আধফোটা প্রেমের ফুল

পর্ব - ১২

🟢

স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে মেহরাব যেন নিজের ভিতরের জগতেই হারিয়ে গেল। কাঁচা হলুদ শাড়ি, সাদা ফুলের গহনা, এক পাশে বিন্যস্ত চুলে ফুলের ছোঁয়া, সব মিলিয়ে স্নিগ্ধা যেন কোনো মায়াবী স্বপ্নের রূপ। তার মুখে হালকা মেকআপ, চোখে এক অপার কোমলতা। মেহরাব বিস্ময়ে অনুভব করে, সৌন্দর্য এতটা নিখুঁত, এতটা নীরব হয়ে তাকে জয় করে ফেলবে, সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।

স্নিগ্ধার পেছনে নিধী আসছিল ধীরে ধীরে, শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে তার চোখেমুখে এখন এক অনাবিল সারল্য আর নারীত্বের সূচনালগ্নের চিহ্ন। হলুদ শাড়ি, সাদা ফুলের গহনা আর খোপা করা চুলে গোঁজা কয়েকটি ছোট্ট ফুল তাকে এক অনন্য প্রভায় আলোকিত করেছে।

তাকে দেখতে গিয়েই থমকে দাঁড়াল এহসান। নিধীর দিকে তাকিয়েই যেন সময়ের গতি অন্যরকম হয়ে গেল। বুকের ভেতর হঠাৎ করেই অজানা এক আবেগ খেলে গেল, যেন হৃদপিণ্ড নিজের নিয়ম ভুলে অন্য সুরে বাজতে শুরু করেছে। এহসান বুঝে গেল, সে এক গভীর টান অনুভব করছে। নিধীর প্রতি, তার প্রতিটি ভঙ্গির প্রতি। এই অনুভবের নাম কী, সে জানে না পুরোপুরি। কিন্তু এটুকু বোঝে, এটা অন্য কিছু।

স্নিগ্ধা ও নিধিকে আসতে দেখে একবার চোখ তুলে তাকায় ওয়াসিফ। চোখ সরিয়ে নেয়ার আগেই সে থমকে যায়। ঠিক তখনই ধীরে ধীরে পেছন থেকে আসছে উমাইরা। খোলা চুলে হালকা কাঁচা ফুলের সাজ, কানে ছোট্ট একজোড়া ফুলের তৈরি দুল। পরনে হলুদ শাড়ি, মুখে কোনো প্রসাধনের ছোঁয়া নেই, শুধু হালকা লিপস্টিক আর চোখে একটুকরো কাজল। কিন্তু এতটুকুতেই তার মুখখানি যেন দীপ্ত হয়ে উঠেছে এক অজানা জ্যোতিতে। নিঃসন্দেহে এই স্নিগ্ধ রূপ, অনাবিল সরলতা ও আত্মবিশ্বাস মিলেমিশে ওয়াসিফকে বারবার পরাস্ত করছে।

ওয়াসিফ আচমকা দু’পা পিছিয়ে আসে। তার দৃষ্টি স্থির, হৃদস্পন্দন এলোমেলো। ওয়াসিফ প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, রাফসান ধরে ফেলে তাকে। রাফসান একটু অবাক হয়ে তাকাতেই, বুকের ওপর হাত রেখে ওয়াসিফ কাঁপা গলায় বলে ওঠে—

-"এই মেয়ে আমাকে মারার পাঁয়তারা করছে, রাফসান।"

রাফসান অবাক হয়ে হাসে, আর ওয়াসিফ একটু হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তার কাঁধে।

তিনজনের এই হালকা নাটকীয়তা আর মুগ্ধতা যেন মুহূর্তটাকে আরও মায়াবী করে তোলে। ওদিকে স্নিগ্ধা, নিধী, উমাইরা তাদের পাশ দিয়ে হেসেখেলে এগিয়ে যায়। প্রীতি ও অয়নের গায়ে ইতিমধ্যেই অনেক হলুদ লেগে গেছে, তারা কাজ সেরে রেডি হতে হতে বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তের সৌন্দর্যের কাছে যেন সময়ও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

অয়ন ও প্রীতিকে হলুদ লাগানোর পর উমাইরা, নিধী ও স্নিগ্ধা একসাথে এগিয়ে এসেছে ছেলেদের হলুদ লাগাতে। মেহরাব আর এহসান বেশ শান্তভাবে মেনে নিয়েছে, হালকা মুচকি হাসিতে ওদের মুখ রাঙা হলুদের ছোঁয়ায় রাঙিয়ে উঠেছে। কিন্তু ওয়াসিফ? সে যেন একেবারে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে! তার মুখে স্পষ্ট অনিচ্ছার ছাপ।

উমাইরা একটু থেমে, ঠোঁট কামড়ে সামান্য রাগ দেখিয়ে রাফসানের দিকে তাকায়। চোখেমুখে অগ্নি জ্বলে ওঠার ভঙ্গি করে বলে—

-"আপনার বন্ধুকে বলুন, হলুদ লাগাতে দিয়ে। হলুদ না লাগাতে দিলে কিন্তু আপনার খবর আছে, রাফসান ভাই!"

রাফসান তো আঁতকে উঠে দুই পা পিছিয়ে যায়। তারপর দুই হাত তুলে শান্তি চেয়ে ওয়াসিফের দিকে ফিরে বলে—

-"ভাই, দয়া করে আমার জান ভিক্ষা দে। হলুদ লাগিয়ে নিস। না হলে তোর এই বডিগার্ড আমাকে সত্যি মেরে ফেলবে!"

রাফসানের এই কাঁদো কাঁদো অবস্থা দেখে চারপাশে হাসির রোল পড়ে যায়। কিন্তু ওয়াসিফ তখনও গম্ভীর, তার মুখে কোনো হাসি নেই, বরং আরো সাবধানে দূরে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে।

ঠিক তখনই উমাইরা চোখে চোখে ইশারা করে স্নিগ্ধা ও নিধীকে। দুইজন বুঝে নেয় কাজের সংকেত। মুহূর্তেই নিধী ও স্নিগ্ধা দুই দিক থেকে ওয়াসিফের দুই হাত টেনে ধরে ফেলে।

ওয়াসিফ হতভম্ব, কি হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই উমাইরা দ্রুত এগিয়ে এসে দুই গালে ঠেসে হলুদ মেখে দেয়। আর তারপর একঝলক হাওয়ার মতো দৌড়ে পালিয়ে যায়।

ওয়াসিফ তৎক্ষণাৎ ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে—

-"আজ তোকে ছাড়ব না!"

বলেই লাগায় এক দৌড় উমাইরার পিছে। ছেলেরা হেসে কুটিপাটি, আর মেয়েরা উল্লাসে ফেটে পড়ে। আজকের এই হলুদের খেলায় হাসি, ছলনা আর হৃদয় সব একসাথে মিশে গেছে।

মেহরাব হেসে রাফসানের উদ্দেশ্যে বলে—

-"আচ্ছা ভাইয়া, তুমি উমাইরাকে এত ভয় পাও কেনো বলো তো?"

রাফসান চোখ বড় করে উঠে—

-"তোদের বোন তো বোন নয় লা, এজেনে জমদূত!"

মেহরাব অবাক হয়ে—

-"আরে ভাই, এমন বলছো কেনো? আমাদের এত লক্ষ্মী একটা বোন!"

রাফসান একটু নড়েচড়ে বসে, অতীত স্মৃতিতে ডুবে গিয়ে বলতে শুরু করে—

-"শোন তাহলে, তখন উমাইরার বয়স মাত্র দশ। সেদিন আমাদের একটা ফুটবল ম্যাচ ছিল। উমাইরা তখন তোর মনির এর কাছে ওয়াসিফের বাড়িতে ছিল। ওয়াসিফ বের হচ্ছিল মাঠে খেলতে, উমাইরা বায়না ধরল, 'আমি যাব, আমিও যাব!'

ওর বায়নার কাছে হার মেনে ওয়াসিফ নিয়ে এলো মাঠে। ওকে একটা বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে আমরা খেলায় মন দিলাম। তো খেলতে খেলতে এক পর্যায়ে আমি ওয়াসিফকে পাস দিলাম, কিন্তু বলটা সোজা গিয়ে লাগে ওর নাকে। ব্যস, সাথে সাথেই রক্ত ঝরতে শুরু করলো।

উমাইরা তো এই দৃশ্য দেখে ভয়ে না, বরং রেগে গিয়ে বেঞ্চ থেকে উঠে এক ছুট! আমি কিছু বোঝার আগেই সে মাঠের মাঝখানে হাজির, আর চারপাশ থেকে একটা ইট কুড়িয়ে নিয়ে আমাকে ধাওয়া দিলো।

চেঁচিয়ে বলছে—

'আমার ভাইজানকে মেরেছো! কোন সাহসে? আজই তোর শেষ দিন! দাঁড়া বলছি!'

পুরো মাঠজুড়ে আমি দৌড়াচ্ছি আর পেছনে ছোটে এক দশ বছরের ‘জমদূত’ হাতে ইট নিয়ে! কেউ তাকে থামাতে পারছে না। শেষমেশ, রক্তমাখা মুখে ওয়াসিফই এসে তাকে দুই হাতে জাপটে ধরে। কিন্তু তাতেও কি? ওর হাত-পা ছুরাছুরি করেই চলেছে, যেন আমাকেই শেষ না করে ছাড়বে না! মাঠে উপস্থিত সকলেই হাসাহাসি করে গড়াগড়ি খাচ্ছিল আমার এই নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে।"

মেহরাব হো হো করে হেসে উঠে—

-"ভাইয়া, তাই বলো! এখন বুঝি কেনো তুমি উমাইরার নাম শুনলেই গা কাঁপে!" বলেই হাসতে হাসতে পড়ে গেলো মাটিতে।

------------------------

-"উমাইরা, দাঁড়া বলছি! ধরতে পারলে আর রক্ষা নেই তোর!"

ওয়াসিফ হেসে হেসে দৌঁড়ে চলেছে উমাইরার পিছুপিছু। আর উমাইরা? সে যেন এক পাখির মতো হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে। বারবার পেছনে ফিরে তাকিয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে, তার সেই হাসি যেন সকালবেলার রোদ্দুরের মতো উজ্জ্বল, মুক্ত।

খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে ছন্দে ছন্দে, আর রঙিন শাড়ির আঁচল ছুটছে পেছনে, যেন দুষ্টু কোনো মেঘ খেলে বেড়াচ্ছে আকাশে।

ওয়াসিফ বারবার হাত বাড়াচ্ছে সেই আঁচল ধরতে, কিন্তু প্রতিবারই সে অপারগ, যেন এক অলৌকিক খেলার মাঝে হারিয়ে গেছে তারা।

দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে কখন যে রিসর্টের একদম শেষ সীমানায় চলে এসেছে, তারা টেরই পায়নি। চারদিক নিস্তব্ধ, জনমানবহীন, কেবল প্রকৃতির নিঃশব্দ উপস্থিতি। সামনে এগোনোর আর কোনো পথ নেই।

ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ করেই উমাইরার শাড়ির আঁচলে পড়ে এক টান। থমকে দাঁড়ায় সে। পেছনে ঘুরে দেখে, ওয়াসিফ দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে সেই পরিচিত চঞ্চল দৃষ্টি। আঁচলটা সে একহাতে ধরে, ধীরে ধীরে পেঁচিয়ে নিচ্ছে নিজের কবজিতে, যেন প্রতিশোধ নয়, এক কোমল দাবি।

ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসে উমাইরার দিকে, আর উমাইরা একপা একপা করে পেছাতে থাকে।

শেষমেশ পিঠ ঠেকে যায় এক ছায়াময় গাছের গায়ে। থেমে যায় তার গতি, আর ঠিক তখনই ওয়াসিফ এসে দাঁড়ায় তার সামনে। চোখে চোখ পড়ে যায় দুজনের, এক চঞ্চল, এক বিস্মিত। মুহূর্তটা স্থির, নিঃশব্দ, কেবল শোনা যায় দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ, আর দূরের ঝিঁঝিঁপোকার ডাক।

শাড়ির আঁচল তখনও ওয়াসিফের হাতে বাঁধা, আর তার দৃষ্টি....যেন উমাইরার হৃদয় পড়ে ফেলতে চাইছে এক নিঃশব্দ কবিতায়।

-"এবার কোথায় পালাবি?"

উমাইরার দৃষ্টি চঞ্চল, কখনও মাটির দিকে, কখনও ওয়াসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার নিচু হয়ে যায়। এতটা কাছে ওয়াসিফকে পেয়ে যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। শাড়ির আঁচল এখনও ওয়াসিফের হাতে, আর তার হৃদপিণ্ড যেন বুনছে অজস্র স্পন্দনের সুর।

মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলল সে—

-"এভাবে....সামনে এসে দাঁড়ালে....আমি তো ঠিকমতো....নিশ্বাসই নিতে পারি না...."

শব্দগুলো যেন ওর ঠোঁট ছুঁয়ে ধীরে ধীরে গলে পড়ছে বাতাসে, লাজুক অথচ গভীর।

ওয়াসিফের ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি খেলে যায়। সে একটু ঝুঁকে আসে উমাইরার দিকে, গলার স্বর নিচু, কিন্তু গভীর—

-"তোর দৌড়ের চেয়ে, তোর এই থেমে যাওয়াটা.... অনেক বেশি বিপজ্জনক, জানিস তো?"

উমাইরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। লজ্জায় তার পুরো শরীর আড়ষ্ঠ হয়ে গেছে। হাত-পা যেন জড়িয়ে এসেছে, নিঃশ্বাস হালকা ভারি হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকায় সে, ওয়াসিফের চোখে। আর ঠিক তখনই সময় যেন থেমে যায়।

ওই চোখের ভাষা....আজ একেবারেই ভিন্ন। চিরচেনা দৃষ্টিতে আজ যেন নেশা মেশানো আবেশ, গভীর টান, এক অনিবার্য টানের আহ্বান। উমাইরা তাকিয়েই থাকে, আশ্চর্য, স্তব্ধ, কৌতূহলী।

ওয়াসিফ তার সেই গভীর চোখের দৃষ্টিতে তাকিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে আনে নিজের মুখ। উমাইরার মুখশ্রীতে এসে পড়ে তার গরম নিঃশ্বাস—কাঁপন ধরায় সমস্ত স্নায়ুতে।

দূরত্বটুকু আর থাকে না। তপ্ত মুহূর্তে, নিঃশব্দে, ওয়াসিফ তার ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে দেয় উমাইরার নরম ওষ্ঠে এক নীরব, কোমল দাবি নিয়ে।

উমাইরা স্তব্ধ। শরীর নিথর, কিন্তু হৃদয় কাঁপছে, অজস্র তরঙ্গে। চারদিক নিস্তব্ধ। হাওয়া থেমে গেছে। পাতার মর্মর সরে গেছে। পাখির ডাক মিলিয়ে গেছে দূরে।

একটিমাত্র মুহূর্ত দাঁড়িয়ে আছে, দুজন মানুষের নিঃশব্দ বন্ধনে।

প্রায় মিনিট পাঁচেক পর, নিজেও হারিয়ে গিয়েছিল মুহূর্তের গভীরতায়, ওয়াসিফ ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয় উমাইরাকে। উমাইরা টলে পড়ার মতো অবস্থা, গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বুকে হাত রেখে জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। মুখটা রক্তাভ, চোখে এক ধরণের বিস্ময় আর লজ্জার মিশ্র প্রতিচ্ছবি।

তার এই অবস্থা দেখে হেসে ওঠে ওয়াসিফ। গলার স্বর চাপা, কিন্তু কটাক্ষে মোড়ানো স্নেহে ভরা—

-"এইটুকুতেই হাপিয়ে গেলি? সারাজীবন আমাকে সামলাবি কিভাবে? তুই কিন্তু বুঝে-শুনে, আমায় ভালোবেসে নিজের সর্বনাশ করেছিস।"

উমাইরা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে, নিঃশব্দ, নিথর। তার চোখে লেগে আছে হাজার প্রশ্ন, ঠোঁটে আটকে থাকা অজস্র অপূর্ণ বাক্য। তবু সাহস করে ফিসফিস করে বলে—

-"আপনি....আপনি কিভাবে জানলেন? আপনিও কি....আমাকে....?”

শব্দগুলো কাঁপছিল, ওর গলার মতোই। তার বুকের ভেতর যেন ছলাৎ করে উঠেছে কিছু, লজ্জা, উত্তেজনা, ভয়....আর অজানা এক আনন্দ। ওয়াসিফ কিছুই বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে উমাইরার চোখে, সেই চেনা, গভীর, নিশ্চিন্ত দৃষ্টিতে। তার চোখ যেন বলে দিচ্ছে, সব জবাব ওই দৃষ্টির ভেতরেই আছে। শব্দের প্রয়োজন নেই।

আকস্মিকভাবে, কোনো সতর্কতা না দিয়ে, ওয়াসিফ উমাইরার দুই বাহু টেনে নিয়ে আসে নিজের একদম কাছাকাছি। উমাইরার কথাগুলো ঠোঁটেই জমে যায়,তার বুক ধকধক করছে, ঠোঁট শুকিয়ে আসছে।

হঠাৎই ওয়াসিফ নিজের গাল দু’টো আলতো করে গোষে দেয় উমাইরার দুই গালে। মাখিয়ে দেয় হলুদের উজ্জ্বল রঙ, নরম গালের উপরে লেগে থাকে উষ্ণ ছোঁয়া আর একরাশ বিস্ময়। তারপর ঠিক যেমনটা হঠাৎ কাছে এনেছিল, তেমনি ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয় ওয়াসিফ।

উমাইরা খানিকটা পিছিয়ে যায়, চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে, লজ্জায়, হতবাক হয়ে।

ঠিক তখনই, ওয়াসিফ এগিয়ে আসে আবারও। সামনে নয়, এবার ঝুঁকে পড়ে একপাশে, খুব ধীরে, তাকে ছুঁয়ে না গিয়েও স্পর্শ করে।

উমাইরার শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ নামে। সমস্ত শরীর নিথর, শুধু চোখের পাতা ধীরে কাঁপে। হৃদপিণ্ডের শব্দ যেন কানে বাজছে।

ওয়াসিফের ঠোঁট উমাইরার কানের পাশে পৌঁছায়। কণ্ঠস্বর যেন মদিরা ভেজা, ধীরে, গভীর, মুগ্ধতা

ছোঁয়া—

-"এই শাড়ি পরে….আমাকে পুরোপুরি বেসামাল করে তুলেছিস। নিজের উপর আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছি না আমি। তোর এই লাজে রাঙা মুখশ্রী, এই অপার্থিব রূপ, এটা শুধুই আমার জন্য। এই সৌন্দর্যের কোনো অংশ অন্য কারও চোখে পড়ুক, আমি সহ্য করতে পারবো না। আজকের এই মুহূর্ত....এই অস্থিরতা....এই স্পর্শ সব কিছুর জন্য তুই দায়ী।"

কথাগুলো বলে ওয়াসিফ একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নেয় উমাইরার মুখ, তারপর নিঃশব্দে ঘুরে যায়। ধীরে ধীরে হাঁটা ধরে, যেন অনুভূতির ভার নিয়ে নিজেকে সামলাতে চাইছে।

আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে উমাইরা, নিঃশব্দ, স্তব্ধ, ভেতরে ঝড় বইতে থাকা এক নীরব পল্লবের মতো।

চারদিক তখনও নিস্তব্ধ, রোদ পড়েছে রিসর্টের বাঁধানো ইটের ওপর, বাতাসে শাড়ির আঁচল দুলছে ধীরে। উমাইরা বাকরুদ্ধ। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না, এইমাত্র কী ঘটে গেলো? "আমার শাড়ি পরাতে, ওয়াসিফ ভাই বেসামাল হয়ে গেলেন?" মনটা ধক করে উঠলো। মাথায় যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। "তাহলে কি....ওয়াসিফ ভাই আমায় ভালোবাসেন?" হ্যাঁ....ভালোবাসেনই তো! না হলে এমনভাবে চোখে চোখ রেখে বলতেন কেন? না হলে এমনভাবে ছুঁয়ে দিতেন কেন, এমন মুহূর্ত সৃষ্টি করতেন কেন?

তার বুকের ভেতর কেমন এক মধুর আলোড়ন জেগে উঠেছে। লজ্জায় মুখশ্রীটা লাল হয়ে উঠেছে, যেন বসন্তের পলাশ রঙ ছুঁয়ে গেছে গালের প্রান্তে।

মনের ভেতর গুনগুন করে বয়ে চলেছে এক অদ্ভুত অনুভূতি, নতুন, অচেনা, অথচ অতি আপন।

ভালো লাগার গভীর আবেশে ডুবে যাচ্ছে সে।

যাকে উমাইরা ভালোবাসে, সেই মানুষটিও....তাকে ভালোবাসে।

----------------------

ওয়াসিফ নিজের ঠোঁট মুছতে মুছতে হলুদের ভেন্যুতে এসে পৌঁছায়। মুখে এক রহস্যময় মুচকি হাসি। ওকে দেখেই মেহরাব, এহসান আর রাফসান তড়িঘড়ি করে এগিয়ে আসে।

ওয়াসিফের মুখের সেই চাপা হাসি দেখে ওরা থমকে যায়। তিনজনের চোখে কৌতুহল ও সন্দেহ একসাথে খেলে যায়।

মেহরাব চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে—

-"এই, এত হাসছো কেন?"

ওয়াসিফ মুখের হাসি গায়েব করে হালকা সুরে বলে—

-"তোরা কি করছিস এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?"

তিনজন একসাথে কোমরে হাত রেখে ওয়াসিফকে ঘিরে গোল করে দাঁড়ায়। সন্দেহে ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে।

এহসান একটু সন্দিহান হয়ে বলে ওঠে—

-"তুমি আগে বল, এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আর আমার বোন কোথায়? কি করেছ ওর সাথে?"

ঠিক সেই মুহূর্তে উমাইরা দুই হাতে শাড়ির আঁচল সামলে দৌঁড়ে আসে। ওর মুখে লাজুক এক চাহনি, আর দুই গালে লেগে আছে হলুদের দাগ, যেন সব কিছুই বলে দিচ্ছে। চুলগুলো এলোমেলো, নিঃশব্দে কাঁপছে বুকটা।

ওয়াসিফ চোখের কোণে মুচকি হেসে বলে—

-"ঐ যে তোর বোন। এবার সর, যেতে দে আমাকে।"

বলেই নিজের জিপে উঠে বসে। রাফসানও চড়ে বসে তার পাশে। ইঞ্জিনের শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে, ধুলোয় মিশে যায় গাড়ির ছায়া।

গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ। দিনভর হইহুল্লোড় আর আনন্দের পর সবাই এখন যার যার মতো বিশ্রামে গেছে। বেশ ভালোই কেটেছে দিনটা, রং খেলায় মেতে উঠেছিল সবাই, ছিল নাচ-গান, হাসি-মজা....সব মিলিয়ে জমজমাট এক উৎসবমুখর দিন।

এখন চারদিক খানিকটা নিস্তব্ধ। ক্লান্ত শরীরে বিশ্রাম নিচ্ছে সবাই। কারণ, সামনে যে আসল দিন, আগামীকাল বিয়ে। সেই দিনে থাকবে আরও উত্তেজনা, ব্যস্ততা আর ধকল। এক নতুন জীবনের শুরু, আর সবার ওপর দিয়েই চলবে দৌড়ঝাঁপ আর দায়িত্বের ভার।

----------------------

আজ বিয়ের দিন সবাই ভীষণ বেস্ত সময় পার করছে।

ছেলেরা সব খাবারের দিকটা দেখছে। উমাইরা, স্নিগ্ধা ও নিধী প্রীতির সাজগোজ দেখছে। পার্লার থেকে লোক এসেছে সবাই সাজগোজে বেস্ত। প্রীতির সাজ শেষ বাকি মেয়েরাও সেজে নিয়েছে ইতিমধ্যে। ছেলেরা সবাই এসে ফ্রেশ হয়ে রুমে তৈরি হচ্ছে। সবাই তৈরি হয়ে বাহিরে অনুষ্ঠানের দিকে গেছে। অয়নকে নিয়ে বাহিরে যাবে ছেলেরা তারপর ঘোড়ায় করে আসবে। সবাই বাহিরে অপেক্ষা করছে।

ওয়াসিফ নিজের জুতো খুঁজে পাচ্ছে না সারা ঘর ইতিমধ্যে খোজা শেষ। ক্লান্ত ও বিরক্তি নিয়ে খাটের ওপর বসে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে দুটি কোমল হাত খুব যত্ন সহকারে ওয়াসিফের পা দুটো ধরে জুতো পরিয়ে দিচ্ছে। ওয়াসিফ চমকে উঠে তাকিয়ে দেখে। সোনালী রঙের শাড়ি পরা এক রমণী। ওয়াসিফ চিন ফেলে এ আর কেউ নয় তার উমাইরা। জুতো পড়ানো শেষ হলে উমাইরা চোখ তুলে তাকায় ওয়াসিফের পানে। মিষ্টি একটি হাসি উপহার দেয়। ওয়াসিফ বিমুগ্ধ তার মোহনমল্লিকার রূপে। ওয়াসিফের পাঞ্জাবির সাথে মিলিয়ে উমাইরা শাড়ি পরেছে। ওয়াসিফ উমাইরার বহু ধরে উঠিয়ে জড়িয়ে ধরে।

-"মাশ আল্লাহ্। তোকে খুব সুন্দর লাগছে চড়ুই।"

উমাইরা লজ্জায় মুচকি মুচকি হাসছে। ওয়াসিফ তাকে ছাড়িয়ে কপালে আলতো করে ওষ্ঠ ছোঁয়ায়। তারপর বলে—

-"আর কে কে দেখেছে তোকে?"

-"কেউ না আপনিই প্রথম।"

ওয়াসিফ অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করলো ভেতরে। আরও কিছুক্ষণ মুগ্ধ নয়নে উমাইরাকে দেখলো ওয়াসিফ। হঠাৎই এহসান ডাকতে এসেছে ওয়াসিফকে দেরি হয়ে যাচ্ছে বের হতে হবে আবার আসতেও হবে। ওয়াসিফ উমাইরার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

----------------------

প্রীতি বেবি পিংক কালারের লেহেঙ্গা পড়েছে। তাকে কোনো রাজকুমারীর থেকে কম মনে হচ্ছে না। বড় যাত্রী এসে পড়েছে। মেয়েরা রিসর্টের ভেতর থেকেই ছেলে পক্ষের সাথে যোগ হয়েছে। সাদা ঘোড়ায় অয়ন বেবি পিংক কালারের শেরওয়ানি পড়ে এগিয়ে আসছে। প্রীতির কাজিনরা সবাই গেট ধরে রেখেছে। তারপর গেটে তুমুল ঝগড়ায় হেরে গিয়ে টাকা দিয়ে অয়নকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসানো হয় প্রীতির পাসে।

স্নিগ্ধা lavender রংয়ের সারার পড়েছে। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মেহরাব কালো পাঞ্জাবিতে। মেহরাব একটু ঝুঁকে স্নিগ্ধার কানে কানে ফিসফিস করে বলছে—

-"মারাত্মক লাগছে ম্যাডাম। আপনার রূপে আজকে আমি ঘায়েল।"

স্নিগ্ধা বিস্ফোরিত নয়নে তাকায়। মেহরাবের চোখে ভাষা যেনো পড়ে ফেলেছে সে। লজ্জায় মাথা নিচু করে মুচকি মুচকি হাসছে।

এহসানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নিধী। এহসান খেয়াল করেছে। অপরূপ সুন্দরী লাগছে তাকে। নিধিকে চমকে দিয়ে এহসান নিধীর কোমর ধরে এক টানে নিজের কাছে নিয়ে আসে। মুখ নিধীর কানের কাছে নিয়ে প্রশ্ন করে—

-"মারতে এসেছো? দেখছ না তোমার থেকে দূরে দূরে থাকছি। এই রূপ দেখিয়ে আমাকে মারার ফন্দি করেছ তুমি?"

নিধী আমতা আমতা করে বলল—

-"কি....কি বলছেন এহসান ভাই?"

-"বোঝ না কি বলেছি?"

নিধী দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বোঝায় সে বোঝেনি। এহসান দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে নিধিকে ছেড়ে দেয়। তারপর স্টেজে দৃষ্টি রেখে বলে—

-"আমার প্রেম পছন্দ না। নিজেকে তৈরি রেখো খুব শীগ্রই এহসান রহামনের নামে নিজেকে দলিল করে দিতে হবে তোমাকে।"

নিধী কি স্তব্ধ করে কথা গুলো বলে এহসান প্রস্থান করে।

-------------------

বিয়ের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। খাওয়াদাওয়া করে বিয়ের কাজ শেষ করতে করতে প্রায় রাত হয়ে গেছে। এখন সবাই বাসর ঘরের দরজা ধরে রেখেছে। অয়ন আবার এই বিষয়ে কোনো ঝামেলা চায়নি। এতদিন পর বউকে কাছে পাবে। গেট ধরে যে যা চেয়েছে অয়ন সেই মতোই দিয়ে বাসর ঘরে প্রবেশ করে।

অয়ন ও প্রীতিকে বাসর ঘরে দিয়ে সবাই যার যার মতো বিশ্রাম নিতে চলে গেছেন। মুরুব্বীরা এখনো বাহিরে বসে কথা বার্তা বলছে। আজাদ রহমান ও মোসলেম শেখের পরিবার এই বিয়েতে যথেষ্ট খুশি। প্রতিটা কাজ নিখুঁত ভাবে সম্পূর্ণ করেছে ছেলে মেয়ে গুলো। সবাই তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে রয়েছে।

অয়ন ও প্রীতিকে বাসর পাঠিয়ে, ওয়াসিফ এহসান মেহরাব ও রাফসান বেরিয়েছে একটু রাতের শহর দেখতে।

গাড়ি চলছিল ধীরে ধীরে, একঘেয়ে রাস্তা পেরিয়ে। জানালার পাশে বসে থাকা ওয়াসিফের মুখে হালকা এক তৃপ্তির হাসি খেলছিল বারবার। পাশে বসে থাকা রাফসান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে, চুপচাপ। আচমকা সে জিজ্ঞেস করল—

-"বল তো দেখি, কবে থেকে এত পাগল হলি?"

ওয়াসিফ একটু চমকে তাকাল তার দিকে, যেন বুঝতেই পারল না প্রশ্নটা কিসের দিকে ইঙ্গিত করছে।

পেছনে বসে মেহরাব ও এহসান ও একটু এগিয়ে এসে শুনতে শুরু করলো তাদের কথা।

আধফোটা প্রেমের ফুল পর্ব ১২ গল্পের ছবি