প্রীতি, লামিয়া ও রাইসা, হিংসার বিষে আক্রান্ত হয়ে উমাইরার হৃদয়ে ছুঁড়েছে কথার বিষাক্ত তীর। সাজ্জাদ ও শান, হিংস্রতা আর প্রতিশোধের অন্ধ নেশায়, ওয়াসিফকে মুছে দিতে চেয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে।
অন্তিকা, ভালোবাসার স্নেহছায়া না পেয়ে অন্তর পুড়েছে, আর সেই জ্বালায় ওয়াসিফের সর্বনাশে নিজেকে উৎসর্গ করতে চেয়েছে।
অন্যদিকে, অয়ন ভালোবেসে প্রেয়সীর সব দোষত্রুটি মেনে নিয়েছে, ভুল হোক, গ্লানি হোক কিংবা অন্ধকার অতীত, সবকিছু ভালোবাসার স্রোতে ধুয়ে আপন করে নিয়েছে। লারা, বন্ধুত্বের অর্থ জানে বলেই জীবন দিতে পিছপা হয়নি এক মুহূর্তও। ওয়াসিফ, ভালোবাসার টানে পৌঁছে গিয়েছে নৃশংসতার শেষ সীমানায়, মানুষ খুন করতেও পিছপা হয়নি।
আর উমাইরা....সে বন্ধুত্বের জন্য নিজের সীমার ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়িয়েছে। নিজের প্রাণের থেকেও আপন মানুষদের আগলে রেখেছে বুক দিয়ে। অচেনাদের জন্যও বাড়িয়ে দিয়েছে সহানুভূতির হাত। ভালোবাসার জন্য, সে-ও পেরিয়ে গেছে রক্তের সীমারেখা, প্রয়োজনে হত্যার পথ বেছে নিতে পিছপা হয়নি।
এ যেন প্রতিটি সম্পর্কের গভীরতম মুখোশ খুলে ফেলার এক অব্যক্ত গল্প। যেখানে হিংসা, ভালোবাসা, প্রতিশোধ আর বন্ধুত্ব একে অন্যকে ছুঁয়ে, ধাক্কা দিয়ে, কখনো রক্ষা করে তো কখনো ধ্বংস করে। এই গল্পে কেউ একরঙা নয়। সবাই ধূসর। ভালোবাসা এখানে কখনো আশ্রয়, কখনো অস্ত্র। হিংসা কখনো প্রতিশোধ, কখনো আত্মরক্ষা। আর বন্ধুত্ব? কখনো সেটাই হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।
সাজ্জাদ ও শান, তাদের ভেতরে না ছিল অনুশোচনা, না ছিল কোনো বিবেকের আওয়াজ। অন্ধ হিংসা ও বিশ্বাসঘাতকতায় নিজেদের ডুবিয়ে দিয়েছিল তারা।
আর সবশেষে তাদের জন্য অপেক্ষা করেছিল নির্মম পরিণতি, মৃত্যু। যার ওপর ভরসা করে অন্য বন্ধুকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, সেই বিশ্বাসটাই একদিন তাদের নিঃশেষ করে দিল। বিশ্বাসভঙ্গের ফল কতটা বিষাক্ত হতে পারে, তার জ্যান্ত উদাহরণ হয়ে থাকল শানের মৃত্যু সাজ্জাদের হাতে।
আর অন্তিকা, ভালোবাসাহীন হৃদয়, অভিমানী আত্মা, আর ভাঙাচোরা আত্মবিশ্বাসের মিশেলে সে বেছে নিয়েছিল প্রতিহিংসার পথ। সব শেষে এখন সে একা, শূন্য, জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে নিজের অপরাধের মূল্য চুকিয়ে চলেছে, নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গভাবে।
প্রীতি, রাইসা ও লামিয়া, বিবেকের তীক্ষ্ণ দংশনে এক সময় নিজেদের ভেঙে গড়েছে নতুন ভাবে। অপরাধবোধ কুরে কুরে খেয়েছে তাদের ভিতরটা, নিঃশব্দে। শেষ পর্যন্ত, ক্ষমা পাওয়ার আশায় তারা করেছে দীর্ঘ অপেক্ষা, উমাইরার একটুকরো দৃষ্টি, একফোঁটা ক্ষমার স্পর্শ পেতে। নিজেদের অহং, অভিমান সব ভেঙে নুয়ে পড়েছে তারা, আর তাতেই পেয়েছে ক্ষমার আশীর্বাদ।
লারা ও উমাইরার মধ্যকার গভীর বন্ধুত্ব দেখে আজ প্রীতির চোখ খুলেছে। সে বুঝেছে, বন্ধুত্ব কেবল একসাথে হাসার নাম নয়, বন্ধুত্ব মানে পাশে থাকা, আগলে রাখা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। নিজের ভুলের কারণে সে হারিয়েছে এক অমূল্য মানুষকে, যার ভালোবাসা, যন্ত্রণা, বিশ্বাস সবটাই একপাক্ষিক ছিল না। ক্ষমা সে পেয়েছে, কিন্তু সেই পুরনো উমাইরাকে আর ফিরে পায়নি কখনো। এ-ই যেন তার জীবনের এক নীরব অনুতাপ।
---------------------
লারাকে দু’দিন পরই হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাড়িতেই চলছে তার সেবা-শুশ্রূষা। এর মধ্যেই সাজ্জাদুলের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে পুলিশ লারা ও উমাইরাকে থানায় তলব করে। সঙ্গে ছিল অয়ন, এহসান এবং মেহরাব। আর ওয়াসিফ তখন ইতালিতে, তার গবেষণাকাজ এবং ফর্মুলা চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত।
পুলিশ স্টেশনের ছোট একটি কক্ষে সকলেই বসে। লারা ও উমাইরা ধীরে ধীরে সেই রাতের সমস্ত ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছে। ঘর জুড়ে এক চাপা উত্তেজনা, নিঃশব্দতার ভেতরেও যেন শব্দের গুঞ্জন শোনা যায়। ঠিক এমন সময়ে সামনের ডেস্কে বসা অফিসারের মোবাইলটি বেজে ওঠে। ফোন রিসিভ করতেই তার মুখের রঙ বদলে যায়, চোখেমুখে ধরা পড়ে একরাশ অস্থিরতা।
ফোন রেখে দিয়ে তিনি একটু থেমে সকলের দিকে তাকালেন, তারপর কণ্ঠ নম্র করে বললেন—
-"দুঃখিত, আপনাদের আর আটকানো যাচ্ছে না। এখনই বাড়ি যেতে পারেন। ভবিষ্যতে আমরা আর আপনাদের বিরক্ত করব না।"
উমাইরা, লারা, অয়ন, এহসান, মেহরাব, সকলেই হতবাক। মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে, কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। বিস্মিত অয়ন একটু এগিয়ে এসে জানতে চায়—
-"কিন্তু হঠাৎ কি হলো, অফিসার? আপনারাই তো ডেকেছিলেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। এখন আবার বলছেন যাওয়ার কথা!"
অফিসার অস্বস্তির হাসি মুখে এনে বলল—
-"আসলে....উনি যে ওয়াসিফ আয়মানের স্ত্রী, সেটা তো আগে বলেননি! তাহলে তো আপনাদের এখানে আসতেই হতো না।"
এবার আরও চমকে উঠল সবাই। এহসান ধমকভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করল—
-"কে ফোন করেছিলেন আপনাকে?"
অফিসার নিচু গলায় একরকম শ্রদ্ধাভরে বলল—
-"ওয়াসিফ আয়মান। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী। ইউরোপিয়ান এলিটদের কাছে যিনি প্রিয়মুখ, এমনকি ইতালিয়ান মাফিয়াদের সঙ্গেও যার সখ্যতা। তার নাম শুনলেই বোঝা যায়, কারো হাত তার পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।"
বাকিটা আর কারও বোঝার বাকি থাকল না। নিঃশব্দে সবাই থানার দরজার দিকে এগিয়ে যায়। চোখে মুখে ছিল স্বস্তি, হৃদয়ে ছিল এক অদ্ভুত আশ্রয়ের অনুভব।
ওয়াসিফ যেন আবারও নিজের অস্তিত্বের শক্তি প্রমাণ করে দিল। যত দূরেই থাকুক, উমাইরার গায়ে কোনো আঁচ পড়তে দেবেন না, এই একটিই সত্য বারবার দৃঢ় হয়ে ধরা দেয়।
---------------------
দেড় মাস কেটে গেছে। সময় যেন নীরব পায়ে হেঁটে এসে ভবিষ্যতের দ্বার খুলে দাঁড়িয়েছে। উমাইরার এক্সিবিশন ঘনিয়ে এসেছে। ইতালিতে দীর্ঘদিনের গবেষণা শেষে ওয়াসিফও ফিরে এসেছে দেশে।
আর আজ, কানাডা যাওয়ার পালা উমাইরা ও লারার।
উমাইরার সব পেইন্টিং আগেই পাঠানো হয়ে গেছে। বাকি শুধু যাত্রা। রহমান ভিলার ড্রয়িং রুমে সবাই উপস্থিত, মাথায় মেঘ, চোখে রোদ্দুর। সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামছে লারা ও উমাইরা। দুজনেই যেন আলোকিত এক আলাদা ছায়া। তাদের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই, উৎসুক, স্নেহমাখা দৃষ্টিতে।
নিচে এসে উমাইরা মায়ের ও বাবার হাত দুটো ধরে বলল—
-"চিন্তা কোরো না। লারাকে ওর বাবার কাছে বুঝিয়ে দিয়েই ফিরে আসব।"
কথায় ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল বিশ্বাস। সবাই যেন হালকা প্রশ্বাস ফেলল। তবুও, কেউ জানে না, উমাইরা এখনো সব সত্য বলেনি। সে জানে, বলার সময় আসবে, কানাডার নিঃসঙ্গ রাতে।
রাতের ফ্লাইট। এহসান, মেহরাব, অয়ন, নিধী, স্নিগ্ধা, সবাই এসেছে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে। শেষ মুহূর্তের আলিঙ্গন, হাসি, কিছু না বলা কথা।
সবাইকে বিদায় জানিয়ে উমাইরা এগিয়ে এল ওয়াসিফের সামনে। চোখ তুলে একটু বাঁকা হাসিতে বলল—
-"বিয়ে না করেই সবার সামনে ‘বউ বউ’ বলে বদনাম করছেন আপনি। মিথ্যেকে সত্যি করার ইচ্ছে কি আদৌ আছে?"
ওয়াসিফ শান্ত মুখে তাকিয়ে রইল। তারপর গম্ভীর সুরে বলল—
-"সময় এলেই বুঝতে পারবি।"
উমাইরা হেসে মাথা নাড়াল। ফিরে যেতে যাবে, ঠিক তখনই ওয়াসিফ ওর হাত ধরে ফেলল। চোখে আদেশ, ঠোঁটে একরাশ অভিমান।
সবার উদ্দেশে বলল—
-"তোমরা গাড়িতে গিয়ে বসো। লারা, তুমি ভেতরে যাও।"
কেউ দ্বিধা করল না। উমাইরা কৌতূহলে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ওয়াসিফ এবার ঝুঁকে ওর কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। উমাইরার চোখ বন্ধ হয়ে গেল, সেই স্পর্শে যেন কেমন এক আশ্বাস মিশে গেল হৃদয়ে।
ওয়াসিফ মুখ তুলে বলল—
-"নিজের খেয়াল রাখবি। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবি। ফোন করলে সাথে সাথে রিসিভ করবি, এক সেকেন্ড দেরি হলেও খবর আছে।"
উমাইরা হেসে বলল—
-"আর যদি আমি বলি, সাথে যেতে?"
ওয়াসিফ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ বলল—
-"চল।"
-"সত্যি?"
উমাইরার চোখ গোল হয়ে গেল উচ্ছ্বাসে।
-"হ্যাঁ, চল।"
ওয়াসিফ তার হাতটা শক্ত করে ধরল। উমাইরা বিস্ময়ে, আনন্দে জমে গেল। ওয়াসিফ মোবাইলটা কানে নিয়ে এহসানকে কল করল—
-" আমি যাচ্ছি। বাকিদের বুঝিয়ে দিস।"
এয়ারপোর্টের গেটের দিকে হেঁটে যাচ্ছে দুটো মানুষ, একজন আঁকিয়ে, একজন রক্ষাকর্তা। সামনে একটা নীহারিকাময় পথ, যার নাম ভালোবাসা।
-----------------------
বাড়ি ফিরেই এহসান, মেহরাব, অয়ন, নিধী, স্নিগ্ধা সবাই ড্রয়িংরুমে বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল। সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনার ঘূর্ণাবর্তে প্রত্যেকেই যেন একরকম ক্লান্ত, শরীর যেমন অবসন্ন, মন তেমনি ভারাক্রান্ত।
পরিবারের বাকি সদস্যরাও এসে একে একে যোগ দিল। কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, ওয়াসিফ কোথায়?
অয়ন শান্ত গলায় জানাল—
-"ভাই আগেই টিকিট কেটে রেখেছিল। কাউকে কিছু না বলেই উমাইরাকে নিয়ে ফিরে গেছে। চিন্তার কিছু নেই।"
এ কথায় কারও মুখে আর প্রশ্ন জাগল না। সবাই ধীরে ধীরে নিজ নিজ কক্ষে চলে গেল। অয়ন রুমে ঢুকতেই প্রীতি নিঃশব্দে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল। এত কিছু ঘটে গেছে, মানসিকভাবে সবাইই বিধ্বস্ত। অয়ন প্রীতিকে খাটে বসিয়ে মাথা তার কোলের ওপর রেখে শুয়ে পড়ল। প্রীতি আদরের পরশে ওর চুলে আঙুল বুলাচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎ করেই, প্রীতি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। অয়ন চমকে উঠে বসে পড়ল। দু’হাত দিয়ে ওর মুখটা তুলে ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
-"কী হয়েছে জান, কাঁদছো কেন?"
প্রীতি কাঁদতে কাঁদতেই বলল—
-"লারা...লারা নিজের জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি উমাইরার জন্য। একটুও ভাবেনি নিজের কথা। অথচ আমি....আমি কী করলাম? ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি আমরা। তবুও, হিংসায় অন্ধ হয়ে বন্ধুত্বকেই শেষ করে দিলাম। আমি বন্ধু নামের কলঙ্ক। ক্ষমা পেয়েও ফিরে পাইনি আমার সেই একমাত্র বান্ধবীকে।"
অয়ন ওকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল—
-"কেঁদো না। যা হবার হয়েছে। উমাইরা তোমাকে ক্ষমা করলেও মনের গহীনে সেই আঘাতটা রয়ে গেছে। কথা অনেক সময় ছুরির চেয়েও গভীর ক্ষত তৈরি করে। তবু বলব, আমার বোন ননদ রূপে খারাপ না। বান্ধবী রূপে না পারলেও, ননদ রূপে সে পাশে থাকবে তোমার। নিজেকে একবার উমাইরার জায়গায় বসিয়ে ভাবো, ক্ষমা তুমি কি করতে পারতে?"
প্রীতি মাথা নাড়ল। সত্যিই, অয়নের কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। নিজের ভুলের শাস্তি হিসেবে একমাত্র বান্ধবীকে হারিয়েছে সে। ভাগ্য ভালো, অয়নকে হারায়নি।
পরদিন সকাল। ড্রয়িংরুমে সবাই জমা হয়েছে। এহসান সবাইকে নিজের কথায় চমকে দিল—
-"আমি....আমি নিধিকে বিয়ে করতে চাই।"
শব্দটা যেন বাজ পড়ার মতো আঘাত হানল ঘরে। সবাই একসাথে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
আজান রহমান বিস্ময়ে বললেন—
-"কি বলছিস এসব? এটা কীভাবে সম্ভব?"
এহসান নির্ভীক কণ্ঠে উত্তর দিল—
-"কেনো অসম্ভব? ওয়াসিফ ভাই আর উমাইরার জন্য তোমরা রাজি হলে, আমার জন্য কেন নয়?"
বাবা মুখ ফিরিয়ে নিলেন, শান্ত ভাবে বললেন—
-"বিয়েতে শুধু ভালোবাসা নয়, সম্মতিও লাগে। নিধি কি রাজি? আর ওর বাবা-মা? ওরা কি মেনে নেবে?"
এবার উঠে দাঁড়ালেন রুবাইদা বেগম। কণ্ঠে দৃঢ়তা, চোখে অধিকারবোধ।
-"কেনো দেবো না ভাইজান? আমাদের এহসানের মতো ছেলে কি আর খুঁজে পাওয়া যায়? আমার মেয়ে রাজি না থাকলেও, আমি জোর করে দিয়েই দেবো। ভাইয়ের ঘরে থাকলে আমার মেয়ে কখনো কষ্ট পাবে না।"
মেহরাবের বাবা মৃদু হেসে বললেন—
-"আমার কোনো আপত্তি নেই। ঘরের মেয়ে ঘরেই থাকুক, আর কি চাই!"
এই কথার পরই যেন ঘরজুড়ে স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করল। দাদাভাই হেসে বলে উঠলেন—
-"তাহলে ঠিক রইল, ওয়াসিফ আর উমাইরার সাথে একসাথেই বিয়ে হবে এদের। কী বলো সবাই?"
সবাই আনন্দের সাথে সায় দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে রুবাইদা বেগম আবারও মুখ তুললেন—
-"ভাইজান, আমার আরেকটা চাওয়া আছে!"
-"বল বোন, তোকে না বলতে পারি?"
-"মেহরাব...স্নিগ্ধাকে পছন্দ করে। তুমি কি স্নিগ্ধাকে ওর জন্য দেবে?"
স্নিগ্ধা অবাক হয়ে একবার মেহরাবের দিকে তাকাল। মেহরাব হাসিমুখে চোখ টিপে দিল। লজ্জায় স্নিগ্ধা দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। তার পেছন পেছন নিধিও ছুটল। ঘরে হেসে উঠল সবাই। দীর্ঘদিন পর যেন আবার আনন্দে ভরে উঠল রহমান ভিলা। চোখের জল মুছে, ভালোবাসা ফিরে এলো। ভবিষ্যৎ একসাথে পথচলার,তিনটি জুটি, তিনটি গল্প, এক হৃদয়ের মিলন।
-----------------------
দিন গড়িয়ে যাচ্ছে। বিয়ের প্রস্তুতি যেন ঘরজোড়া উৎসব। মেহরাব, স্নিগ্ধা, এহসান আর নিধী, সবাই যেন ছুটছে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। জামাকাপড়, গহনা, ডেকোরেশন, সব কিছুতেই ব্যস্ততার ছাপ। তবে বিয়ের আসল জৌলুশ, পোশাক নির্বাচন আর পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপ, সেটা তোলা আছে উমাইরার জন্য। ওর হাতেই সবটা জমা। উমাইরাকে আগেই সব জানানো হয়েছে ফোনে। খবর পেয়ে সে বেশ খুশি, কিন্তু এখন ওর দিনরাত মিশে আছে, এক্সিবিশনের প্রস্তুতিতে। লারা আর ওয়াসিফ ওর পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে, প্রত্যেক পদক্ষেপে সাহায্য করছে নিঃশব্দে।
ওয়াসিফ অনেক আগেই উমাইরার নিরাপত্তার জন্য একজন বডিগার্ড রেখেছিল, যার কাজ শুধু রক্ষা করা নয়, উমাইরার প্রতিটি খুঁটিনাটি খবর রাখা। তাই উমাইরার চলাফেরা, ব্যস্ততা, সব খবরই ওয়াসিফের জানা। যদিও প্রথমে সে সবটা গোপন রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু উমাইরা একদিন সরাসরি বলেই দিয়েছিল " আপনি সব জানেন, আমি জানি তা।"
আর মাত্র দুদিন পর উমাইরার স্বপ্নের প্রদর্শনী। আজ বিকেলেই সে ভিডিও কলে সবাইকে একসঙ্গে পেল। মুখে হাসি, চোখে উচ্ছ্বাস।
-"আমি তোমাদের সবার জন্য টিকিট কেটে রেখেছি। আগামীকাল ভোরেই ফ্লাইট।"
ওপাশে চুপচাপ বসে থাকা সবাই যেন একসাথে চমকে উঠলো। আজাদ রহমান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন—
-"কি বলছিস এইসব! আমরা এখন হঠাৎ করে কানাডা যাবো কেন?"
পাশ থেকে অন্য মুরুব্বিরাও বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন পর্দার ওপারে থাকা উমাইরার মুখের দিকে। সে হেসে বলল—
-"তোমাদের জন্য একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ আছে। যাও, গিয়ে সবাই প্রস্তুতি নাও। ফ্লাইটের সব ডিটেইলস অয়ন ভাইয়ার কাছে আছে। এখন রাখি, প্রচুর কাজ বাকি। কাল তোমাদের রিসিভ করতে আমি নিজে থাকবো এয়ারপোর্টে।"
একটু থেমে দাদু আর দাদীর দিকে তাকিয়ে কোমল গলায় বলল—
-"দাদুভাই, দাদী....জানি পথটা তোমাদের জন্য সহজ নয়। তবুও এসো না প্লিজ। তোমাদের না দেখলে দিনটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।"
বাড়ির সবার মনেই প্রশ্ন, কী হচ্ছে এসব? এমন হঠাৎ তাড়াহুড়ো কেন? এত অল্প সময়ে কানাডা যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ কারণ আছে। কারও মুখে প্রশ্ন জেগে উঠছে, কেউ বা শুধু চোখের ভাষায় অবাক ভাব প্রকাশ করছে। কিন্তু উমাইরার গলায় যে দৃঢ়তা, যে আবেগ, তাতে কেউ আর দ্বিধা করতে পারল না।
সব জিজ্ঞাসা, সব ভাবনা একপাশে সরিয়ে রেখে সবাই নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিতে লেগে গেল। লাগেজ খুলে জামাকাপড় গোছানো, পাসপোর্ট খোঁজা, টিকিট মিলিয়ে দেখা, ঘরের প্রতিটা কোণেই যেন ছুটোছুটি লেগে গেল এক অপার্থিব আনন্দ আর কৌতূহলের ছায়া নিয়ে।
----------------------
রাত পেরিয়ে এসেছে নতুন দিন। দিনের আলোয় ঝলমল করছে চারদিক, কিন্তু কানাডার আকাশে রয়েছে এক ধরণের শীতলতা, যেন রোদের মাঝেও জমে থাকা নিঃশব্দ ঠান্ডা। ফেব্রুয়ারি মাস, বরফের শহর এখনও সাদা কুয়াশায় মোড়ানো। আজ ১৩ তারিখ, আগামীকাল সেই বিশেষ দিন, উমাইরার স্বপ্নের এক্সিবিশনের প্রথম প্রহর।
আজ উমাইরা পরেছে এক সুন্দর নরম রঙের থ্রিপিস, তার উপর ঠান্ডা হাওয়া সামলাতে জড়িয়ে নিয়েছে উষ্ণ একটি ওভারকোট। মুখে হালকা মেকআপ, চোখে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি। ওয়াসিফ যথারীতি গম্ভীর, পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট, চোখে সেই চিরচেনা চশমা আর চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। হাতে ধরা একটি মোটা ওভারকোট, উমাইরার জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক নিচে। উমাইরা নামতেই চোখাচোখি হল দু’জনের। আর কোনো কথা না বলে দু’জনে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়লো এয়ারপোর্টের দিকে।
রাত আটটার ফ্লাইটে এসে পৌঁছল প্রিয় মুখগুলো, একে একে সবাই। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বিমানবন্দরের গেট পেরিয়ে বের হতেই উমাইরা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো সবাইকে। কারও চোখে বিস্ময়, কারও চোখে আনন্দের অশ্রু। বিদেশ বিভুঁইয়ে পরিচিত মুখগুলো যেন বাড়ির গন্ধ নিয়ে এসেছে। ব্যাগপত্র সব গাড়িতে তোলা হল। গাড়ি ছুটে চলল উমাইরার বাড়ির উদ্দেশ্যে, শান্ত, সুশৃঙ্খল, শিল্পের ছোঁয়ায় ভরপুর এক শান্ত আবাসস্থল।
বাড়িতে পৌঁছে সবাই একে একে গোসল সেরে, বিশ্রাম নিয়ে রাতের খাবার খেলো। তারপর ডাইনিং রুমের আলো-আঁধারিতে সবাই মিলে বসলো গল্প করতে। পরিবেশটা নরম, উষ্ণ আর ঘরোয়া।
এই সুযোগে উমাইরা হাসিমুখে ঘোষণা করল—
-"কাল সকাল দশটার আগে সবাই রেডি থাকবে। তোমাদের নিয়ে একটা জায়গায় যাবো। ওকে?"
-"কোথায় যাবি?"আজাদ রহমান প্রশ্ন করলেন কৌতূহল নিয়ে।
-"আছে বাবা, এখন বলব না। কালকে একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ আছে তোমাদের জন্য!" উমাইরার চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক।
ওয়াসিফ কফির মগ থেকে এক চুমুক দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল—
-"কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। যা বলছে শুনো, কাল সব বুঝে যাবে।"
সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। কোনো প্রশ্ন আর এল না। চোখেমুখে ছিল শুধু একটাই ভাব, ‘কাল’ কী আনবে, সেই অজানা আনন্দের অপেক্ষা।
----------------------
সকালের ঠান্ডা হাওয়ায় ঘরের জানালাগুলো ঝাপসা হয়ে আছে। তবে ড্রয়িং রুমে আলো জ্বলছে সম্পূর্ণভাবে, কেবল আলো নয়, সেখানে বসে থাকা মুখগুলোতেও রয়েছে আলো-আঁধারি ভাব। সকলে একসঙ্গে তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে। সবাই সোফায় বসে আছে, কিন্তু চোখেমুখে যেন প্রশ্নের ছায়া। ওয়াসিফ আর উমাইরার এখনো দেখা নেই। অথচ ঘড়ির কাঁটা দশ ছুঁইছুঁই। এক ধরনের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে সবার মনে, চিন্তার বুদবুদের মতো।
"কি হতে যাচ্ছে আসলে?"
"এইভাবে এত তাড়াহুড়ো করে সবাইকে কানাডা নিয়ে আসার মানে কি?"
"এই ভিসা, টিকিট, সব কিছু এত সহজে হয়ে গেল কীভাবে?"
কেউ মুখে বলছে না কিছুই, কিন্তু চোখে চোখে চলেছে নিঃশব্দ আলোচনা। কেউ কেউ ভেবেই নিয়েছে, উমাইরা পারেই। আর যেখানে ওয়াসিফ আছে, সেখানে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। তবুও, এক অজানা ভাবনা যেন বুকের ভেতর জমে আছে, আর তো ক'দিন পরেই ওরা আসতো বাংলাদেশে, তাহলে এত হঠাৎ তলব কেনো? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে ভাসছিল সবাই, ঠিক তখনই নামলো ওয়াসিফ।
সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ যেন ধীর সুরে বাজতে শুরু করলো ওর পায়ে পায়ে। আজ পুরোপুরি কালো পোশাকে সাজানো নিজেকে। কালো রংটা উমাইরার পছন্দ কি না, কালো শার্ট, কালো টাই, কালো শার্প কাট সুটকোট। চোখেমুখে দৃঢ়তা, পায়ে আত্মবিশ্বাসের ছায়া। যেন কোনো গল্পের রাজপুত্র।
ওকে দেখে যেন সবাই এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
রাহেলা বেগম ছেলেকে এভাবে দেখে নিজের বুকেই হাত রাখলেন। "এই ছেলেটা আমারই গর্ভজাত?"
আজকের দিনের সৌন্দর্য যেন উল্টো প্রশ্ন করে তাকে। ছেলের রূপে বিস্মিত হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, আর নিজের ভেতরে কোথাও গর্বে নীরব এক ঢেউ উঠল।
সবার মুখে প্রশংসার ঢল, কে হাসছে, কে মন্তব্য করছে, সবাই ওয়াসিফকে ঘিরে এক আনন্দময় গুঞ্জনে ব্যস্ত। ঠিক সেই মুহূর্তেই সিঁড়ির ওপরে ভেসে উঠল এক ছায়া। উমাইরা। গাঢ় নীলের তৈরি এক শাড়ি ওর উপস্থিতি যেন নিঃশব্দ বিস্ময় হয়ে দাঁড়ালো সবার চোখে। ঠাণ্ডার জন্য হালকা শাল জড়ানো কাঁধে। চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে মৃদু রঙ, আর মুখে আত্মবিশ্বাস আর রহস্যের মিশ্র এক অভিব্যক্তি। হাত ভর্তি নীল রঙের চুরি। মাথায় গোজা এক গাঢ় নীল রঙের গোলাপ। ওয়াসিফের পছন্দ নীল রং ও নীল গোলাপ। তাই আজ উমাইরা নীল রঙে নিজেকে সাজিয়েছে। সবার দৃষ্টি উঠে গেল একসাথে, আর থেমে রইল ঠিক সিঁড়ির মাঝপথে।
ওয়াসিফ দাঁড়িয়ে গেছে, অপলক তাকিয়ে আছে।
"এই মেয়েটা তার। শুধু তার। এই মুহূর্তে, এই নিঃশ্বাসে।"
উমাইরা সবার এমন চাহনি দেখে হেসে ফেলল। নিচে নেমে গিয়ে বলল—
-"এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো তোমরা?"
সবার মধ্য থেকে এহসান এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখল উমাইরার।
-"বোন আমার....আজ তো দেখছি তুই ওয়াসিফ ভাইকে মেরে ফেলার প্ল্যান করেছিস!"
বলেই হেসে উঠল সে। বাকিরাও হেসে উঠল সাথেসাথে, মুহূর্তটা হালকা হয়ে গেল উষ্ণতার আলোয়।