শীতের সকালে সূর্যের ঝিলিক খেলা করছে ধূসর কুয়াশার পর্দায়। জানালার ফাঁক গলে সোনালি আলোর রেখা এসে পড়েছে ওয়াসিফের শান্ত মুখশ্রীর ওপর। উমাইরা নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে সেই আলো আড়াল করলো-একটুখানি কোমল ছায়া যেন বুনলো তার প্রিয় মানুষের ওপর।
প্রকৃতি আজ যেন আপন রূপে নিজেকে সাজিয়ে তুলেছে। বাতাসে শীতের হিমস্পর্শ, অথচ হৃদয়ে এক অজানা উষ্ণতা। ওয়াসিফ এখনো নিদ্রামগ্ন, ক্লান্ত দেহ তার বিছানায় নিবিড় প্রশান্তিতে আবিষ্ট। উমাইরার চোখ আটকে আছে সেই মুখের প্রতিটা রেখায়। মনে মনে ভাবে-এতটা মোহনীয়, এতটা অসাধারণ মানুষটি কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে? এই সামান্য, সাধারণ অসুন্দর উমাইরাকে?
তার বিশ্বাসই হয় না। কেমন যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়। কিছুক্ষণ এভাবেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে সে আস্তে করে কোল থেকে মাথাটি নামিয়ে মাথার নিচে একটা বালিশ গুঁজে দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যায় তার নিজ কক্ষে।
------------------
আজকের দিনটি বিদায়ের। সকালের সূর্য যেমন নরম, তেমনই নরম সকলের মনও। প্রত্যেকে নিজের ব্যাগ-পত্র গুছিয়ে নিচে এসে জমায়েত হয়েছে। বিদায়ের মুহূর্তে সবার চোখে একরাশ বিষণ্নতা, অথচ ঠোঁটে সৌজন্যের হাসি।
এক এক করে সবাই নিজ নিজ গন্তব্যের পথে রওনা হয়। ওয়াসিফ এগিয়ে এসে অয়নের হাতে দুটো টিকিট ধরিয়ে দেয়-মালদ্বীপ যাওয়ার।
-"বিদেশে বিয়ে করার স্বপ্ন ছিল প্রীতির," ওয়াসিফ শান্ত কণ্ঠে বলল। "হয়তো বাস্তবে তা হলো না, কিন্তু এই হানিমুন হোক ওর সেই স্বপ্নের ছোঁয়া। আগামীকাল তোমাদের ফ্লাইট, সময় মতো চলে যেও।"
অয়ন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার ভাইয়ের জীবনে চলছে বিপর্যয়ের ঝড়, আর সে কিনা যাবে হানিমুনে?
-"তোমাকে এ অবস্থায় রেখে আমি কোথাও যাবো না," দৃঢ় স্বরে বলে ওঠে অয়ন।
-"বাচ্চামো করিস না অয়ন," ওয়াসিফ কাঁধে হাত রাখে। "এই মুহূর্ত আর ফিরে আসবে না। আমার চিন্তা বাদ দে। আমি সামলে নেবো। তুই বরং ওকে নিয়ে একটু ঘুরে আয়।"
অয়ন কিছু বলতে গিয়েও আর পারে না। ওয়াসিফের চোখে এমন এক দৃঢ়তা, যা সে উপেক্ষা করতে পারে না। অবশেষে সে ও প্রীতি রাজি হয়।
এক এক করে সবাই বিদায় নিয়ে চলে যায়। রহমান ভিলা যেন হঠাৎ নিঃসঙ্গতায় ভরে ওঠে। নিস্তব্ধ দেয়ালগুলো যেন কিছু একটা খুঁজে বেড়ায়। যাঁরা রয়ে গেছেন, তাঁরাও নিজেদের কক্ষে নিভৃতে সময় কাটাচ্ছেন। দিনটি কেটেছে এক নিঃশব্দ বিষণ্নতায়।
---------------
পরদিন সকালে সবার মুখে কিছুটা প্রশান্তির ছাপ। সকলে একসাথে টেবিলে নাস্তা করছেন, মাঝে মাঝে কথাবার্তা হচ্ছে হালকা গল্পে। আজ সন্ধ্যায় অয়ন ও প্রীতির ফ্লাইট। এদিকে উমাইরাও জানিয়েছে, কানাডা থেকে তার এক প্রিয় বান্ধবী আসছেন।
সন্ধ্যায়, পুরো পরিবারের সকলে মিলে এসেছে এয়ারপোর্টে অয়ন ও প্রীতিকে বিদায় জানাতে এবং উমাইরার বান্ধবীকে রিসিভ করতে। প্রীতি ও অয়ন ফ্লাইটের সময় হওয়ায় ভেতরে চলে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পেরোতেই কানাডা থেকে আসা বিমানটি ল্যান্ড করে।
সবাই অধীর অপেক্ষায়। হঠাৎ করেই কোথা থেকে এক উজ্জ্বল রূপবতী তরুণী ছুটে এসে জাপটে ধরে উমাইরাকে। এমন জোরে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে যে উমাইরা এক পা, দুই পা পিছিয়ে যায়।
সবার চোখে বিস্ময়ের ছায়া। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।
হঠাৎ উমাইরা আনন্দে চিৎকার করে ওঠে—
-"লারা!"
তারপর নিজের চিরচেনা সুরে সেই মেয়েটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, হাসতে হাসতে ঘুরতে থাকে গোল গোল।
সেই মুহূর্তে, এয়ারপোর্টের ব্যস্ত ভিড়ে এক নিখাদ আবেগ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর ফিরে পাওয়ার আনন্দে এক টুকরো গল্প জন্ম নেয়।
সবাই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেও মুহূর্তেই বুঝে যায়, এই তো সেই কাঙ্ক্ষিত রমণী, যার আগমনের অপেক্ষায় ছিল উমাইরার পরিবার। কারো মুখে কিছু না থাকলেও চোখে মুখে স্পষ্ট, সবার মনে প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেছে।
উমাইরা হেসে সবার দিকে তাকিয়ে বলে—
-"পরিচয় করিয়ে দিই, এ হলো লারা। আমার কলেজ জীবনের প্রিয় বান্ধবী, আত্মার আত্মীয়।"
লারা সবার প্রতি এক আন্তরিক হাসি ছুঁড়ে দেয়। ভদ্র, প্রাণবন্ত, আর স্বভাবজাত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যায় সকলে। কুশল বিনিময়ের এক আবেশী মুহূর্তের পর সকলে গাড়িতে উঠে পড়ে। সন্ধ্যার হালকা বাতাস গায়ে মেখে তারা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়, হৃদয়ে এক নতুন অতিথির উষ্ণতা আর পুরনো দিনের গল্পের আবেশ নিয়ে।
বাড়িতে ফিরে সবাই ক্লান্ত শরীর আর প্রশান্ত মন নিয়ে বিশ্রামে চলে যায়। ভ্রমণের ধকল, নতুন অতিথির আগমন এবং বিদায়ের আবহ মিলিয়ে যেন দিনের শেষ ভাগে নেমে আসে এক কোমল নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর ড্রইংরুমে বসে লারার সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডায় মেতে ওঠে এহসান, উমাইরা, স্নিগ্ধা। দাদু-দাদিও যোগ দেন সেই প্রাণখোলা আড্ডায়। কত পুরোনো স্মৃতি, নতুন গল্প, হাসি আর উচ্ছ্বাসে ঘরটা যেন আবার প্রাণ ফিরে পায়।
লারা মাঝে মাঝে হেসে ওঠে তার স্বভাবসুলভ উচ্ছ্বাসে, আর দাদু দাদির চোখে-মুখে ফুটে ওঠে অপার স্নেহ। মনে হয়, এ যেন অনেকদিনের চেনা মুখ, যাকে আজ বহুদিন পর ঘরে ফিরে পেয়ে ঘরও কথা বলতে শুরু করেছে। লারা কানাডিয়ান তবে উমাইরা তাকে বেশ ভালই বাংলা শিখিয়েছে এই কয় বছরে।
রাত গভীর হলে সবাই একসাথে রাতের খাবার শেষ করে। এরপর একে একে যার যার কক্ষে চলে যায় সবাই, একটা শান্ত, নিরুদ্বেগ রাতের আশায়।
----------------------------
নিস্তব্ধ রাত। চারদিক কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত। বাহিরে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস বইছে, যেন রাতটা নিজেই কিছু লুকিয়ে রেখেছে। ভাঙা একতলা একটি পুরনো বাড়ি, যার দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ আর ছাদের ফাঁক দিয়ে পড়ছে চাঁদের কুয়াশা মাখা আলো।
বাড়ির ভিতরে, ম্লান আলোয় দেখা যায় একটি পুরাতন ধুলো জড়ানো সোফা। সেখানে বসে আছে এক পুরুষ, পা এক পায়ের উপর তুলে রাখা, ঠোঁটে ঝুলছে একটি জ্বলন্ত সিগারেট। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে ঘরের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে উপরে উঠে যাচ্ছে। তার পেছনে দুজন বডিগার্ড পিস্তল হাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
সামনের টেবিলে রাখা, একটা লাইটার, সিগারেটের বাক্স, এবং একটা কালো পিস্তল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক ও এক নারী, তাদের হাতে কিছু গোপন ডকুমেন্টস ও একটি পেনড্রাইভ। বাতাস থমথমে, সময় যেন থেমে গেছে। হঠাৎ সেই বসে থাকা মানুষটি নিঃস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠল—
-"সব ঠিকঠাক এনেছ তো?"
ছেলেটি মাথা নুইয়ে বলল—
-"ইয়েস স্যার! আপনি চাইলে এক্সপার্ট দিয়ে চেক করিয়ে নিতে পারেন। সময় ছিল না, তাই শুধু সব কপি করে এনেছি।"
পুরুষটি ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকালেন।
-"ভালো কাজ করেছ। এই কাজের পুরস্কার তোমরা শীঘ্রই পাবে। কিন্তু এখন....ওয়াসিফের পাশে থাকো। কিছুতেই কারো কিছুর আঁচ পেতে দিও না। পরবর্তী বার যখন আমি ডাকব, ঠিক এই জায়গায় আবার দেখা হবে।"
-"আন্ডারস্টুড!"
-"তোমরা এখন যেতে পারো।"
দুজন ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে চলে যায়।
পুরুষটি টেবিল থেকে ডকুমেন্টস ও পেনড্রাইভ হাতে তুলে নিয়ে হঠাৎ এক অস্বাভাবিক উচ্চস্বরে হেসে উঠল, হাসি যেন শীতল, অন্ধকারে কাঁপন ধরানো।
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। শুধু সিগারেটের শেষ অংশে ধুঁকতে থাকা আগুনটা যেন সেই হাসির প্রতিধ্বনি।
-----------------------
মেহরাবদের বাসার ড্রয়িংরুমে হালকা হাসির রোল।
সন্ধ্যার কফি আর গল্পে জমে উঠেছে ঘরটা। সোফার একপাশে নিধী বিয়ের অ্যালবাম খুলে বসে আছে, একের পর এক ছবি দেখাচ্ছে, "এইটা দেখো, কতো সুন্দর ক্যান্ডিড!" সবাই একসাথে হাসছে, কোনোটা নিয়ে মজা করছে, কোনোটা নিয়ে প্রশংসা।
কিন্তু মেহরাব যেন একেবারেই অন্য জগতে।সে চুপচাপ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। আঙুল থেমে আছে এক ছবিতে, স্নিগ্ধা।
বিয়ে বাড়ির ভিড়েও যেন সে আলাদা জ্বলছে। চুলে গুঁজে রাখা গোলাপ, মুখে হালকা হাসি, অথচ চোখে গভীরতা। মেহরাব একটার পর একটা ক্যান্ডিড দেখতে থাকে, মাঝে মাঝে ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি খেলে যায়।
-"অদ্ভুত মেয়ে! এতটা সহজভাবে এতটা সুন্দর কীভাবে হয়?"মনে মনে ভাবে সে।
এই মুহূর্তেই নিধীর ফোনটা হঠাৎ বাজতে শুরু করে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে নাম—"এহসান কলিং..."
নিধী এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায়।
-"এক মিনিট, আমি একটু রুম থেকে আসি!"
বলেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে ফোন হাতে দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে যায়।
ড্রয়িংরুম আবার হালকা চুপচাপ। কিন্তু মেহরাবের মনে তখনো চলছে একটাই নাম, স্নিগ্ধা।
নিস্তব্ধ ঘর। একফোঁটা আলো নেই চারপাশে। অন্ধকারে ডুবে থাকা রুমে শুধু খোলা জানালা আর বারান্দা। ঠান্ডা বাতাস ঢুকে পর্দাগুলোকে ধীরে ধীরে দুলিয়ে যাচ্ছে, যেন নিঃশব্দে কোনো গল্প বলছে। নিধী ধীরে পা ফেলে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর নিঃশব্দে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। আকাশে চাঁদের আলো মিশে আছে হালকা বাতাসে।
নিধী ফোনটা কানে দিয়ে নরম, স্নিগ্ধ গলায় বলল—
-"হ্যালো?"
ওপাশ থেকে এহসান সেই পরিচিত কণ্ঠ শুনে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। গভীর, গাম্ভীর্যভরা পুরুষালি কণ্ঠে সে বলল—
-"কি করছিলে?"
-"ড্রয়িং রুমে সবাই বসে বিয়ের ছবি দেখছিলাম। আপনি?"
নিধীর কণ্ঠে ছিল একধরনের নরম প্রশান্তি।
-"মিস করছিলাম!"
-"অয়ন ভাইয়াকে?"
-"তোমাকে!"
এক মুহূর্তে নিধীর হৃদয়ে ঢেউ খেলে গেল। বুক ধক করে উঠলো। কান পর্যন্ত গরম হয়ে উঠল তার। লজ্জায় কণ্ঠ যেন সরে যায়, ধীরে বলল—
-"আজকেই তো এলাম, মিস করার কি আছে?"
-"বুকে ঝড় তুলে বলছো মিস করার কি আছে?"
নিধী চুপ। কথার ওজন যেন তার কণ্ঠ আটকে দিল। কী বলবে, ভাষা খুঁজে পায় না সে।
এহসানের গলা আবার ভেসে এল—
-"বুকের ভিতর তোলপাড় চলছে, নিধী। অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে। আর তার কারণ, তুমি! খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে বুকের মধ্যে টেনে আনার ব্যবস্থা করছি। তারপর এই যন্ত্রণার পুরো হিসাব তুলব তোমার কাছে!"
নিধী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। ফোন কানে, চোখে একরাশ লজ্জা আর অজানা আবেগ। সে ভেবেছিল, ভালোবাসা পেলে অনেক কিছু বলবে, অনেক গল্প জমে আছে মনে। কিন্তু এখন? এখন তার কণ্ঠ যেন সব কথা হেরে গেছে অনুভবের কাছে।নিধী ফোনে এহসানকে চুপচাপ শুনে বলল—
-"আপনি পাশে থাকলেই আমার সবকিছু ঠিক লাগে, আর না থাকলে, নিজের ভেতরটাও কেমন অচেনা মনে হয়।"
চুপচাপ থেকে গেল এহসান, নিধীর কথায় যে তার পুরো পৃথিবী আটকে।
-----------------------
পরদিন সকালে উমাইরা লারাকে সঙ্গে নিয়ে ভার্সিটিতে আসে। তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস ছিল, যা বিয়ের ব্যস্ততায় এতদিন বাদ পড়েছিল। ভাবল, অনেক দিন পর ভার্সিটিতে আসছে, সঙ্গে লারাকেও নিয়ে যাওয়া যাক, তাকে ঘুরিয়ে পুরো ক্যাম্পাস দেখানো যাবে।
ক্লাস শেষ করে দুজনে মিলে চলে যায় ক্যাম্পাসের এক শান্ত নির্জন কোণে, যেখানে নীরবতা আর সবুজ ছায়া মিলে একধরনের প্রশান্তি ছড়ায়। সেখানে বসতেই লারা জিজ্ঞেস করল—
-"তোর এক্সিবিশন কবে?"
-"আরও দুই মাস পর!" স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল উমাইরা।
-"পেইন্টিং শেষ?"
উমাইরা মাথা দুলিয়ে না বোঝাল। লারার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। বিরক্তির সুরে বলে উঠল—
-"তুই কি দেশে সব ফেলে মানুষের সেবা করতে এসেছিস? নিজের ক্যারিয়ারটাই নষ্ট করতে চাস? পাঁচটা বছর ধরে যেটার জন্য এত পরিশ্রম করলি সেটা এইভাবে শেষ করে দিবি?"
-"আরে ধীরে বল, পুরো কথা না শুনেই রিএক্ট করছিস কেন?"
-"আচ্ছা বল শুনি, পুরো কথা বল এখন।"
উমাইরা এক নিঃশ্বাসে বলল—
-"আর একটা পেইন্টিং বাকি আছে। বিয়ের আগে যা সময় পেয়েছি, টুকটাক করে বাকিগুলো শেষ করেছি। কিন্তু শেষটার ভাবনাটা কিছুতেই স্পষ্ট হচ্ছে না। কি আঁকব বুঝে উঠতে পারছি না।"
মুখটা তার মলিন হয়ে যায়।
-"এই জন্য এত দুশ্চিন্তা! গাধা একটা!" হালকা চট করে বলে লারা।
-"দুই মাস হাতে সময় আছে, একটা না একটা আইডিয়া আসবেই। মন দিয়ে বসে গেলে ঠিক বের হবে। না হলে যেগুলো বিক্রি হয়নি, সেখান থেকে একটা দিলেই চলবে।"
-"হুম, দেখি কি হয়। এখন বাদ দে এসব চিন্তার কথা।"
-"আচ্ছা শোন, তোর বাড়ির লোক জানে তুই একজন আর্টিস্ট? যে বছরে দুইবার এক্সিবিশন করে?"
-"না!" ছোট করে উত্তর দেয় উমাইরা।
-"মানে? কাউকে কিছু বলিস নি?"
-"না!"
-"বলবি না?"
-"বলব। এবার সবার জন্য কানাডায় এক্সিবিশনের টিকেট রাখব। সবাইকে নিয়ে যাব। সেখানে থাকব আমার দুইটা সারপ্রাইজ।"
লারা কৌতূহল নিয়ে ঝুঁকে পড়ল—
-"কেমন সারপ্রাইজ?"
-"সেটা এক্সিবিশনের দিনই জানতে পারবি। এখন এই প্রশ্ন বন্ধ কর। আমি বলব না কিছুই।"
-"ওকে বস!"
মজা করে লারা কপালে এক হাত স্যালুট ঠুকে দিল। উমাইরা তার কাণ্ড দেখে হেসে ফেলল। সেই হাসিতে যেন সব দুশ্চিন্তা একটু হলেও হালকা হলো।
----------------------
ঠাণ্ডা জমাট রাত। বাইরে কুয়াশায় ঢাকা চারদিক, নিঃশব্দ বাতাসে ভেসে আসছে হিমেল হাওয়া। জানালার কাঁচ জমে ওঠেছে, যেন কেউ আঙুল ছুঁলেই গুঁড়ো হয়ে যাবে। ওয়াসিফ একা। নিজের ঘরে বসে।
ঘরের আলো হালকা। বিছানার পাশে রাখা ডেস্কে ছড়িয়ে আছে কিছু গবেষণাপত্র, কিছু ছেঁড়া স্কেচ, আর অর্ধেক ফেলে রাখা কফির কাপ।
তবে ওয়াসিফের মন এখন অন্য কোথাও। চোখ স্থির, মুখে চাপা রাগ। বারবার তার ল্যাবে হামলা হচ্ছে। প্রতিবারই খুব নিখুঁতভাবে। সে জানে কে করছে। কিন্তু প্রমাণ নেই। এবার আর ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
ফোনটা তুলে সে মেসেজ পাঠাল বাকি চারজনকে:
-"আগের ল্যাবে ফিরে যাও সবাই। ওইখানেই আবার সব শুরু করতে হবে। আমি আসছি, সব ব্যাখ্যা দেব।"
শীতল বাতাসে কাঁপতে থাকা ঘরে ফোনটা ব্লিপ করে বেজে উঠলো। একে একে রিপ্লাই আসতে লাগল—
-"ল্যাবে আগুন দিয়েছে কে, তাকে ধরব না?
-'এই মুহূর্তে সেটা স্থগিত। আগে ফর্মুলাটা ইতালিতে পাঠাতে হবে। So, get back to work."
-"Understood."
ওয়াসিফ ফোনটা পাশে রেখে ধীরে ধীরে দুই হাত মাথার পেছনে রেখে শুয়ে পড়ল।
চোখ বন্ধ করল না। শুধু ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকল।
ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় ঠাণ্ডা হাসি,
যে হাসির গভীরে ছিল প্রতিশোধের আগুন, আর হিমের মতো নির্মম পরিকল্পনা।