো না। আজ রাতের আসল জ্যোত্স্না তো সে, আমার নববধূ।"
উমাইরা চোখ তুলে চাইল। চোখে কেমন এক আর্দ্র আলো। ওয়াসিফ সেই চোখে চোখ রেখে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল, একটি স্নেহ, প্রেম আর ইবাদতের স্পর্শে।
-"তোকে আজ বউ রূপে দেখতে পেয়ে আমি যেন হারিয়ে যাচ্ছি। এই লাল শাড়িতে তুই এমন আকর্ষণীয় যে, নিজেকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তুই এত সুন্দর কেন, চড়ুই? তোর এই রূপ বারবার আমাকে বেসামাল করে দিচ্ছে, বউ।"
লজ্জায় উমাইরার গাল টকটকে হয়ে উঠল। ওয়াসিফ মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে, তারপর দুই গালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বলে—
-"চোখ খোল। তোর একান্ত ব্যক্তিগত, হালাল নেশাটাকে দেখবি না?"
উমাইরা ধীরে জড়তা নিয়ে চোখ মেলে তাকাল। সামনে বসে থাকা সাদা পাঞ্জাবি পরা সেই পুরুষ...তার স্বপ্নের পুরুষ...এখন তার স্বামী। তারই নামের পাশে যুক্ত হয়েছে আজ উমাইরার পরিচয়। উমাইরা কাঁপা গলায় বলল—
-"আপনি আমার সব স্বপ্নকে ছুঁয়ে পূর্ণ করে দিয়েছেন। আমি কল্পনা করতাম, লাল বেনারশি পরে বসে আছি আপনার জন্য, আর আপনি আসছেন সাদা পাঞ্জাবিতে, আমার জীবনের রাজপুত্তুর হয়ে...আজ ঠিক তাইই তো হয়েছে। এই মুহূর্তটায় আমার জীবনের সব অপূর্ণতা যেন মিলিয়ে গেছে। আপনি আছেন, আমি আছি, এই ভালবাসা আছে। আমার বুক ভরে গেছে প্রশান্তিতে, চোখ ভরে গেছে আনন্দে। ভালোবাসি আপনাকে, ওয়াসিফ আয়মান...সবকিছুর জন্য। শুধু পাশে থাকার জন্য, আমার হয়ে থাকার জন্য।"
ওয়াসিফ একটুকরো হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলে—
-"ভালোবাসি, মিসেস ওয়াসিফ আয়মান।"
এই বলে সে নিজের ওষ্ঠে উমাইরার ওষ্ঠ স্পর্শ করায়, সেই প্রথম হালাল স্পর্শ। উমাইরার শরীর যেন কেঁপে উঠল আবেশে। ওয়াসিফ ধীরে তাকে আবার আসন ঠিক করে বসিয়ে দিল। তারপর গাড়ি আবার ছুটে চলল। নিঃশব্দ পাহাড়ি রাস্তায় জিপের শব্দ একমাত্র সঙ্গী। কিছুদূর যাওয়ার পর ওয়াসিফ হঠাৎ বলল—
-"একটা গান শোনা?"
-"কি?"
-"একটা গান ধর।"
-"এখন?"
-"হ্যাঁ, এখনই।"
-"হোটেলে গিয়ে শোনাবো না-হয়?"
-"না। আমি তো তোর গলা শুনতে চাই এই পথ চলার মাঝখানে, এই চাঁদের নিচে, এই রাতের আলোয়, আমার গাড়ির মধ্যে, আমার স্ত্রীর।"
উমাইরা ধীরে মুখ তুলে তাকাল। চোখে জল, ঠোঁটে হাসি। তখনও চাঁদ আকাশে একাই জ্বলছিল, তবে তারা আর একা ছিল না। স্বামীর প্রথম ইচ্ছে পূরণ করে উমাইরা ধীরে চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নেয়। জিপ ছুটে চলেছে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে, আকাশে অর্ধেক চাঁদ আর গাড়ির ভিতরে প্রেমে মোড়া নীরবতা। এই নিঃশব্দতা ভেদ করে হঠাৎ উমাইরার কণ্ঠে ভেসে আসে এক আবেগময় সুর, নরম, কোমল, কাঁপা গলা যেন এক হালকা বাতাসের মতো ওয়াসিফের গায়ে ছুঁয়ে যায়—
"Tumne jo hai maanga toh
Dil ye haazir ho gaya
Tumko maana manzil aur
Musafir ho gaya..."
ওয়াসিফ ধীরে তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে থাকে।
উমাইরার চোখ বন্ধ, ঠোঁটে গান, গালে একটুকরো লজ্জার আলো।
"Lo safar shuru ho gaya
Humsafar tu ho gaya
Lo safar shuru ho gaya
Mera humsafar tu ho gaya..."
ওয়াসিফের মুখে এক প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে, ঠিক সেই হাসি, যা শুধু জীবনের প্রার্থনা পূর্ণ হলে আসে।
"Dil ki bechaini ko aaya
Ab kahin aaram hai
Tu na ho toh sochta dil
Tujhko subaho shaam hai..."
উমাইরা গানের প্রতিটি চরণে যেন হৃদয় ঢেলে দিচ্ছে।
গাড়ির চারপাশে রাত গভীর, পাহাড় নিস্তব্ধ, আর ভিতরে সৃষ্টি হচ্ছে এক চিরন্তন মুহূর্ত।
"Iss kadar tu har ik pal mein
Mere shaamil ho gaya
Lo safar shuru ho gaya
Humsafar tu ho gaya..."
গান শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণের নীরবতা।ওয়াসিফ শুধু একবার বলে উঠল—
-"তুই জানিস না, তোর এই গলাটা আমার জীবনের প্রিয়তম নেশা।"
উমাইরা চুপ। শুধু একবার চোখ তুলে তাকাল।
তারপর জানালার কাঁচে মাথা রেখে ধীরে বলল—
-"আজ থেকে আমার জীবনের প্রতিটি গান আপনার জন্য, আমার একান্ত ব্যক্তিগত হালাল নেশা, আমার রাজপুত্র।"
ওয়াসিফ হাসে। গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়।
পাহাড়ি পথে জিপ এগিয়ে চলে, আর পেছনে রয়ে যায় উমাইরার সুরেলা কণ্ঠ, আর সেই একরাশ ভালোবাসা মেশানো শব্দ—
"Lo safar shuru ho gaya…"