আধফোটা প্রেমের ফুল

পর্ব - ৭

🟢

-"কেমন আছিস উমাইরা?

প্রশ্নের উত্তর করলো না উমাইরা। নিঃশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে রইলো। সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রীতি, রাইসা ও লামিয়া। তাদের উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল উমাইরা।

-"আমদের ক্ষমা করে দে উমাইরা! আমরা ভুল করেছি। ভুল ছিলাম আমরা। তুই নির্দোষ ছিলি। আমরা হিংসা থেকে, শয়তানের প্ররোচনায় তোর সাথে অন্যায় করেছি। তুই সব সময় আমাদের সাপোর্ট করেছিস, পাশে থেকেছিস, ইমোশনালি আমাদের সাপোর্ট করেছিস। অথচো যখন তোর প্রয়োজন ছিল, তখন আমরা তোর সাথে খারাপ আচরণ করেছি, দুরত্ব বাড়িয়েছি। আমাদের মাফ করে দে উমাইরা, আমরা সত্যিই অনুতপ্ত। রাগের বসে মাথা কাজ করছিল না আমদের। যা মুখে এসেছে তোকে বলেছি। মাফ করে দে আমাদের।"

কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে কথা গুলো বলছিল প্রীতি, রাইসা, লামিয়া। অপরাধবোধ তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে।

উমাইরা এখনও উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে, নির্বিকার ভঙ্গিতে। তার বলার কিছু নেই, শোনারও কিছু নেই। পাঁচ বছর আগের অপমান এখনো তার হৃদয়ে ক্ষত হয়ে জ্বলছে। সেই ক্ষতের ওপর কেউ কখনো মলম লাগাতে আসেনি। তাহলে সে কেন আজ অন্যের কষ্টে সান্ত্বনা হয়ে দাঁড়াবে?

প্রীতি, রাইসা ও লামিয়া, তিনজনেই এসে দাঁড়ায় উমাইরার সামনে।প্রীতি কাঁপা কণ্ঠে বলতে শুরু

করে—

-"আমি বোকা, উমাইরা! একেবারে নির্বোধ! আমি একজন খারাপ মানুষ। আমি জানি, যেই অন্যায়টা করেছি, তার কোনো ক্ষমা হয় না। তুই ছিলি নির্দোষ, কিন্তু আমার হিংসা আমাকে কুরে কুরে খেয়েছে। সেই হিংসার বশে তোর সঙ্গে আমি অন্যায় করেছি, শব্দের বিষে তোকে ক্ষতবিক্ষত করেছি। আমি তোর জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেখেছি, সত্যি আমি ক্ষমার অযোগ্য। আমি হিংসার বসে তোর সাথে সম্পর্ক রাখতে চাই নি, অথচ বুঝতে পারিনি, তোকে হারিয়ে আমি আসলে নিজের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটাই করেছি। আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারছি না। তোকে ছাড়া আমার জীবন অপূর্ণ। আমার ভুলে আমি যে তোর মত বন্ধু হারিয়েছি, সেটা আজ বুঝতে পারছি প্রতিটি নিঃশ্বাসে।"

কাঁদতে কাঁদতে প্রীতি বলছে কথাগুলো। উমাইরা প্রতিক্রিয়াহীন দাঁড়িয়ে থাকে, নীরব, নিশ্চুপ। শুধু শুনে যাচ্ছে, কোনো কথা নেই, কোনো অভিব্যক্তি নেই।

এমন সময় রাইসা ও লামিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলে—

-"তোকেই আমরা দায়ী করেছিলাম সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার জন্য। অথচ আজ বুঝতে পারছি, যাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার জন্য তোকে দাই করেছিলাম, তারাই ছিল প্রতারক। ওরা আমাদের ঠকিয়েছে, বিষাদ, বিভ্রান্তি, মিথ্যার জাল বুনে আমাদের চোখে ধুলা দিয়েছে।আমরা সেই মিথ্যাকে সত্য ভেবে তোকে আঘাত করেছি, তোর পাশে না দাঁড়িয়ে তোকে একা করে দিয়েছি।

আমাদের কোনো মুখ নেই ক্ষমা চাওয়ার, উমাইরা। সত্যিই নেই। তবুও নির্লজ্জের মতো তোর সামনে দাঁড়িয়েছি। আমরা তোকে আবার ফিরে পেতে চাই। দয়া করে, ক্ষমা কর। আমাদের ফিরিয়ে দিস না, উমাইরা। আবার আপন করে নে একটিবার, শুধু একটিবার!"

নীরবতা ভেঙে অবশেষে মুখ খুলল উমাইরা। কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু সেই শান্ততায় জমে আছে বছরের পর বছর জমে থাকা রক্তক্ষরণ।

-"আমার সঙ্গে তো সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। এখন হঠাৎ আবার কেনো সম্পর্ক গড়তে চাইছেন?"

রাইসা কাঁদতে কাঁদতে জবাব দেয়—

-"ভুল ছিলাম আমরা, উমাইরা। অবুঝ ছিলাম। বুঝতে পারিনি, তুই আমাদের জীবনে কী পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ ছিলি। তুই চলে যাওয়ার পরেই বুঝেছি, তোর অভাব, তোর শূন্যতা আর ভালোবাসা, সব কিছু কেমন তীব্র হয়ে উঠেছে। তোকেই তো চাই, আবার আগের মতো করে চাই!"

উমাইরা এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে,নীরব, স্থির। তারপর বলে—

-"ভুল তো করেছিলেন। কিন্তু সব ভুল ঠিক করা যায় না। আসছি। ভালো থাকবেন।" এইটুকু বলেই উমাইরা চলে যায়।

পিছন থেকে তিনজনে একসাথে ডেকে ওঠে

-"উমাইরা! উমাইরা প্লিজ দাঁড়া!" কিন্তু তার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। একবারও পেছনে না তাকিয়ে সে এগিয়ে চলে, একেবারে নিশ্চুপ, কিন্তু ভেতরে একটা অধ্যায়ের চিরতরে ইতি টেনে।

-----------------------

বাড়িতে ফিরে উমাইরা কারও সঙ্গে একটি কথাও না বলে সোজা নিজের রুমে চলে যায়। সারাদিনেও আর বের হয় না। বাড়ির সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়,হঠাৎ এমন কী ঘটল মেয়েটার?

ঠিক তখনই অয়ন জানায়, ভার্সিটিতে প্রীতি, রাইসা আর লামিয়ার সঙ্গে উমাইরার দেখা হয়েছিল। পুরো ঘটনা বিস্তারিত খুলে বলে সে। সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

আজাদ রহমান একরাশ ক্লান্তি নিয়ে বলেন—

-"কি হবে এখন? মেয়েটার রাগ তো কিছুতেই কমে না। আবার না জানি কোন ঝড় উঠে আসে আমাদের ওপর!"

রাত নয়টা। পুরো ঘর নিস্তব্ধ, অন্ধকারে ডুবে। জানালার পর্দা হাওয়ার দোলায় বারবার উড়ে উঠে আবার ঝুলে পড়ে। ঘরের মেঝেতে এলোমেলো ভঙ্গিতে বসে আছে উমাইরা। পিঠ ঠেকানো খাটের সাথে, মাথা নিচু, দুই কোলের মাঝে গোঁজা। অন্ধকারে তার মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু শরীরভঙ্গি বলছে, সে বিধ্বস্ত, চূর্ণ।

ঠিক এমন সময় ঘরে প্রবেশ করে ওয়াসিফ। প্রথমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তাকায় ও, তার অভিব্যক্তি বোঝা কঠিন। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে উমাইরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।

একটু সময় নীরবে তাকিয়ে থাকে, তার দৃষ্টিতে সহানুভূতি, ভীষণ রকমের উদ্বেগ। তারপর একটানা নীরবতা ভেঙে ফিসফিস করে বলে—

-"তুই আবার ভেঙে পড়েছিস, উমাইরা?

আমি জানি, তোর ভেতরটা কতটা জ্বলছে। আমি দেখতে পাচ্ছি, অনুভব করতে পারছি। তুই চাইলেও তোকে যন্ত্রণাহীন রাখতে পারিনি। কিন্তু আজ, যদি একটু সঙ্গ নিতে চাস, আমি আছি। তোর পাশে। নিরবে হলেও আছি।"

উমাইরা মাথা তুলে ওয়াসিফের দিকে তাকায়। চোখ দুটো অসম্ভব লাল। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে সোজা হয়ে বসে বলল—

-"আমি যখন ছোট, একবার অনেক জ্বর হয়েছিল। স্কুলে যেতে পারিনি। প্রীতি, লামিয়া আর রাইসা স্কুলে গিয়ে জানতে পারে আমি আসিনি। তখন ওরাও ক্লাস না করে সোজা আমার বাসায় চলে আসে।

আমি তখন জ্বরে ঘোরে, কম্বলে মোড়ানো। সারা শরীর জ্বরে পুড়ছে, মুখ ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে। আমাকে ঐ অবস্থায় দেখে ওরা তিনজন সে কী কান্না! টানা দুই ঘণ্টা আমার মাথার পাশে বসে কেঁদেছিল।

তখন বাড়িতে ছিল শুধু মা আর অয়ন ভাইয়া। স্নিগ্ধা তখন অনেক ছোট। মা আর অয়ন ভাইয়া অনেক কষ্টে ওদের শান্ত করে। সারাটা দিন ওরা আমার পাশেই ছিল, একজন মাথায় ঠান্ডা পানি দিয়ে পট্টি দিচ্ছিল, একজন হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিল, আরেকজন ফল কেটে খাইয়ে দিচ্ছিল।

রাত দশটার দিকে বাবা এসে ওদের পৌঁছে দেয়। যতদিন জ্বর ছিল, ওরা প্রতিদিন নিয়ম করে এসে আমার যত্ন নিয়েছে।"

উমাইরা থেমে গেল। ওয়াসিফ নিঃশব্দে তার সব কথা শুনছে। উমাইরার চোখে অশ্রু নেই, সে পাথরের মতো বসে আছে। শান্ত ভঙ্গিমায় কথা বলছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করল—

-"স্কুলের দরজায় হাত লাগায় আমার এক নখ উঠে যায়। বেশ অনেকটা রক্ত পড়েছিল। ওরা তিনজন সেই ক্ষত দেখেই পুরো স্কুল মাথায় তুলে ফেলেছিল। হৈচৈ, কান্নাকাটি, দৌড়াদৌড়ি, সবই করেছিল। কোথাও কোনো ফার্স্ট-এইড বক্স পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন একজন নিজের ওড়না ছিঁড়ে আমার আঙুলে বেঁধে দেয়, আর বাকি দুজন আমাকে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে ঢুকেই শুরু করে চিৎকার-চেঁচামেচি, ডাক্তার ডাকো, রক্ত বন্ধ করো! সামান্য একটা আঘাত, অথচ আমার রক্তক্ষরণ ওরা কেউ সহ্য করতে পারেনি। প্রীতি তো পুরো রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে ভাসিয়ে ফেলেছিল।"

যাদের আমার হাতের ক্ষত সহ্য হলো না, আমার অসুখে যাদের বেশি কষ্ট হতো, তারাই কিনা একদিন আমাকে ক্ষতবিক্ষত করলো? কোথায় গেল সেই শৈশব? কোথায় গেল সেই বন্ধুত্ব? আমার খেলার সাথী, যাদের আমি আমার বোন মনে করতাম, তারাই একদিন আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য এত আয়োজন করলো! তাহলে এখন কেন সেই সম্পর্ক জোড়া লাগাতে চাইছে?"

ওয়াসিফ নির্বাক। কী বলবে সে? কী-ই বা বোঝানোর আছে তার? সে জানে, অন্যায় করেছে। আর সেই অন্যায়ের শাস্তিও তারা পাচ্ছে। অথচ যে দোষ করেনি, সে-ই আজ ক্ষমা করতে না পারার কষ্টে ভেঙে পড়ছে।

ওয়াসিফ ধীরে উমাইরার মাথায় হাত রাখে। শান্ত ও কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে—

-"তুই কি ওদের ওপর প্রতিশোধ নিতে চাস? তুই কি ঘৃণা করিস ওদের?"

উমাইরা মাথা নিচু করে বলে—

-"না....না! আমি কেন ওদের কোনো ক্ষতি চাইবো? ওদের কোনো ক্ষতি হোক, এটা আমি চাই না।"

ওয়াসিফ আবারও জিজ্ঞেস করে—

-"তুই ওদের ঘৃণা করিস, উমাইরা?"

উমাইরা নিশ্চুপ।

ওয়াসিফ আবারও কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করে—

-"ঘৃণা করিস?"

উমাইরা ফিসফিস করে বলে—

-"না।"

ওয়াসিফ হালকা মাথা নাড়ে।

-আমি জানি। তুই কাউকে ঘৃণা করতে পারিস না, এটা তোর মধ্যে নেই। কিন্তু ওদের করা অন্যায় আর অপমান তুই ভুলতে পারছিস না, সেটা আমি বুঝতে পারছি। তবুও এই ভুলতে না পারা, ক্ষমা করতে চেয়েও ক্ষমা করতে না পারাটাই তো তোকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে। নিজের কষ্টের অবসান ঘটানো কি আমাদের দায়িত্ব নয়? নিজেকে ভালো রাখা কি আমাদের নিজের প্রতি দায়িত্ব নয়? তুই বুদ্ধিমতি উমাইরা। তুই যা করবি আমি সব সময় তোকে সাপোর্ট করব। তোর পাশে থাকব। নিজেকে আর কষ্ট দিস না।"

সেই রাতে ওয়াসিফ চলে যাওয়ার পর উমাইরা একটু স্বাভাবিক হয়। অনেক কিছু বুঝতে পারে উপলব্ধি করে। নিজের কষ্ট বাড়িয়ে আর কোনো লাভ নেই।

----------------------------

উমাইরা আনমনে ভার্সিটির প্রাঙ্গণে হাঁটছিল। হঠাৎ কারো সঙ্গে ধাক্কা লাগে। সঙ্গে সঙ্গে সে ছিটকে সরে যায় এবং বারবার "সরি" বলতে থাকে।

যার সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল, সে আর কেউ নয়, প্রীতি।

প্রীতি হালকা হাসি দিয়ে বলে—

-"সমস্যা নেই, ব্যথা লাগেনি। তোর ব্যথার কাছে তো কোনো ব্যথাই কিছু না।"

উমাইরা চোখ তুলে তাকায়। সামনে প্রীতি, তার পেছনে রাইসা আর লামিয়া দাঁড়িয়ে। তাদের দেখে উমাইরা দ্রুত সরে যেতে চায়, কিন্তু প্রীতি তার হাত ধরে ফেলল। কাঁপা গলায় বলল—

-"মাফ করে দে না, উমাইরা। পাঁচ বছর ধরে তোকে হারিয়ে আমরা শাস্তি ভুগছি। জানি, তুই আমাদের ছাড়া ভালো ছিলি না, আমরাও পারিনি। তোর সঙ্গে দূরত্বই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।"

উমাইরা এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয়, উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রীতির কথাগুলো তাকে থামিয়ে দেয়। পায়ের গতিও থেমে যায়, চোখ দুটো স্থির হয়ে যায়, মাথা নিচু করে চুপচাপ শুনতে থাকে।

প্রীতি তখন কেঁদে ফেলল—

-"মাফ করে দে সোনা! আমরা তোকে অনেক ভালোবাসি। তোকে ছাড়া আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসে, মনে হয় বাঁচবো না। প্লিজ.....ক্ষমা কর। একটা অন্যায়ের জন্য অনেক বড় শাস্তি পেয়েছি আমরা, এই পাঁচটা বছর তোকে না পেয়ে। আর এই শাস্তি পেতে চাই না। ক্ষমা কর, শাস্তি থেকে মুক্তি দে।"

মনের অজান্তেই চোখ দিয়ে অস্রু গড়িয়ে পড়ছে। ঝাপসা চোখে সামনে তাঁকিয়ে দেখলো ওয়াসিফ দুই হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিগূঢ় চাহনি ছিল সামনে দণ্ডায়মান রমণীর পানে। উমাইরা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল পেছন থেকে ভেসে আসে তিনটি কাতর কন্ঠস্বর। যেই কন্ঠে ছিল অনুতপ্ত, অপরাধবোধ, ক্ষমা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

উমাইরা কাদঁছে, নীরব কান্না। যেই কান্নার শব্দ শোনা যায় না, শোনা যায় অজস্র অভিমান অভিযোগ। ঝাপসা দৃষ্টি ওয়াসিফের দিক তাক করা। ওয়াসিফ নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝেছে উমাইরা কষ্ট পাচ্ছে। কাছের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে এই দূরত্ব তাকে কষ্ট দিচ্ছে, ক্ষতবিক্ষত করছে। কিন্তু মনে জমে থাকা অভিমানের দেয়াল কাছে টানতে দিচ্ছে না বান্ধবীদের। উমাইরা এপর্যায়ে পিছে ঘুরে। আর পিছে ঘুরে উমাইর স্তব্ধ হয়ে যায়। প্রীতি, রাইসা লামিয়া কান ধরে হাঁটু গেড়ে বসেছে। চোখে অশ্রু, অপরাধবোধ, অনুতপ্ত, আকুল অনুরোধ ক্ষমা পাওয়ার। উমাইরা বিশ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উমাইরা ঘাড় বাঁকিয়ে পিছনে দাঁড়ানো ওয়াসিফের দিক দৃষ্টিপাত করলে, ওয়াসিফ তাকে চোখের ইশারায় বোঝায় ক্ষমা করে দিতে। উমাইরাও যেনো এইটুকুর আশাতেই ছিল। কেউ তাকে বলুক ক্ষমা করে দিতে আর উমাইর নির্দ্বিধায় ক্ষমা করে দিবে।

সব কিছু ভুলে উমাইরা ছুটে গেলো তিন বান্ধবীর নিকটে। নিজেও হাঁটু গেড়ে বসে জড়িয়ে ধরেছে বান্ধবীদের। যেনো বহু দিনের আকাঙ্ক্ষা, বহু দিনের অপেক্ষা ছিল। চার বান্ধবী হাউমাউ করে কাদঁছে। পথচারী সকলেই স্তব্ধ পায়ে দাঁড়িয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করছে। এরই মধ্যে সেখানে উপস্থিত হয় আর দু'জন মানব ও মানবী। উমাইরার পানে তাকিয়ে থাকে বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ। চার বান্ধবীর কান্না যেনো থামার নামই নিচ্ছে না। হঠাৎই পুরুষালি কন্ঠ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফিরে তাকায় চারজন।

-"আমরা কি ক্ষমা পাবো না?"

অয়ন ও স্নিগ্ধা দাঁড়িয়ে আছে ওয়াসিফের পাশে। স্নিগ্ধা কান ধরে ও অয়ন উমাইরার প্রিয় ফুল হুইয়াট লিলি (ম্যাডোনা লিলির) ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখশ্রী বিষন্নতায় ঘেরা, চোখে অপরাধবোধ, ক্ষমা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুই ভাই বোন। উমাইরা উঠে ছুটে গিয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাদঁছে। অয়ন বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। বোনের মাথা আলতো করে হাত রেখে বলছে—

-"ক্ষমা করে দে বোনু! আমি আর কখনও তোকে ভুল বুঝে আঘাত করবো না। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি মাফ কর আমকে। মনের মাঝে ক্ষোভ অভিমান পুষে রাখিস না। আগের মতন হয়ে যা আমার সোনা বোন।"

উমাইরা ভাইকে ছেড়ে দাঁড়িয়েছে, ভাইয়ের চোখের অশ্রু বৃদ্ধাঙ্গুলের সাহায্যে মুছে দিয়ে বলল—

-"এভাবে বলো না ভাইয়া! আমি তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করেছি। তোমারও আমাকে আমার ভুলের জন্য ক্ষমা করে দাও। আমি আর রাগ করে নেয় তোমাদের ওপর প্লিজ তোমরাও আর এইসব মনে রেখো না, ভুলে যাও সব।"

অয়ন বোনের চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে আবারও জড়িয়ে ধরলো তাকে, সাথে যুক্ত হলো স্নিগ্ধাও। তিন ভাই-বোন কেঁদে-কেঁটে ভাসিয়েছে। তিন ভাই-বোনের আবেগঘন মুহূর্ত দেখে রাইসা, প্রীতি, লামিয়া ও নিজেদের ধরে রাখতে পারল না ছুটে গেলো প্রিয় বান্ধবীকে আলিঙ্গন করতে। অয়ন উমাইরাকে ছেড়ে ওয়াসিফের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। দুই ভাই মিলে মেয়েগুলোর পাগলামো দেখছে। ওয়াসিফ ওদের কান্না দেখে বিরক্ত হচ্ছে। প্রায় দু'ঘন্টা যাবৎ এরা কান্না করছে আর কত সহ্য করায় যায়। ওয়াসিফ এবার বিরক্তি সূচক শব্দ করে বলে উঠলো—

-"মেয়ে মানুষ এত কাদতে পারে বাবা গো বাবা! এখনই তো বন্যা হয়ে যাবে রে তোদের পানিতে এইবার থাম তোরা আর সহ্য হচ্ছে না আমার। অনেক হয়েছে চল সবাই বাড়ি চল।"

উমাইরা সবাইকে ছেড়ে দাঁড়িয়েছে, সবাই মিলে নিজেদের চোখের পানি মুছে নিলো। উমাইরা ওয়াসিফ খোঁচা মারার জন্য ওয়াসফিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল—

-"দেখেছিস হিংসে হিংসে! আমাদের ভালবাসা দেখে একজনের গা জ্বলে যাচ্ছে বুঝলি। হুহ! হিংসুটে লোক কোথাকার।"

মুখ ভেংচিয়ে বলল উমাইরার কথা শুনে সবাই হেঁসে উঠলো। ওয়াসিফ চোখ রাঙিয়ে তাকিয়েছে উমাইরার পানে। সেই দৃষ্টি দেখে উমাইরা শুকনো ঢোক গিলে জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজে নিলো। তারপর সবাইকে তারা দিলো বাসায় যাওয়ার জন্য।

মন অভিমানের পালা শেষ। সবাই সবার ভুল বুঝে ক্ষমা চেয়েছে, ক্ষমা পেয়েছে। সবার সম্পর্ক আবার সেই আগের মত হয়েছে। কারও মনে এখন কোনো দুঃখ নেই, নেই কোনো অভিমান। দিন যায় দিন আসে সবার মধ্যেই এখন এক সুখকর অনুভূতি। সবার সাথে সবার মধুর সম্পর্ক পুনরায় তৈরি হয়েছে। উমাইরাও আগের মত চঞ্চল ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। সবাই বেশ খুশি উমাইরার সেই চিরচেনা রূপ দেখে।

--------------------------

সেই দিনের পর কেটে গেছে দুই মাস। সবকিছু যেন এখন আগের মতোই স্বাভাবিক। উমাইরা ফিরে পেয়েছে তার পুরোনো চঞ্চলতা, আর এতেই যেন বাড়ির সবার মুখে ফিরে এসেছে হাসি।

তবু মনটায় কোথাও একটা বিষাদের ছায়া রয়ে গেছে।

সময় হয়তো একদিন সে ক্ষত মুছে দেবে।

প্রীতিদের সাথে আগের মতো মিশতে কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু সম্পর্কটা সে ত্যাগও করবে না কখনো।

হয়তো একদিন,আবারও উমাইরার মনে পুরনো জায়গাটুকু ফিরে পাবে প্রীতিরা।

উমাইরার আজ ভার্সিটি নেই। দুই ফুপু ও তাদের পরিবারকে জরুরি তলব করেছে উমাইরা। সেই তলবেই সকলে এসে উপস্থিত হয়েছে রহমান ভিলায়। সবাই এখন ড্রয়িং রুমে বসে আছে উমাইরার জরুরি কথা শোনার জন্য। আজাদ রহমান কণ্ঠ স্ফুট করে নিঃশব্দে একটু খাঁকারি দিলেন, তারপর মৃদু স্বরে বলতে শুরু করলেন—

-"কি এমন জরুরি কথা বলো তো মা শুনি, সবাই অপেক্ষা করছে।"

-"আসলে আব্বু, ভাইয়া আর প্রীতির তো বিয়ের প্রোগ্রাম করা হয়নি! আমি ছিলাম না বলে ওরা কেউ প্রোগ্রাম করতে চায়নি। তাই আমি ভাবছিলাম, এখন যেহেতু আমি এসে গেছি এবার ওদের বিয়ের প্রোগ্রামটা করা উচিত।" উমাইরার কথার সাথে তাল মিলিয়ে রাহেলা বেগম ও রুমানা বেগম সম্মতি পোষণ করে বললেন—

-" হ্যাঁ! উমাইরা ঠিক বলেছে আজাদ। এইবার ওদের প্রোগ্রামটা করা উচিত। প্রীতির বাবা-মা যথেষ্ট ভদ্র মানুষ সেই জন্য এত বছর অপেক্ষা করেছেন। এইবার আমাদেরও উচিত তাদের সম্মান রক্ষা করার।"

-"হ্যাঁ বুবু! আমিও এটা নিয়েই বেশ কিছুদিন যাবৎ ভাবছিলাম। তোমাদের সবাইকে নিয়ে বসতামও, কিন্তু তার আগেই আমার বোঝদর মেয়েই বলে ফেলল সব। বেশ আমি প্রীতির বাবার সাথে কথা বলে তারিখ ঠিক করছি তবে।"

-"আব্বু, আরও একটি কথা ছিল আমার!"

-"হ্যাঁ বল!

-"আসলে আব্বু, প্রীতির ছোটো বেলা থেকেই অনেক শখ ছিল ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করবে। তো আমি ভাবছিলাম, আমাদের আপন কাছের আত্মীয়স্বজন ও প্রীতির কাছের আত্মীয়স্বজন আর কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবদের নিয়েই একটা ডেস্টিনেশন ওয়েডিং অ্যারেঞ্জ করলে কেমন হয়? তারপর আমরা ফিরে এসে না হয় বড় করে একটা রিসেপশন প্ল্যান করলাম যেখানে তোমরা প্রোফেশনাল বন্ধু-বান্ধব পাড়া-প্রতিবেশী ও পরিচিত সবাইকে ইনভাইট করলে। এটা করলে কেমন হয়?"

স্নেহের আলোয় ঝলমল মুখ, হৃদয়ের অতল গহ্বর থেকে উঠে আসা নিঃশব্দ উচ্ছ্বাস। চোখের তারায় খেলে বেড়াচ্ছে গর্ব ও ভালোবাসার মৃদু ঝিলিক। সবাই তাকিয়ে আছে উমাইরার মুখপানে। সবাই আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উমাইরাকে বলল—

-"এত ভাবনা তোর সবাইকে নিয়ে? আল্লাহ তোর সব কামনা-বাসনা পূরণ করুক মা! তোকে সব খারাপ থেকে দূরে রাখুক। সব ভালো তোর হোক এই দুয়াই করি আমরা। তুই যেইভাবে বলেছিস আমরা সেই ভাবেই করবো। প্রীতির ইচ্ছেকে আমরা সম্মান করবো। আমি আজই কথা বলব প্রীতির বাবার সাথে তারপর তারিখ ঠিক করে সবাইকে নিমন্ত্রণ করবো।"

সবাই বেশ খুশি হয়েছে এই সিদ্ধান্তে। এখন শুধু তারিখ ঠিক করার অপেক্ষা তারপরই শুরু হয়ে যাবে বিয়ের তোড়জোড়।

-----------------------

প্রীতি ও অয়নের বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে। নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখে। আজ নভেম্বরের ২ তারিখ। আর মাত্র ২৭ দিন বাকি। সবাই শপিং, ওয়েডিং প্লানিং নিয়ে বেস্ত সময় পার করছে। রিসোর্ট বুকিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বুকিং, প্রতিটা আত্মীয়স্বজন দের নিমন্ত্রণ, সকলের যাত্রার ব্যবস্থা করা, এইসব করতে বেশ অনেকটাই সময় চলে যাবে, সেইসব কিছু মাথায় রেখেই এত লেট একটি তারিখ বাছাই করা হয়েছে।

আধুনিক যুগ! সবার পছন্দ এখন ভিন্নি রকম। বাবা-মাদের পছন্দের সাথে এখনকার আধুনিক যুগের সন্তানদের পছন্দ মেলে না। এইসব কিছু ভেবে আজাদ রহমান— বোন-বোনজামাই, স্ত্রী, ছোট ভাই ও তার স্ত্রী, বাবা-মা সবাইকে নিয়ে বসেছেন কথা বলার জন্য। তিনি সবাইকে সবটা বুঝিয়ে নিজের চিন্তা প্রকাশ করেন। রুমানা বেগম সব কিছু শোনার পর একটি পরামর্শ দেন—

-"তুমি ঠিকই বলেছ। আমাদের পছন্দের সাথে ওদের পছন্দ নাও মিলতে পারে। কুণ্ঠাবোধ করে প্রকাশ করবে না। কিন্তু বিয়েটা তো ওদেরই, আর একবারই অনুষ্ঠান করা হয়। তাই ওদের মনমতো না হলে আমদেরও খারাপ লাগবে। তাই বলছিলাম, ওয়াসিফকে ও উমাইরাকে বিয়ের সব দায়িত্ব দেওয়া উচিত। ওয়াসিফ ওদের সবার বড়, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, বোঝদার ও দায়িত্বশীল ও একা হাতে সব সামলে নিবে। আর উমাইরা ভাই ও বান্ধবীর পছন্দ সম্পর্কে অবগত, ও যথেষ্ট দায়িত্বশীলও বটে ওয়াসিফকে সাহায্য করতে পারবে। আর বাকি ছেলে-মেয়েরা তো আছেই কেউ কাজের ক্ষেত্রে পিছপা হবে না। ওদের ওপর সব দায়িত্ব দিয়ে দাও। আর আমরা বড়রা একটু আনন্দ করি। ওদেরও তো দায়িত্ব নেওয়া শিখতে হবে নাকি? তোমরা সবাই কি বলো?"

সবাই বেশ কিছুক্ষণ ভেবে সহমত পোষণ করল। আজাদ রহমান বললেন—

-"হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ! অনেকদিন আমাদেরও কোথাও যাওয়া হয় না ঘুরতে। এই সুযোগে নিজেদের মতো করে আমরা সময়ও কাটাতে পারবো আবার বিয়ের কাজ ও সম্পন্ন হবে। আমি তবে মোসলেম শেখের (প্রীতির বাবা) সাথে কথা বলে সব ঠিক করছি। রাতে ওয়াসিফকে আসতে বলো বুবু।" রাহেলা বেগমের উদ্দেশে বললেন কথাটি।

-"ঠিক আছে!"

----------------------

রাতের বেলায় সবাই কাজ সেরে বাড়ি ফিরেছেন। ওয়াসিফকে ফোন করেই বলা হয়েছে এইবাড়িতে আসতে। যতদিন না বিয়ের উদ্দেশ্যে তারা রওনা হচ্ছেন এই বাড়িতেই থাকবে। বিয়ের অনেক তোড়জোড় চলছে কেনা-কাটা বাকি সবাই একসাথে করলে সহজ হবে।

সবাই বাড়িতে এসে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার শেষ করে ড্রয়িং রুমে বসেছেন। উমাইরা ও ওয়াসিফকে সম্পূর্ণ বিষয়টা খুলে বললেন। উমাইরা তো বেজায় খুশি। তার খুব সখ ছিল ভাইয়ের বিয়ের সব কাজ সে নিজে করবে। খুশির চোটে উমাইরা নাচা শুরু করে দিয়েছে। তাকে দেখে স্নিগ্ধা, নিধী (ছোট ফুপুর মেয়ে স্নিগ্ধার সমবয়সী) ওরাও এসে নাচা শুরু করে দিয়েছে। তিন বোন মিলে নাচের এক পর্যায়, অয়ন, এহসান ও মেহরাবকে টেনে নিয়েছে। সবাই মিলে অয়নকে মাঝে রেখে গোল গোল ঘুরছে আর গান গাইছে। ওদোর কান্ডো দেখে বড়োরা সবাই হাসছেন আর ভাবছেন "এতো দিনে তাদের বাড়িটা বাড়ি মনে হচ্ছে, উমাইরার জন্য।" প্রত্যেকটা সদস্যের চোখে-মুখে প্রশান্তির হাসি খেলা করছে।

ওয়াসিফ ল্যাবে ছিল, আজকে প্রচুর কাজের প্রেসার ছিল। নতুন একটি ফর্মুলার জন্য সবার ওপরে অনেক চাপ যাচ্ছে। অনেক ক্লান্ত থাকায় ওয়াসিফ উঠে বলতে শুরু করলো—

-"ঠিক আছে বিয়ের সব কিছু আমরা সামলে নেবো। তোমরা শুধু আনন্দ কর তাতেই চলবে। তোমাদের কিছু করতে হবে না। আমি দু'দিনের মাঝে ভালো একটা রিসোর্ট বুক করে নেবো। আর তুই ভালো কোনো ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের খোঁজ নে। খোঁজ পেলে অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে আমকে জানাস।"

শেষের কথা গুলো উমাইরার উদ্দেশে বলে প্রস্থান করলো ওয়াসফি। বাড়ির প্রতিটা সদস্য বেশ সন্তুষ্ট অনেক খুশি তারা ছেলে-মেয়ের ওপর। সত্যিই এমন সন্তান ভাগ্য করে পাওয়া যায়। প্রতিটি সন্তানের দিকে তাকিয়ে গর্ববোধ করছেন রহমান বিলায় উপস্থিত সকলেই।

ওয়াসিফ চলে যাওয়ার পর, অয়ন বাদে বাড়ির ছেলে-মেয়ে সকলে বাড়ির বড়দের উদ্দেশে বলে উঠলো—

-"তোমরা শুধু এইবার আমাদের কাজ দেখো আর এনজয় কর, বুঝলে?"

পাশ থেকে উমাইরা সবাইকে সাইড করে বীরের মত সামনে এসে দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে—

-"এই বিয়ে তো তোমরা শুধু চিল করবে বুঝেছো? কোনো কাজে হাত লাগবে না খবরদার। শুধু আমাদের কাজ দেখবে প্রশংসা করবে আর নিজেদের মতন সময় কাটাবে। মা, কাকিমণি, মনি, ছোট মনি আর দাদী তোমরা চাইলে কুটনামি করতে পারো আমাদের কোনো সমস্যা নেই, কি বলো দাদুভাই?"

-"হ্যাঁ, আমার দুই নম্বর বউ একদম ঠিক কথা বলেছে। অবশ্য এ কথা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। মেয়ে মানুষ মানেই তো কুটনামি, কি বলিস আজাদ?"

রসিকতার সুরে বললেন আরিফ রহমান। তার কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো উপস্থিত বাকি রমণীরা। তেড়ে গিয়ে বলতে শুরু করলো—

-"বাবা কি বলছেন আপনি? আমরা কুটনামি করি? তো আপনি কিভাবে জানলেন আমরা কুটনামি করি, নিশ্চই আপনিও সামিল ছিলেন সেই কুটনামিতে নইলে তো আপনার জানার কথা না!"

সন্দিহান হয়ে কথা গুলো বললো ফাহমিদা বেগম (কাকিমনি)। বাকি রমণীরাও তার কথায় তাল মেলালো। লেগে গেলো ছোট খাটো একটি দ্বন্দ্ব। ভাই-বোনেরা অসহায় হয়ে একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। কি বললো আর এরা কি বুঝে ঝগড়া শুরু করলো। ক্লান্ত ভঙ্গিমায় উমাইরা, এহসান, অয়ন, স্নিগ্ধা, নিধী, মেহরাব প্রস্থান করলো। ওরা চালিয়ে যাক ওদের ঝগড়া। এখন থামাতে গেলেই ওদেরও টেনে নেবে। তার চেয়ে বাবা থাক করুক ঝগড়া। পরে একাই ঠিক হয়ে যাবে।

--------------------

দোতলায় উঠে সবাই সবার রুমে চলে গেছে। এহসান ও মেহরাব এক সাথে থাকবে, আর স্নিগ্ধা নিধী একসাথে। ওরা সমবয়সী হওয়ায় একসাথে থাকতে দ্বিমত করে নি।

স্নিগ্ধা ও নিধীর চোখে আজ ঘুম ধরা দেয় নি। দু'জনেই শুয়ে আছে, দৃষ্টি উপরে সিলিংয়ের উপর স্থির। আপন মনে ভেবে চলেছে কিছু একটা। স্নিগ্ধা একটু শান্ত প্রকৃতির মেয়ে, অন্যদিকে নিধী উমাইরার মতন চঞ্চল প্রকৃতির। হঠাৎ নিধী উঠে এক হাত মাথায় রেখে বালিশে ঠেস দিয়ে রেখেছে। স্নিগ্ধার উদ্দেশে বলছে—

-"এই স্নিগ্ধা, বলছি কি শোন না!"

-"হুম, বল শুনছি।"

-"আচ্ছা এহসান ভাইয়ার কি গার্লফ্রেন্ড আছে?"

-"না, নেই! কেন বলতো?" কথাটা বলে স্নিগ্ধাও নিধীর দিকে ফিরলো।

-"দরকার আছে। আচ্ছা বল কোনো পছন্দের কেউ কি আছে?"

-"তুইও এমন ভাবে বলছিস না নিধী! থাকলেও বা কি আমকে কি বলবে নাকি, আমি কি ভাইয়ার ফ্রেন্ড নাকি যে আমকে বলবে?"

-"হুম তাও ঠিক।"

-"হয়েছে এইসব ভাবা-ভাবি অনেক এইবার ঘুমিয়ে পর।"

-"হুম! আচ্ছা চল ঘুমিয়ে পড়ি।" বলেই দুজনে ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিয়ে আবারও শুয়ে পড়ল।

আধফোটা প্রেমের ফুল পর্ব ৭ গল্পের ছবি